- বি। দে । শ
- সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
১৮০ বছর পর টিকটকে ফিওদর দস্তয়েভস্কি ! রাতজাগা স্বপ্নদ্রষ্টার প্রেমে মজেছে জেন জ়ি
কল্পনার জগতে বন্দি এক নিঃসঙ্গ স্বপ্নদ্রষ্টা, ক্ষণস্থায়ী প্রেম আর এক রাতের সুখ— দেড়শো বছরেরও বেশি পুরনো সেই গল্পেই মজেছে জেন জ়ি। ‘বুকটক’-এর হাত ধরে ব্রাজিল থেকে ব্রিটেন, স্পেন— নতুন করে পাঠক খুঁজে পেয়েছে দস্তয়েভস্কির ‘হোয়াইট নাইটস’। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম যখন বার বার পাঠাভ্যাস নষ্ট হওয়ার অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, তখন এ এক্কেবারে উল্টো ছবি। ছোটো ভিডিয়োর দুনিয়াই ফিরিয়ে আনছে পুরনো বইয়ের পাঠক ! ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত রুশ সাহিত্যিকের এই উপন্যাসিকা আজ জেন জ়ি-র হাতে হাতে।
নিজেকে ক্লাসিক সাহিত্যের বিশেষ পাঠক বলে দাবি করেন না মার্সেলো নোগেইরা। অথচ রুশ সাহিত্যিক ফিওদর দস্তয়েভস্কির উপন্যাসিকা তাঁকেই করে তুলেছে তার অন্যতম প্রচারক। ২৭ বছরের ব্রাজিলীয় এই বই-ইনফ্লুয়েন্সারের হাত ধরে টিকটকে এখন নতুন করে আলোচনায় দস্তয়েভস্কির সেই পুরনো গল্প— নিঃসঙ্গতা, স্বপ্ন, প্রেম আর বাস্তবতার টানাপড়েনের গল্প। প্রকাশের প্রায় দুই শতক পরে ব্রাজিলে বেস্টসেলারের তালিকায় উঠে এসেছে ‘হোয়াইট নাইটস’। প্রকাশনা সংস্থা ‘এডিতোরা ৩৪’-এর তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় এই উপন্যাসিকার বিক্রি বেড়েছে ৪৬৩ শতাংশ। শুধু ব্রাজিলেই নয়, ব্রিটেন ও স্পেনের বইয়ের দোকানেও দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে বইটির মজুত। কী এমন আছে এই পুরনো গল্পে, যা আজকের টিকটক-প্রজন্মকে এতটা টানছে ?
গল্পের কেন্দ্রে এক স্বপ্নবিলাসী মানুষ। কোনো প্রচলিত অর্থে নায়ক নয়। সে যোদ্ধা নয়, বিজয়ী নয়, সমাজের কেন্দ্রেও নেই সে। সে একা। সে স্বপ্ন দেখে। নিজের কল্পনার মধ্যে এমন একটি পৃথিবী বানিয়ে নেয়, যেখানে বাস্তবের প্রত্যাখ্যান তাকে স্পর্শ করতে পারে না। দস্তয়েভস্কির এই চরিত্রটি তাই আজকের পাঠকের কাছে আশ্চর্য রকম পরিচিত। সেন্ট পিটার্সবার্গের রাস্তায় একা ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে এক তরুণীর সঙ্গে তার দেখা হয় তার। তারপর প্রেম। তীব্র, আবেগময়, আবার একই সঙ্গে ক্ষণস্থায়ী। চারটি রাত আর একটি সকাল ধরে দস্তয়েভস্কি অনুসরণ করেছেন সেই মানুষটিকে, যে এত দিন নিজের কল্পনার জগতেই বেঁচেবর্তে ছিল, প্রথম বার বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে সে। আর সে কারণেই হয়তো গল্পটি আজকের তরুণদের এত কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
নোগেইরার টিকটক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১৩ হাজার অনুগামী। তাঁর মতে, জেন জ়ি প্রজন্মের পাঠকেরা ‘নিঃসঙ্গ স্বপ্নদ্রষ্টা’ চরিত্রটির মধ্যে নিজেদেরই ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। তাঁর মতে, আজকের বহু তরুণ-তরুণী নিজেদের যে একাকিত্বের মধ্যে আবিষ্কার করেন, ‘হোয়াইট নাইটস’-এর নায়ক সে অনুভূতিকেই শব্দের উচ্চারণ দেয়। দস্তয়েভস্কির কথকের উপলব্ধিও সামাজিক মাধ্যমে বার বার ফিরে আসছে। ‘হে ঈশ্বর! আনন্দের একটি গোটা মিনিট! মানুষের গোটা জীবনের জন্য সেটুকু কি সত্যিই খুব কম?’— গল্পের এ লাইনটিই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত অংশগুলির একটি। ক্ষণিকের সুখও যে গোটা জীবনের স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে, সে উপলব্ধিই যেন নতুন প্রজন্মের পাঠকের মনে দাগ কাটছে।
টিকটকের বইপ্রেমী সম্প্রদায়—‘বুকটক’। সেখানে কোনো বইয়ের আলোচনা ছড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব যে বইয়ের দোকানের তাক পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, ‘হোয়াইট নাইটস’ তারই নতুন উদাহরণ। হাজার হাজার মন্তব্যে দস্তয়েভস্কির গল্প নিয়ে উচ্ছ্বাস। এক পাঠকের মন্তব্য, ‘এ গল্প আপনাকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে ফেলবে। বাস্তব জীবনকে এতটা কাব্যিক ভাবে লেখা হয়েছে যে এ থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় নেই!’ ২৯ বছরের পালোমা লিমা রুশ সাহিত্যের অনুরাগী এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার। তাঁর ইউটিউব চ্যানেলেও ‘হোয়াইট নাইটস’ পড়া তরুণদের ভিড় বেড়েছে। কেন? লিমার ব্যাখ্যা, বইটি ছোটো, কিন্তু ভীষণ তীব্র এর অভিঘাত। তার উপর রয়েছে এমন এক প্রেমের গল্প, যার সঙ্গে টিকটকের জনপ্রিয় ‘ট্রোপ’-গুলির মিল রয়েছে। বন্ধুত্ব থেকে প্রেমে পৌঁছনোর মতো গল্পের ধাঁচ তরুণ পাঠকের কাছে যেমন জনপ্রিয়, তেমনই ‘হোয়াইট নাইটস’-এর ক্ষণস্থায়ী প্রেমও সহজে তাদের আকৃষ্ট করছে।
তবে মজার বিষয়, রাশিয়ায় ছবিটা কিছুটা আলাদা। মস্কো বুক ফেয়ারে লেখক একাতেরিনা কভিতকো বলেছেন, রাশিয়ার তরুণ পাঠকদের মধ্যে এ বই নিয়ে উৎসাহ পশ্চিমের তুলনায় অনেকটাই কম। তাঁর মতে, গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রটি একা। সে ভালবাসা খুঁজছে, খুঁজছে এমন কাউকে, যার উপর ভরসা করা যায়। কভিতকোর কথায়, ‘হয়তো পশ্চিমের কিশোর-কিশোরীরা এখন সে অবস্থার মধ্যেই বাস করছে।’ তবে, টিকটকের এ উন্মাদনার আরও একটি তাৎপর্য রয়েছে। ‘হোয়াইট নাইটস’ অনেকের কাছেই দস্তয়েভস্কির সাহিত্যজগতে প্রবেশের দরজা হয়ে উঠছে। ছোটো উপন্যাসিকাটি পড়ে কেউ কেউ এবার হাত বাড়াচ্ছেন তাঁর আরও কঠিন, দীর্ঘ রচনার দিকে। তালিকায় রয়েছে ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’। ‘এডিতোরা ৩৪’-এর ড্যানিলো হোরা বিষয়টিকে বলেছেন ‘অপ্রত্যাশিত’। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’-এর বিক্রি বেড়েছে ৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ, যে সামাজিক মাধ্যমকে এত দিন বই পড়ার অভ্যাস নষ্ট করার অন্যতম কারণ বলে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে, সে মাধ্যমই কি তবে ক্লাসিক সাহিত্যের নতুন পাঠক তৈরি করছে? ‘হোয়াইট নাইটস’-এর ঘটনা অন্তত সে সম্ভাবনাই দেখাচ্ছে।
তবে শুধু গল্প নয়, বইয়ের বাহ্যিক সৌন্দর্যও এই নতুন পাঠক-উন্মাদনার অন্যতম অংশ। নোগেইরার মতে, টিকটকে পাঠক হওয়াটাও এখন এক ধরনের ‘এস্থেটিক’। বই পড়ার পাশাপাশি বইটি হাতে নিয়ে ছবি তোলা, সুন্দর প্রচ্ছদ দেখানো, নিজের পাঠ-অভিজ্ঞতা ভিডিয়োয় তুলে ধরা— সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক নতুন পাঠসংস্কৃতি। ডিজিটাল বইয়ের যুগেও তাই ছাপা বইয়ের চাহিদা বাড়ছে। নোগেইরার যুক্তি, ‘‘কিন্ডলের চেয়ে একটি অসাধারণ প্রচ্ছদই বেশি নজর কাড়ে।’’ তিনি ‘হোয়াইট নাইটস’ নিয়ে যে ভিডিয়োটি করেছিলেন, সেখানে ব্যবহার করেছিলেন চুম্বনরত এক যুগলের রঙিন পপ-আর্ট প্রচ্ছদযুক্ত একটি সংস্করণ। সে সংস্করণের কপি রিও ডি জেনেইরোর বেশ কয়েকটি বইয়ের দোকানে ইতিমধ্যেই শেষ।
ক্লাসিক সাহিত্যের এই অভূতপুর্ব প্রত্যাবর্তনের মাঝেই অন্য একটি দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাহিত্য গবেষকেরা। ব্রাজিলীয় গবেষক এবং রুশ সাহিত্যের অনুবাদক সেসিলিয়া রোসাস সামাজিক মাধ্যমে ক্লাসিক সাহিত্যের নতুন পাঠক তৈরি হওয়ার ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁর সতর্কতা, সামাজিক মাধ্যমে বই নিয়ে তৈরি হওয়া সমস্ত আলোচনা সাহিত্য সমালোচনা নয়। অনেক সময় সেখানে বিশ্লেষণের বদলে কাজ করছে আকর্ষণ, আবেগ, প্রচ্ছদ, ট্রেন্ড এবং বিক্রির কৌশল। রোসাসের মতে, সাহিত্য সমালোচনা বলে যা অনেক সময় সামনে আসে, তা আসলে ‘বিজ্ঞাপন’। ‘হোয়াইট নাইটস’-এর ভিতরের বিষণ্ণতা, অস্তিত্বের প্রশ্ন, স্বপ্ন ও বাস্তবের দ্বন্দ্ব, প্রেমের ক্ষণস্থায়িত্ব—এসব বুঝতে টিকটকের কয়েক সেকেন্ড যথেষ্ট নয়।
কিন্তু তাতে কি দস্তয়েভস্কির বিজয়রথের গতি কমবে? হয়তো না। কারণ ১৮৪৮-এর সেন্ট পিটার্সবার্গের নিঃসঙ্গ স্বপ্নদ্রষ্টা যদি ২০২৬-এর টিকটক-প্রজন্মের হাতে পৌঁছে যান, তবে মাধ্যম বদলালেও সাহিত্যের মূল প্রশ্নটি একই থেকে যায়— মানুষ কতটা একা ? আর সেই একাকিত্বের মধ্যে এক মুহূর্তের ভালবাসার দামই বা কত? দেড়শো বছরেরও বেশি সময় আগে দস্তয়েভস্কি যে প্রশ্ন রেখে গিয়েছিলেন, আজ তার উত্তর খুঁজছে এক নতুন প্রজন্ম। সামাজিক যোগাযোগের এত ভিড়ের মধ্যেও এই একাকিত্বই কি আজকের তরুণের সবচেয়ে গভীর অভিজ্ঞতা ? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে ‘হোয়াইট নাইটস’কে কেবল প্রেমের গল্প হিসাবে পড়া যায় না। সামাজিক মাধ্যমের ভিডিয়ো কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পাঠক যদি নিজের জীবনের কোনো অন্ধকার কোণকে চিনে ফেলেন, তবে ১৮০ বছরের ব্যবধানও যে ঘুচে যায়।
❤ Support Us







