- দে । শ
- আগস্ট ১২, ২০২৬
তৃণমূল জমানার সব ওবিসি শংসাপত্র বাতিলের নির্দেশ হাই কোর্টের, ফের সংরক্ষণ-জটে ‘এসএসসি’ নিয়োগ ?
তৃণমূল সরকারের আমলে চালু হওয়া ওবিসি-এ এবং ওবিসি-বি ব্যবস্থার ভিত্তিতে দেওয়া শংসাপত্রগুলির বৈধতা কার্যত খারিজ করে দিল কলকাতা হাই কোর্ট। বুধবার বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা এবং বিচারপতি অনুজ সিংহের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দিয়েছে, রাজ্যে আর ওবিসি-এ এবং ওবিসি-বি— দুই পৃথক শ্রেণি থাকছে না। ফলে ২০১০ সালের পর ওই কাঠামোর ভিত্তিতে জারি হওয়া শংসাপত্রের উপর আর সংরক্ষণের সুবিধা দাবি করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট শংসাপত্রধারীদের সাধারণ শ্রেণির প্রার্থী হিসাবেই বিবেচনা করতে হবে।
আদালতের এ নির্দেশের জেরে ইতিমধ্যেই চলতে থাকা শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও নতুন করে অনিশ্চয়তার ছায়া। সুপ্রিম নির্দেশ অনুযায়ী, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগে প্রায় চার হাজার প্রার্থীকে ইতিমধ্যেই সুপারিশপত্র দিয়েছে স্কুল সার্ভিস কমিশন। নবম-দশম শ্রেণিতে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রায় ৩৯ হাজার প্রার্থীর মধ্যে ১৫ হাজারের প্রাথমিক তথ্য যাচাইও শেষ। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কারা কোন সংরক্ষণ নীতির আওতায় নিয়োগ পাবেন, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। ফলে ১৪ আগস্ট থেকে একাদশ-দ্বাদশের শিক্ষক নিয়োগের কাউন্সেলিং শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত হয়েছে।
ওবিসি সংরক্ষণের হার নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশের পর সংরক্ষণ ১৭ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশে নামবে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আইনজীবীদের পরামর্শ নিচ্ছে ‘এসএসসি’। মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকে কমিশনের চেয়ারম্যান দুষ্যন্ত নারিয়ালাও জানান, সংরক্ষণ নীতি কী ভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে আইনি মতামত নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, সুপারিশপত্র হাতে পাওয়া প্রার্থীদের নিয়োগের পথও আপাতত পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এ পরিস্থিতিতে ৩১ অগস্টের মধ্যে ২৬ হাজার শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর নিয়োগ শেষ করার যে সময়সীমা সুপ্রিম কোর্ট বেঁধে দিয়েছিল, তা মেনে চলা কার্যত কঠিন হয়ে পড়েছে। ‘এসএসসি’ সূত্রে খবর, প্রয়োজনে শীর্ষ আদালতের কাছে অতিরিক্ত সময় চাওয়া হতে পারে। কত দিনের জন্য সময় চাওয়া হবে, তা নিয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ফলে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর শুরু হওয়া নিয়োগ প্রক্রিয়া ফের আদালতের নির্দেশের জটেই আটকে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ওবিসি শংসাপত্র ঘিরে বিতর্কের সূত্র অবশ্য বেশ কয়েক বছর পুরনো। ২০১০ সালের পর রাজ্যে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিকে ওবিসি-এ এবং ওবিসি-বি—দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই তালিকায় একের পর এক সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শংসাপত্র বিলির ক্ষেত্রেও অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। বিষয়টি গড়ায় কলকাতা হাই কোর্টে। ২০২৪ সালে সে মামলায় হাই কোর্ট ৬৬টি সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ওই সম্প্রদায়গুলির ওবিসি শংসাপত্রও বাতিল করা হয়। আদালত নির্দেশ দেয়, নতুন করে সমীক্ষা চালিয়ে অনগ্রসর শ্রেণির তালিকা তৈরি করতে হবে। তৎকালীন রাজ্য সরকার সে নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে গেলেও শীর্ষ আদালত হাই কোর্টের নির্দেশে হস্তক্ষেপ করেনি।
এর পর আদালতের নির্দেশ মেনে নতুন করে সমীক্ষা চালায় রাজ্য সরকার। সমীক্ষার ভিত্তিতে ওবিসি-এ এবং ওবিসি-বি তালিকায় একাধিক পরিবর্তন করা হয়। নতুন করে মোট ১৪২টি জনগোষ্ঠীকে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু সে সমীক্ষা নিয়েও আপত্তি তোলে হাই কোর্ট। অভিযোগ ওঠে, মাত্র প্রায় আড়াই হাজার নমুনা সংগ্রহ করে তার ভিত্তিতেই এত বড়ো একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের কাছে গিয়েছিল তৎকালীন সরকার। কিন্তু শীর্ষ আদালত হাই কোর্টের রায়ের উপর স্থগিতা দেয় নি। রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ওবিসি নিয়মে পরিবর্তন আনে। ওবিসি-এ এবং ওবিসি-বি—এই দুই পৃথক শ্রেণিবিভাগ তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির জন্য একটি মাত্র সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকবে বলে জানানো হয়। তৃণমূল সরকারের আমলে এ ব্যবস্থা নিয়ে হাই কোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে যে মামলা সুপ্রিম কোর্টে চলছিল, নতুন সরকার তা প্রত্যাহারও করে নেয়। ফলে আগের ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ প্রেক্ষাপটেই বুধবারের হাই কোর্টের রায়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, পৃথক ওবিসি-এ এবং ওবিসি-বি কাঠামোর ভিত্তিতে জারি হওয়া শংসাপত্র আর সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কার্যকর থাকবে না। বিশেষ করে যাঁরা হাই কোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের আগের নির্দেশের পর নতুন করে ওবিসি শংসাপত্র পেয়েছিলেন, তাঁদের সামনে তৈরি হয়েছে বড়ো প্রশ্ন। নিয়োগে তাঁদের সংরক্ষিত প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হবে, না কি সাধারণ শ্রেণির প্রার্থী হিসাবে— সেটিই এখন ‘এসএসসি’র কাছে সবচেয়ে বড়ো আইনি সমস্যা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ২৬ হাজার শূন্যপদের নিয়োগেও। গত বছর নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের জেরে আদালতের নির্দেশে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল হয়েছিল। সে শূন্যপদ পূরণের জন্য নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করে এসএসসি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল, ৩১ আগস্টের মধ্যে গোটা প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। কিন্তু একের পর এক আইনি জটিলতায় সেই লক্ষ্যমাত্রা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
মাধ্যমিক স্তরের নিয়োগে ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ হাজার প্রার্থীর তথ্য যাচাই শেষ হয়েছে। অন্যদিকে, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে প্রায় চার হাজার প্রার্থী সুপারিশপত্র পেয়েছেন। কাউন্সেলিং হয়ে যাওয়া প্রার্থীদের পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট ১২ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংরক্ষণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ ইতিমধ্যেই সে প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে। ১৪ আগস্ট থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ১২টি বিষয়ের প্রার্থীদের কাউন্সেলিংও আপাতত থামিয়ে দিয়েছে। তবে শুধু শিক্ষক নিয়োগই নয়, শিক্ষাকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়ছে। যদিও, ৮,৪৭৭টি শূন্যপদে শিক্ষাকর্মী নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার ফল পুজোর আগেই প্রকাশ করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন এসএসসি চেয়ারম্যান। অর্থাৎ শিক্ষক নিয়োগ যেখানে সংরক্ষণ-জটে আটকে পড়েছে, সেখানে গ্রুপ সি এবং গ্রুপ ডি-র ফল প্রকাশের কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছে কমিশন।
প্রসঙ্গত, ‘এসএসসি’-র স্বচ্ছতা বাড়াতে কমিশনে চার নতুন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ এডুকেশনাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রো-চ্যান্সেলর স্বামী আত্মপ্রিয়ানন্দ, নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের কোষাধ্যক্ষ স্বামী শাস্ত্রজ্ঞানানন্দ, গোলপার্কের রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচারের সেক্রেটারি তথা বেলুড় রামকৃষ্ণ মঠের গভর্নিং বডির সদস্য ও অন্যতম ট্রাস্টি স্বামী তত্ত্বসারানন্দ এবং আইআইএম কলকাতার স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের অধ্যাপক রম্যা তারাকাড বেঙ্কটেশ্বরণ। নতুন সদস্যদের উপস্থিতিতে কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য। স্বামী আত্মপ্রিয়ানন্দ বলেন, এসএসসির যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে, যাতে নিয়োগপ্রার্থীদের সামনে কোনও অস্পষ্টতা না থাকে।
কিন্তু বুধবারের আদালতের রায়ের পর সে স্বচ্ছতার পাশাপাশি সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সময়সীমা। একদিকে ওবিসি সংরক্ষণের নতুন কাঠামো কী হবে, অন্য দিকে পুরনো শংসাপত্রের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে এগিয়ে যাওয়া প্রার্থীদের কী ভাবে নিয়োগ করা হবে— দুই প্রশ্নের উত্তর না মিললে ২৬ হাজার নিয়োগের চাকা ফের থমকে থাকার আশঙ্কা। সুপ্রিম কোর্টের বেঁধে দেওয়া ৩১ আগস্টের সময়সীমাও যে ভাবে ঘনিয়ে আসছে, তাতে জটিলতা বাড়বে বলেই মনে করছে শিক্ষামহল।
❤ Support Us





