- বি। দে । শ
- আগস্ট ১১, ২০২৬
মানবতাবিরোধী অপরাধে সিরিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা
সিরিয়ার মাটিতে দীর্ঘ ১৪ বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর এ বার বিচারের কাঠগড়ায় ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে মৃত্যুদণ্ড দিল সিরিয়ার একটি আদালত। তবে আদালতে হাজির ছিলেন না আসাদ। তাঁর অনুপস্থিতিতেই মঙ্গলবার সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। একই মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তাঁর ভাই মাহের আল-আসাদ এবং আতেফ নাজিবকেও।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাব। লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। দীর্ঘ সংঘর্ষের অন্যতম মুখ ছিলেন বাশার। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহীদের অভিযানে তাঁর সরকারের পতন হয়। দামাস্কাস হাতছাড়া হওয়ার পর পরিবার-সহ রাশিয়ায় পালিয়ে যান তিনি। মস্কো তাঁকে আশ্রয় দেয়। সে থেকেই রাশিয়ায় রয়েছেন প্রাক্তন সিরীয় প্রেসিডেন্ট। এর পর সিরিয়ায় নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। আহমেদ আল-শারা বর্তমানে দেশের প্রেসিডেন্ট। আসাদের বিরুদ্ধে এ রায়কে তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটাই তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম আদালতের দণ্ডাদেশ।
আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূত্রপাত দক্ষিণ সিরিয়ার দারা শহরে। ২০১১ সালের মার্চে সরকারি নীতির বিরুদ্ধে দেওয়াল লিখনের অভিযোগে কয়েক জন কিশোরকে আটক করা হয়েছিল। তাঁদের উপর নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে ক্ষোভ ছড়ায়। বিক্ষোভ শুরু হয় দারায়। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়ন পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। ক্রমে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন রূপ নেয় সশস্ত্র সংঘর্ষে। শুরু হয় দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। একদিকে আসাদ সরকারের বাহিনী, অন্যদিকে বিভিন্ন বিদ্রোহী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী। পরে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে একাধিক আন্তর্জাতিক শক্তিও।
সে সময়ে দারা প্রদেশে রাজনৈতিক নিরাপত্তা শাখার প্রধান ছিলেন আতেফ নাজিব। সিরিয়ার সেনাবাহিনীর প্রাক্তন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজিবকে দমন-পীড়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসাবে দেখা হয়। মঙ্গলবার আদালতে সাজা ঘোষণার সময় নাজিব উপস্থিত ছিলেন। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে তাঁকে কারাবন্দির পোশাক পরে আদালতের খাঁচার ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বিচারক তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন। অন্য অভিযুক্ত, মাহের আল-আসাদ ছিলেন বাশার সরকারের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক মুখ। সিরিয়ার সেনাবাহিনীর অভিজাত ফোর্থ ডিভিশনের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। গৃহযুদ্ধের সময় আসাদ সরকারের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে তাঁর বাহিনীর ভূমিকা ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর মাহেরও রাশিয়ায় পালিয়ে যান। ফলে তাঁর বিরুদ্ধেও অনুপস্থিতিতে বিচার হয়েছে। মঙ্গলবার তাঁকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ মামলায় আরও কয়েক জন প্রাক্তন সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সিরিয়ার প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফাহদ আল-ফ্রেইজও।
এ মামলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনেকের কাছে মঙ্গলবারের রায় শুধুমাত্র একটি আদালতের সিদ্ধান্ত নয়, দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানও। নুহা আল-মাসরি তাঁদেরই একজন। তিনি পাঁচ সদস্যের প্রসিকিউশন দলের সদস্য হওয়ার পাশাপাশি মামলার একজন বাদীও। ২০১১ সালের মার্চে দারার আল-ওমারি স্কোয়ারে দমন-পীড়ন ও হত্যাকাণ্ডে তাঁর ভাই নিহত হন। রায়ের পর মাসরি বলেন, আদালতের এ সিদ্ধান্ত তাঁদের ত্যাগ, নিহতদের আত্মত্যাগ এবং নিখোঁজ ও বন্দিদের দীর্ঘ যন্ত্রণা তুলে ধরেছে। তাঁর কথায়, ১৫ বছর ধরে তাঁরা নিজেদের অধিকার ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। তবে এখানেই থামতে চান না মাসরি। তাঁর দাবি, আসাদ, ও তৎকালীন সরকারের সঙ্গে যুক্ত অন্যদের বিরুদ্ধেও বিচার চলতে হবে। তাঁর দাবি, নতুন সিরিয়ায় এ বার থেকে অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
তবে, আদালত মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলেও বাস্তবে বাশার আল-আসাদকে সিরিয়ার মাটিতে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকর করা কতটা সম্ভব, তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। আসাদ এবং মাহের— দু–জনেই বর্তমানে রাশিয়ায় রয়েছেন। তাঁদের প্রত্যর্পণের জন্য মস্কোর সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু রাশিয়া তাঁদের সিরিয়ার হাতে তুলে দেবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। আসাদের বিরুদ্ধে নতুন সিরীয় প্রশাসনের পদক্ষেপও এই প্রথম নয়। গত ডিসেম্বরে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। এর পর পুরনো সরকারের বহু কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে আসাদ-সহ সরকারের বহু শীর্ষ নেতাদের নাগাল পাওয়া যায় নি।
উল্লেখ্য, ১৯৬৫ সালে জন্ম বাশারের। তাঁর বাবা হাফেজ আল-আসাদ প্রায় তিন দশক সিরিয়া শাসন করেছেন। ২০০০ সালে বাবার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন বাশার। তবে প্রথমে তাঁর ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত ছিল না। হাফেজের বড়ো ছেলে বাসিল আল-আসাদকে উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হতো। ১৯৯৪ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় বাসিলের মৃত্যু হলে বাশারই হয়ে ওঠেন পরিবারের পরবর্তী মুখ। ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি বাবার তৈরি রাজনৈতিক কাঠামোই ধরে রাখেন। সামরিক, নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা ব্যবস্থায় তাঁর ব্যাপক প্রভাবও বজায় ছিল। কিন্তু ২০১১ সালের আন্দোলন তাঁর শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। গণবিক্ষোভ থেকে শুরু হয়ে যে সংঘর্ষ পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল, তা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলেছে। ইরান ও রাশিয়ার সমর্থনে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন বাশার।
❤ Support Us







