- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ২৫, ২০২৬
আকাশছোঁয়া দামে লাগাম টানতে কড়া পদক্ষেপ, আমদানি করা চিনি দু-মাসের মধ্যে বাজারে ছাড়ার নির্দেশ কেন্দ্রের
দেশজুড়ে লাগামছাড়া চিনির দাম। মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে খুচরো বাজারে চিনির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় কালোবাজারি ও কৃত্রিম সঙ্কট ঠেকাতে সক্রিয় হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। সোমবার বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের তরফে জারি করা নতুন বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বিদেশ থেকে আমদানি করা চিনি সর্বোচ্চ দু-মাসের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত বা পরিশোধন করে খোলা বাজারে বিক্রি করতে হবে। বাজারে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে কেন্দ্র জানিয়েছিল, আমদানি করা চিনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধন করতে হবে এবং ৩১ অক্টোবরের মধ্যে তা বাজারে বিক্রি করতে হবে। তবে পরিশোধনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে সে ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে পরিশোধন ও বাজারজাতকরণের প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উৎসবের মরসুমে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা থাকায় দ্রুত বাজারে অতিরিক্ত চিনি পৌঁছে দেওয়াই কেন্দ্রের অন্যতম লক্ষ্য।
চিনির দাম বৃদ্ধির পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে আখচাষের ক্ষতি, জোগানের তুলনায় চাহিদা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন নিয়ে আগের পূর্বাভাস বদলে যাওয়ায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণত অক্টোবর থেকে পরের বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কে চিনি উৎপাদনের অর্থবর্ষ হিসেবে ধরা হয়। ২০২৫-২৬ চিনি অর্থবর্ষের শুরুতে মনে করা হয়েছিল, আগের বছরের তুলনায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়বে এবং দেশে উদ্বৃত্ত চিনি থাকবে। সে সময় ‘ইন্ডিয়ান সুগার অ্যান্ড বায়ো এনার্জি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রাথমিক অনুমান ছিল, আগের অর্থবর্ষের তুলনায় উৎপাদন প্রায় ১৮.৩ শতাংশ বাড়তে পারে।
উৎপাদন বৃদ্ধির সেই পূর্বাভাসের উপর ভিত্তি করেই কেন্দ্র বিদেশে চিনি রফতানির অনুমতি দিয়েছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ১৫ লক্ষ টন চিনি রফতানির অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ফেব্রুয়ারিতে আরও ৫ লক্ষ টন রফতানির অনুমতি মেলে। এর তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে জানুয়ারি ২০২৫-এ মাত্র ১০ লক্ষ টন চিনি রফতানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তবে চলতি মরসুমে উৎপাদনের পূর্বাভাস বদলাতে শুরু করে। মে মাসে সরকার জানিয়ে দেয়, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আর চিনি রফতানি করা যাবে না। জুলাইয়ে চিনিকলগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ আরও কড়া করা হয়। আগস্টে প্রতি মাসে চিনিকলগুলির বাজারে বিক্রির পরিমাণ ২২.৫ লক্ষ টনে বেঁধে দেওয়া হয়। গত বছরও মাসিক বিক্রির পরিমাণ প্রায় একই ছিল। কিন্তু মরসুমের শুরুতে উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা থাকায় এ বার বিক্রির পরিমাণ বাড়তে পারে বলে আশা করা হয়েছিল।
চিনির বাজারের বর্তমান সঙ্কটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ইথানল উৎপাদন নিয়েও বিতর্ক। পেট্রলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মেশানোর নীতিকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। চিনি ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, চলতি বছরে প্রায় ৩২ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি ইথানল উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁদের যুক্তি, এর ফলে খাদ্যপণ্য হিসেবে বাজারে চিনির জোগান কমেছে এবং দাম বৃদ্ধির উপর তার প্রভাব পড়েছে। বিরোধীরাও অভিযোগ করেছে, ইথানল মিশ্রণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে কেন্দ্র দেশের খাদ্যসুরক্ষার সঙ্গে আপস করছে। যদিও কেন্দ্র এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। খাদ্য মন্ত্রকের বক্তব্য, চিনির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে ই-২০ পেট্রল নীতির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। বরং ইথানল উৎপাদনে আখের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমানো হচ্ছে। ২০২২-২৩ সালে ইথানল তৈরিতে মোট চিনির প্রায় ১২ শতাংশ ব্যবহার করা হলেও ২০২৫-২৬ সালে সেই হার কমে প্রায় ৯ শতাংশ হয়েছে। কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, দেশে উৎপাদিত ইথানলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ভুট্টার মতো দানাশস্য থেকে তৈরি হয়।
উৎপাদন, রফতানি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার সমীকরণে পরিবর্তনের ফলেই শেষ পর্যন্ত এক দশকেরও বেশি সময় পরে বিদেশ থেকে চিনি আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে কেন্দ্রকে। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১০ লক্ষ টন চিনি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং আমদানিতে কোনো শুল্ক দিতে হবে না। এখন নতুন নির্দেশের মাধ্যমে আমদানি করা চিনি দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে ছাড়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়ায় কেন্দ্রের লক্ষ্য হলো বাজারে জোগান বাড়ানো, কালোবাজারি রোধ করা এবং উৎসবের মরসুমে সাধারণ মানুষের উপর চিনির মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমানো।
❤ Support Us






