- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১৬, ২০২৬
মমির বুকে মহাকাব্য! ১,৬০০ বছরের নিদ্রাসঙ্গী ট্রয় যুদ্ধের কাহিনি, হতবাক প্রত্নতত্ত্ববিদেরা
মিশরের মরুভূমি ইতিহাসকে এমন ভাবে ফিরিয়ে আনে, হাজার বছরের ধুলো সরিয়ে হঠাৎ খুলে যায় কোনো বন্ধ দরজা। সে দরজার ওপারে থাকে মানুষ, বিশ্বাস, ভয়, মৃত্যু। আবার কখনো কখনো সাহিত্যের ভাষা। এমনই এক আবিষ্কার সামনে এল, যা শুধু প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসেই নয়, প্রাচীন সাহিত্যচর্চার ইতিহাসেও নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রায় ১,৬০০ বছর আগে মমিকরণের সময় এক মৃতদেহের সঙ্গে রেখে দেওয়া হয়েছিল হোমারের ‘ইলিয়াড’ মহাকাব্যের একটি অংশ। মিশরের প্রাচীন অক্সিরিঙ্কাস নগরীর ধ্বংসাবশেষে খননকার্য চালাতে গিয়ে সেই প্যাপিরাসের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। তাঁদের দাবি, কোনো গ্রিক সাহিত্যকর্মকে মমিকরণের আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে ব্যবহার করার এমন নজির এর আগে কখনো দেখা মেলেনি।
চমকপ্রদ এ আবিষ্কার ঘিরে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক প্রত্নতাত্ত্বিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কারণ, এত দিন মমির সঙ্গে যে সব গ্রিক প্যাপিরাস পাওয়া গিয়েছে, সেগুলির অধিকাংশই ছিল জাদুবিদ্যা, তন্ত্র-মন্ত্র কিংবা পরলোক সংক্রান্ত ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এই প্রথম কোনো মহাকাব্যের অংশকে মৃতদেহের সঙ্গে সমাধিস্থ করার প্রমাণ মিলল। বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট অব অ্যানশিয়েন্ট নিয়ার ইস্ট স্টাডিজ’ (আইপিওএ)-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অক্সিরিঙ্কাস প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে এই আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন গবেষক মাইতে মাসকোর্ত ও এস্থার পন্স। ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে মিশরের আল-বাহনাসা অঞ্চলে খননকার্য চলাকালীন ’৬৫ নাম্বার কবর’ নামে চিহ্নিত একটি সমাধিক্ষেত্রে রোমান যুগের একটি মমি উদ্ধার করেন নুরিয়া কাস্তেয়ানোর নেতৃত্বাধীন দল।
প্রথমে আর পাঁচটি প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের মতোই ছিল সেটি। কিন্তু মমিটির উদরের উপর রাখা ভঙ্গুর প্যাপিরাস গবেষকদের কৌতূহলী করে তোলে। পরীক্ষার পর স্পষ্ট হয়, এটি কোনো ধর্মীয় মন্ত্র বা যাদুবিদ্যার দলিল নয়। বরং প্রাচীন গ্রিসের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম, হোমারের ‘ইলিয়াড’–এর অংশবিশেষ। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, প্যাপিরাসটি সেখানে ঘটনাচক্রে এসে পড়েনি। বরং মমিকরণের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই সেটিকে মমির শরীরে স্থাপন করা হয়েছিল। অর্থাৎ, মৃত ব্যক্তির পরলোকযাত্রার সঙ্গে কোনো না কোনো ভাবে এই সাহিত্যকর্মকে যুক্ত বলে মনে করেছিলেন সে সময়ের মানুষ। এ আবিষ্কারের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অক্সিরিঙ্কাস প্রকল্পের অন্যতম পরিচালক ও ধ্রুপদী ভাষাতত্ত্ববিদ ইগ্নাসি-জাভিয়ের আদিয়েগো বলেছেন, ‘আমরা এর আগেও মমিকরণের সঙ্গে যুক্ত অবস্থায় গ্রিক প্যাপিরাস পেয়েছি। সেগুলি গুটিয়ে সিল করে মৃতদেহের সঙ্গে রাখা হতো। সেগুলির বিষয়বস্তু ছিল মূলত জাদুবিদ্যা বা ধর্মীয় আচারসংক্রান্ত। এই প্রথম কোনো সাহিত্য নিদর্শনকে এভাবে পাওয়া গেল।’ তিনি আরও জানান, ‘উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে অক্সিরিঙ্কাসে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রিক প্যাপিরাস আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে সাহিত্য পাণ্ডুলিপি পাওয়া নিঃসন্দেহে অভিনব ঘটনা।’
প্যাপিরাসটির প্রকৃত পরিচয় জানতে দ্বিতীয় দফার গবেষণা অভিযান চালানো হয়। সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ মার্গালিদা মুনার, প্যাপিরোলজিস্ট লিয়া মাসসিয়া এবং অধ্যাপক আদিয়েগো মিলে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষতিগ্রস্ত লেখাগুলির পাঠোদ্ধার করেন। অবশেষে তাঁরা নিশ্চিত হন, সেটি ‘ইলিয়াড’–এর দ্বিতীয় খণ্ডের বিখ্যাত ‘ক্যাটালগ অব শিপস’ অংশ থেকেই নেওয়া। গ্রিক সাহিত্যের অন্যতম পরিচিত এ অধ্যায়ে ট্রয় যুদ্ধের উদ্দেশে রওনা হওয়া গ্রিক বাহিনীর বিস্তৃত তালিকা রয়েছে। কোন রাজ্য থেকে কত জাহাজ এসেছে, কোন যোদ্ধা কোন বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন; তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে সেখানে। ট্রয় অভিযানের প্রস্তুতি ও গ্রিক শক্তির ব্যাপ্তি বোঝাতে এ অংশের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পশ্চিমা সাহিত্যের ইতিহাসে এটিকে অন্যতম স্মরণীয় অংশ হিসেবেও ধরা হয়।
যে স্থানে আবিষ্কারটি হয়েছে, সেই অক্সিরিঙ্কাস প্রাচীন মিশরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রেকো-রোমান নগরী। কায়রো থেকে প্রায় ১৯০ কিলোমিটার দক্ষিণে নীল নদের বাহর ইউসুফ শাখার কাছে অবস্থিত এ অঞ্চল বহু দশক ধরেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে অমূল্য ভাণ্ডার। শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে হাজার হাজার প্যাপিরাস এখানে তুলনামূলক ভাবে অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল। সাম্প্রতিক খননকার্যে ‘আল-বাহনাসা নেক্রোপলিস’-এ একটি বৃহৎ সমাধি-কমপ্লেক্সও চিহ্নিত হয়েছে। সেখানে চুনাপাথরের তৈরি তিনটি সমাধিকক্ষের মধ্যে একাধিক রোমান যুগের মমি এবং অলঙ্কৃত কাঠের সারকোফেগাস পাওয়া গিয়েছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৯২ সালে অধ্যাপক জোসেপ পাদ্রোর নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অক্সিরিঙ্কাস প্রকল্প’। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এ অভিযান বর্তমানে মিশরে স্পেনের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী প্রত্নতাত্ত্বিক কর্মসূচি। গবেষকদের মতে, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা সর্বশেষ অভিযানে যে সব আবিষ্কার হয়েছে, নতুন আবিষ্কৃত এই প্যাপিরাস নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। গবেষকরদের সামনে প্রশ্ন, মৃত্যুর পরে মানুষের যাত্রাপথে কেন একটি সাহিত্যকর্মকে সঙ্গী করা হয়েছিল? মৃত ব্যক্তি কি কোনো শিক্ষিত গ্রিকভাষী অভিজাত ছিলেন? না কি ‘ইলিয়াড’–এর কোনো বিশেষ অংশকে তৎকালীন সমাজে আধ্যাত্মিক বা প্রতীকী গুরুত্ব দেওয়া হতো? আপাতত এসব প্রশ্নের উত্তর অজানা।
❤ Support Us








