- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ২৬, ২০২৬
যুদ্ধের অভিঘাতে বিপন্ন বিশ্বখাদ্য নিরাপত্তা, সমুদ্রপথ সুরক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান ভারতের
রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় সমুদ্রপথ ও পরিকাঠামো সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মহলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে ভারত। নয়াদিল্লির তরফে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি, সার, সামুদ্রিক পরিবহণ, কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় সরাসরি বিঘ্ন ঘটছে, বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। বিশেষ করে আমদানি নির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে।
রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠকে, রাষ্ট্রসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি পার্বাথানেনি হরিশ বলেছেন, বর্তমান বিশ্বের সংঘাতগুলি যুদ্ধক্ষেত্রের তাৎক্ষণিক পরিসর ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত প্রভাব ফেলছে। বিঘ্নিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা।
ভারতের মতে, আঞ্চলিক সংঘাতের অভিঘাত এখন আর সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। শক্তি ও জ্বালানি বাজার, সার সরবরাহ, সামুদ্রিক পরিবহণ, কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা তৈরি হওয়ায় বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমদানির উপর বেশি নির্ভরশীল উন্নয়নশীল দেশগুলিই এর ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
রাষ্ট্রসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি বলেছেন সংঘাতের মানবিক পরিণতি কমানোই নিরাপত্তা পরিষদের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দ্রুত, নিরাপদ ও অবাধ মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে সংঘাতরত পক্ষগুলির মধ্যে ‘ডি-কনফ্লিকশন’ বা সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য সমন্বয় ব্যবস্থাকেও সমর্থন করা প্রয়োজন।
একইসঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের গৃহীত পদক্ষেপ, বিশেষত নিষেধাজ্ঞা যাতে মানবিক সহায়তা এবং বৈধ খাদ্য ও কৃষিপণ্যের বাণিজ্যে অনিচ্ছাকৃত বাধা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে ভারত। পাশাপাশি সংঘাত ও অস্থিরতার মতো মৌলিক সমস্যাগুলির সমাধানে গুরুত্ব আরোপে জোড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে । দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ , অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ , রাষ্ট্রসংঘের উন্নয়ন ব্যবস্থা এবং রোম-ভিত্তিক খাদ্য ও কৃষি সংস্থাগুলির নেতৃত্বে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষেও সওয়াল করেছে ভারত।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাণিজ্যিক জলপথের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে ভারত। হরিশ বলেন, নিরাপদ ও পূর্বানুমানযোগ্য সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ খাদ্য, সার, জ্বালানি এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যক পণ্য নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিবহণের জন্য অপরিহার্য। যুদ্ধ বা সংঘাতের কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট সংঘাতপূর্ণ এলাকার বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে খাদ্য আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলির পাশাপাশি মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ও সামুদ্রিক পরিকাঠামো রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে ভারত। একইসঙ্গে বৈধ বাণিজ্যিক পণ্য এবং মানবিক সহায়তার চালান যাতে অযথা বাধার মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জানান, ২০২৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে বিশ্বে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মাত্রাও ছিল অত্যন্ত বেশি। অন্তত ২৬ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েছিলেন।
২০২৫ সালে সুদান ও গাজায় একই সময়ে দুর্ভিক্ষের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়াকে গুতেরেস একটি ‘লজ্জাজনক মাইলফলক’ হিসেবে বর্ণনা করেন। রাষ্ট্রসংঘের সর্বশেষ ‘Hunger Hotspots’ রিপোর্ট অনুযায়ী, সবচেয়ে উদ্বেগজনক ১৩টি ক্ষুধাপীড়িত অঞ্চলের মধ্যে ১২টিতেই ক্ষুধার প্রধান চালিকাশক্তি হল সংঘাত ও হিংসা।
চলতি মার্কিন-ইজরায়েল-ইরান সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে গুতেরেস বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ এবং এক-তৃতীয়াংশ সার বাণিজ্য পরিচালিত হয়। বিধিনিষেধ ও সমুদ্রপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে পণ্যের দাম বেড়েছে এবং সরবরাহ কমেছে। এর পাশাপাশি লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলাও খাদ্য ও অন্যান্য অত্যাবশ্যক পণ্যের সরবরাহব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
খাদ্য, সার, জ্বালানি এবং মানবিক সহায়তার লজিস্টিক ব্যবস্থায় কোথায় এবং কী ধরনের বিঘ্ন তৈরি হচ্ছে, তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি।
এই কাজে রাষ্ট্রসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বা FAO, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা WFP-সহ বিভিন্ন বিশেষায়িত সংস্থার প্রযুক্তিগত দক্ষতা ব্যবহারের প্রস্তাবে ভারতের পক্ষে বলা হয়েছে এই মূল্যায়ন অবশ্যই তথ্যনির্ভর, প্রমাণভিত্তিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সদস্য দেশ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক সংগঠন এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে ভারত। হরিশ বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য সাশ্রয়ী ও পূর্বানুমানযোগ্য মূল্যে সার, উন্নত মানের বীজ, কৃষি প্রযুক্তি এবং স্বল্পসুদের অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি খাদ্য ও কৃষি উপকরণের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
একটি মাত্র উৎপাদন মডেলের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিরুদ্ধেও সতর্ক করেছে ভারত। এই ধরনের নির্ভরতা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সরবরাহব্যবস্থাকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে উল্লেখ করেন হরিশ। খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে ভারত। হরিশের বক্তব্য, খাদ্য নিরাপত্তার ধারণাকে শুধু চাল, গম ও ভুট্টার মতো প্রধান শস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। জলবায়ু-সহনশীল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসল হিসেবে মিলেট বা শ্রীঅন্নের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
❤ Support Us






