Advertisement
  • দে । শ
  • আগস্ট ৭, ২০২৬

স্বাক্ষরে ইতিহাসের পাঠ, নজর কাড়ছে নন্দলাল বসুর হাতের ছাপ — নেহরু চিলড্রেনস মিউজিয়ামে চলছে ‘সই-সাবুদ’ প্রদর্শনী

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
স্বাক্ষরে ইতিহাসের পাঠ, নজর কাড়ছে নন্দলাল বসুর হাতের ছাপ — নেহরু চিলড্রেনস মিউজিয়ামে চলছে ‘সই-সাবুদ’ প্রদর্শনী

কলমের আঁচড়ে ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ। এমনই এক ব্যতিক্রমী আয়োজন ঘিরে শিল্পপ্রেমীগবেষকসংগ্রাহক থেকে সাধারণ দর্শকদের ভিড় জমেছে কলকাতার নেহরু চিলড্রেনস মিউজিয়ামে। কলকাতা কথকতা’-র উদ্যোগে আয়োজিত সই-সাবুদ’ প্রদর্শনীতে এক ছাদের নীচে জায়গা পেয়েছে দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের বিরল স্বাক্ষরচিঠিদলিলস্মারক ও ব্যক্তিগত সংগ্রহ। আর দর্শকদের দৃষ্টি সবচেয়ে বেশি আটকে থাকছে শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর সংরক্ষিত ডান হাতের ছাপ। সংগ্রাহকদের দাবিএ নিদর্শন দুষ্প্রাপ্য।

নেহরু চিলড্রেনস মিউজিয়ামের একতলার প্রদর্শনীকক্ষে ৬ গস্ট শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে আগামী ৯ গস্ট পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা থাকছে প্রদর্শনী। শহরের ১৩ জন সংগ্রাহকের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বেছে আনা হয়েছে প্রদর্শনীর অধিকাংশ সামগ্রী। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়উজ্জ্বল সরদারফাল্গুনী দত্তরায়-সহ আরও অনেকে। তবে, প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর লাল রঙে সংরক্ষিত ডান হাতের ছাপ। শুধু স্বাক্ষর নয়শিল্পীর হাতের ছাপও যে ইতিহাসের অমূল্য দলিল হয়ে উঠতে পারেসে উপলব্ধিই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে এই সংগ্রহ। ভারতীয় আধুনিক শিল্পধারার অন্যতম নির্মাতাশান্তিনিকেতনের কলাভবনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ভারতীয় সংবিধানের অলংকরণের অন্যতম শিল্পী নন্দলাল বসুর বিরল স্মারক শিল্প-ইতিহাসের গবেষকদের কাছেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

অভূতপূর্ব এই প্রদর্শনীর নাম সই-সাবুদ। সেখানে ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন থেকে স্বাধীন ভারতের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়জ্যোতি বসুবুদ্ধদেব ভট্টাচার্যমমতা বন্দ্যোপাধ্যায়— বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের স্বাক্ষর যেমন রয়েছেতেমনই রয়েছে সাহিত্যশিল্পবিজ্ঞানক্রীড়া ও সংস্কৃতির অসংখ্য বরেণ্য মানুষের অটোগ্রাফ। ভারতের প্রথম মুখ্য বিচারপতি এলিজা ইম্পের ১৭৮২ সালের একটি চিঠিও প্রদর্শিত হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে গোপাল মুখোপাধ্যায়ের হাতে লেখা চিঠিভিভিএস লক্ষ্মণসৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়-সহ একাধিক ক্রীড়াবিদের স্বাক্ষর করা ব্যাটবল  অন্যান্য স্মারক।

একটি বিশেষ প্রদর্শনী সামগ্রী ইতিমধ্যেই দর্শকদের কৌতূহলের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সত্যজিৎ রায় নিজের হাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জর্জ বার্নার্ড শ‘-এর স্বাক্ষর অনুশীলন করেছিলেন। সেই অনুশীলনের একটি পাতাও প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে রয়েছে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার লিওনেল মেসির স্বাক্ষরিত জার্সি। আরও একটি ব্যতিক্রমী সংগ্রহ নজর কেড়েছে। জাদুকর পি সি সরকার জুনিয়র এক সময়ে জ্যোতি বসুভাস্কর চিন্তামণি কর  সত্যজিৎ রায়ের স্বাক্ষর নিয়েছিলেন সিমেন্টের উপর। সেই বিরল সিমেন্টের ফলকও প্রদর্শনীর অংশ। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কশিল্পীবিজ্ঞানীব্যবসায়ী ও ক্রীড়াবিদদের স্বাক্ষরও স্থান পেয়েছে এই সংগ্রহে।

আয়োজকদের বক্তব্যমোবাইল ফোন ও সেলফির যুগে অটোগ্রাফ সংগ্রহের সংস্কৃতি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ একটি স্বাক্ষরের পিছনে লুকিয়ে থাকে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎসময়ের প্রেক্ষাপটস্মৃতি এবং ইতিহাস। সেই হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই এ উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য। তাই প্রদর্শনীতে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে স্কুলপড়ুয়াদের। তাঁদের জন্য অটোগ্রাফ সংগ্রহচিঠি লেখাঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণ নিয়ে কর্মশালারও আয়োজন করা হয়েছেযেখানে সংগ্রাহকেরা তাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেবেন।

প্রদর্শনীর আর-একটি উল্লেখযোগ্য দিক প্রকাশনা। কলকাতা কথকতা’ ও ফাটাফাটি’-র যৌথ উদ্যোগে প্রদর্শনী থেকে নির্বাচিত একশো জন বিশিষ্ট ব্যক্তির স্বাক্ষর নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে একটি অটোগ্রাফ-সংকলন। পাশাপাশি ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেলদের ছবি নিয়ে সিগারেট কার্ড’-এর আদলে বিশেষ তাসের সেটও প্রকাশ করা হয়েছে। অটোগ্রাফ সংগ্রহের প্রসঙ্গে উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে একাধিক স্মৃতিও। জানা যায়কবির কাছে প্রায় প্রতিদিনই অটোগ্রাফের খাতা পৌঁছত। অনেকেই স্বাক্ষরের সঙ্গে কবিতাও চাইতেন। পরে মহাত্মা গান্ধীর অনুপ্রেরণায় রবীন্দ্রনাথ নিজের প্রতিটি স্বাক্ষরের বিনিময়ে দরিদ্র-ভাণ্ডারের জন্য এক টাকা নেওয়ার নিয়ম চালু করেছিলেন। যদিও স্নেহবশত বহু ক্ষেত্রেই তিনি সেই নিয়ম ভেঙে দিতেন। সে ইতিহাসও নতুন করে ফিরে এসেছে প্রদর্শনীর আবহে।

এদিকেপ্রদর্শনী চলাকালীন নেহরু চিলড্রেনস মিউজিয়ামকে ঘিরেও বড় স্বস্তির খবর মিলেছে। সম্প্রতি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ঘাটতি মেরামতে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা প্রয়োজন বলে সমীক্ষায় উঠে আসায় আগামী ১৬ গস্ট থেকে জাদুঘর বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপে সে সিদ্ধান্ত বদলেছে। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেআপাতত বন্ধ হচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। মিউজিয়ামের তরফে জানানো হয়েছেরাজ্য সরকারের সহযোগিতা ছাড়া প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ পরামর্শদাতা সুব্রত গুপ্তের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারের উদ্যোগে জাদুঘরের পরিকাঠামো উন্নয়নের পথও খুলে গিয়েছে বলে আশাবাদী কর্তৃপক্ষ।

উল্লেখ্য, ১৯৬৬ সালের ২২ ডিসেম্বর ৯৯ বছরের লিজে পাওয়া জমিতে গড়ে ওঠা এই মিউজিয়াম ১৯৭২ সালের ১৪ নভেম্বর উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। বর্তমানে এখানে ৯৬টি দেশের ১,১০০-রও বেশি পুতুলপ্রায় ৩০০টি গণেশ-মূর্তিমাটির পুতুলে রাম-রাবণের যুদ্ধের দৃশ্য-সহ একাধিক স্থায়ী প্রদর্শনী রয়েছে। ন্যাশনাল কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন’-এর পরিচালনায় চলা এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় ২ কোটি দর্শনার্থী এসেছেন বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!