Advertisement
  • দে । শ
  • আগস্ট ১৩, ২০২৬

চাঁদিপুরা থেকে নিপা, জাপানি এনসেফ্যালাইটিস— বর্ষায় বাড়ছে ভাইরাসের চোখরাঙানি ?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
চাঁদিপুরা থেকে নিপা, জাপানি এনসেফ্যালাইটিস— বর্ষায় বাড়ছে ভাইরাসের চোখরাঙানি ?

বর্ষা নামতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে একাধিক ভাইরাসজনিত রোগ। কোথাও সংক্রমণ সীমিতকোথাও আবার আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও রোগটির ভয়াবহতার কারণে সতর্ক প্রশাসন। সে তালিকায় এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় চাঁদিপুরা ভাইরাস। গুজরাতে গত ৩০ জুন থেকে ১২ গস্ট পর্যন্ত ২৩৮টি সন্দেহভাজন সংক্রমণের মধ্যে ৪১টি পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ নিশ্চিত আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর অনুপাত প্রায় ৬৫.৯ শতাংশ।  টি নমুনার পরীক্ষার ফল এখনো আসেনি। ফলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বদলাতে পারে।   

গুজরাতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রফুল পানসেরিয়া জানিয়েছেনযে এলাকায় চাঁদিপুরা শনাক্ত হয়েছেসেখানে সংক্রমণের নতুন উৎস যাতে তৈরি না হয়সে জন্য জোরদার নজরদারি চালানো হচ্ছে। রাজ্যের সিভিল হাসপাতালগুলিতেও চাঁদিপুরা আক্রান্তদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থার কথা জানিয়েছেন তিনি। প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দিলেই রোগীদের দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসার আওতায় আনার উপর জোর দিচ্ছে স্বাস্থ্য দফতর। চাঁদিপুরা মূলত একটি বালিমাছি বাহিত ভাইরাস। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিশেষ ভাবে ভয়াবহ হতে পারে। আচমকা উচ্চ জ্বরের পর বমিমাথাব্যথাখিঁচুনিচেতনা হারানো এবং দ্রুত মস্তিষ্কে প্রদাহ— রোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণ অত্যন্ত দ্রুত গুরুতর আকার নিতে পারে।  সবচেয়ে বড়ো সমস্যাচাঁদিপুরার নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত লাইসেন্সপ্রাপ্ত টিকা নেই। ফলে রোগ দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসাই আপাতত প্রধান ভরসা।

এদিকে, গুজরাত ও রাজস্থানে এনসেফ্যালাইটিসের ঘটনা সামনে আসার পরে মহারাষ্ট্রেও সতর্কতা জারি হয়েছে। রাজ্য স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ১২ গস্ট চাঁদিপুরা নিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করে। শিশুদের মধ্যে জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনিচেতনার পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে সতর্কতা জারি হওয়া মানেই মহারাষ্ট্রে চাঁদিপুরার বড়ো আকারের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে গিয়েছেএমন নয়। প্রতিবেশী রাজ্যে সংক্রমণ এবং বর্ষাকালে বাহক পতঙ্গের সক্রিয়তা বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখেই আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন।

চাঁদিপুরার পাশাপাশি নিপা ভাইরাসও স্বাস্থ্য কর্তাদের উদ্বেগের তালিকায় রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গে দুই জন স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে নিপা শনাক্ত হয়েছিল। দুজনেই উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের একই বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে এক জন সুস্থ হয়ে ওঠেন। অন্য জন ১২ ফেব্রুয়ারি একাধিক জটিলতার কারণে মারা যান। ওই ঘটনার পরে সংস্পর্শে আসা প্রায় ২০০ জনকে চিহ্নিত করে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। তবে বৃহত্তর জনসংখ্যার মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে পশ্চিমবঙ্গের ঘটনাকে এখনো পর্যন্ত সীমিত সংক্রমণ হিসাবেই দেখা হচ্ছে। জুনে কেরালার কোঝিকোড়ে ফের এক জনের শরীরে নিপা শনাক্ত হয়। যদিও এ পর্যন্ত দ্বিতীয় কোনও সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। ফলে, একে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ বলা যাচ্ছে না। তবে, বাদুড়ের মতো প্রাকৃতিক বাহকের উপস্থিতি এবং কেরালায় অতীতে বার বার সংক্রমণের ঘটনা থাকায় সম্ভাব্য নতুন সংক্রমণ ঠেকাতে সতর্কতা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপা প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুর হার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এক্ষেত্রেও এখনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোনো টিকা নেই। নির্দিষ্ট কোনও সর্বজনীন অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসাও নেই। ফলে দ্রুত শনাক্তকরণআইসোলেশনসংস্পর্শ ব্যক্তিদের নজরদারি আর নিবিড় সহায়ক চিকিৎসাই মূল অস্ত্র।

চাঁদিপুরা বা নিপার মতো বিরল ভাইরাসের খবর সামনে এলেও ভারতের জনস্বাস্থ্যে জাপানি এনসেফ্যালাইটিসের গুরুত্ব আলাদা। এটি বহু দিন ধরেই দেশের বিভিন্ন অংশেবিশেষত উত্তর-পূর্ব ও কিছু পূর্বাঞ্চলেমশাবাহিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ। জাপানি এনসেফ্যালাইটিসে প্রথমে জ্বরমাথাব্যথাবমি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। গুরুতর হলে মস্তিষ্কে প্রদাহখিঁচুনিঅচেতনতা এবং স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতি হতে পারে। মৃত্যুও ঘটতে পারে। তবে চাঁদিপুরা ও নিপার তুলনায় এখানে একটি বড় স্বস্তির জায়গা রয়েছে— জাপানি এনসেফ্যালাইটিসের কার্যকর টিকা রয়েছে । ভারতের টিকাকরণ কর্মসূচিতেও তা অন্তর্ভুক্ত।

বিরল ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ডেঙ্গুকে ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ চাঁদিপুরা বা নিপার তুলনায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ অনেক বেশি বিস্তৃত। কেন্দ্রীয় রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ৬,৯২৭টি ডেঙ্গু আক্রান্ত এবং ১০টি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। বর্ষা ও বর্ষা পরবর্তী সময়ে এ সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে পারে। সাধারণ জ্বরের পাশাপাশি গুরুতর ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণরক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া এবং একাধিক অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হয়ে মৃত্যু হতে পারে। এক্ষেত্রে, বাড়ির আশপাশে জল জমতে না দেওয়ামশার বংশবৃদ্ধি বন্ধ করা এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।

দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশে নজরে রয়েছে কিয়াসানুর ফরেস্ট ডিজিজ বা ‘কেএফডি’। এটি মূলত সংক্রমিত টিক বা খুব ছোট এক ধরনের পরজীবী পোকার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে পৌঁছয়। কর্নাটক এ রোগের অন্যতম প্রধান এলাকা হলেও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি রাজ্যেও নজরদারি রয়েছে। হঠাৎ জ্বরমাথাব্যথাপেশিতে ব্যথাবমিদুর্বলতা— আক্রন্তের প্রাথমিক উপসর্গ। গুরুতর ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ এবং স্নায়বিক জটিলতা হতে পারে। তবে এটি এখনো সর্বভারতীয় সংক্রমণের পর্যায়ে যায় নি। মূলত নির্দিষ্ট পরিবেশ ও বনাঞ্চল-নির্ভর সংক্রমণের ঝুঁকিই এখানে বেশি।

ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস’-ও ভারতে সম্পূর্ণ অজানা নয়। অধিকাংশ আক্রান্তের ক্ষেত্রে উপসর্গ মৃদু বা একেবারেই থাকে না। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাসটি মস্তিষ্কে পৌঁছে এনসেফ্যালাইটিস বা মেনিনজাইটিস তৈরি করতে পারে। চিকিৎসায় দেরি হলে রোগীদের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।  অন্যদিকে, ‘ক্রিমিয়ান-কঙ্গো হেমোরেজিক জ্বর, ভারতে অত্যন্ত বিরল হলেও গুরুতর। জ্বরমাথাব্যথাপেশিতে ব্যথাবমি এবং পরে রক্তক্ষরণ— এ রোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গুরুতর ক্ষেত্রে লিভারকিডনি ও অন্যান্য অঙ্গ আক্রান্ত হতে পারে। এই দুই ভাইরাসের ক্ষেত্রে ভারতে সংক্রমণ তুলনামূলক ভাবে সীমিত। তাই এগুলিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আতঙ্কের কারণ নেই। তবে নির্দিষ্ট এলাকায় সংক্রমণ শনাক্ত হলে দ্রুত নজরদারি ও চিকিৎসা জরুরি।

তাহলে কি ভারতে নতুন কোনও মহামারি’ আসছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ‘কোভিড-১৯’-এ আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও, তা আগের পরিস্থিতির মতো নয় বলেই মত চিকিৎসকদের। তাঁদের মতে, করোনা ভাইরাস  এখনো মানুষের মধ্যে ঘুরছেসময়-সময় এর সংক্রমণ বাড়ছে-কমছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কয়েকটি জায়গায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার খবরও সামনে এসেছে। বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসকেরা ইনফ্লুয়েঞ্জার পাশাপাশি মৃদু কোভিডের রোগী বাড়ার কথা জানিয়েছেন। তবে ছবিটা এখনই ২০২০ বা ২০২১ সালের মতো নয়। অর্থাৎদেশ জুড়ে নতুন করে বড়ো ধরনের কোভিড-ঢেউ বা হাসপাতালগুলিতে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে— এমন পরিস্থিতির প্রমাণ এখনো নেই বরং বিভিন্ন রাজ্যে বিচ্ছিন্ন ভাবে সংক্রমণ বাড়ছে। মিজোরামে গস্টের শুরুতে কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও বর্তমানে সক্রিয় রোগীর সংখ্যা কমে পাঁচে নেমে এসেছে। অন্য দিকে পুণেতে চিকিৎসকেরা সাম্প্রতিক সময়ে মাঝারি মাত্রার কোভিড রোগী এবং কিছু ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা বাড়ার কথা জানিয়েছেন।  

কোভিডের ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখন আর প্রতিদিনের সর্বভারতীয় আক্রান্তের সংখ্যা আগের মতো নিয়মিত ভাবে প্রকাশিত হয় না। ফলে ১৩ গস্টের নিরিখে দেশে ঠিক কত জন সক্রিয় কোভিড রোগী রয়েছেনতার একটি নির্ভুল সর্বভারতীয় সংখ্যা বলা কঠিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোভিড ড্যাশবোর্ডেও বর্তমানে বিভিন্ন দেশের রিপোর্টিং ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে তথ্য প্রকাশিত হয়। আবার সব সংক্রমণ পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়ে না। অনেক আক্রান্ত টেস্টও করান নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট ও সাব-ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাবও কোভিডের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নয়। ফলে কোনো একটি নতুন ভ্যারিয়েন্টের নাম সামনে এলেই তা আগের কোভিড-ঢেউয়ের মতো ভয়ঙ্কর— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কারণ নেই। বরং সংক্রমণ কত দ্রুত ছড়াচ্ছেগুরুতর রোগী বা হাসপাতালে ভর্তি বাড়ছে কি না এবং মৃত্যুর হার কী রকম— এ সূচকগুলিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বর্ষার এ মরশুমে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— দ্রুত রোগ শনাক্তকরণমশা ও অন্যান্য বাহক নিয়ন্ত্রণসন্দেহভাজন রোগীর দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছনোসংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নজরদারি এবং অযথা আতঙ্ক না ছড়ানো।বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে আচমকা উচ্চ জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনিঅস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাবআচরণে পরিবর্তন বা চেতনা হারানোর মতো উপসর্গ দেখা দিলে তা সাধারণ জ্বর ভেবে বাড়িতে ফেলে রাখা বিপজ্জনক হতে পারে। একই ভাবে নিপা-প্রবণ এলাকায় জ্বরের সঙ্গে স্নায়বিক বা শ্বাসযন্ত্রের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!