- প্রচ্ছদ রচনা বি। দে । শ
- আগস্ট ২৮, ২০২৬
ফের হড়পা বানের আশঙ্কা! নেপালে মৃত ৪৬৯, নিখোঁজ ২৯০ ভারতীয় সহ দেড় হাজার মানুষ, তিব্বতে বাঁধ ভাঙায় স্তব্ধ উদ্ধারকাজ
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বানের ধাক্কা কাটতে না কাটতেই ফের বিপদের আশঙ্কা। বিপর্যয়ে এখনো পর্যন্ত ৪৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজের সংখ্যা ১,৪০০-র বেশি। যার মধ্যে ২৯০ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। এর মধ্যেই শুক্রবার তিব্বতের দিকে একটি জলাধার বা প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর ঘিরে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে চলমান উদ্ধারকাজ। নিরাপত্তাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে অবিলম্বে উঁচু ও নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, বুধবারের ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ হয়েছে। আটটি জেলা থেকে দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে চিতওয়ানে—১৭৮ জন। নওয়ালপরাসি ইস্টে ১১০, গোরখায় ৪৪, নুয়াকোটে ৩৭, ধাদিংয়ে ৩৩, তানাহুতে ২৮, নওয়ালপরাসি ওয়েস্টে ২৭ এবং রাসুয়ায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো চলছে নিখোঁজদের সন্ধান। নদীর গতিপথের দু-ধারে কাদা, পাথর, গাছপালা ও ধ্বংসাবশেষের স্তূপ। তার মধ্যেই জীবনের চিহ্ন খুঁজছেন উদ্ধারকারীরা। হেলিকপ্টারে বিচ্ছিন্ন এলাকায় পৌঁছনোর চেষ্টা চলছে। স্থলপথেও নদীর পাড় এবং নীচের দিকে ভেসে যাওয়া বসতিগুলিতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত ১,৫৪৫ জনকে দুর্গত এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৮৪ জন কাঠমান্ডুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযানে নেপাল সেনা, পুলিশ-সহ ৭,৪৫১ জন নিরাপত্তাকর্মী নামানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২,৩৯১ জন নেপাল সেনার সদস্য। কিন্তু উদ্ধারকারীদের সামনে এখন নতুন বিপদ।
উদ্ধারকাজ যখন জোরকদমে চলছিল, তখনই তিব্বতের দিকে একটি প্রাকৃতিক জলাধার বা ‘ব্যারিয়ার লেক’-এর জল উপচে পড়ার খবর ঘিরে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে নেপাল ও চিন— দুই দেশেই উদ্ধারকাজ সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। রাসুয়া জেলায় ইতিমধ্যেই নতুন করে হড়পা বানের জল ঢুকতে শুরু করেছে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। গত বুধবার হিমবাহ ধসের পর পাহাড়ি নদীগুলিতে আচমকাই নেমে এসেছিল বিপুল জল, পাথর, বরফ ও কাদার স্রোত। মুহূর্তের মধ্যে নদীর দু-পাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বাড়ি, রাস্তা, সেতু, গাড়ি থেকে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প— বাদ যায়নি কিছুই। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোট। নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পর্যটক, তীর্থযাত্রী এবং বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত মানুষ। ভারতীয় নাগরিকদের নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিদেশ মন্ত্রকের হিসাবে, নেপালে এখনও ২৯০ জন ভারতীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এক বিপর্যয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই দ্বিতীয় বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে মূলত পাহাড়ি নদীর জলপ্রবাহ ঘিরে। চিনের তরফে নেপালকে সতর্ক করা হয়েছে, হিমবাহ ধসের পর পাহাড়ি নদীর খাতে বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও কাদামাটি জমে গিয়েছে। কোথাও কোথাও সেই ধ্বংসাবশেষ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দিয়ে অস্থায়ী বাঁধের মতো তৈরি করেছে। সে বাঁধে জল জমতে জমতে চাপ বাড়ছে। কোনো জায়গায় সেই বাধ ভেঙে গেলে একসঙ্গে বিপুল জল, পাথর, বরফ ও কাদামাটি নীচের দিকে ধেয়ে আসতে পারে। বুধবার ভোটেকোশী নদীর ক্ষেত্রে যে ধরনের বিপর্যয় দেখা গিয়েছিল, ফের তেমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে নেপাল প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার রাতে চিনের জলসম্পদ দফতরও সতর্কতা জারি করে। তাদের বক্তব্য, পাথর, কাদা ও তুষার জমে তিব্বতের ছোকেন খোলা এবং পুরেপি সাংপো নদীর সঙ্গমস্থলে একটি বিশাল ব্যারিয়ার লেক তৈরি হয়েছে। ওই জলাধারের জলস্তর বাড়তে থাকায় সেটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। হ্রদটি ভেঙে গেলে তার জল কোন পথে কত দ্রুত নীচের দিকে নামবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে নেপাল প্রশাসনের। ফলে আপাতত উদ্ধারকাজের থেকেও উদ্ধারকারীদের নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন করে বন্যার আশঙ্কার মধ্যে রাসুয়া-সহ একাধিক এলাকায় উদ্ধারকাজ সাময়িক ভাবে বন্ধ করা হয়েছে। হেলিকপ্টারও নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে খবর। স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্রুত উঁচু জায়গায় চলে যেতে বলা হয়েছে। নেপাল পুলিশের এক আধিকারিকের দাবি, দ্বিতীয় দফার বন্যা প্রথম বারের থেকেও ভয়াবহ হতে পারে। নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়তে থাকায় উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত যানবাহনগুলিও ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চিনের তিব্বতেও একই পরিস্থিতি। চিনা সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ব্যারিয়ার লেক থেকে জল উপচে পড়তে শুরু করায় উদ্ধারকারী দলগুলিকে আপাতত অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে দুর্গত এলাকায় পৌঁছে যাওয়া জরুরি পরিষেবা দলগুলিকে প্রায় এক কিলোমিটার পিছিয়ে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, নিখোঁজদের সন্ধানে যে উদ্ধারকাজ চলছিল, নতুন বিপদের আশঙ্কায় সেটিই এখন থমকে রয়েছে।
রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার জন্য এক কোটি নেপালি টাকা করে এবং পার্শ্ববর্তী ধাদিং জেলার জন্য ৫০ লক্ষ নেপালি টাকা অর্থসাহায্যের ঘোষণা করেছে কাঠমান্ডু। তবে প্রশাসনের সামনে এখন প্রধান সমস্যা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছনো এবং নদীর গতিপথে জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরানো। নতুন করে জল নেমে এলে উদ্ধারকারীদের পাশাপাশি আরও বহু মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে। নেপালের বিপর্যয়ে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, এখনও ২৯০ জন ভারতীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের অবস্থান জানার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে ৮৪ জন ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৬৩ জন কর্মী এবং তামিলনাড়ুর ২১ জন রয়েছেন। তিব্বতের দিকে থাকা প্রায় ২০০ জন ভারতীয়ও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে উদ্ধারের জন্য সাহায্য চেয়েছেন। কাঠমান্ডুতে ভারতীয় দূতাবাস এবং বিদেশ মন্ত্রকের ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। বন্যায় আটকে পড়া বা নিখোঁজ সিকিমের বাসিন্দাদের সন্ধান এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বিশেষ টাস্ক ফোর্স গড়েছে সিকিম সরকার। ‘সিকিম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’র ডিরেক্টর প্রভাকর রাইয়ের নেতৃত্বে ওই দল কেন্দ্রীয় সরকার, নেপালে ভারতীয় দূতাবাস এবং অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করছে।
নেপালের বন্যার সরাসরি অভিঘাত পৌঁছেছে ভারতেও। উত্তরপ্রদেশের মহারাজগঞ্জ ও কুশীনগার জেলার নদী থেকে সাতটি দেহ উদ্ধার হয়েছে। প্রশাসনের অনুমান, নেপালের বন্যার স্রোতে ভেসে ওই দেহগুলি ভারতে চলে এসে থাকতে পারে। মহারাজগঞ্জে চারটি এবং কুশীনগরে তিনটি দেহ উদ্ধার হয়েছে। কুশীনগরে উদ্ধার হওয়া দেহগুলি সীমান্ত থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার ভাটিতে পাওয়া যায়। দেহগুলির পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। নেপাল ও চিনের সরকারি মৃতের তালিকায় এই সাতটি দেহ এখনো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর সতর্ক উত্তরাখণ্ডও। রাজ্যে হিমবাহ-হ্রদ, নদী এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নজরদারি আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসন মন্ত্রী মদন কৌশিক জানিয়েছেন, নেপালের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে হিমবাহ-হ্রদগুলির বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং উন্নত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। আধুনিক সেন্সর, জলস্তর মাপার যন্ত্র এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, নিরাপদে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করা এবং স্থানীয় স্তরে সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে। কুমায়ুনেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কালী-শারদা নদীর জলস্তর, বানবাসা, টনকপুর এবং শারদা ব্যারাজের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে প্রশাসন।
বিপর্যয়ের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। ইতিমধ্যেই সে দেশে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে। নেপালের জন্য সাহায্যের হাত বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। নেপালের বিপর্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভয়াবহ অবস্থা। আমরা নেপাল সরকারের সঙ্গে কথা বলেছি। যে কোনো প্রয়োজনে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা ত্রাণ পাঠাচ্ছি।’ ট্রাম্প আরও জানিয়েছেন, নেপালের নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁদের কথা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সাহায্যের কথা জানাতে বলা হয়েছে। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিয়ো গোর সমাজমাধ্যমে ট্রাম্পের এই বার্তা তুলে ধরে বলেন, এই দুঃসময়ে নেপালকে সাহায্য করতে আমেরিকা ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’। এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার তিব্বতের উদ্ধার ও ত্রাণকাজ নিয়ে শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি চিনফিং। চিনা সরকারি সংবাদ সংস্থা শিনহুয়ার খবর, নিখোঁজদের সন্ধান ও উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হিমবাহ, হিমবাহ-হ্রদ এবং ভূতাত্ত্বিক বিপর্যয়ের আরও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। নেপালকে জরুরি সাহায্য এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহযোগিতার বিষয়টিও চিন বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে শিনহুয়া।
❤ Support Us








