- দে । শ
- আগস্ট ২৬, ২০২৬
বাংলাদেশে প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের ‘শীর্ষ নেতা’? ইক্রামুলকে ঘিরে চাঞ্চল্য, জঙ্গি নেটওয়ার্ক নিয়ে বাড়ছে ভারতের উদ্বেগ
বাংলাদেশের মাটিতে আল কায়েদা-উপমহাদেশ বা আল কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS)-এর ‘দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা’ ইক্রামুল হক ওরফে আবু তালাহ প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন — এমনই অভিযোগ করেছেন শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ । এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে বাংলাদেশের তারেক রহমান সরকারকে নিশানা করেছেন তিনি । অভিযোগটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলেও, ইক্রামুলের অতীত এবং ভারতে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা জঙ্গি নেটওয়ার্ক তৈরির অভিযোগের কারণে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারতীয় গোয়েন্দারাও।
রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের আন্তর্জাতিক জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত কমিটির চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রকাশিত রিপোর্টেও বাংলাদেশকে ঘিরে নিরাপত্তা-উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে । রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে ব্যবহার করে নিজেদের সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা করছে । আফগানিস্তানকে মূল ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে সংগঠনটি জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (JMB)-এর মতো পুরনো সহযোগী জঙ্গি সংগঠনগুলিকে অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে ফের সক্রিয় করার চেষ্টা করছে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে ।
ইক্রামুল হক ওরফে আবু তালাহকে একিউআইএস-এর ‘দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, তাঁর বিরুদ্ধে ভারতে একাধিক জঙ্গি কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে বলে দাবি করেছেন পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের এক শীর্ষ আধিকারিক । তাঁর বিরুদ্ধে ভারতে অন্তত ১০টি জঙ্গি কার্যকলাপ সংক্রান্ত মামলা রয়েছে বলেও দাবি তদন্তকারীদের ।
ময়মনসিংহের বাসিন্দা ইক্রামুল ২০১৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য উত্তরপ্রদেশের দেওবন্দে আসেন । তদন্তকারীদের দাবি, সেখানেই তিনি আল কায়েদার মতাদর্শে প্রভাবিত হন । পরবর্তীতে একিউআইএস-এর নিয়োগ বা ‘দাওয়া’ বিভাগের দায়িত্বও পান বলে গোয়েন্দাদের বক্তব্য ।
তদন্তে আরও দাবি করা হয়েছে, কোচবিহারের দিনহাটার এক দম্পতিকে নিজের বাবা-মা পরিচয় দিয়ে ইক্রামুল ভারতীয় নথিপত্র তৈরি করেছিলেন । সেই নথির ভিত্তিতে ভারতীয় পাসপোর্টও তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ । এনআই-এর তদন্ত অনুযায়ী, ৩৩ বছর বয়সি ইক্রামুল প্রায় দু’বছর পশ্চিমবঙ্গে ছিলেন । ওই সময়ের মধ্যে মধ্যপ্রদেশ থেকে গুজরাত পর্যন্ত একাধিক স্লিপার সেল এবং জঙ্গি মডিউল তৈরির সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি ।
ইক্রামুলের তৈরি বলে অভিযোগ ওঠা কয়েকটি মডিউলের সদস্যদের রাজ্য পুলিশ গ্রেফতার করার পর ২০২২ সালে তিনি চোরাপথে বাংলাদেশে পালিয়ে যান বলে গোয়েন্দাদের দাবি । এরপর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় স্ত্রী-সহ তাঁকে গ্রেফতার করা হয় ।
কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর পরিস্থিতি বদলে যায় । অগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। এর কিছুদিন পর, ১০ অক্টোবর জামিনে মুক্তি পান ইক্রামুল । তারপর থেকেই তাঁর অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে ।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের কাছে ইক্রামুলের বাবা জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে নারায়ণগঞ্জের কোনও একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন । বাংলাদেশের পুলিশের কাছেও ইক্রামুল সম্পর্কে এই তথ্যই রয়েছে বলে জানা গিয়েছে । তবে বর্তমানে তিনি কোথায় রয়েছেন বা কী ধরনের কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত, সে বিষয়ে কোনও বিস্তারিত তথ্য পুলিশের হাতে নেই ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গি সংগঠনগুলির সক্রিয়তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভারতীয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের দাবি, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে সরাসরি জঙ্গি কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৩৭০ জন জামিন পেয়েছেন।
জামিন পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আনসার-উল-বাংলা টিমের প্রতিষ্ঠাতা মুফতি জসিমুদ্দিন রহমানিও রয়েছেন বলে গোয়েন্দাদের দাবি। পাশাপাশি জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ-এর প্রায় ১৮৫ জন নেতা-কর্মীও জামিন পেয়েছেন বলে জানা গিয়েছে ।
গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, জামিনে মুক্তি পাওয়া জঙ্গি সংগঠনের বহু সদস্য বর্তমানে প্রায় প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন । ফলে অতীতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলি ফের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই চলতি বছরের ২৬ ও ৩১ জুলাই আশুলিয়া এবং ঢাকার মতিঝিল এলাকা থেকে দুটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস উদ্ধার হয় । ওই ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া এক ব্যক্তির JMB-র সঙ্গে যোগ রয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি ।
এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও ঢাকা শহরের একটি মাদ্রাসায় IED বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে । তদন্তে ওই মাদ্রাসায় IED তৈরির জন্য ব্যবহৃত একটি কার্যত ‘কারখানা’র সন্ধান পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে ।
বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রভাব ভারতের নিরাপত্তার উপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা ভারতীয় গোয়েন্দাদের। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিক ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম নামে একটি সংগঠনের কয়েক জন সদস্যের গ্রেফতারের প্রসঙ্গ তুলে জানিয়েছেন, মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে ওই সংগঠনের মাধ্যমে মৌলবাদী কার্যকলাপ চালানোর অভিযোগ উঠেছিল।
তদন্তকারীদের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় আগে থেকেই তৈরি হয়ে থাকা জঙ্গি মডিউলগুলিই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। সীমান্তে নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়িয়ে অনুপ্রবেশ কমানো সম্ভব হলেও, অতীতে তৈরি হয়ে যাওয়া মডিউল এবং স্লিপার সেলগুলি পুরোপুরি ধ্বংস করা না গেলে ভবিষ্যতে সেগুলি ফের সক্রিয় হতে পারে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের রিপোর্টে AQIS-এর কার্যকলাপ ও সাংগঠনিক কৌশল নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, সংগঠনটি মূলত আফগানিস্তানের মাটি থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে প্রভাব বাড়াতে JMB-র মতো পুরনো সহযোগী সংগঠনগুলিকে অর্থ ও অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে ফের সক্রিয় করার চেষ্টা করছে AQIS।
ছোট ছোট সেল বা মডিউলের মাধ্যমে সংগঠনকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। ফলে কোনও একটি মডিউল নিরাপত্তা সংস্থার হাতে ধরা পড়লেও গোটা নেটওয়ার্কের কার্যকলাপ থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। এই বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামোই ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কাছে বিশেষ উদ্বেগের কারণ।
গত বছর নভেম্বর মাসে লালকেল্লার সামনে একটি গাড়ি বিস্ফোরণে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই ঘটনার জন্য AQIS-কে দায়ী করা হয়েছে বলে রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে AQIS-কে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সক্রিয় জঙ্গি সংগঠন হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে।
ফলে ভারতের নিরাপত্তা-উদ্বেগ শুধু পূর্ব সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে আফগানিস্তানকেন্দ্রিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক, অন্যদিকে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সংগঠন বিস্তারের সম্ভাবনা—দুই দিক থেকেই ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।
বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তা জোরদার করতে গত কয়েক বছর ধরেই একাধিক পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর সীমান্ত পরিস্থিতির উপর নজর আরও বাড়ানো হয়েছে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও একাধিকবার রাজ্যে এসেছেন।
এর মধ্যেই ঢাকায় ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং বা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন-সহ চার আধিকারিকের সফর নতুন করে তাৎপর্য তৈরি করেছে। বাংলাদেশে তাঁরা সে দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বাংলাদেশের তরফে এই সফরকে রুটিন সফর হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে ভারতীয় গোয়েন্দা মহলের একাংশের মতে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জঙ্গি তৎপরতা এবং তার সম্ভাব্য প্রভাব ভারতের নিরাপত্তার উপর কীভাবে পড়তে পারে, সেই বিষয়ও বৈঠকে আলোচিত হয়ে থাকতে পারে ।
জেএমবি এবং ইক্রামুলের বিভিন্ন মডিউল নিয়ে তদন্ত করা পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এক আধিকারিকের মতে, সীমান্তে নজরদারি ও নিরাপত্তা বাড়ানোর ফলে অনুপ্রবেশ কমেছে । কিন্তু অতীতে যে জঙ্গি মডিউলগুলি তৈরি হয়ে গিয়েছে, সেগুলি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা না গেলে বিপদ থেকেই যাবে ।
ভারতের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু সীমান্ত দিয়ে নতুন অনুপ্রবেশ ঠেকানো নয় । বাংলাদেশে তৈরি হওয়া বা আশ্রয় পাওয়া পুরনো জঙ্গি নেটওয়ার্ক, স্লিপার সেল এবং মডিউলগুলির পুনর্গঠন রুখে দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ ।
ইক্রামুল হকের বর্তমান অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা, বাংলাদেশে একাধিক জঙ্গির জামিন পাওয়ার অভিযোগ এবং AQIS-এর বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সংগঠন বিস্তারের সম্ভাবনা—এই তিনটি বিষয়ই ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলির উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে ।
❤ Support Us






