- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ১৯, ২০২৬
জনগণনার আগে এনআরসি ! ধর্মঘটে ফের উত্তপ্ত মণিপুর
জনগণনা শুরুর আগে রাজ্যে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা ‘এনআরসি’ কার্যকর করার দাবিতে মণিপুরে টানা দ্বিতীয় দিনেও তুঙ্গে ধর্মঘটের আঁচ। বুধবারও উপত্যকার পাঁচ জেলায় বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কার্যত বন্ধ। রাস্তায় নামেনি গণপরিবহণ। যদিও বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু বেসরকারি যানবাহন চলাচল করতে দেখা গিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বাঁশের খুঁটি, পাথর ফেলে রাস্তা আটকে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন ধর্মঘট সমর্থকেরা। কোথাও আবার দেখা গিয়েছে ‘এনআরসি না হলে জনগণনা নয়’ লেখা পোস্টার।
‘এনআরসি’-র দাবিতে ‘ন্যায্য ও সুষ্ঠু সীমানা পুনর্বিন্যাস অভিযান’-এর ডাকা ৪৮ ঘণ্টার রাজ্যব্যাপী ধর্মঘট শুরু হয়েছে মঙ্গলবার। বুধবার ছিল তার দ্বিতীয় দিন। উপত্যকার ইম্ফল পূর্ব, ইম্ফল পশ্চিম, থৌবাল, কাকচিং ও বিষ্ণুপুর—এই পাঁচ জেলাতেই ধর্মঘটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে চূড়াচাঁদপুর-সহ পাহাড়ি জেলাগুলিতে ধর্মঘটের তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। এদিন, ইম্ফল পূর্ব এবং ইম্ফল পশ্চিম জেলার বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকেই রাস্তায় নেমে পড়েন ধর্মঘট সমর্থকেরা। বাঁশের খুঁটি, পাথরের স্তূপ দিয়ে রাস্তা আটকে দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও যানবাহন থামিয়ে দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি, মণিপুরে জনগণনা ও সীমানা পুনর্বিন্যাসের কাজ শুরুর আগে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি কার্যকর করতে হবে। তাঁদের যুক্তি, ‘এনআরসি’ না হলে রাজ্যে বেআইনি ভাবে বসবাসকারী মানুষকে চিহ্নিত করা কঠিন হবে।
ইম্ফল পূর্বের খুরাই লামলং বাজার এলাকায় রাস্তা অবরোধ ও স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তাবাহিনীর মধ্যে একাধিক বার ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। একটি নিরাপত্তাবাহিনীর কনভয়ের পথ আটকে দেওয়া হলে সেটিকে ফিরে যেতে হয় বলেও খবর। ওই সংঘর্ষে এক যুবক আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। শুধু রাস্তা অবরোধ নয়, একাধিক জায়গায় সরকারি দফতর ঘেরাওয়েরও চেষ্টা করেন আন্দোলনকারীরা। পরোমপাট এলাকায় জনগণনা দফতরে ঢোকার চেষ্টা করেন তাঁদের একাংশ। নিরাপত্তারক্ষীরা বাধা দিলে উত্তেজনা তৈরি হয়। নোমেইবুং আয়াংপালি, উরিপোক এবং বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকাতেও রাস্তা আটকে যানবাহন চলাচল বন্ধ করার চেষ্টা হয়।
বিক্ষোভের সময়ে মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচন্দ সিং, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোবিন্দাস কোন্থৌজাম সিংয়ের কুশপুতুলও পোড়ানো হয়। থৌবাল জেলাতেও ধর্মঘটের ব্যাপক প্রভাব পড়ে। বিক্ষোভের জেরে জেলা প্রশাসনের কর্মীদের উপ-জেলাশাসকের দফতরের কাছ থেকে ফিরে যেতে হয় বলে জানা গিয়েছে। থৌবাল, কাকচিং এবং বিষ্ণুপুরের সরকারি দফতরগুলিতে কর্মীদের উপস্থিতিও ছিল তুলনামূলক ভাবে কম। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ থাকায় পড়াশোনাও থমকে যায়। তবে মণিপুরের পাহাড়ি এলাকায় পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। চূড়াচাঁদপুর-সহ পাহাড়ি জেলাগুলিতে এই ধর্মঘটের তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। সেখানে স্বাভাবিক ভাবেই দৈনন্দিন কাজকর্ম চলেছে।
ধর্মঘটের মধ্যেই ‘এনআরসি’ কার্যকরের দাবিতে কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মণিপুর সরকার। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মণিপুরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং। দিল্লি থেকে ফিরে ইম্ফল বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি, ‘এনআরসি’ হালনাগাদ, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং পাল্টা অবরোধ-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে অমিত শাহের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে। বীরেন সিংয়ের দাবি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়গুলি ‘গভীর উদ্বেগ ও ধৈর্যের সঙ্গে’ শুনেছেন। তাঁর কথায়, আলোচনার পরে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন অমিত শাহ। বৈঠকে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ‘এনআরসি’ হালনাগাদের জন্য মণিপুর সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলির কথাও তুলে ধরেছেন বলে জানান বীরেন। এর মধ্যে রাজ্য মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত ও মণিপুর বিধানসভার পাশ করা প্রস্তাবের বিষয়ও রয়েছে। প্রসংগত, ২০২২ সালে মণিপুর বিধানসভায় রাজ্যে ‘এনআরসি’ কার্যকরের দাবিতে একটি প্রস্তাব পাশ হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের ১ মার্চ বিধানসভা ফের সে অবস্থানকে সমর্থন করে।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বেআইনি অনুপ্রবেশ মণিপুরের কাছে অত্যন্ত গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। তাঁর দাবি, এ পর্যন্ত ৯,০২৬টি অননুমোদিত গ্রামের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জনগণনা শুরু হওয়ার আগে ‘এনআরসি’ করা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনিও মনে করেন। বীরেন বলেন, জনগণনার আগে ‘এনআরসি’ মণিপুরের মূলনিবাসী জনগোষ্ঠীর বহুদিনের দাবি। একই সঙ্গে, দাবি আদায়ের আন্দোলনে হিংসার আশ্রয় না নেওয়ার জন্য মানুষের কাছে আবেদন জানান তিনি। তাঁর আশা, কেন্দ্র অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ করবে। বুধবার ইম্ফলের বাবুপাড়ায় মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে রাজ্যের একাধিক বিশিষ্ট শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচন্দ সিং। উদ্দেশ্য, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি আর পারস্পরিক আস্থা ফেরানোর পথ খোঁজা। শিল্পীদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মণিপুরের সংকট প্রথমে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত হিসেবে শুরু হলেও এখন তা তিনটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাতে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মেইতেই সম্প্রদায়ের মানুষকে সংকটের অবসানে উদ্যোগী হওয়ার আবেদন জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কয়েক জন ব্যক্তির অন্যায়ের জন্য গোটা একটি সম্প্রদায়কে দায়ী করা অনৈতিক। তাঁর মতে, মণিপুরে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে সংঘাতের সময় তৈরি হওয়া বিভাজনের দেওয়াল ভাঙতে হবে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পুরনো আস্থা আর ভালোবাসা ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী ফের স্পষ্ট করে দেন, তাঁর সরকার মণিপুরে ‘এনআরসি’ কার্যকরের পক্ষে।
তবে, মণিপুরে ‘এনআরসি’ ঘিরে মণিপুরে শুধু কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আলোচনা নয়, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যেও মতপার্থক্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মেইতেই ও নাগা সংগঠনগুলি জনগণনার আগে ‘এনআরসি’-র কাজ শেষ করার দাবি তুলেছে। মণিপুরের নাগা সংগঠন ‘ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল’ও ‘এনআরসি’ নিয়ে একই অবস্থান নিয়েছে। তাদের বক্তব্য, ‘এনআরসি’ কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত মণিপুরে জনগণনা এবং সীমানা পুনর্বিন্যাস; কোনো কাজই করা উচিত নয়। অন্যদিকে কুকি সংগঠনগুলি এ দাবির বিরোধিতা করে কোনো শর্ত ছাড়াই জনগণনা করার দাবি জানিয়েছে। ‘কুকি জো কাউন্সিল’-এর বক্তব্য, নিয়মিত সরকারি প্রক্রিয়া হিসাবে জনগণনা নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু মণিপুরে ‘এনআরসি’-র ভিত্তিবর্ষ হিসেবে ১৯৫১ সালকে ব্যবহার করার প্রস্তাব নিয়ে তাদের গুরুতর আপত্তি রয়েছে।
‘কুকি জো কাউন্সিল’-এর মুখপাত্র গিনজা ভুয়ালজং বলেন, ১৯৫১ সালে মণিপুরের বহু পাহাড়ি এলাকা ছিল অত্যন্ত দুর্গম। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল। বহু জায়গায় রাস্তা পর্যন্ত ছিল না। ফলে সে সময় জনগণনা করতে গিয়ে পাহাড়ের বহু গ্রামে পৌঁছনোই সম্ভব হয়নি। অনেক গ্রামের সম্পূর্ণ জনসংখ্যার হিসাবও নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁর যুক্তি, ১৯৫১ সালকে ‘এনআরসি’-র ভিত্তিবর্ষ করা হলে সে সময়ের প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে যেসব গ্রাম নথিভুক্ত হয়নি, সেখানকার বহু মূলনিবাসী মানুষের বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এই ভিত্তিবর্ষ মেনে নেওয়া হলে গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে দাবি কুকি সংগঠনটির। কুকি নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলির একটি প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যেই দিল্লিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও জনগণনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, মণিপুরে ২০২৭ সালের জনগণনার স্ব-গণনা পর্ব ১৭ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে। তা চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। এর পরে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে বাড়ি-গণনা ও আবাসন সংক্রান্ত গণনার কাজ। এই জনগণনা শুরুর ঠিক আগেই ‘এনআরসি’ নিয়ে মণিপুরে আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছে। রবিবার ইম্ফলে জনগণনা কার্যক্রমের অধিকর্তার দফতরের সামনে বিক্ষোভ দেখান পড়ুয়ারা। তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে বলে অভিযোগ।চ এরপর ১৬ আগস্ট সন্ধ্যায় ইম্ফল পূর্ব এবং ইম্ফল পশ্চিম জেলায় কয়েকশো মানুষ মশাল মিছিল করেন। তাঁদের দাবি স্পষ্ট— মণিপুরে জনগণনার কোনো কাজ শুরুর আগে ‘এনআরসি’ কার্যকর করতে হবে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, বেআইনি ভাবে রাজ্যে প্রবেশ করা মানুষদের চিহ্নিত করতে হলে প্রথমেই নাগরিকদের একটি নির্ভরযোগ্য নথি তৈরি করা প্রয়োজন। সে আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতায় ‘ন্যায্য ও সুষ্ঠু সীমানা পুনর্বিন্যাস অভিযান’-এর ডাকা ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট শুরু হয় মঙ্গলবার। বুধবার ছিল তার দ্বিতীয় দিন। বুধবার মধ্যরাতে ধর্মঘট শেষ হওয়ার কথা।
❤ Support Us





