- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ৭, ২০২৬
আকাশযুদ্ধে নতুন দিগন্ত ! ভারতীয় বায়ুসেনার ‘টপ গান’ স্কুলে প্রথম মহিলা পাইলট স্কোয়াড্রন লিডার ভাবনা কান্ত
ভারতীয় বায়ুসেনার ইতিহাসে আরও এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা। দেশের প্রথম মহিলা হিসেবে ভারতীয় বায়ুসেনার সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ‘ফাইটার কমব্যাট লিডার’ বা ‘এফসিএল’ কোর্স সফল ভাবে সম্পন্ন করলেন স্কোয়াড্রন লিডার ভাবনা কান্ত। এই কৃতিত্বের হাত ধরেই তিনি ভারতীয় বায়ুসেনার প্রথম মহিলা ‘টপ গান’ ফাইটার পাইলট হিসেবে ইতিহাসে নিজের নাম লিখিয়ে ফেললেন। যে সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, ভারতীয় সামরিক বিমানচালনার ইতিহাসে মহিলাদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।
গোয়ালিয়রের ‘ট্যাকটিক্স অ্যান্ড এয়ার কমব্যাট ডেভেলপমেন্ট এস্টাবলিশমেন্ট’-এ অনুষ্ঠিত ২০ সপ্তাহের কঠোর প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে ভারতীয় বায়ুসেনার সবচেয়ে কঠিন এবং মর্যাদাপূর্ণ কোর্সগুলির অন্যতম বলে ধরা হয়। প্রতি বছর ভারতীয় বায়ুসেনার ফাইটার পাইলটদের মধ্যে মাত্র এক শতাংশ এই বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হন। অর্থাৎ, এ কোর্সে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়াই বিরাট সম্মানের, আর সফল ভাবে তা সম্পূর্ণ করা একজন পাইলটকে বায়ুসেনার সর্বোচ্চ মানের যুদ্ধকৌশল বিশেষজ্ঞদের সারিতে স্থান করে দেয়।
এই প্রশিক্ষণ শেষ করার অর্থ শুধুমাত্র দক্ষ যুদ্ধবিমানচালক হওয়া নয়। একজন ‘ফাইটার কমব্যাট লিডার’-কে জটিল আকাশযুদ্ধ অভিযানের পরিকল্পনা, নেতৃত্ব আর বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত করা হয়। কঠিন ‘এয়ার-টু-এয়ার’ এবং ‘এয়ার-টু-গ্রাউন্ড’ যুদ্ধকৌশল, দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল হামলার পরিকল্পনা, বহুস্তরীয় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং উচ্চ-তীব্রতার অপারেশন পরিচালনার মতো বিষয় এ কোর্সের মূল অংশ। সফল প্রার্থীরা পরবর্তীকালে শুধু যুদ্ধ অভিযানে নেতৃত্বই দেন না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ফাইটার পাইলটদের জন্য যুদ্ধকৌশল প্রণয়ন এবং ‘অপারেশন নীতি’ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এ কারণেই ‘ট্যাকটিক্স অ্যান্ড এয়ার কমব্যাট ডেভেলপমেন্ট এস্টাবলিশমেন্ট’-কে প্রায়শই মার্কিন নৌবাহিনীর কিংবদন্তি ‘স্ট্রাইক ফাইটার ট্যাকটিক্স ইনস্ট্রাক্টর প্রোগ্রাম’, অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে ‘টপ গান’ নামে পরিচিত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ভারতীয় সমতুল্য বলে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭১ সালে ‘ট্যাকটিক্স অ্যান্ড কমব্যাট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং স্কোয়াড্রন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৭২ সালে এর বর্তমান নামকরণ হয়। তারপর থেকেই ভারতীয় বায়ুসেনার যুদ্ধ প্রস্তুতি ও কৌশলগত উৎকর্ষের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। সেখানে যুদ্ধবিমান, পরিবহণ বিমান, হেলিকপ্টার, রাডার কন্ট্রোলার এবং অস্ত্র ব্যবস্থার জন্য নতুন যুদ্ধকৌশল তৈরি করা হয়, ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিয়র’ প্রণয়ন করা হয় এবং পরিষেবায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে নতুন যুদ্ধবিমান, রাডার ও অস্ত্র ব্যবস্থার বিস্তৃত মূল্যায়নও করা হয়। টিএসিডিই-র প্রশিক্ষকরা বাছাই করা হয় ভারতীয় বায়ুসেনার সবচেয়ে অভিজ্ঞ ফাইটার পাইলট, হেলিকপ্টার পাইলট ও রাডার কন্ট্রোলারদের মধ্য থেকে।
ভাবনা কান্তের গগনচুম্বী এ সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। বিহারের দারভাঙ্গা জেলার বাসিন্দা, পেশায় একজন ইঞ্জিনিয়ারিং স্নাতক ভাবনা ছোটবেলা থেকেই আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখতেন। ২০১৬ সালের জুন মাসে তিনি অবনী চতুর্বেদী ও মোহনা সিংয়ের সঙ্গে ভারতীয় বায়ুসেনার ইতিহাসে প্রথম তিন মহিলা ফাইটার পাইলটের ব্যাচে কমিশনপ্রাপ্ত হন। সে সিদ্ধান্তই ভারতীয় সামরিক বিমানচালনার দীর্ঘ দিনের পুরুষ-প্রাধান্যের প্রথায় বড়ো পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। এরপর দ্রুতই নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন ভাবনা। ২০১৭ সালের নভেম্বরে তিনি ফাইটার স্কোয়াড্রনে যোগ দেন এবং ২০১৮ সালের মার্চ মাসে ‘মিগ-২১ বিসন’ যুদ্ধবিমানে প্রথম একক উড়ান সম্পন্ন করেন। ২০১৯ সালে তিনি ভারতের প্রথম মহিলা ফাইটার পাইলট হিসেবে দিনের বেলায় যুদ্ধ অভিযান পরিচালনার অনুমোদন পান। প্রথমে ‘মিগ-২১ বিসন’ উড়িয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর বর্তমানে তিনি ভারতীয় বায়ুসেনার অন্যতম শক্তিশালী বহুমুখী যুদ্ধবিমান ‘সুখোই-৩০ এমকেআই’ পরিচালনা করছেন।
ভাবনা একের পর এক সাফল্যের সাক্ষী থেকেছেন। ২০২১ সালে তিনি প্রথম মহিলা ফাইটার পাইলট হিসেবে প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে ভারতীয় বায়ুসেনার ‘কনটিনজেন্ট’ ও ‘ট্যাবলো’-র অংশ হয়ে ইতিহাস গড়েন। পরে ২০২৪ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসের ‘ফ্লাইপাস্ট’-এও অংশ নিয়ে আকাশে নিজের দক্ষতার ছাপ রেখে যান। ২০১৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে ভাবনা বলেছিলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই যুদ্ধবিমান ওড়ানোর স্বপ্ন দেখতাম। সুযোগ পাওয়ার পর এক মুহূর্তও দেরি করিনি। আমি মনে করি এ সিদ্ধান্ত অনেক আগেই আমার নেওয়া উচিত ছিল।’ তাঁর সে কথারই বাস্তব প্রতিফলন ঘটল এক দশক পরে। ভারতের প্রথম মহিলা ফাইটার পাইলটদের অন্যতম থেকে আজ দেশের প্রথম মহিলা ‘টপ গান’— প্রতিটি ধাপে তিনি নতুন ইতিহাস লিখেছেন।
ভাবনা কান্তের এই সাফল্য প্রমাণ দিচ্ছে ভারতীয় বায়ুসেনায় মহিলাদের অংশগ্রহণ ধারাবাহিক ভাবে নতুন উচ্চতায় পৌঁছচ্ছে। কয়েক মাস আগেই স্কোয়াড্রন লিডার শিবাঙ্গী সিং ‘কোয়ালিফায়েড ফ্লাইং ইনস্ট্রাক্টর’ ব্যাজ অর্জন করেছেন। তিনি গত বছরের অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে রাফাল যুদ্ধবিমানে নিয়ে উড়েছিলেন। আবার এ বছরের শুরুতে স্কোয়াড্রন লিডার সান্যা ভারতীয় বায়ুসেনার প্রথম মহিলা অফিসার হিসেবে ‘ক্যাটাগরি-এ কোয়ালিফাইড ফ্লাইং ইনস্ট্রাক্টর’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। ফলে যুদ্ধবিমান পরিচালনা, প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব— তিন ক্ষেত্রেই ভারতীয় মহিলারা যে দ্রুত নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। আকাশসীমা রক্ষার দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি দেশের প্রথম মহিলা ফাইটার কমব্যাট লিডার হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া নিঃসন্দেহে ভারতীয় বায়ুসেনার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। শুধু আর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, দেশের অসংখ্য তরুণীর কাছে উজ্জ্বল বার্তা— দক্ষতা, অধ্যবসায় এবং সাহস থাকলে আকাশও আর সীমা নয়।
❤ Support Us







