- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ১৩, ২০২৬
বই পড়লে কমবে কারাবাসের মেয়াদ ! ব্রাজিলে বন্দিদের মুক্তির পথ দেখাচ্ছে পড়াশোনা
জেলখানার মোটা দেওয়াল। লোহার গরাদ। নির্দিষ্ট সময়ের রুটিন। সমাজ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, অবসাদে ঘেরা দিন গোনার একঘেয়ে অপেক্ষা। বন্দিজীবনের সঙ্গে সাধারণত এ ছবিটিই জড়িয়ে থাকে। কিন্তু সে জীবনে যদি হঠাৎ ঢুকে পড়ে বই? যদি একটি বই পড়ে, তার মর্মার্থ বুঝে, তা নিয়ে নিজের ভাবনা লিখে দেখাতে পারলে যদি কমে যায় কারাবাসের মেয়াদ?
জেলখানা শাস্তির জায়গা। অপরাধের বিচার হয়েছে, আদালত সাজা দিয়েছে, তার পর নির্দিষ্ট কয়েক বছর বা মাস বন্দিত্ব— এ সরল হিসাবেই যেন কারাবাসের অর্থ শেষ। আসলেই কী শুধু তাই? আধুনিক দণ্ডব্যবস্থার সামনে প্রশ্নটি ক্রমশ অন্য রকম হয়ে উঠছে: মানুষকে কেবল শাস্তি দিলেই কি সমাজ নিরাপদ হয়, না কি এমন কোনো বন্দোবস্ত দরকার, যাতে সাজা শেষ হওয়ার পরে সে মানুষটি বদলে যাওয়া নতুন এক নাগরিক হয়ে সমাজের মূল স্রোতে ফেরেন? তাই তো পৃথিবীজুড়ে দীর্ঘমেয়াদের জেলখানার নাম – সংশোধনাগার।
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ব্রাজিল সরকার এক অভিনব ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বন্দিরা বই পড়বেন, অর্থ বুঝে তার উপর লিখবেন নিজস্ব ভাবনা-চিন্তা। লেখা গ্রহণযোগ্য হলে সাজা কমবে চার দিন। বছরে সর্বাধিক বারোটি বই পড়ে কমানো যেতে পারে ৪৮ দিন পর্যন্ত কারাবাসের মেয়াদ। হঠাৎ শুনলে মনে হয়, এ যেন বইয়ের সঙ্গে স্বাধীনতার সরাসরি লেনদেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এ কোনো সময় কেনাবেচার ব্যবস্থা নয়; বরং শাস্তির সময়ের একটি অংশকে শিক্ষার সময় হিসাবে পুনর্নির্ধারণ করার চেষ্টা। মনের গহীন অন্ধকারকে শিক্ষার, ভাবনা-চিন্তার আলোকে আলোকিত করবার প্রচেষ্টা।
ব্রাজিলের ‘রেমিসাও পেল়া লেইতুরা’ বা পড়ার মাধ্যমে সাজা কমানোর এ ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল তুঙ্গে। একটি বই পড়ে চার দিন আগে জেল থেকে বেরোনোর সুযোগ— এমন ধারণা সাধারণ পাঠকের কাছে প্রথমে চমকপ্রদ বলেই মনে হবে। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত যুক্তিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বন্দি কেবল বই হাতে নিলেন, কয়েকশো পাতা উল্টে শেষ করলেন, চার দিনের ছাড় পেয়ে গেলেন— ব্যাপারটি তো এমন নয়। তাঁকে বইটি পড়ে তার বিষয়বস্তু সম্পর্কে নিজের উপলব্ধি লিখিত ভাবে প্রকাশ করতে হয়। তাঁর লেখা থেকে বোঝা দরকার যে বইটি তিনি সত্যিই পড়েছেন, নিজের মতো করে অন্তত লেখার মূল ভাবনাটুকু বুঝেছেন। অর্থাৎ, এ ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে পড়া, বোঝা আর নিজের ভাষায় প্রকাশ করা। একটি বই শেষ করা এখানে লক্ষ্য নয়; বইটির সঙ্গে বৌদ্ধিক সম্পর্ক তৈরি করাটাই মূল কথা। ফলে চার দিনের প্রণোদনা থাকলেও তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে শিক্ষার শর্ত। যা ধীরে ধীরে সম্পূর্ণভাবে বদলে ফেলতে পারে অতীতে গুরুতর অপরাধ করা ব্যক্তিকে।
এ জায়গাতেই ব্রাজিলের পরীক্ষাটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারাগারে বন্দি মানুষকে সমাজ দূরে সরিয়ের রাখতে চায়। তাঁর স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, চলাফেরার অধিকার সীমিত হয়েছে, সময়ের উপর তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু তাঁর চিন্তার জগৎ কি একই ভাবে বন্দি থাকবে? শারীরিক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কি পড়ার অধিকার, শেখার অধিকার, নতুন কিছু জানার অধিকারও শেষ হয়ে যায়? ব্রাজিলের এ নীতি অন্তত সে ধারণাকে স্বীকার করে না। বরং ধরে নেয়, কারাগারের ভিতরেও একজন মানুষ শিখতে পারেন, ভাবতে পারেন, নিজের ভাষা তৈরি করতে পারেন। আর সে শিক্ষাকে যদি তাঁর সাজা কমানোর সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে শাস্তি ও পুনর্বাসনের মধ্যেও নিবিড় এক সেতু তৈরি হতে পারে।
ব্রাজিলের এ ধারণার গুরুত্ব বোঝার জন্য ‘শাস্তি’ এবং ‘পুনর্বাসন’-এর পার্থক্যটি মনে রাখা দরকার। কোনো অপরাধের জন্য শাস্তি প্রয়োজন কি না, সে প্রশ্ন এখানে নয়। প্রশ্ন হলো, শাস্তির উদ্দেশ্য কী! যদি কারাবাসের একমাত্র উদ্দেশ্য হয় একজন মানুষকে সমাজ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন রাখা, তবে কারাগারের ভিতরে তাঁর প্রতিটি দিন একই রকম। কিন্তু যদি উদ্দেশ্যের মধ্যে পুনর্বাসন বা সংশোধনের প্রক্রিয়াও যুক্ত থাকে, তবে বন্দি জীবনের প্রতিটি দিন কিছুটা অর্থপূর্ণ করে তোলার প্রশ্ন আসে। একজন বন্দি কাজ করছেন, পড়াশোনা করছেন, ভাবছেন, কোনো না কোনো দক্ষতা অর্জন করছেন, বই পড়ছেন— এ কর্মকাণ্ডগুলি তখন শুধুমাত্র সময় কাটানোর উপায় থাকে না। এগুলি হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের সমাজে ফিরে যাওয়ার পূর্ব প্রস্তুতি।
এখানে চার দিনের হিসাবটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু চার দিনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনার দর্শন। কাউকে সরাসরি বলা হচ্ছে না, ‘তুমি ভালো মানুষ হয়ে ওঠো, তাহলে তোমাকে পুরস্কার দেব।’ বরং বলা হচ্ছে, ‘তুমি নিজের সময়ের কিছু অংশ শিক্ষায় বিনিয়োগ করো, তার স্বীকৃতি হিসাবে তোমার সাজা কিছুটা কমবে।’ এ পার্থক্যটি সূক্ষ্ম হলেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ জেলখানার বন্দির কাছে সময়ই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাঁর জীবনের যে সময়টি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে, সে সময়ের কিছুটা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা তাঁকে পড়াশোনার দিকে টেনে আনতে পারে। কেউ হয়তো সাহিত্যপ্রেমী নন, কিন্তু চার দিনের জন্য বই হাতে নিলেন। সে বই পড়তে গিয়ে হয়তো প্রথম বার কোনো চরিত্র নিয়ে ভাবলেন, কোনো সামাজিক প্রশ্ন নিয়ে নিজের মত তৈরি করলেন, কিংবা নিজের জীবনের সঙ্গে বইটির কোনো ঘটনার মিল খুঁজে পেলেন। প্রণোদনা দিয়ে শুরু হওয়া পাঠ শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় পরিণত হতে পারে। শিক্ষার ইতিহাসে এমন ঘটনা অস্বাভাবিক নয়—অনেক অভ্যাসই শুরু হয় প্রয়োজন বা বাধ্যবাধকতা থেকে, পরে তা হয়ে ওঠে আগ্রহ।
অবশ্য এ ব্যবস্থাকে ঘিরে একটি আপত্তিও স্বাভাবিক। বই পড়া যদি স্বাধীন জ্ঞানচর্চা হয়, তবে তার সঙ্গে সাজা কমানোর মতো বাস্তব সুবিধা জুড়ে দিলে পড়ার স্বতঃস্ফূর্ততা কি নষ্ট হয় না? বন্দি কি তখন সাহিত্য পড়ছেন, না কি চার দিন কমানোর জন্য কয়েকটি পাতা মুখস্থ করছেন? প্রশ্নটি উড়িয়ে দেওয়ার নয়। কিন্তু ব্রাজিলের ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, শুধু বই পড়ার দাবি যথেষ্ট নয়; বইটি বুঝেছেন কি না, তার প্রমাণ দিতে হবে। ফলে প্রণোদনাটি অন্তত সক্রিয় পাঠের দিকে ঠেলে দেয়। একজন বন্দি যদি চার দিনের জন্য বই হাতে নেন এবং সে বই সম্পর্কে নিজের ভাষায় লিখতে বসেন, তবে তিনি শুধু পাতা উল্টে পার পেয়ে যেতে পারবেন না। তাঁকে ভাবতে হবে, বুঝতে হবে, লিখতে হবে। এ প্রক্রিয়াটিই শিক্ষার মূল বিষয়।
তবে বই পড়ার এ উদ্যোগকে অপরাধ পুনরাবৃত্তি রোধের কোনো জাদুকাঠি হিসাবে দেখা ভুল হবে। কোনো একটি বই একজন মানুষের জীবনের সমস্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মানসিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। কারাবাস কাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে কাজ না পাওয়া, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, সামাজিক কলঙ্ক, দারিদ্র্য, মাদকাসক্তি, সহিংস পরিবেশ কিংবা অপরাধী চক্রের প্রভাব— এ সমস্ত কারণ পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
সেখানে বইয়ের ভূমিকা কিছুটা সীমিত। কিন্তু সীমিত বলেই তা অপ্রয়োজনীয় নয়। বরং সংশোধনের বহু স্তরের মধ্যে পড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হতে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও কারাগারে শিক্ষামূলক কর্মসূচি এবং পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমার মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অতএব বই একা কাউকে বদলে দেয় না, কিন্তু শিক্ষার পরিসর তৈরি করার মাধ্যমে বদলের প্রবল সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
আর এখানেই আসে আরও বড়ো প্রশ্ন—আদতে বই পৌঁছবে কার কার কাছে? কোনো নীতির সৌন্দর্য তার ঘোষণায় নয়, তার বাস্তব প্রয়োগে। ব্রাজিলের কারাগারে পড়াশোনার নানা প্রকল্প থাকলেও সব কারাগারে লাইব্রেরি বা উপযুক্ত পড়ার জায়গা নেই। ফলে একই দেশের দুই বন্দির সুযোগ এক নয়। একজন হয়তো শত শত বইয়ের নাগাল পাচ্ছেন, অন্যজন একটি বই পাওয়ার জন্যও প্রশাসনিক অনুমতির অপেক্ষায়। একজনের পাশে শিক্ষক বা স্বেচ্ছাসেবক আছেন, অন্যজন একাই বই পড়ছেন। একজনের লেখা নিয়মিত মূল্যায়ন হচ্ছে, অন্যজন জানেনই না কী ভাবে অংশ নিতে হবে। এ বৈষম্য দূর না হলে বই পড়ে সাজা কমানোর অধিকার কাগজে জাতীয় হলেও বাস্তবে তা অসম অধিকার হয়ে উঠতে পারে। ফলে, বই পড়ার জন্য লাইব্রেরি চাই, বই চাই, প্রশিক্ষিত মানুষ চাই, লেখার সুযোগ চাই, আলোচনার জায়গা চাই। নিরক্ষর বন্দির জন্য আলাদা সহায়তা চাই। ভিন্ন শিক্ষাগত স্তরের বন্দিদের জন্য ভিন্ন পদ্ধতি চাই। শুধু চার দিনের লোভ দেখিয়ে হাতে বই ধরিয়ে দিলেই হবে না; বইটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার পরিবেশও তৈরি করতে হবে। নইলে নীতি থাকবে, কিন্তু তার প্রাণ থাকবে না।
এখানে আমাদের নিজেদের সমাজের কথাও মনে পড়ে। কারাগারে বই, গ্রন্থাগার, শিক্ষা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমরা কতটা ভাবি? সাধারণত কারাগার নিয়ে আলোচনা হলেই উঠে আসে নিরাপত্তা, বন্দির সংখ্যা, পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা, পুলিশি ব্যবস্থা কিংবা অপরাধের কঠোর শাস্তির দাবি। বন্দিদের শিক্ষা, পাঠাভ্যাস, মানসিক পুনর্বাসন বা মুক্তির পর সমাজে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা তুলনায় অনেক কম। অথচ একজন বন্দি এক দিন না এক দিন মুক্তি পাবেন— জীবনদণ্ডের ক্ষেত্র বাদ দিলে অধিকাংশ কারাবাসেরই শেষ তারিখ আছে। প্রশ্ন হলো, সে দিনটি যখন আসবে, তখন মানুষটি কারাগারে ঢোকার সময়কার মানুষই থাকবেন, না কি কিছু শিখে, কিছু বদলে, কিছু তৈরি করে বেরোবেন? এ প্রশ্নটি দণ্ডব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকা উচিত।
ব্রাজিল মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও সম্ভবত এখানেই। কারাগারে বই দেওয়া কোনো ‘দয়া’ নয়। রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত। যে বন্দি পড়তে শেখেন, লিখতে শেখেন, নিজের চিন্তাকে ভাষায় প্রকাশ করতে শেখেন, তিনি মুক্তির পরে নিজের জীবনকে অন্য ভাবে গড়ে তোলার কিছুটা বেশি সুযোগ পেতে পারেন। যে বন্দি কোনো পেশাগত দক্ষতা অর্জন করেন, তাঁর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। যে বন্দি নিজের সঙ্গে অন্যের জীবন নিয়ে ভাবতে শেখেন, তাঁর সামাজিক সম্পর্কের ধরন বদলাতে পারে। অবশ্য এসবই সম্ভাবনা, নিশ্চয়তা নয়। কিন্তু পুনর্বাসনের নীতির কাজই তো হলো সম্ভাবনার পরিসর বাড়ানো।
আরও একটি দিক ভুলে গেলে চলবে না। জেলখানার বদ্ধ জীবনে বই শুধু শিক্ষাই দেয় না, এক ধরনের মানসিক অবকাশও দেয়। দীর্ঘ বন্দিজীবনে উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, সংবাদপত্রের কয়েকটি পৃষ্ঠা একজন মানুষকে কয়েক ঘণ্টার জন্য অন্য এক জগতে নিয়ে যেতে পারে। কারাগারের বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি নয়, কিন্তু অদ্ভুত এক মানসিক দূরত্ব। অন্য মানুষের জীবন, অন্য সময়, অন্য সমাজ, অন্য সংকটের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে তাকানোর সুযোগ। সাহিত্য সে অর্থে শুধু বিনোদন নয়; আত্মপর্যালোচনারও মাধ্যম। সে অপরাধের দায় মুছে দেওয়ার দাবি করে না, কিন্তু জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে তো শেখায়! ব্রাজিলের অভূতপূর্ব নীতিটিও তাই বইকে কেবল জ্ঞান অর্জনের বস্তু হিসাবে দেখছে না, বন্দির সময়ের সঙ্গে তার একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তৈরি করছে। বইয়ের মূল্য হয়ে উঠছে সময়। চার দিন। একটি বই পড়ে চার দিন। বছরে বারোটি বই পড়ে ৪৮ দিন। সংখ্যাটি শুনতে হয়তো ছোটো। কিন্তু একজন বন্দির কাছে চার দিনও চার দিন। চার দিন আগে পরিবারের কাছে ফেরা, চার দিন আগে কাজের সন্ধানে বেরোনো, চার দিন আগে জীবনের অন্য অধ্যায়ে প্রবেশ করা— এ সময়ের মূল্য বাইরের মানুষ চট করে বুঝতে পারবেন না।
মনে রাখতে হবে, কারাগার শেষ পর্যন্ত সমাজেরই একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানে যারা বন্দি, তাঁরা সমাজের মানুষ, ভিনগ্রহের প্রাণী নন। তাঁদের অপরাধের বিচার হয়েছে, সাজা হয়েছে; বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাজা শেষ হওয়ার পরে তাঁদের আবার সমাজেই ফিরতে হবে। অতএব প্রশ্নটি শুধু তাঁদের নিয়ে নয়, বাইরের মানুষদের নিয়েও। কারাগারে মানুষকে বন্দি রাখা রাষ্ট্রের ক্ষমতা।আর বন্দিত্বের মধ্যেও একজন মানুষকে শেখার সুযোগ দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বই সে দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে সস্তা, সহজ, একই সঙ্গে সবচেয়ে গভীর উপায়গুলির একটি হতে পারে। তাই শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের এ উদ্যোগের হিসাব দিনের হিসাবে মাপা উচিত নয়। আসল হিসাব আরও দীর্ঘ। কত জন বন্দি প্রথম বার বই পড়লেন? কত জন নিয়মিত পাঠক হলেন? কত জন লিখতে শিখলেন? কতজন নতুনভাবে ভাবতে শিখলেন? কত জন মুক্তির পরে পড়াশোনা চালিয়ে গেলেন? কত জন পুনরায় অপরাধে ফিরলেন না? ক-টা কারাগারে সত্যিকারের গ্রন্থাগার তৈরি হলো? এসব প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে বই দিয়ে সাজা কমানোর নীতি আদতে সফল কি না।
❤ Support Us







