- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ১৯, ২০২৬
সংকটে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ! লক্ষাধিক স্কুলে শিক্ষকের অভাব, নেই বিদ্যুৎ, জল, শৌচাগার
প্রতিকী চিত্র
২০১৪ সালে কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল বিজেপি জোট। ধারাবাহিকভাবে তৃতীয় বারের মতো মসনদে আসীন রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ক্ষমতায় আসার লড়াইয়ে, নির্বাচনি মঞ্চে, ইস্তেহারে মনমোহন সিং সরকারের বিরুদ্ধে বিজেপির অভিযোগের তালিকা ছিল দীর্ঘ। তার মধ্যে অন্যতম ছিল দুর্নীতি, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, শিল্পায়নের অভাব, দেশের নিরাপত্তার অভাব, শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতি-সহ একাধিক বিষয়। এ মুহূর্তে কেন্দ্রের পাশাপাশি ২০টির বেশি রাজ্যে বিজেপি বা ‘এনডিএ’ সহযোগী কোনো আঞ্চলিক দল ক্ষমতায়। বিরোধীদের একের পর এক অভিযোগ কার্যত নস্যাৎ করে, দেশজুড়ে প্রায় একচেটিয়াভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে পদ্মশিবির।
তবে, সংসদে ও বাইরে একাধিক ইস্যুতে নরেন্দ্র মোদি সরকারকে কোণঠাসা করবার চেষ্টাও করছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া’ জোট। অনান্য নানান অভিযোগের সঙ্গে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব পরিস্থিতি ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত একাধিক সরকারি-বেসরকারি রিপোর্ট, সংসদীয় কমিটির উদ্বেগ, বিভিন্ন স্বাধীন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বহু রিপোর্ট, ‘সিজেপি’-র স্কুল অভিযানে সামনে আসা ছবি; এ সবই জানান দিচ্ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে সরকারি স্কুলগুলি তীব্র সংকটে।
ক্ষমতায় আসার আগে, নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপির দাবি ছিল, সরকারি শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থের অভাব, শিক্ষক-ঘাটতি, পড়াশোনার মান নিয়ে উদ্বেগ, গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিস্তর ফারাক এবং ধনী ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সুযোগের অসমতা— দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে একাধিক পুরনো ও গভীর সমস্যা রয়েছে। ক্ষমতায় এলে দ্রুত এসব সমস্যা মেটানোর বিপুল প্রতিশ্রুতিও এসেছিল। আজ, এক দশকেরও বেশি সময় পরে মোদি সরকারের আমলে দেশের লক্ষাধিক জীর্ণ-বিদীর্ণ সরকারি স্কুলগুলির দিকে তাকালে স্পষ্ট দেখা যায়, রাজনীতির ময়দানে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবের মধ্যে ফারাক কতখানি।
স্কুলে ভর্তি বেড়েছে, উচ্চশিক্ষার পরিসর প্রসারিত হয়েছে, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে। ২০২০ সালে চালু হয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি। সে নীতিতে বড়াই করে বলা হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষায় পড়া ও অঙ্কের ভিত শক্ত করা থেকে শুরু করে বৃত্তিমূলক শিক্ষা, বিষয় নির্বাচনে নমনীয়তা এবং উচ্চশিক্ষায় পড়ুয়ার অংশগ্রহণ বাড়ানোর মতো একাধিক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের কথা। কিন্তু পরিসংখ্যান অন্য কথা বলছে। গত কয়েক বছরে দেশের হাজার হাজার সরকারি স্কুল একত্রিত হয়েছে বা বন্ধ হয়েছে। এখনো এক লক্ষেরও বেশি স্কুলে মাত্র এক জন শিক্ষক দিয়ে ‘পড়াশোনা’ চলছে। লক্ষাধিক স্কুলে মৌলিক পরিকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। নেই পানীয় জল, শৌচাগার, বিদ্যুৎ। আবার, অতিমারির ধাক্কা কাটিয়ে পড়াশোনার মান কিছুটা ফিরলেও বহু পড়ুয়ার বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি হয়নি। উচ্চশিক্ষার পরিসর বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু জাতীয় শিক্ষানীতির নির্ধারিত ৫০ শতাংশ উচ্চশিক্ষায় ভর্তির লক্ষ্যমাত্রা থেকে দেশ এখনো যোজন যোজন দূড়ে।
কেন্দ্রের বক্তব্য, শিক্ষাব্যবস্থা ধীরে ধীরে কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সূচকে উন্নতিও হয়েছে। সমালোচকদের পাল্টা বক্তব্য, পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ভিতও দুর্বল হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষাখাতে সরকারের বিনিয়োগ এখনো অপ্রতুল। ভারতের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থা পৃথিবীর বৃহত্তম শিক্ষাব্যবস্থার একটি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ২৫ কোটি পড়ুয়া দেশের ১৪ লক্ষেরও বেশি স্কুলে পড়াশোনা করে। শিক্ষক রয়েছেন প্রায় এক কোটি। গ্রামীণ ভারতের ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সি শিশুদের ৯৮.১ শতাংশই স্কুলে ভর্তি রয়েছে বলে ২০২৪ সালের বার্ষিক শিক্ষার অবস্থা সমীক্ষায় উঠে এসেছে। এখন প্রশ্ন হলো, স্কুলে গিয়ে শিশুরা আদৌ কতটা শিখছে। এ জায়গাতেই ছবিটা জটিল। ২০২৪ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, গ্রামীণ সরকারি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির মাত্র ৪৪.৮ শতাংশ পড়ুয়া দ্বিতীয় শ্রেণির স্তরের একটি লেখা পড়তে সক্ষম। অঙ্কের ক্ষেত্রে পঞ্চম শ্রেণির সরকারি স্কুলের মাত্র ২৬.৫ শতাংশ পড়ুয়া তিন অঙ্কের একটি সংখ্যাকে এক অঙ্কের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করার মতো প্রাথমিক অঙ্ক করতে পারে।
অন্যদিকে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে স্কুলছুটের সংখ্যা। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ‘ইউডিআইএসই’ তথ্য অনুযায়ী, দেশের স্কুলশিক্ষার পরিকাঠামো, পড়ুয়ার সংখ্যা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পড়ুয়াদের জন্য ব্যবস্থা, শিক্ষায় সরকারি ব্যয়ের মতো একাধিক বিষয়ে অবস্থা উদ্বেগজনক। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে সরকারি এবং সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের সংখ্যা ১০,৯২,৬৭১। তার মধ্যে প্রাথমিক স্কুলই ৯,১১,০৩২টি। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির জন্য স্কুল রয়েছে ৪,১২,৮০৫টি। মাধ্যমিক স্তরে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১,৬১,৮০৮-এ। আর উচ্চমাধ্যমিক স্তরে স্কুল মাত্র ৯০,৮৬৬টি। পড়ুয়ার সংখ্যাতেও ছবিটা একই। প্রাথমিক স্তরে পড়ুয়া ৬ কোটি ১৮ লক্ষ ৪৫ হাজার ৩৩ জন। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে তা কমে ৪ কোটি ৮ লক্ষ ৯৩ হাজার ৯৭৮। নবম-দশমে ২ কোটি ৩৬ লক্ষ ৬৮ হাজার ২২০। একাদশ-দ্বাদশে পৌঁছতে পৌঁছতে সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬৪ লক্ষ ১৭ হাজার ৯৪৯-এ। অর্থাৎ শিক্ষার স্তর যত উপরে উঠছে, স্কুল ও পড়ুয়ার সংখ্যা পাল্লা দিয়ে কমছে। তাদের মতে, দশ লাখের বেশি সরকারি স্কুলের বিপুল অংশই কেবল প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার আগেই প্রায় ৭৩ শতাংশ পড়ুয়ার পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। এর পিছনে রয়েছে পরিবারের আর্থিক চাপ, কাজের সন্ধানে পরিবারের স্থানান্তর, বাড়ির দায়িত্ব, যাতায়াতের সমস্যা, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক লাভ সম্পর্কে পরিবারের অনিশ্চয়তা। সব শিশুর উপর এ চাপ সমান নয়। সামাজিক ভাবে পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠী, দরিদ্র পরিবার এবং প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের ঝুঁকি বেশি।
আরও উদ্বেগ বহু সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো ঘিরে। শ্রেণিকক্ষ রয়েছে কি না, বিদ্যুৎ রয়েছে কি না, পানীয় জল পাওয়া যায় কি না, ছেলে ও মেয়েদের জন্য ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার রয়েছে কি না— এসব প্রশ্নের উত্তরই একটি স্কুলের ন্যূনতম কার্যক্ষমতা বোঝায়। এ ক্ষেত্রেও সরকারের দাবি আর পরিসংখ্যানের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পর্যবেক্ষকেরা দাবি করেছেন, এখনো প্রায় ১ লক্ষ ১৯ হাজার স্কুলে বিদ্যুৎ নেই। বহু স্কুলে শৌচাগার থাকলেও তা ব্যবহারযোগ্য নয় বা পর্যাপ্ত নয়। সর্বজনীন স্কুলশিক্ষার জন্য কয়েক দশক ধরে একের পর এক প্রকল্প চালু হওয়ার পরেও যদি কোনো স্কুলে মৌলিক পরিকাঠামো অসম্পূর্ণ থাকে, তবে বাস্তবায়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে মেয়েদের উপর। ব্যবহারযোগ্য মেয়েদের শৌচাগার না থাকলে বিশেষ করে বয়ঃসন্ধির পর স্কুলে নিয়মিত যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। নিরাপদ পানীয় জলের অভাবও নিছক পরিকাঠামোগত সমস্যা নয়। এর সঙ্গে শিশুর স্বাস্থ্য, উপস্থিতি আর মর্যাদার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে।
ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র সম্ভবত এক-শিক্ষক স্কুলগুলির সংখ্যা। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দেশে এখনো এক লক্ষের বেশি স্কুলে মাত্র এক জন শিক্ষক রয়েছেন। বিভিন্ন বছরের পরিসংখ্যান ও সংজ্ঞার পার্থক্যের কারণে সংখ্যাটি প্রায় ১ লক্ষ ৪ হাজার থেকে ১ লক্ষ ১১ হাজারের মধ্যে ওঠানামা করেছে। ২০২৩-২৪ সালের সরকারি তথ্যেও এক-শিক্ষক স্কুলের সংখ্যা এক লক্ষের বেশি ছিল। স্কুলগুলিতে পড়ুয়ার সংখ্যা কয়েক লক্ষ। একাধিক শ্রেণী জুড়ে দিয়ে পড়াতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষকরা। তার উপর রয়েছে হাজিরা নেওয়া, প্রশাসনিক কাজ, নথিপত্র তৈরি, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের দায়িত্ব এবং কখনো কখনো শ্রেণিকক্ষের বাইরের কাজ। জাতীয় স্তরে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত দেখলে সমস্যাটি ততটা ভয়াবহ বলে মনে নাও হতে পারে। কারণ জাতীয় গড় স্থানীয় বৈষম্যকে অনেকটাই ঢেকে দেয়। ধারা যাক, কোনো একটি স্কুলে ২০ জন পড়ুয়ার জন্য এক জন শিক্ষক রয়েছেন। জাতীয় গড়ের বিচারে সেই অনুপাত খুব খারাপ নয়। কিন্তু ওই ২০ জন শিশুর কাছে শিক্ষক-ঘাটতিই সম্পূর্ণ বাস্তবতা। সেই এক জন শিক্ষককে একসঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণির পড়ুয়াকে সামলাতে হলে প্রত্যেক শিশুকে আলাদা করে সময় দেওয়া কঠিন। এখানেই জাতীয় গড় এবং বাস্তবতার ফারাক।
শিক্ষক-ঘাটতির ক্ষেত্রেও রাজ্যভেদে পার্থক্য রয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, কয়েকটি রাজ্যে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষক-ঘাটতি চরমে। কোথাও আবার ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত জাতীয় গড়ের তুলনায় অত্যন্ত বেশি। এ সমস্যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের প্রশ্নও। স্কুলশিক্ষার বাস্তবায়নে রাজ্যগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক নিয়োগ, স্কুল একত্রিত করা, পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ—এসবের অনেকটাই রাজ্য সরকারের দায়িত্ব। ফলে শিক্ষক-ঘাটতির দায় একমাত্র কেন্দ্রের উপর চাপানো যেমন সরলীকরণ, তেমনই কেন্দ্রের অর্থ বরাদ্দ, নীতির কাঠামো এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির প্রভাব অস্বীকার করাও সম্ভব নয়।
লাগাতার কমছে সরকারি স্কুলের সংখ্যাও। তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে দেশে সরকারি স্কুলের সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার কমেছে। ২০২০-২১ সালে সরকারি স্কুলের সংখ্যা ছিল ১০ লক্ষ ৩২ হাজার ৪৯। ২০২৪-২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ লক্ষ ১৩ হাজার ৩২২-এ। অর্থাৎ নিট কমেছে ১৮ হাজার ৭২৭টি। কোথাও স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা কমেছে, কোথাও একাধিক স্কুল একত্রিত হয়েছে, কোথাও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হয়েছে, আবার কোথাও রাজ্য সরকারের হটকারি সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের যুক্তিও রয়েছে। খুব কম পড়ুয়ার স্কুলে এক জন শিক্ষক রেখে দেওয়ার বদলে যদি কাছাকাছি ‘একত্রিত স্কুল’-এ তাদের নিয়ে যাওয়া যায়, সেখানে বেশি শিক্ষক, উন্নত পরিকাঠামো, গ্রন্থাগার, পরীক্ষাগার বা অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা সামনে আসে। একটি প্রান্তিক গ্রামের স্কুল বন্ধ হলে, কয়েক মাইল পথ পাড়ি দিয়ে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ কতখানি রয়েছে। বিশেষ করে ছাত্রীদের। যেখানে আজও দেশের বহুল অংশে মেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে সমাজে বিভিন্ন বাধানিষেদ রয়েছে! দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে পড়ুয়াদের নিত্য যাতায়াতের খরচ বহন করা সম্ভব কি? বর্ষাকালে সেই রাস্তা ব্যবহার করা যায় কি? ছাত্রীদের ক্ষেত্রে দূরের স্কুলে যাওয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব কি? বিশেষভাবে সক্ষম পড়ুয়াদের জন্য উপযুক্ত যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে কি? এ প্রশ্নগুলির উত্তর না থাকলে স্কুল একত্রিত করার প্রশাসনিক ‘দক্ষতা’ শেষ পর্যন্ত পড়ুয়ার অনুপস্থিতি বা স্কুলছুটের সংখ্যাই বাড়িতে দেবে।
সরকারি স্কুলের সংখ্যা কমে যাওয়া বা স্কুলগুলিকে একত্রিত করার সঙ্গে আর একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে— বেসরকারি শিক্ষার উপর পরিবারের নির্ভরতা বৃদ্ধি। ভারতে বেসরকারি স্কুলের বিস্তার গত কয়েক দশকে দ্রুত হয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে বেসরকারি স্কুল অনেক সময় ইংরেজি-মাধ্যম শিক্ষা, অপেক্ষাকৃত উন্নত পরিকাঠামো, ছোটো শ্রেণিকক্ষ এবং বেশি বিকল্পের প্রতিশ্রুতি দেয়। দরিদ্র পরিবারের কাছে সে বিকল্পের মূল্য অনেক বেশি। স্কুলের মাসিক বেতনই শেষ কথা নয়। বই, পোশাক, যাতায়াত, পরীক্ষার খরচ, বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ফি— মিলিয়ে একটি শিশুকে বেসরকারি স্কুলে পড়ানোর খরচ আকাশছোঁয়া। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখানেই তৈরি হতে পারে দুই স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা। সামর্থ্যবান পরিবার বেশি অর্থ খরচ করে শিক্ষার সুযোগ কিনবে, আর সরকারি ব্যবস্থার উপর নির্ভর করা দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা ক্রমশ শিক্ষার আলো থেকে দূরে চলে যাবে। অথচ সরকারি শিক্ষার অন্যতম ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। একটি শিশুর পরিবার কতটা ধনী, সে কোন এলাকায় জন্মেছে কিংবা তার বাবা-মায়ের সামাজিক অবস্থান কী—এসবের ঊর্ধ্বে উঠে একটি ন্যূনতম মানের শিক্ষা নিশ্চিত করাই ছিল সরকারি শিক্ষার অন্যতম মূল লক্ষ্য।সে জায়গায় বৈষম্য বাড়লে শিক্ষার সামাজিক সমতার ভূমিকা দুর্বল হয়।
শিক্ষার সংস্কার শেষ পর্যন্ত অর্থের প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়। ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’-তে বহু পুরনো একটি জাতীয় লক্ষ্য আবার সামনে আনা হয়েছে— দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৬ শতাংশ শিক্ষায় সরকারি ব্যয় করার লক্ষ্যমাত্রা। কিন্তু সে লক্ষ্যমাত্রা এখনো পূরণ হয়নি। মোদি সরকারের শিক্ষাবিষয়ক নীতির সমালোচকেরা তাই বলেন, নীতির উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান রয়েছে। তাঁদের মতে, শুধু বরাদ্দের অঙ্ক দেখলেও শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগের প্রকৃত ছবি বোঝা যায় না। দেখতে হবে মোট সরকারি ব্যয়ের কত শতাংশ শিক্ষায় যাচ্ছে। দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের কত শতাংশ শিক্ষায় খরচ হচ্ছে। বরাদ্দ করা অর্থের কতটা বাস্তবে খরচ হচ্ছে। কেন্দ্র কতটা দিচ্ছে, রাজ্য কতটা দিচ্ছে। নয়া শিক্ষানীতির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার জন্য সে অর্থ যথেষ্ট কি না। এক্ষেত্রে উত্তরটা নেতিবাচক। স্কুল পরিকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং বৃত্তির প্রয়োজন বিপুল ব্যয়ের তুলনায় বরাদ্দ অনেকটাই কম।
মোদি সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো নীতিগত পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে জাতীয় নয়া শিক্ষানীতি। এ নীতিতে পাঁচ-তিন-তিন-চার কাঠামোয় স্কুলশিক্ষার পুনর্গঠন, প্রাথমিক স্তরে পড়া ও অঙ্কের ভিত শক্ত করা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষায় বহুবিষয়ক শিক্ষার প্রসার, বিষয় নির্বাচনে নমনীয়তা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গবেষণার উপর জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে শিক্ষামহলের একাংশের মতে, এ নীতির বাস্তবায়নের প্রচেষ্টার থেকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেশি।দেশে ১৪ লক্ষেরও বেশি স্কুল রয়েছে। রয়েছে শত শত বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাজার হাজার কলেজ। একটি নীতিপত্র প্রকাশ করলেই ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অর্থ, পর্যাপ্ত শিক্ষক, প্রশিক্ষিত প্রশাসন, কার্যকর পরিকাঠামো এবং কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে সমন্বয়। প্রধানমন্ত্রীর ‘স্কুল ফর রাইজিং ইন্ডিয়া’ বা ‘পিএম শ্রী’ প্রকল্পে ১৪,৫০০-র বেশি আদর্শ স্কুল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের লক্ষ্য জাতীয় শিক্ষানীতির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বাস্তবে দেখানোর মতো কিছু উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়— ১৪,৫০০টি আদর্শ স্কুল কি দেশের ১৪ লক্ষেরও বেশি স্কুলের সমস্যার সমাধান করতে পারে? জাতীয় শিক্ষানীতির আসল পরীক্ষা হবে সেই সাধারণ সরকারি স্কুলে, যেখানে গ্রামের শিশুরা পড়াশোনা করে। সে স্কুলে কি প্রশিক্ষিত শিক্ষক আছে? শ্রেণিকক্ষ আছে? গ্রন্থাগার আছে? পরীক্ষাগার আছে? ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার আছে? বিদ্যুৎ আছে? ইন্টারনেট আছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শিশুটিকে তার বয়স অনুযায়ী পড়তে, লিখতে শিখেছে? বিভিন্ন বিষয় শেখানোর মতো পর্যাপ্ত শিক্ষক আছে?
প্রযুক্তি শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। দীক্ষা, স্বয়ম, অনলাইন পাঠক্রম, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ— বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে প্রযুক্তিকে শিক্ষার সুযোগ প্রসারের মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা তখনই সমান সুযোগ তৈরি করতে পারে, যখন প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিও সবার কাছে থাকে।সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যানে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ আগের তুলনায় বেড়েছে। তবু দেশের বিপুল অংশের স্কুল এখনো এসব সুবিধার সম্পূর্ণ নাগাল পায়নি। অতিমারির সময়ে এ বৈষম্য সবচেয়ে নির্মম ভাবে সামনে এসেছিল। উচ্চবিত্ত পরিবারের পড়ুয়াদের কাছে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং পড়ার আলাদা ঘর থাকলে অনলাইন শিক্ষা হয়তো স্বস্তিকর। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের ছাত্রছাত্রীকে যদি পরিবারের আরও কয়েক জনের সঙ্গে একটি ঘরেই, একটি ফোন ভাগ করেই পড়াশোনা করতে হয়, তার কাছে অনলাইন শিক্ষা প্রায় শ্রেণিকক্ষ থেকেই হারিয়ে যাওয়ারই সমান। ভারতের বাস্তবতায় প্রযুক্তি শিক্ষককে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু শিক্ষককে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিকও আছে, যা পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। তা হলো, পড়ুয়াদের কী শেখানো হচ্ছে। তাদের বিশাল সিলেবাসে কী রয়েছে। বিজেপি জমান্য সময়ে পাঠ্যপুস্তক, বিশেষ করে ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের বইয়ে পরিবর্তন নিয়ে বার বার রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, পাঠ্যক্রমকে অপ্রয়োজনীয় ভার থেকে মুক্ত করা, আধুনিক করা এবং নতুন শিক্ষানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করাই এ পরিবর্তনের উদ্দেশ্য। বিরোধী দল এবং শিক্ষাবিদদের একাংশের অভিযোগ, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব বাড়ছে। বিতর্কটি অবশ্য শুধু একটি অধ্যায় বাদ পড়ল কি না, একটি অনুচ্ছেদ পরিবর্তিত হলো কি না— এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়। বড়ো প্রশ্ন হলো, ভারতের কোটি কোটি নতুন প্রজন্ম দেশের অতীত সম্পর্কে, বর্তমান সম্পর্কে কী শিখছে। ইতিহাস নিজেই বহু ব্যাখ্যার বিষয়। একটি গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব শুধুমাত্র শাসকের পছন্দ অনুযায়ী ব্যাখ্যা মুখস্থ করানো নয়। প্রমাণ যাচাই করা, একাধিক ব্যাখ্যার সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং প্রচলিত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন করার ক্ষমতাও শিক্ষার অনিবার্য অংশ।
❤ Support Us







