- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ১২, ২০২৬
বন্যাবিধ্বস্ত অসম, পাশে আছে বাংলা । ১০ কোটির আর্থিক সহায়তা ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর
বানভাসি অসমে দুর্যোগের মেঘ কাটার লক্ষণ নেই। গত কয়েকদিনের লাগাতার বৃষ্টিতে ব্রহ্মপুত্র ও তার শাখা নদীগুলির রুদ্ররূপে রাজ্যের বিস্তীর্ণ অংশ এখনো জলের তলায়। বন্যার কবলে পড়ে ইতিমধ্যেই মৃতের সংখ্যা একশোর গণ্ডি ছাড়িয়েছে, ঘরবাড়ি বিধস্ত হয়েছে, কৃষিজমি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই মুহূর্তে রাজ্যের ৭টি জেলায় প্রায় ১ লক্ষ ২৬ হাজারেরও বেশি মানুষ ঘরছাড়া, অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন ত্রাণশিবিরে। কোথাও বাড়ির দোতলায়, কোথাও আবার ছাদে উঠে কোনও মতে দিন কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা। প্রশাসনের তরফে চলছে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ।
এরইমধ্যে নতুন করে বৃষ্টির পূর্বাভাসে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বুধবারও রাজ্যের একাধিক নদীর জল বইছে বিপদসীমার উপর দিয়ে। ফলে নতুন করে আরও এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যেই ফুলেফেঁপে ওঠা নদীগুলির জল আরও বাড়লে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে চিন্তায় প্রশাসন। দুর্গত ও বিপজ্জনক এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ‘অসম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’ (এএসডিএমএ)-র দৈনিক বন্যা বুলেটিন অনুযায়ী, চলতি বছরের বন্যায় এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১০১।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে গোলাঘাট ও শিবসাগর জেলায়। কেবল গোলাঘাটেই প্রায় ৭০ হাজার মানুষ জলমগ্ন। শিবসাগরের গ্রামীণ জনপদগুলির অবর্ণনীয় দুর্দশা, প্রায় ৪০ হাজার বাসিন্দা গৃহহীন। এছাড়া চরাইদেও, দারাং, জোরহাট, কার্বি আংলং এবং নগাঁওয়ের মতো জেলাগুলিতেও বন্যার করাল গ্রাস থেকে রেহাই পায়নি। সরকারি খতিয়ান বলছে, প্রায় ৪৫৬টি গ্রাম এখনো অথই জলে ডুবন্ত। ১২ হাজার হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমি জলমগ্ন হয়ে পড়ায় আসন্ন দিনগুলিতে তীব্র খাদ্যসংকটের আশঙ্কা করছেন অনেকে।
প্রতিবেশী রাজ্যের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অসম সরকারকে ১০ কোটি টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়ার প্রস্তাব বুধবার বিধানসভায় ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার বিধানসভায় নগরোন্নয়ন দফতরের দুটি বিল সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়। সে পর্ব শেষ হওয়ার পর স্পিকারের বিশেষ অনুমতি নিয়ে বক্তব্য রাখতে ওঠেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই উঠে আসে অসমের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি। প্রতিবেশী রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়া, মানুষের দুর্ভোগ আর প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে অসমে বন্যার মধ্যে আটকে পড়া বাঙালিদের প্রসঙ্গও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, বন্যায় অসমে ইতিমধ্যেই ১০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পড়শি রাজ্যের পাশে দাঁড়ানোই রাজ্যের দায়িত্ব বলে মনে করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ কোটি টাকা আর্থিক সাহায্য অসম সরকারকে দেওয়ার জন্য এখানে প্রস্তাব রাখছি এবং আমরা সেটা অসমের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব।’
অসমের বন্যা পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অসমের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের একটি ‘বিশেষ আধ্যাত্মিক সম্পর্ক’ রয়েছে। সে সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করে তিনি জানান, দুর্যোগের সময়ে প্রতিবেশী রাজ্যকে একা থাকতে দিতে চায় না পশ্চিমবঙ্গ। তাঁর বক্তব্য, মণিপুর ও ছত্তীশগড়ের মতো কয়েকটি রাজ্য ইতিমধ্যেই অসমকে সাহায্যের কথা ঘোষণা করেছে। সে তালিকায় এ বার পশ্চিমবঙ্গও যুক্ত হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকেই ১০ কোটি টাকা দেওয়া হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। বন্যার জল নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র সামনে এলে সে প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে।
এদিকে, ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান তুলে ধরে কেন্দ্রের কাছে বিশেষ আর্থিক প্যাকেজের জন্য দরবার করেছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। তিনি জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তি মেরামত, দুর্গত মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য ১,০০০ কোটি টাকারও বেশি খরচ হতে পারে।বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর পাশাপাশি সেনা ও স্থানীয় প্রশাসন দিনরাত এক করে কাজ করলেও, নদীগুলির জলস্তর দ্রুত না কমলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। হিমন্ত জানিয়েছেন, স্থায়ী ত্রাণের লক্ষ্যে ৯ আগস্ট দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের কাজ শুরু হয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ৮,০০০-এরও বেশি পরিবারের ক্ষয়ক্ষতি খতিয়ে দেখা হয়েছে। আনুমানিক ১৫০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ সমীক্ষা ৩০ আগস্ট পর্যন্ত চলবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আপার অসমের ভয়াবহ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলিতে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার পরিবারের ক্ষয়ক্ষতি খতিয়ে দেখা হবে। তাঁর হিসাব, শেষ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি মেরামত এবং পুনর্বাসনে ১,০০০ কোটি টাকারও বেশি প্রয়োজন হতে পারে। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন , ‘প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না। তাই প্রশাসনকে কোনো খামতি না রেখে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে।’
বন্যার হাত থেকে স্থায়ী ভাবে মানুষকে রক্ষা করার লক্ষ্যে ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণে নতুন মডেল হাউসিং প্রকল্পের কথাও ভাবছে অসম সরকার। এ বিষয়ে কেন্দ্র এবং সমাজবিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত। তিনি বলেছেন, ‘আমরা চাই, বন্যার পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান খুঁজে বার করতে।’ ত্রাণে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন ও গোষ্ঠীর ভূমিকার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যা দুর্গতদের সাহায্যের জন্য ৭২ জন ইউটিউবার অর্থ সংগ্রহ করেছেন। তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে দুর্গত এলাকায় গিয়ে ত্রাণ বিলির কাজ শুরু করেছেন। তবে সে অর্থ যথাযথ ভাবে বন্যা দুর্গতদের জন্য খরচ হচ্ছে কি না, তা প্রশাসন নজরে রাখছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলির দিকেও নজর দিয়েছে সরকার। আপার অসমে ক্ষতিগ্রস্ত ৪৯৪টি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র পুনর্গঠনের জন্য ১১.৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব কেন্দ্রগুলি ফের চালু করতে চায় সরকার, যাতে দ্রুত সমস্ত পরিষেবা স্বাভাবিক করা যায়। প্রতিটি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্য সর্বোচ্চ ২.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সরাসরি আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কাজও চলছে। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে ৬৪,৮৯১টি বন্যাকবলিত পরিবারকে প্রাথমিক সাহায্য হিসাবে ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। আরও ৩১,২১২টি পরিবারকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ওই অর্থ দেওয়া হবে।
মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলেও এসেছে উল্লেখযোগ্য অর্থ। শর্মা জানিয়েছেন, ২৬ হাজারেরও বেশি ছোটো অঙ্কের অনুদান জমা পড়েছে। তার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকেও বড়ো অঙ্কেরও অনুদান এসেছে। এখনো পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ১৪২ কোটি টাকা জমা পড়েছে। ওই অর্থ মডেল হাউসিং কলোনি তৈরির কাজে ব্যবহার করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে প্রতিবছরের বন্যার কারণ খুঁজতে গিয়ে অসম সরকারের নজর এখন ব্রহ্মপুত্রের উপনদীগুলির দিকে। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, এত দিন বন্যা নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় ব্রহ্মপুত্রই মূলত কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তিব্বত এবং অরুণাচল প্রদেশে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হচ্ছে। তাতে ব্রহ্মপুত্রের বন্যার ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ব্রহ্মপুত্রের উপনদীগুলির জলেই বহু এলাকায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। আপার অসমে সাম্প্রতিক বন্যার পিছনে প্রধান ভূমিকা নিয়েছে ব্রহ্মপুত্রের উপনদী ডিখৌ। তার সঙ্গে ধানসিড়ি, দোরিকা-সহ একাধিক নদীর জলও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ফলে জলসম্পদ দফতরকে এ বার উপনদীগুলির দিকে আরও বেশি নজর দিতে হবে।
❤ Support Us





