- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
রাশিয়ার তেল কিনলে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ! মার্কিন পার্লামেন্টে বিল পাশ, দিল্লির প্রতিক্রিয়ার দিকে নজর ওয়াশিংটনের
রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করা দেশগুলির বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের পথ আরও প্রশস্ত করল আমেরিকা। রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল কেনে — এমন দেশগুলির পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়ার প্রস্তাব-সংবলিত একটি বিল বুধবার পাশ হয়েছে মার্কিন আইনসভার নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে। এর ফলে ভারত ও চিনের মতো রাশিয়ার বড়ো তেল ক্রেতা দেশগুলির উপর শুল্ক চাপানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে এখনই ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক বসছে না। বিলটি আইনে পরিণত হলে শুল্ক আরোপ করা হবে কি না এবং হলে তার হার কত হবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন বিলটির নাম ‘লিন্ডসে অ্যান্ড গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬’। প্রাক্তন রিপাবলিকান সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামাঙ্কিত এই বিল গত মাসেই মার্কিন আইনসভার উচ্চকক্ষ সেনেটে পাশ হয়েছিল। সেখানে বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ৮৬ জন সেনেটর এবং বিপক্ষে ভোট পড়েছিল ১১টি।
বুধবার বিলটি হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে পেশ করা হলে পক্ষে ২৬২টি এবং বিপক্ষে ১৫৯টি ভোট পড়ে। রিপাবলিকান পার্টির অধিকাংশ সদস্য বিলের সমর্থনে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটিক পার্টিরও বেশ কয়েক জন সদস্য বিলটির পক্ষে ভোট দেন। ফলে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই বিলটি পাশ হয়ে গেল। পরবর্তী ধাপে এটি হোয়াইট হাউসে যাবে। ট্রাম্প তাতে স্বাক্ষর করলেই তা আইনে পরিণত হবে। আমেরিকার যুক্তি, বিভিন্ন দেশকে তেল বিক্রি করে রাশিয়া বিপুল অর্থ উপার্জন করছে এবং সেই অর্থ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে ব্যবহার করছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ হামলা শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ার উপর একাধিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর পাশাপাশি রুশ তেল বিক্রির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টাও শুরু হয়।
অন্যদিকে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর রাশিয়া তুলনামূলক কম দামে বিভিন্ন দেশকে অশোধিত তেল বিক্রির প্রস্তাব দেয়। ভারত, চিন-সহ একাধিক দেশ সেই সুযোগ নেয়। বর্তমানে রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রথম দুই স্থানে রয়েছে চিন ও ভারত। দেশের বিপুল অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ভারত গত কয়েক বছরে রাশিয়ার অশোধিত তেলের উপর উল্লেখযোগ্য ভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। তেলবাহী জাহাজের চলাচলের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে ‘কেপলার’-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ভারত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ লক্ষ ব্যারেল অশোধিত তেল রাশিয়া থেকে আমদানি করেছে। ভারতের মোট আমদানি করা অশোধিত তেলের প্রায় ৪৫ শতাংশ রাশিয়া থেকে এসেছে।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের পরিস্থিতির মধ্যে এই নির্ভরতা আরও বেড়েছে। শেষ দু-মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের আমদানি করা অশোধিত তেলের প্রায় ৫০ শতাংশই রাশিয়া থেকে এসেছে। রাশিয়া থেকে তেল বা গ্যাস কেনে — এমন পাঁচটি দেশের বিরুদ্ধে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব আগেও সামনে এসেছিল। তবে কংগ্রেসে পাশ হওয়া বর্তমান বিলে সর্বোচ্চ শুল্কের হার কমিয়ে ১০০ শতাংশ রাখা হয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে মার্কিন প্রশাসনের হাতে রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল আমদানি করা দেশগুলির বিরুদ্ধে বড় ধরনের বাণিজ্যিক চাপ তৈরির ক্ষমতা থাকবে। তবে আইনে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের অনুমতি থাকলেও প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রে বাস্তবে কত শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে, তা নির্ভর করবে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের উপর।
কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, কংগ্রেসে পাশ হওয়া এই বিলকে অবিলম্বে শুল্ক আরোপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে ভারত ও চিনের মতো দেশের সঙ্গে দর-কষাকষিতে কাজে লাগাতে পারেন ট্রাম্প। বিশেষ করে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনার সময় ওয়াশিংটন অতিরিক্ত সুবিধা আদায়ের জন্য এই সম্ভাব্য শুল্ককে চাপ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা। তবে ভারতের বিরুদ্ধে এখনই চড়া হারে শুল্ক আরোপ করা হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কূটনীতিকদের একাংশের মতে, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী এবং বাব-এল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলও পরিস্থিতির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এ অবস্থায় ভারতীয় তেল আমদানির উপর হঠাৎ এমন শুল্ক চাপানো হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের উপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। তাই ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত সরাসরি বড়ো ধরনের শুল্ক আরোপ না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে বলে মনে করছেন ওই কূটনীতিকেরা। তাঁদের একটি অংশের মতে, আগামী নভেম্বরে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশনের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্তও ট্রাম্প অপেক্ষা করতে পারেন। আমেরিকার ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের বক্তব্য, এই আইনের মূল উদ্দেশ্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো, যাতে তাঁকে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করা যায়।
তবে ডেমোক্র্যাটদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, রাশিয়াকে সরাসরি শাস্তি না দিয়ে কেন রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলির উপর শুল্ক চাপানো হবে। এই যুক্তিতে তাঁরা বিলটিতে সংশোধনী আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন না পাওয়ায় সেই সংশোধনী প্রস্তাব খারিজ হয়ে যায়। ফলে এখন মূল প্রশ্ন একটাই — কংগ্রেসের দুই কক্ষে পাশ হওয়া বিলটিতে ট্রাম্প সই করবেন কি না, আর সই করলে ভারত ও চিনের মতো রুশ তেলের বৃহৎ ক্রেতা দেশগুলির উপর বাস্তবে কতটা শুল্ক চাপানো হবে। সে সিদ্ধান্ত এখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে।
❤ Support Us







