Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • আগস্ট ৭, ২০২৬

সংখ্যার রাজনীতিতে ‘ডিলিমিটেশন’ মোড়: অবস্থান স্পষ্ট করল ডিএমকে, সব দলের সাংসদদের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বিজয়

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সংখ্যার রাজনীতিতে ‘ডিলিমিটেশন’ মোড়: অবস্থান স্পষ্ট করল ডিএমকে, সব দলের সাংসদদের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বিজয়

ডিলিমিটেশন বা লোকসভা কেন্দ্রের সীমানা পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে জাতীয় রাজনীতিতে ফের উত্তাপ ছড়িয়েছে। নরেন্দ্র মোদি সরকার মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর করতে লোকসভার আসন বৃদ্ধি এবং সে সূত্রে সংবিধানের ১৩১তম সংশোধনী বিল আবার সংসদে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী ১৬ আগস্ট থেকে বিশেষ অধিবেশনেরও কথা শোনা যাচ্ছে। এরই মধ্যে জল্পনা ছড়িয়েছিলদীর্ঘদিনের বিরোধিতার অবস্থান থেকে সরে এসে দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝগম (ডিএমকে) হয়তো বিলটিকে সমর্থনের কথা ভাবছে। কিন্তু শুক্রবার সে জল্পনায় কার্যত ইতি টেনে দিলেন ডিএমকে নেতাতামিলনাড়ু বিধানসভার বিরোধী দলনেতা উদয়নিধি স্টালিন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, ‘ডিএমকে শুরু থেকেই ডিলিমিটেশন বিল’-এর বিরোধিতা করেছে ভবিষ্যতেও সে অবস্থান বজায় রাখবে।

‘ডিএমকে’ নেতার এই মন্তব্য শুধু তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেনিসংসদের সংখ্যার অঙ্কেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণলোকসভায় সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সে সংখ্যা জোগাড় করা বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের কাছে সহজ নয়। ফলে লোকসভায় ডিএমকের ২২ জন সাংসদের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তামিলনাড়ুর রাজনীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পর থেকেই নয়া জল্পনার সূত্রপাত। বিধানসভা নির্বাচনের পরে কংগ্রেস বহু বছরের জোটসঙ্গী ডিএমকে’-এর হাত ছেড়ে মুখ্যমন্ত্রী সি. জোসেফ বিজয়ের সরকারকে সমর্থন করে। তারপর থেকেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়, ‘ডিলিমিটেশন প্রশ্নে ডিএমকে কী কেন্দ্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতার পথে হাঁটছে সে সম্ভাবনাকে আরও উসকে দিয়ে একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্ত মানলে দলটি বিলের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান নিতে পারে স্ট্যালিনের দল।

তবে, এদিন উদয়নিধির বক্তব্যে পরিষ্কারমহিলা সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস এবং ডিলিমিটেশন’-এর শর্ত জুড়ে দেওয়ার পদ্ধতির সঙ্গেও তাদের মৌলিক আপত্তি রয়েছে। তাঁর দাবি, মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করার জন্য ডিলিমিটেশন’-কে অপরিহার্য শর্ত বানানোর যুক্তি তাঁরা মেনে নেবেন না। এদিকেবিষয়টির গুরুত্ব বুঝেই শনিবার তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রাজ্য থেকে নির্বাচিত সব দলের লোকসভা ও রাজ্যসভার সাংসদদের বৈঠকে ডেকেছেন। টিভিকে’-এর কোনও সাংসদ বর্তমানে সংসদের দুকক্ষেই না থাকলেও, ‘ডিলিমিটেশন ইস্যুতে সর্বদলীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা হিসেবে এ বৈঠককে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতেদক্ষিণ ভারতের অভিন্ন স্বার্থের প্রশ্নে বিজয়ের এ উদ্যোগ আগামী দিনের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিতও হতে পারে।  

এদিকে, সংসদের অঙ্কও এখন বিজেপির সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে ৫৪৩ সদস্যের লোকসভায় তিনটি আসন শূন্য রয়েছে। সব সদস্য ভোটাভুটিতে অংশ নিলে সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে প্রয়োজন হবে ৩৬০টি ভোট। গত ১৭ এপ্রিল একই ধরনের বিল লোকসভায় তোলা হলেও দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না থাকায় তা পাশ করাতে ব্যর্থ হয়েছিল কেন্দ্র। সে সময় ৫২৮ জন সদস্য ভোটে অংশ নিয়েছিলেন। বিল পাশের জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৫২টি ভোটকিন্তু সরকারের পক্ষে পড়েছিল মাত্র ২৯৮টি ভোট। তবে এপ্রিলের পর রাজনৈতিক সমীকরণে কিছু পরিবর্তন এসেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে নতুন গঠিত  এনসিপিআই-এ যোগ দেওয়া ২০ জন সাংসদ এবং উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা (ইউবিটি) ছেড়ে একনাথ শিন্ডে শিবিরে যাওয়া ছয় জন সাংসদ এখন কার্যত এনডিএ’-এর পাশে রয়েছেন। ফলে সরকারের সম্ভাব্য সমর্থন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২৪-এ। দিল্লির রাজনৈতিক মহলে শরদ পওয়ারের এনসিপি (এসপি)-র কয়েক জন সাংসদের সমর্থন নিয়েও জল্পনা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে যদি ডিএমকের ২২ জন সাংসদও সরকারের পাশে দাঁড়াতেনতবে সরকারের সম্ভাব্য সমর্থন ৩৪৬-এ পৌঁছে যেত। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সংখ্যার থেকে মাত্র কয়েকটি ভোট পিছিয়ে থাকত এনডিএ। তখন ছোটো আঞ্চলিক দল এবং নির্দল সাংসদদের সমর্থন নিয়েই সাংবিধানিক সংশোধনী পাশ করানোর বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত। সে কারণেই ডিএমকের অবস্থানকে এত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবিদক্ষিণ ভারতের আশঙ্কা দূর করতে বিলে কিছু সংশোধনের ইঙ্গিত দিয়েছিল বিজেপি। প্রস্তাব ছিল, ‘ডিলিমিটেশন’-এর পরে প্রত্যেক রাজ্যের লোকসভা আসন ৫০ শতাংশ করে বাড়ানো হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও এপ্রিলে সংসদে বলেছিলেনবিরোধীরা যদি বিল সমর্থন করেতবে সরকার সংশোধনী এনে রাজ্যভিত্তিক ৫০ শতাংশ আসন বৃদ্ধির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে প্রস্তুত। ডিএমকের মূল আপত্তি এখানেই। দলের আশঙ্কা২০২৭ সালের জনগণনার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের কারণে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির আসন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বেকিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল দক্ষিণের রাজ্যগুলি তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়বে। ফলে লোকসভায় তাদের প্রতিনিধিত্বের অনুপাত কমে যেতে পারে। সে আশঙ্কা দূর করতেই দল চাইছে সব রাজ্যের আসন সমান হারে বৃদ্ধি পাক এবং রাজ্যভিত্তিক আসনসংখ্যার পূর্ণ তালিকা বিলের মধ্যেই উল্লেখ থাকুক।

ডিলিমিটেশন বিতর্কে দক্ষিণ ভারতের যুক্তিকে আরও জোরালো করে তুলেছেন কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুরও। তাঁর বক্তব্যসমান হারে আসন বৃদ্ধি হলেও বাস্তবে বড় রাজ্যগুলির রাজনৈতিক প্রভাব আরও বাড়বে। শতাংশের হিসাবে বৃদ্ধি সমান হলেও প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের ব্যবধান আরও বিস্তৃত হবে। এদিকে কংগ্রেস ইতিমধ্যেই সংসদের আসন্ন ভোটাভুটির কথা মাথায় রেখে তিন-লাইন হুইপ জারি করার প্রস্তুতি নিয়েছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীও কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুকে জানিয়ে দিয়েছেনবিরোধী শিবিরের কাছে এ বিল বর্তমান আকারে গ্রহণযোগ্য নয়। সব মিলিয়ে ‘ডিলিমিটেশন’-কে ঘিরে কেন্দ্র ও দক্ষিণী রাজ্যগুলির নয়া সংঘাত এখন আর কেবল আসন পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ক্রমশ দেশের  যুক্তরাষ্ট্রীয়  কাঠামোজনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল রাজ্যগুলির রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং ভবিষ্যতের জাতীয় ক্ষমতার ভারসাম্য-এর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!