Advertisement
  • বি। দে । শ
  • আগস্ট ১৩, ২০২৬

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এগিয়ে বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফখরুল, প্রতিদ্বন্দ্বী জামাত জোটের অলি আহমেদ, ২০ আগস্ট ভোট

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এগিয়ে বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফখরুল, প্রতিদ্বন্দ্বী জামাত জোটের অলি আহমেদ, ২০ আগস্ট ভোট

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই প্রার্থী করল বাংলাদেশের শাসকদল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বৃহস্পতিবার দলের মহাসচিবের নাম রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২০ গস্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পরে ফের একাধিক প্রার্থীকে নিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে, সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে ভোটের অঙ্কে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন মির্জা ফখরুল। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে তিনিই হতে চলেছেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।

বৃহস্পতিবার, দুপুর আড়াইটে নাগাদ বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে পৌঁছে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসিরউদ্দিনের কাছে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী আধিকারিকও নাসিরউদ্দিন। নির্বাচন কমিশনের তরফে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। একই দিনে বিরোধী ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী হিসাবেও মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ওই জোট লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-র চেয়ারম্যান কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) অলি আহমেদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করেছে। ফলে এ বার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিছক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। ভোটের অঙ্কে বিএনপি প্রার্থী অনেকটাই এগিয়ে থাকলেওপ্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে থাকছেন আরও এক প্রার্থী।

রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার আগে বৃহস্পতিবার দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক হয়। তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সে বৈঠকেই ফখরুলের নাম অনুমোদিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব সামলানো ফখরুলই এ বার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দলের মুখ হতে চলেছেন। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিবের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকেও সরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকেও তাঁর সরে দাঁড়ানোর কথা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সংসদে তাঁর ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হবে। সে আসনে পরবর্তী সময়ে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট হলেও, মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল। কারণরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের কোনো ভূমিকা নেই। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ীজাতীয় সংসদের সদস্যেরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। ৩৫০ আসনের জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোটের হাতে রয়েছে ২৪৮টি আসন। ফলে সংসদীয় পাটিগণিতের হিসাবে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হওয়ার কথা নয়। তার উপর বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদও এ ভোটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য নিজের দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্যপদ খারিজ হওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা আরও সীমিত। সে কারণে মির্জা ফখরুলের জয় কার্যত নিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছে।

তবে অলি আহমেদের প্রার্থিতা এই নির্বাচনকে আলাদা রাজনৈতিক তাৎপর্য দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের তরফে বৃহস্পতিবার তাঁর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। জোটের সমন্বয়ক এবং জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন ভবনে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসিরউদ্দিন তা গ্রহণ করেন। নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদও সে সময় উপস্থিত ছিলেন। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর হামিদুর রহমান আজাদ বলেনজয় বা পরাজয়ের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা। কোনো নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া হওয়া উচিত নয় বলেই তাঁদের বক্তব্য। অলি আহমেদ একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ— এ পরিচয়ও তুলে ধরেছে ১১-দলীয় জোট।

এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে যে সময়সূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন কমিশনতাতেও শুরু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। ৬ গস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। বৃহস্পতিবার১৩ গস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া হয়েছে। ১৬ গস্ট হবে মনোনয়নপত্রের যাচাই-বাছাই। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ গস্ট বিকেল ৪টে। এর পরেও যদি একাধিক বৈধ প্রার্থী থেকে যানতা হলে ২০ গস্ট দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ঢাকার সংসদ ভবনের কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে।      

এ নির্বাচনের পটভূমিতে রয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিনের আকস্মিক পদত্যাগ। গত ২৪ জুলাই শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান সাহাবুদ্দিন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অভিঘাতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তিনি রাষ্ট্রপতি হিসাবে বহাল ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর, বিএনপি ক্ষমতায় এলে মহম্মদ সাহাবুদ্দিনের আর ওই পদে টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। তাঁর পদত্যাগের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির পদটি শূন্য। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ীরাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সাময়িক ভাবে সে দায়িত্ব পালন করেন সংসদের স্পিকার। সে অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। সংবিধানেই বলা রয়েছেরাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যেই ২০ গস্ট ভোট হচ্ছে।

এদিকে, মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপির অন্দরেও শুরু হয়েছে নতুন সমীকরণ। দলের মহাসচিবের পদে কে বসবেনতা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রায় ১৬ বছর ধরে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদটি সামলেছেন ফখরুল। ২০১১ সালে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। ২০১৬ সালে জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ভাবে মহাসচিবের দায়িত্ব পান। দলের দুই শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়ে সামনে থেকে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ফখরুল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তাঁকে একাধিক বার গ্রেফতার এবং কারাবাস করতে হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিএনপির ভিতরে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ এবং গ্রহণযোগ্য নেতা করে তুলেছে।

এ বার তাঁর জায়গায় কে আসবেনতা নিয়েও দলের ভিতরে একাধিক নাম ঘুরছে। দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম বিশেষ ভাবে আলোচনায় রয়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রের খবরজাতীয় কাউন্সিল না হওয়া পর্যন্ত প্রথমে কাউকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। পরে কাউন্সিলের মাধ্যমে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রুহুল কবির রিজভী এ বারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। ফলে মন্ত্রিসভাতেও জায়গা পাননি। ফলে দলের একাংশ মনে করছেআপাতত তাঁকেই ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বিএনপি নেতৃত্ব

তবে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে দলের পাশাপাশি সরকারের মধ্যেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রকের দায়িত্ব নতুন কাউকে দেওয়া হবেনা কি বর্তমান মন্ত্রিসভার কোননো সদস্যকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হবেতা এখনও স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য হলে সেখানে উপনির্বাচনও করতে হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও একটি বিষয় বিশেষ ভাবে নজর কাড়ছে। একাধিক প্রার্থী থাকার কারণে এ বার ভোট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হতে চলেছে। যদিও সংসদীয় শক্তির বিচারে বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফখরুল অনেকটাই এগিয়েতবু অলি আহমেদের প্রার্থিতা নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক চরিত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা যোগ করেছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!