- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ১৪, ২০২৬
জনগণনা সহ একাধিক সরকারি কাজের দায়িত্বে শিক্ষকরা, স্কুলের পঠন-পাঠন চলবে কী ভাবে? রাজ্যকে প্রশ্ন হাই কোর্টের
জনগণনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজে স্কুলশিক্ষকদের একসঙ্গে বড়ো সংখ্যায় নিয়োগ করা নিয়ে প্রশ্ন তুলল কলকাতা হাই কোর্ট। শুক্রবার এ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের প্রশ্ন, দিনের বেশিরভাগ সময় স্কুলে কাটানোর পরে শিক্ষকেরা কখন জনগণনার কাজ করবেন? আর যে শিক্ষক-শিক্ষিকারা দূরদূরান্ত থেকে স্কুলে যাতায়াত করেন, তাঁদের পক্ষে স্কুলের দায়িত্ব সামলে ফের অন্যত্র গিয়ে জনগণনার কাজ করা কতটা সম্ভব? আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এল, প্রশাসনিক কাজের চাপে স্কুলের স্বাভাবিক পঠনপাঠন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও।
মামলাটি করেছেন সরকারি স্কুলের একাংশ শিক্ষক। তাঁদের বক্তব্য, জনগণনার দায়িত্ব পালনে তাঁদের আপত্তি নেই। কিন্তু একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক শিক্ষককে ওই কাজে যুক্ত করলে বহু স্কুলেই নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকবে না। বিশেষ করে বর্তমানে সরকারি স্কুলগুলি এমনিতেই শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে। নতুন কাজের দায়িত্বে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। শুনানিতে বিচারপতি রাও রাজ্যের আইনজীবীর কাছে জানতে চান, ‘শিক্ষকেরা কখন স্কুল করবেন, কখনই বা জনগণনার কাজ করবেন?’ তাঁর প্রশ্ন, যে সমস্ত শিক্ষক দূর থেকে কর্মস্থলে আসেন, তাঁদের কথা মাথায় রেখেই কি জনগণনার কাজে নিয়োগ করা হয়েছে? তাঁদের কর্মস্থল, যাতায়াতের দূরত্ব এবং স্কুলে থাকার সময়ের মতো বিষয়গুলি বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি।
রাজ্যের আইনজীবীর উদ্দেশে বিচারপতি জানতে চান, ‘জনগণনার কাজে নিযুক্ত করার আগে বায়োডেটা পরীক্ষা করেননি কেন? শিক্ষকেরা কোথা থেকে কাজে আসছেন, তা দেখেননি কেন?’ আদালতের বক্তব্য, সকল শিক্ষককে একই সঙ্গে কাজে না পাঠিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েক জনকে দায়িত্ব দেওয়া হলে স্কুলের কাজও সচল রাখা সম্ভব। রাজ্যের তরফে অবশ্য আদালতে বলা হয়, জনগণনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় কাজ। দেশের অন্যান্য রাজ্যেও এ প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু তাতে বিচারপতির প্রশ্নবাণ থামেনি। তিনি জানতে চান, শিক্ষকেরা যদি সকাল থেকে স্কুলে থাকেন, তা হলে জনগণনার কাজের জন্য তাঁদের সময়ই বা কোথায়? শুনানিতে শনিবারেও শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়ার প্রসঙ্গ ওঠে। বিচারপতির প্রশ্ন, ‘সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত স্কুল করেন। তা হলে জনগণনার কাজ করার জন্য তাঁদের সময় কোথায়?’ রাজ্যের আইনজীবী তখন জানান, শিক্ষকরা বিকেল ৪টে পর্যন্ত স্কুলে থাকেন না। এ বক্তব্য আদালতের নথিতে রাখা হবে কি না, তা-ও রাজ্যের কাছে জানতে চান বিচারপতি।
শিক্ষকদের তরফে অবশ্য আদালতে জানানো হয়, তাঁরা জনগণনার দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত। কিন্তু প্রশাসনের তরফে তাঁদের ওই সময়টিকে ‘অন ডিউটি’ হিসেবে গণ্য করা প্রয়োজন। না হলে এক দিকে স্কুলে অনুপস্থিত থাকার জন্য প্রশাসনিক সমস্যা তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে জনগণনার দায়িত্ব পালনের কারণেও তাঁদের কাজের চাপ বাড়বে। এ সমস্যার সমাধানে ‘রোটেশন’ পদ্ধতির কথাও শুনানিতে উঠে আসে। হাই কোর্টের প্রস্তাব, একসঙ্গে বহু শিক্ষককে জনগণনার কাজে না পাঠিয়ে চার-পাঁচ জন করে শিক্ষককে পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে এক দিন অন্তরও কাজ করানো যেতে পারে। তাতে এক দিকে জনগণনার কাজ এগোবে, অন্যদিকে স্কুলের পঠনপাঠনও পুরোপুরি থমকে থাকবে না।
তবে প্রশাসনের উদ্দেশ্যে বিচারপতির বক্তব্য, ‘অন্য বন্দোবস্ত করুন। শিক্ষকেরা কাজ সেরে কখন বাড়ি যাবেন?’ এই মন্তব্যেই কার্যত উঠে এসেছে শিক্ষকদের উপর চাপতে থাকা জোড়া দায়িত্বের প্রশ্ন। দিনের বেলায় স্কুল, তার পরে জনগণনার কাজ— দুই দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ব্যক্তিগত সময়ও কার্যত থাকছে না বলে মামলাকারীদের অভিযোগ। শিক্ষকদের সংগঠনগুলির একাংশের অভিযোগ, জনগণনা নতুন কোনো বিচ্ছিন্ন দায়িত্ব নয়। ভোটের ডিউটি, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন, নির্বাচনী প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন সরকারি সমীক্ষা এবং প্রশাসনিক তথ্য সংগ্রহ— বছরের বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের একাধিক কাজে শিক্ষকেদের নিয়োগ করা হয়। ফলে অনেক স্কুলেই শিক্ষকদের মূল দায়িত্ব, অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষে পড়ানো, ক্রমশ পিছনের সারিতে চলে যাচ্ছে।
বিশেষ করে গ্রাম ও জেলার বহু স্কুলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগের। কোথাও শিক্ষক রয়েছেন মাত্র এক জন, কোথাও বা দু-জন। তাঁদের মধ্যে কেউ যদি একাধিক দিন সরকারি কাজে বাইরে থাকেন, তা হলে স্কুলে নিয়মিত ক্লাস চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য শিক্ষককে একসঙ্গে একাধিক শ্রেণি সামলাতে হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়ে পড়ুয়ারাই। শিক্ষক সংগঠনগুলোর দাবি, জনগণনার কাজে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করা হোক। কোন সময় তাঁদের এই দায়িত্ব পালন করতে হবে, স্কুলে তাঁদের অনুপস্থিতির সময়ে বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে এবং ওই সময়টিকে কী ভাবে সরকারি ডিউটি হিসেবে গণ্য করা হবে— সবটাই প্রশাসনের তরফে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
এখন নজর মঙ্গলবারের শুনানির দিকে। শুক্রবার আদালত মামলাকারী শিক্ষকদের বসবাসের জায়গা, তাঁদের স্কুল কোথায়, কত দূর থেকে তাঁরা যাতায়াত করেন এবং স্কুলে কতক্ষণ থাকেন—এ সমস্ত তথ্য রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেলের কাছে জমা দিতে বলেছে। পরবর্তী শুনানিতে ওই তথ্যের ভিত্তিতে রাজ্য তার সিদ্ধান্ত জানাবে। তবে তার আগেই জনগণনার দায়িত্বে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে প্রশ্নটি আরও এক বার সামনে এল, তা হলো— শিক্ষকদের প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের দায়িত্বও কি সমান গুরুত্বে দেখা হচ্ছে? ভোট থেকে জনগণনা, সরকারি কাজের পরিসর যত বাড়ছে, ততই কি স্কুলের পড়াশোনার সময় কমছে? আদালতের শুক্রবারের প্রশ্নে সে বিতর্কই ফের সামনে।
❤ Support Us








