- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ১৩, ২০২৬
‘সুগৌলি চুক্তি’র মূল নথিই হারিয়েছে নেপাল ? সীমান্ত-বিতর্কে নতুন প্রশ্ন
দুশো বছরের পুরনো একটি চুক্তি। আর সে চুক্তির মূল নথিই কোথায়, তা জানে না নেপাল! ভারত-নেপাল সীমান্ত-বিতর্কের অন্যতম ভিত্তি ১৮১৬ সালের ‘সুগৌলি চুক্তি’-র আসল কপি নেপালের কাছে রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কাঠমান্ডু। নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল সে কথা জানিয়েছেন দেশের সংসদের। জাতীয় আর্কাইভে চুক্তি-সংক্রান্ত কিছু নথি রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলিই যে মূল, স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্র—তার প্রমাণ মেলেনি। ফলে লিপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পিয়াধুরা নিয়ে দীর্ঘদিনের ভারত-নেপাল সীমান্ত-বিতর্কে ইতিহাসের পুরনো নথি নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
সংসদে নেপালের বিদেশমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকারি চুক্তির মূল নথি আমাদের হাতে রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সরকারের কাছে স্পষ্ট তথ্য নেই। জাতীয় আর্কাইভে বিভিন্ন চুক্তি-সংক্রান্ত কাগজপত্র সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু সেগুলির মধ্যে কোনটি প্রকৃত সরকারি চুক্তির মূল নথি, তা নিশ্চিত করা যায়নি। অর্থাৎ, নেপালের কাছে ‘সুগৌলি চুক্তি’-র যে কপি রয়েছে, তা আদৌ মূল নথি কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয়। তবে, এই প্রথম নয়। ২০১৯ সালেও নেপালের তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী প্রদীপ গ্যাওয়ালি জানিয়েছিলেন, ১৮১৬ সালের ‘সুগৌলি চুক্তি’ এবং ১৯৫০ সালের ‘ভারত-নেপাল শান্তি ও মৈত্রী চুক্তি’-র নথি নেপালের কাছে রয়েছে। তবে সেগুলি মূল নথি কি না, তা সঠিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সে সঙ্গে ভারত ও ব্রিটেনে থাকা ঐতিহাসিক নথি ও মানচিত্র খোঁজার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
তারও আগে, ২০১৬ সালে ভারত-নেপাল সম্পর্ক নিয়ে গঠিত ‘এমিনেন্ট পার্সনস গ্রুপ’ ১৯৫০ সালের চুক্তি পর্যালোচনা বা পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা শুরু করলে নেপালের তরফে মূল নথি খোঁজার চেষ্টা হয়। তখনো খোঁজ মেলেনি। সংসদীয় অনুসন্ধানে গ্রন্থাগার, সরকারি আর্কাইভ, জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব দফতর, নারায়ণহিতি প্রাসাদ জাদুঘর, আইন মন্ত্রক এবং বিদেশ মন্ত্রক—বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। কিন্তু ‘সুগৌলি চুক্তি’ এবং ১৯৫০ সালের চুক্তির মূল কপি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
১৮১৪ থেকে ১৮১৬—অ্যাংলো-নেপাল যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ভারত ও নেপালের মধ্যে ‘সুগৌলি চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। ১৮১৫ সালের ডিসেম্বরে চুক্তিতে সই হয়, পরের বছর মার্চে তা অনুমোদিত হয়। নেপালের আধুনিক সীমান্তের কাঠামো তৈরিতে এ চুক্তির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সে চুক্তিরই পঞ্চম ধারা আজকের সীমান্ত-বিতর্কের কেন্দ্রে। সেখানে কালী নদীর পশ্চিমে থাকা ভূখণ্ডের উপর নেপালের দাবি প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছিল। ফলে নেপালের পশ্চিম সীমান্ত হিসেবে কালী বা মহাকালী নদী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু দুই শতাব্দী পরেও প্রশ্নের উত্তর মেলেনি— কালী নদীর উৎস কোথায়? নেপালের দাবি, কালী নদীর উৎস লিম্পিয়াধুরায়। এ হিসাব অনুযায়ী লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি এবং লিপুলেখ কালী নদীর পূর্ব দিকে পড়ে। ফলে ওই তিন অঞ্চলই নেপালের ভূখণ্ডের মধ্যে পড়ে বলে কাঠমান্ডুর দাবি।
ভারতের ব্যাখ্যা অবশ্য আলাদা। দিল্লির মতে, কালী নদীর উৎস লিপুলেখ অঞ্চলের নীচের দিকের ঝরনাগুলিতে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক প্রশাসনিক ও রাজস্ব নথির ভিত্তিতে ভারতের দাবি, কালাপানি দীর্ঘদিন ধরেই পিথোরাগড় জেলার প্রশাসনিক পরিসরের মধ্যে ছিল। ফলে দু–দেশই নিজেদের দাবির পক্ষে ব্রিটিশ আমলের মানচিত্র, প্রশাসনিক রেকর্ড এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক নথি তুলে ধরে। সমস্যা আরও জটিল করেছে ‘সুগৌলি চুক্তি’-র ভাষ্যই। চুক্তিতে লিম্পিয়াধুরাকে কালী নদীর উৎস হিসাবে স্পষ্ট করে চিহ্নিত করা হয়নি। চুক্তির সঙ্গে এমন কোনো মানচিত্র ছিল বলেও নিশ্চিত প্রমাণ নেই, যা দুই পক্ষের কাছে সমান ভাবে গ্রহণযোগ্য এবং নদীর উৎসের অবস্থান নির্দিষ্ট করে। ফলে মূল চুক্তির নথি, পুরনো মানচিত্র, রাজস্ব রেকর্ড এবং প্রশাসনিক দলিল— সব কিছুর গুরুত্বই বেড়ে যায়।
এদিকে, ভারত-নেপাল সীমান্ত-বিতর্ক নতুন মাত্রা পায় ২০২০ সালে। উত্তরাখণ্ডের সঙ্গে লিপুলেখকে যুক্ত করা প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক উদ্বোধন করে দিল্লি। কৈলাস মানস সরোবর যাওয়ার পথের ওই সড়ক নেপালের ভূখণ্ডের উপর দিয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ তোলে কাঠমান্ডু। এর পরই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সরকার নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে। সে মানচিত্রে লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি ও লিপুলেখকে নেপালের ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো হয়। পরে নেপালের সংসদ সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে ওই মানচিত্রকে স্বীকৃতিও দেয়। নেপালের ওই বিতর্কিত পদক্ষেপ অবশ্য মেনে নেয়নি ভারত। দিল্লি একে নেপালের অন্যায্যভাবে ভূখণ্ডগত দাবি সম্প্রসারণ বলে প্রত্যাখ্যান করে। ভারত জানিয়েছিল, একতরফা ভাবে মানচিত্র বদলের এ পদক্ষেপ ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে নয়। তার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপড়েন তৈরি হয়। যে ভারত-নেপাল সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ‘রুটি-বেটি’র সম্পর্ক বলা হয়, সেই সম্পর্কের মধ্যেও সীমান্ত প্রশ্নটি হয়ে ওঠে অস্বস্তির অন্যতম কারণ।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চিন লিপুলেখ গিরিপথ দিয়ে বাণিজ্য ফের চালু করার বিষয়ে সম্মত হওয়ার পর সীমান্ত-বিতর্কটি আবার সামনে আসে। নেপালের নতুন সরকার তাতে আপত্তি জানিয়ে স্পষ্ট করে দেয়, লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা ও কালাপানিকে তারা নিজেদের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের একটি মন্তব্যও নতুন বিতর্ক তৈরি করে। সংসদে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি জানতে পেরেছেন— ভারত যেমন নেপালের ভূখণ্ডে দখল করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তেমনই নেপালও একাধিক জায়গায় ভারতের জমি দখল করেছে। পরে নেপালের বিদেশ মন্ত্রক অবশ্য ব্যাখ্যা দেয়, প্রধানমন্ত্রী মূলত সীমান্তের কারিগরি পর্যায়ের দখল বা দখল-সংক্রান্ত সমস্যার কথা বলেছেন। বিতর্কিত অঞ্চলগুলির বিষয়ে নেপালের সরকারি অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি বলেও জানানো হয়।
তবে, নেপালের কাছে সত্যিই যে ‘সুগৌলি চুক্তি’-র মূল কপি নেই, এমনটা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ চুক্তি-সংক্রান্ত নথি যে নেপালের জাতীয় আর্কাইভে রয়েছে, তা সরকার স্বীকার করেছে। কিন্তু সেগুলির মধ্যে কোনটি মূল, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আর এই অনিশ্চয়তা সীমান্ত-বিতর্কে ঐতিহাসিক নথির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ ‘সুগৌলি চুক্তি’-র পাশাপাশি ব্রিটিশ আমলের মানচিত্র, প্রশাসনিক নথি, রাজস্ব রেকর্ড এবং পরবর্তী সময়ের দ্বিপাক্ষিক দলিল— সবই ভারত ও নেপালের দাবির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নেপালের বিদেশ মন্ত্রক অবশ্য জানিয়েছে, লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ এবং কালাপানি-সহ বিতর্কিত সীমান্ত অঞ্চল নিয়ে তাদের সরকারি অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। অমীমাংসিত সীমান্ত সমস্যা কূটনৈতিক আলোচনা আর পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে মেটানোর পক্ষেই তারা সওয়াল করছে। আবার, সীমান্ত নিয়ে অবস্থান অনড় থাকলেও ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বার্তাও দিচ্ছে কাঠমান্ডু। বিদেশমন্ত্রী খানালের বলেছেন, ভারত ও চিন—দুই প্রতিবেশীর সঙ্গেই সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও মজবুত করতে চায় নেপাল।
❤ Support Us







