Advertisement
  • মা | ঠে-ম | য় | দা | নে
  • অক্টোবর ৬, ২০২৬

আবেগঘন বার্তা দিয়ে, দলের নেতৃত্ব ছাড়লেন বিশ্বকাপজয়ী হরমনপ্রীত কৌর  

আবেগঘন বার্তা দিয়ে, দলের নেতৃত্ব ছাড়লেন বিশ্বকাপজয়ী হরমনপ্রীত কৌর  

এক দশকের নেতৃত্বের অধ্যায়ে ইতি। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের তিন ফরম্যাটের অধিনায়কত্ব থেকেই সরে দাঁড়ালেন হরমনপ্রীত কৌর। মঙ্গলবার সমাজমাধ্যমে আবেগঘন বার্তায় নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিলেন ৩৭ বছরের ভারতীয় তারকা। তবে নেতৃত্ব ছাড়লেও ক্রিকেট থেকে সরে যাচ্ছেন না তিনি। বরং অধিনায়কত্বের দায়িত্বের চাপ থেকে মুক্ত হয়ে আবার শুধুই খেলার ভালবাসার জন্য মাঠে নামতে চান হরমনপ্রীত।

‘হতে পারে আমার নেতৃত্বের অধ্যায় আজ শেষ হলো, কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটের প্রতি আমার ভালবাসা কখনও শেষ হবে না’ — হরমনপ্রীতের বার্তায় বার বার ফিরে এসেছে এ কথা। দীর্ঘ দশ বছরের অধিনায়কত্বে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের উত্থান-পতনের সাক্ষী ছিলেন তিনি। সে যাত্রার সবচেয়ে বড়ো সাফল্য নিঃসন্দেহে ২০২৫ সালের এক দিনের বিশ্বকাপ জয়। দেশের মাটিতে প্রথম বার মহিলা ওয়ান ডে বিশ্বকাপ জিতেছিল ভারত, হরমনপ্রীতের নেতৃত্বেই। তার আগে এবং পরে এশিয়ান গেমসেও তাঁর নেতৃত্বে সাফল্য পেয়েছে ভারতীয় দল। ২০২২ এবং ২০২৬ সালে টানা দু-বার এশিয়ান গেমসে সোনা জিতেছে ভারত।

তবে সাফল্যের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ব্যর্থতাও কম আসেনি। চলতি বছর টি-২০ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই ভারতের বিদায় এবং ব্যাট হাতে হরমনপ্রীতের প্রত্যাশিত ছন্দে না থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। সে আবহেই দলের নেতৃত্বে পরিবর্তনের জল্পনা শুরু হয়েছিল। প্রাক্তন ক্রিকেটার দিয়ানা এডুলজিও স্মৃতি মন্ধানাকে নেতৃত্বে আনার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। যদিও হরমনপ্রীত এর আগে জানিয়েছিলেন, ২০২৮ সালের অলিম্পিক্সে ভারতকে নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। ভারত ইতিমধ্যেই অলিম্পিক্সের জন্য যথাযথ যোগ্যতা অর্জন করেছে। শেষ পর্যন্ত সে স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই নেতৃত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে হরমনপ্রীত লিখেছেন, ‘আজ আমি সব ফরম্যাটেই ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের অধিনায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি। এটি মোটেই সহজ সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু বছরের স্মৃতি, আবেগ, ত্যাগ এবং এমন কিছু মুহূর্ত, যা জীবনের বাকি সময়টা আমার সঙ্গে থেকে যাবে।’ এর পরেই নিজের দায়িত্ববোধের কথা জানিয়েছেন তিনি। হরমনপ্রীতের বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি। এই দলকে আমার যা দেওয়ার ছিল, তার সবটাই দিয়েছি। গর্বের সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করেছি, ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।’

অধিনায়কত্বের দীর্ঘ সময়ে ব্যক্তিগত লক্ষ্যকেও বহু বার পিছনে সরিয়ে রেখেছিলেন বলে জানিয়েছেন হরমনপ্রীত। তাঁর কথায়, দলের স্বার্থকেই সব সময় নিজের আগে রেখেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, ‘আমার রক্ত, আমার ঘাম, আমার সময় এবং বহু বার আমার নিজের খেলা ও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষারও একটা অংশ এই দলের জন্য দিয়েছি। এমন অনেক মুহূর্ত এসেছে, যখন নিজের পারফরম্যান্স, নিজের উন্নতি এবং নিজের চাওয়া-পাওয়াকে এক পাশে সরিয়ে রাখতে হয়েছে। কারণ আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি, দলের স্বার্থই সবার আগে।’

অধিনায়ক হিসেবে সব সিদ্ধান্ত যে সহজ ছিল না, সে কথাও অকপটে বলেছেন হরমনপ্রীত। অনেক সিদ্ধান্ত সতীর্থ, সমর্থক কিংবা বাইরের মহল সহজে মেনে নেয়নি। কোনও কোনও সিদ্ধান্তের ব্যক্তিগত মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছে। তবু দলের উন্নতির কথা মাথায় রেখেই প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, ‘অধিনায়ক হিসেবে আমাকে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এমন সিদ্ধান্ত, যা সব সময় সকলে বুঝতে পারেনি, যা নেওয়া সহজ ছিল না এবং যার জন্য কখনো কখনো ব্যক্তিগত খেসারতও দিতে হয়েছে। কিন্তু আমার নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তের পিছনে একটিই উদ্দেশ্য ছিল — দলকে আরও ভাল করে তোলা, অন্য ক্রিকেটারদের নিজেদের মেলে ধরার, নিজের উপর বিশ্বাস রাখার এবং নিজেদের সেরাটা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।’

দীর্ঘ নেতৃত্বের পথে সমালোচনা, ব্যর্থতা, হতাশার পাশাপাশি সাফল্যের স্বাদও পেয়েছেন হরমনপ্রীত। নিজের বিদায়ী বার্তায় সেই ওঠাপড়ার কথাই তুলে ধরে তিনি বলেছেন — ‘আমি চরম হতাশার মুহূর্ত দেখেছি। হৃদয়ভঙ্গের যন্ত্রণা, সমালোচনা, সংশয় এবং এমন দিনও দেখেছি, যখন কোনো কিছুই আমাদের পক্ষে যাচ্ছিল না। আবার একই সঙ্গে সাফল্যের শীর্ষও স্পর্শ করেছি। জয়, উদ্‌যাপন, দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব এবং এমন কিছু মুহূর্ত দেখেছি, যা প্রতিটি ত্যাগকে সার্থক করে তুলেছিল।’ সে কারণেই নেতৃত্ব ছাড়ার মুহূর্তে কোনও আক্ষেপ রাখতে চান না হরমনপ্রীত। বরং আবেগের পাশাপাশি তাঁর মনে রয়েছে শান্তিও। ‘আজ যখন আমি অধিনায়কত্ব ছাড়ছি, আমার হৃদয় আবেগে ভরা। তবে মনে এক পরম শান্তিও রয়েছে…’ লিখেছেন ভারতের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক।

হরমনপ্রীতের অধিনায়কত্বের শুরু ২০১৬ সালে। মিতালি রাজের উত্তরসূরি হিসাবে ভারতীয় টি-২০ দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি। ২০১৮ সালের টি-২০ বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসাবে ভারতকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। ২০২০ সালে তাঁর নেতৃত্বেই টি-২০ বিশ্বকাপে রানার্স হয়েছিল ভারতীয় দল। এর পরে ২০২২ সালে ওয়ান ডে দলের অধিনায়কত্বও তাঁর হাতে আসে। একই বছর কমনওয়েলথ গেমসে ভারতকে রুপোর পদক এনে দেন তিনি। পরের বছর, ২০২৩ সালে, লাল বলের ক্রিকেটেও নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। অর্থাৎ তিন ফরম্যাটেই ভারতের অধিনায়ক হয়ে ওঠেন হরমনপ্রীত। অধিনায়ক হিসাবে তাঁর সবচেয়ে বড়ো সাফল্য আসে ২০২৫ সালে। দেশের মাটিতে প্রথম বার মহিলা ওয়ান ডে বিশ্বকাপ জেতে ভারত। সেই ঐতিহাসিক দলের নেতা ছিলেন হরমনপ্রীত। তার আগে ২০২২ সালের এশিয়ান গেমসে তাঁর নেতৃত্বে সোনা জিতেছিল ভারত। ২০২৬ সালেও এশিয়ান গেমসে টানা দ্বিতীয় বার সোনা জেতে ভারতীয় দল। চলতি বছর ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারতের প্রথম টেস্ট জয়ও এসেছে তাঁর নেতৃত্বে। অর্থাৎ নেতৃত্বের শেষ পর্বেও ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রইল তাঁর নাম।

অধিনায়ক হিসাবে হরমনপ্রীতের পরিসংখ্যানও তাঁর দীর্ঘ পথচলার সাক্ষ্য দেয়। ভারতকে পাঁচটি টেস্ট, ৫১টি ওয়ান ডে এবং ১৫৫টি টি-২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। টি-২০ ক্রিকেটে অধিনায়ক হিসাবে একাধিক নজিরও রয়েছে তাঁর। প্রথম ক্রিকেটার হিসাবে ১৫০টি টি-২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচে নেতৃত্ব দেওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন হরমনপ্রীত। মহিলা টি-২০ ক্রিকেটে অধিনায়ক হিসাবে তাঁর জয়সংখ্যাও সর্বাধিক — ৯২টি। এশিয়া কাপেও তাঁর নেতৃত্বে ২০১২, ২০১৬, ২০২২ এবং ২০২৬ সালে সাফল্য পেয়েছে ভারতীয় দল। এক দশকের এই দীর্ঘ নেতৃত্বের যাত্রায় তাই শুধু ট্রফিই নয়, ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের পরিবর্তনের সঙ্গেও ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে হরমনপ্রীতের নাম।

হরমনপ্রীত সরে দাঁড়ানোর পর স্বাভাবিক ভাবেই পরবর্তী অধিনায়ক কে হবেন, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। সেই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে তাঁর দীর্ঘ দিনের ডেপুটি স্মৃতি মান্দানা। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক ভাবে নতুন অধিনায়কের নাম ঘোষণা করেনি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। বিশ্বের অন্যতম সেরা মহিলা ব্যাটার হিসাবে ইতিমধ্যেই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন ৩০ বছরের স্মৃতি। হরমনপ্রীতের অনুপস্থিতিতে ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই নয়, মহিলাদের প্রিমিয়ার লিগেও রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর অধিনায়ক হিসাবে স্মৃতির রেকর্ড যথেষ্ট উজ্জ্বল। ফলে হরমনপ্রীতের উত্তরসূরি হিসাবে তাঁর নামই আপাতত সবচেয়ে জোরালো। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।

তবে, নেতৃত্ব ছাড়ার আগে ভবিষ্যৎ ভারতীয় দল নিয়েও আশাবাদী হরমনপ্রীত। তাঁর বিশ্বাস, উত্তরসূরিদের হাতে দল নিরাপদেই থাকবে। তাঁর দৃঢ় প্রত্যয়, ‘আমি মন থেকে বিশ্বাস করি, আমার দল এখন অত্যন্ত ভাল জায়গায় রয়েছে। এই দলে প্রতিভা রয়েছে, মানসিক দৃঢ়তা রয়েছে, আত্মবিশ্বাস রয়েছে এবং রয়েছে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ দেখতে এবং তার অংশ হয়ে থাকতে আমি ভীষণ ভাবে আগ্রহী।’ সতীর্থ, কোচ, সাপোর্ট স্টাফ, ম্যানেজমেন্ট, বিসিসিআই, পরিবার এবং সমর্থকদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। যাঁরা ভাল-মন্দ সব সময়ে তাঁর পাশে ছিলেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সফল মহিলা অধিনায়ক। শেষে তাঁর বার্তা আরও স্পষ্ট—অধিনায়কত্ব শেষ হলেও ক্রিকেটের পথচলা নয়। লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের একটি ছবি দিয়েই সেই বার্তা শেষ করেছেন হরমনপ্রীত। এক দশকের নেতৃত্বের অধ্যায় শেষ হলো। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটের জার্সিতে তাঁর গল্প এখনো শেষ হয়নি।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!