- বি। দে । শ
- আগস্ট ১০, ২০২৬
ঢাকায় তারেকের সঙ্গে বৈঠক ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের, হাসিনা-জট কাটিয়ে দিল্লি আসবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ?
ঢাকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন সে দেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদী। সোমবার দুপুর পৌনে ১২টা নাগাদ (ভারতীয় সময়) বাংলাদেশের সচিবালয়ে দু-জনের মধ্যে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়। গত জুনে বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম তারেক রহমানের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠক করলেন দীনেশ। বৈঠকের ছবি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং ঢাকার ভারতীয় দূতাবাস।
তবে বৈঠকে ঠিক কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি ভারত বা বাংলাদেশ— কোনো পক্ষই। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে যে নতুন করে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই এই বৈঠক হওয়ায় কূটনৈতিক মহলে এর তাৎপর্য যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে হতে চলা ‘ব্রিক্স সম্মেলন’-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে জল্পনা। রবিবার বাংলাদেশের সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’ এক উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিককে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘ব্রিক্স সম্মেলন’-এ যোগ দিতে তারেকের ভারত সফরের সম্ভাবনা কার্যত শেষ। তবে শেষ মুহূর্তে কোনো সমাধানসূত্র বেরিয়ে এলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে বলেও আশা রয়েছে দু-দেশের কূটনৈতিক মহলে।
এ পরিস্থিতিতে সোমবারের বৈঠকে দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কি না, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। বৈঠকের পর ভারতীয় দূতাবাসের তরফে সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত বার্তায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রীর তরফে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের সঙ্গে যৌথ ভাবে ইতিবাচক এবং গঠনমূলক কাজ করার আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন তিনি। দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও তারেক ও দীনেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ‘প্রথম আলো’-র একটি প্রতিবেদনে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, বৈঠকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানো এবং শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের প্রত্যর্পণের বিষয়টি উত্থাপন করেছেন তারেক রহমান। যদিও এ বিষয়ে ভারতীয় দূতাবাসের তরফে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, বৈঠকের পর বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, ‘ব্রিক্স সম্মেলন’-এ তারেক রহমান যোগ দেবেন কি না, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে দিল্লি সফর নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। এরই মধ্যে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের সঙ্গেও বৈঠক করেন দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদী বার্তা দেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘এমন কোনো ইস্যু নেই, যেটা বসে সমাধান করা সম্ভব নয়। ইস্যু থাকবে, সেটার সমাধানও হবে। তবে দুই দেশের মানুষের ইস্যু একটাই। সেটি হলো ভালো সম্পর্ক।’ তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের আগের দিন, রবিবার বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত। সেই বৈঠকের পর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও ইতিবাচক বার্তা দিয়েছিলেন দীনেশ। তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমরা সবাই অনেক সম্মান করি। আমার মতে, যদি দুই রাষ্ট্রনেতার (নরেন্দ্র মোদী ও তারেক রহমান) আলোচনা হয়, তবে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যা সমাধানের পথ খোলে। এখানে কোনও নেতিবাচক দিক নেই। সবটাই ইতিবাচক।’
কূটনৈতিক মহলের মতে, তারেকের সঙ্গে দীনেশের এই বৈঠক এমন এক সময়ে হলো, যখন শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ফের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি সাংবাদিক বৈঠক ঘিরে দু-দেশের মধ্যে নতুন করে চাপানউতর শুরু হয়েছে। ভারত প্রথম থেকেই স্পষ্ট করেছে, হাসিনার ওই সাংবাদিক বৈঠকের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। ওই মঞ্চে যে বক্তব্য রাখা হয়েছে, ভারত সরকার তা সমর্থনও করে না।
বাংলাদেশ অবশ্য ভারতের এ অবস্থান মেনে নিতে নারাজ। ঢাকার অভিযোগ, ভারতে অবস্থান করার সুযোগ নিয়ে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। ভারত সরকার যদি তাঁকে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেয়, তা হলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে ঢাকাকে নতুন করে ভাবতে হবে বলেও বার্তা দেওয়া হয়েছে।
এহেন পরিস্থিতির মধ্যেই তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। ফলে সোমবারের বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া সেই জটিলতা কতটা কমেছে, আদৌ কোনো সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে কি না— তা নিয়েই এখন কৌতূহল দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে। তবে সম্পর্কের উন্নতি নিয়ে আশাবাদী ভারতীয় রাষ্ট্রদূত। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, আলোচনার মাধ্যমেই দুই দেশের মধ্যে জমে থাকা সমস্যাগুলির সমাধান সম্ভব। আর সেই কারণেই তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকদের একাংশ।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের অগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের জেরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। দেশ ছেড়ে ভারতে চলে আসেন তিনি এবং তার পর থেকে ভারতেই রয়েছেন। হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। সেই সময় দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্কে যথেষ্ট শৈত্য তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার, মারধর এবং খুনের অভিযোগ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ফের উন্নতির দিকে এগোতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছিল। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করার বার্তাও দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাংবাদিক বৈঠক ঘিরে তৈরি হওয়া নতুন বিতর্ক সেই সম্পর্কের সমীকরণে ফের প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক মহলের একাংশ।
❤ Support Us








