- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ১২, ২০২৬
বিচারপতি যশবন্ত বর্মাকে দোষী সাব্যস্ত করল লোকসভা তদন্ত কমিটি
সরকারি বাসভবনের স্টোররুম থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা উদ্ধারের ঘটনায় বিচারপতি যশবন্ত বর্মার বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। লোকসভার স্পিকারের নির্দেশে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি বুধবার সংসদের দুই কক্ষে তাদের রিপোর্ট পেশ করে জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া নগদের উপস্থিতি, উৎস কিংবা মালিকানা নিয়ে বিচারপতি বর্মার দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক নয়। বরং সাক্ষীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে তাঁর বক্তব্য ‘এড়িয়ে যাওয়া’ এবং ‘অসন্তোষজনক’ বলেই প্রমাণিত হয়।
‘বিচারপতি তদন্ত আইন’-এর অধীনে গঠিত এ কমিটির তদন্তের মূল বিষয় ছিল, সরকারি বাসভবনের স্টোররুমে এত বিপুল নগদ টাকা কী ভাবে এল, তার সঙ্গে বিচারপতি বর্মার কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগ ছিল কি না। দীর্ঘ তদন্তের পরে কমিটি তার চূড়ান্ত রিপোর্টে স্পষ্ট জানিয়েছে, নগদের উপস্থিতি, হস্তক্ষেপ, ঘটনার বিষয়ে বিচারপতি বর্মার ব্যাখ্যা— এই তিনটি অভিযোগই প্রমাণিত। কমিটির পর্যবেক্ষণ, স্টোররুমে পাওয়া নগদ টাকার উপস্থিতি, তার উৎস কিংবা মালিকানা সম্পর্কে বিচারপতি বর্মা এমন কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি, যা তদন্তকারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়। শুধু তা-ই নয়, ঘটনার পর গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে তদন্ত কমিটি।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, স্টোররুমের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণগুলি যথাযথ ভাবে সুরক্ষিত বা সংরক্ষিত হয়নি। আইন মেনে স্টোররুমটি সিল করে পরিদর্শনের আগেই সেখানে থাকা প্রমাণের অবস্থায় পরিবর্তন ঘটে। ফলে ঘটনার সময় স্টোররুমের প্রকৃত পরিস্থিতি কী ছিল, তা পরবর্তী তদন্তে নির্ভুল ভাবে পুনর্গঠন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তদন্ত কমিটির মতে, এমন ঘটনায় একজন বিচারপতির কাছ থেকে যে ধরনের স্বচ্ছতা, অকপটতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশিত, বিচারপতি বর্মার ব্যাখ্যায় তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং বিভিন্ন সাক্ষ্য ও হাতে থাকা নথিপত্রের সঙ্গে তাঁর বক্তব্য মিলিয়ে দেখার পর কমিটি তাঁকে মামলার প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অভিযোগে ‘দোষী’ সাব্যস্ত করছে। মামলার তদন্ত চলাকালীন সংগৃহীত মৌখিক ও নথিভুক্ত প্রমাণও যুক্ত করা হয়েছে দুই খণ্ডের রিপোর্টে। জানা যাচ্ছে, লোকসভার স্পিকার ওম বিড়ার কাছে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গত মে মাসেই তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। বুধবার তা সংসদের দুই কক্ষে পেশ করা হয়।
উল্লেখ্য, ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ১৪ মার্চের রাতে। সে দিন বিচারপতি যশবন্ত বর্মার সরকারি বাসভবনে আগুন লাগে। আগুন নেভাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছন দমকলকর্মীরা। অভিযোগ, সে সময়ই বাসভবনের একটি স্টোররুমে বিপুল পরিমাণ পুড়ে যাওয়া নোট দেখতে পাওয়া যায়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই বিচারপতির বাসভবনে এত নগদ টাকা কী ভাবে এল, তা নিয়ে দেশ জুড়ে তোলপাড় ওঠে। ঘটনার পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। সে কমিটির রিপোর্টেও বিচারপতি বর্মার বিরুদ্ধে গুরুতর পর্যবেক্ষণ করা হয়। কমিটির মতে, যে স্টোররুমে নগদ টাকা পাওয়া গিয়েছিল, তার উপর বিচারপতি বর্মার নিয়ন্ত্রণ ছিল।
এর পর বিষয়টি গড়ায় সংসদ পর্যন্ত। গত বছরের জুলাইয়ে ২০০-রও বেশি সাংসদ বিচারপতি বর্মাকে পদ থেকে অপসারণের দাবিতে ‘ইমপিচমেন্ট’ প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন। পরে আগস্টে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়া অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করেন। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পরিস্থিতি বদলে যায়। বিচারপতি বর্মা পদত্যাগ করেন। ফলে তাঁকে সংসদের মাধ্যমে অপসারণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। যদিও তাঁর পদত্যাগ এখনো আইন মন্ত্রকের তরফে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয়নি। তবে, বিচারপতিদের নিয়োগ ও অপসারণের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের ভিত্তিতে কোনো বিচারপতি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র দেওয়ার পরে এবং সে পদত্যাগপত্রের প্রতিলিপি প্রকাশ্যে প্রচার করলে তাঁকে ‘পদত্যাগ করেছেন’ বলে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ, কোনো বিচারপতির পদত্যাগ রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল নয়।
প্রসঙ্গত, বিচারপতি বর্মা এর আগে দিল্লি হাই কোর্টের বিচারপতি ছিলেন। নগদ উদ্ধারের বিতর্কের পর তাঁকে তাঁর মূল কর্মক্ষেত্র এলাহাবাদ হাই কোর্টে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাটির তদন্ত এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত তাঁকে ঘিরে বিচারবিভাগীয় বিতর্ককে আরও তীব্র করে তোলে।
❤ Support Us







