Advertisement
  • দে । শ
  • অক্টোবর ৭, ২০২৬

নীল শাড়ি, খালি পা, চোখে চাকরির স্বপ্ন ! কবিতার ১৬০০ মিটার দৌড়ে গর্জে উঠল স্টেডিয়াম

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
নীল শাড়ি, খালি পা, চোখে চাকরির স্বপ্ন ! কবিতার ১৬০০ মিটার দৌড়ে গর্জে উঠল স্টেডিয়াম

কারও পায়ে দৌড়ের জুতো। কারও পরনে ঝকঝকে ট্র্যাকস্যুট। হাতে জলের বোতল, কাঁধে ব্যাগ। আর তাঁদেরই মাঝে নীল শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে এক মহিলা। মাঠে নামার আগে হয়তো খানিকটা অস্বস্তিই হচ্ছিল তাঁর। কিন্তু দৌড় শুরু হতেই বদলে গেল ছবিটা। পায়ের চটি খুলে খালি পায়ে ছুটলেন ১,৬০০ মিটার। একে একে পিছনে ফেললেন অন্য প্রতিযোগীদের। আর তাঁকে ছুটতে দেখে হাততালি আর উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল গোটা স্টেডিয়াম।

সে দৌড়ের ভিডিয়োই এখন সমাজমাধ্যমে ভাইরাল। আর ভাইরাল হওয়া সেই নীল শাড়ির মহিলা হলেন ঝাড়খণ্ডের রামগড় জেলার সোসো গ্রামের বাসিন্দা কবিতা কুমারী। স্বামীহারা কবিতার কাছে হোমগার্ডের চাকরি শুধুমাত্র কর্মসংস্থান নয়। দুই সন্তানকে মানুষ করা, মাথার উপর থাকা প্রায় ৬ লক্ষ টাকার ঋণ শোধ করা আর ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য লড়াইয়ে সবচেয়ে বড়ো ভরসা।

জানা যাচ্ছে, প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে গ্রামের কাছে অসমান জমিতে দৌড়ের অনুশীলন করেন কবিতা। পায়ে দামি জুতো নেই, নেই প্রশিক্ষকের পিছনে টাকা খরচ করার সামর্থ্যও। ইউটিউবের ভিডিয়ো দেখে নিজের মতো করে প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। গত ৪ অক্টোবর সে প্রস্তুতিরই পরীক্ষা দিতে পৌঁছেছিলেন রামগড়ের সিধু-কানহু স্টেডিয়ামে। ক্রীড়াবিদদের পরিচালিত একটি অ্যাকাডেমির উদ্যোগে সেখানে আয়োজন করা হয়েছিল বিনামূল্যের ট্রায়াল। উদ্দেশ্য ছিল, হোমগার্ড নিয়োগের আসল শারীরিক পরীক্ষার আগে প্রার্থীদের মাঠের সঙ্গে পরিচিত করানো। আগামী ২৪ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত এই স্টেডিয়ামেই হওয়ার কথা হোমগার্ড নিয়োগের শারীরিক পরীক্ষা।

স্টেডিয়ামে পৌঁছে অবশ্য ঘাবড়ে গিয়েছিলেন কবিতা। ‘খুব নার্ভাস লাগছিল। সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছিল। আমি শাড়ি পরে এসেছি। আর অন্যদের দেখছিলাম ট্র্যাকস্যুট, জুতো, ব্যাগ, জলের বোতল নিয়ে। একটু অস্বস্তিই হচ্ছিল’ বলছিলেন তিনি।  কিন্তু দৌড় শুরু হওয়ার পর আর পিছনে ফিরে তাকাননি কবিতা। মহিলা প্রার্থীদের জন্য ১,৬০০ মিটার দৌড় শেষ করার সময়সীমা ১০ মিনিট। কবিতা সেই দৌড় শেষ করেন মাত্র ৮ মিনিটে। পান ‘এক্সেলেন্ট’ গ্রেড আর পূর্ণ নম্বর। আর সেই দৌড়ের মুহূর্তটাই বদলে দিল গোটা পরিবেশ। মাঠের চারপাশ থেকে ভেসে এল হাততালি, চিৎকার, উৎসাহের শব্দ। কবিতার জানান, ‘দর্শকরা হাততালি দেওয়া শুরু না করা পর্যন্ত বুঝতেই পারিনি আমি কী করেছি। শুধু চটি খুলে খালি পায়ে দৌড় শুরু করেছিলাম। দৌড়ের সময় মাথায় শুধু হোমগার্ডের চাকরির কথাই ছিল। কেউ আমার ভিডিও করে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন। আশা করছি, পরীক্ষার দিনও একই উদ্যম আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে দৌড়তে পারব।’

৪ অক্টোবরের ওই ট্রায়ালের আয়োজন করেছিলেন রামগড়ের অঙ্কিত রানার অ্যাকাডেমির কর্ণধার অঙ্কিত সিংহ। তাঁর বক্তব্য, শুধুমাত্র অনুশীলনের জন্য ওই ট্রায়ালের আয়োজন করা হয়নি। আসল পরীক্ষার আগে প্রার্থীরা যাতে মাঠের চরিত্র বুঝতে পারেন, সেটিই ছিল মূল উদ্দেশ্য। অঙ্কিত জানান, সিধু-কানহু স্টেডিয়ামের মাঠ একেবারে সমতল নয়। এক দিকে রয়েছে ঢাল। কোথাও বালি, কোথাও নুড়ি, কোথাও আবার অসমান জমি। ফলে আগে থেকে মাঠের সঙ্গে পরিচিত না থাকলে পরীক্ষার দিন অনেকেই সমস্যায় পড়তে পারেন। তাঁর মতে, ‘আসল শারীরিক পরীক্ষার আগে প্রার্থীদের জানা দরকার মাঠটা কেমন। তাই ১৫-২০ কিলোমিটার দূর থেকেও অনেকে এখানে অনুশীলন করতে আসেন।’ সেদিন প্রায় ১,৯০০ জন প্রার্থী ট্রায়ালে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১,১০০ জনই মহিলা। গ্রামাঞ্চল থেকে আসা বহু মহিলা শাড়ি পরেই হাজির হয়েছিলেন। অঙ্কিতের দাবি, প্রায় ৫০-৬০ জন মহিলা সেদিন শাড়ি পরেই দৌড়েছিলেন। গ্রামের মহিলাদের ক্ষেত্রে ট্র্যাকস্যুট ও রানিং জুতো পরে নিয়মিত বাইরে গিয়ে অনুশীলন করা যে সব সময় সহজ নয়, সে কথাও মানছেন অঙ্কিত। তাই আসল পরীক্ষার পরিবেশের সঙ্গে আগে থেকেই তাঁদের পরিচিত করানোই ছিল এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ঝাড়খণ্ডে হোমগার্ড নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। রামগড় জেলায় শূন্যপদের সংখ্যা মাত্র ২৮৪। অথচ আবেদন জমা পড়েছে ১৬ হাজারেরও বেশি। নিয়োগের প্রথম ধাপেই রয়েছে কঠিন শারীরিক পরীক্ষা। ১,৬০০ মিটার দৌড়ের পাশাপাশি রয়েছে লং জাম্প, হাই জাম্প এবং শটপাট। তার পর হবে লিখিত পরীক্ষা। এ নিয়োগে মোট শূন্যপদের ৫০ শতাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত। তার মধ্যেই আবার ৫ শতাংশ পদ রাখা হয়েছে বিধবাদের জন্য। কবিতার কাছে সেই সংরক্ষিত কয়েকটি পদই যেন নতুন জীবনের দরজা।

কবিতার জীবনের গল্প অবশ্য শুধু চাকরির লড়াইয়ের নয়। তার সঙ্গে মিশে রয়েছে একের পর যন্ত্রণার গল্প। ২০০৯ সালে নাবালিকা বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। এখন বয়স প্রায় ৩০। তিন বছর আগে স্বামী দীপক কুমার মাহাতোর মৃত্যু হয়। মুম্বইয়ে কাজ করার পর গুজরাতে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন দীপক। কবিতা জানান, কোভিডের সময় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তাঁর স্বামী। বাড়িতে ফিরে আসার পরেও আর সুস্থ হননি। বার বার অসুস্থ হয়ে পড়তেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে মৃত্যু হয় তাঁর। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব এসে পড়ে কবিতার কাঁধে। শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা, দুই সন্তানকে বড় করা, সংসার চালানো — সবই করতে হয়েছে তাঁকে।

এর মধ্যেই আরও একটি মৃত্যু। স্বামীর মৃত্যুর ছয় মাসের মাথায় তাঁর ছোটো ভাইও মারা যান। স্বামীর চিকিৎসার পিছনে বিপুল খরচ হওয়ায় পরিবারের মাথায় এখন প্রায় ৬ লক্ষ টাকার ঋণ। সংসার চালাতে রামগড় শহরের বিভিন্ন বেসরকারি অফিসে নিরাপত্তারক্ষীর কাজও করেছেন কবিতা। কিন্তু রাত করে শিফট শেষ হওয়ায় গ্রামে ফেরার জন্য যানবাহন পাওয়া যেত না। শেষ পর্যন্ত সেই কাজও ছাড়তে হয় তাঁকে। এখন মূলত ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করেন কবিতা। সেই রোজগারেই এক দিকে ঋণের বোঝা কমানোর চেষ্টা, অন্য দিকে দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ। সন্তানরা রামগড়ের একটি স্কুলে পড়ে। ফলে, হোমগার্ডের শারীরিক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কোনো প্রশিক্ষকের কাছে যাওয়ার সামর্থ্য নেই কবিতার। নেই নতুন পোশাক বা দৌড়ের জুতো কেনার টাকাও। তাই তাঁর প্রশিক্ষক ইউটিউব।

কবিতা বলেন, ‘আমার সন্তানদের ইউটিউব খুলে ভিডিয়ো চালাতে বলি। নিজে ইউটিউব খুব একটা চালাতে পারি না। ভিডিয়ো দেখে দেখে প্রস্তুতি নিই। পোশাক, জুতো বা প্রশিক্ষণের জন্য খরচ করার মতো আমার কাছে এক পয়সাও নেই। তাই নিজের মতো করেই প্রস্তুতি নিতে হয়।’ তবে সমাজমাধ্যমে তাঁর সেই খালি পায়ে দৌড়ের ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। অনেকেই তাঁর পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে এসেছেন। রাজনীতিকেরাও যোগাযোগ করেছেন। ডুমরির বিধায়ক জয়রাম কুমার মাহাতো ফোনে কথা বলেছেন কবিতার সঙ্গে। পাঠিয়েছেন ট্র্যাকস্যুট এবং রানিং শু।

কবিতার বর্তমান প্রশিক্ষক অজয় কারমালি নিজেও রামগড়ে কর্মরত হোমগার্ড। ৩৮ বছরের কারমালি দুলমিতে চালান এইচএমটি ফিজিক্যাল অ্যাকাডেমি। কবিতার গ্রাম থেকে যার দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। প্রায় চার-পাঁচ মাস আগে গ্রামের বাসিন্দাদের বিনামূল্যে শারীরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য অ্যাকাডেমিটি শুরু করেছিলেন কারমালি। সমাজমাধ্যমে তাঁর পোস্ট দেখেই কবিতা যোগাযোগ করেন। জানতে চান, সেখানে তিনি অনুশীলন করতে পারবেন কি না।

কারমালিই তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন নিয়োগের আগে স্টেডিয়ামে গিয়ে দৌড়ানোর। মাঠের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং নিজের উপর বিশ্বাস বাড়ানো— দুই-ই ছিল উদ্দেশ্য। নীল শাড়ি পরে খালি পায়ে যে দৌড় স্টেডিয়াম মাতিয়েছে, তা নিছক দৌড়ের গল্প নয়। এক অদম্য প্রাণশক্তির ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের গল্পও। চাকচিক্যের বাইরে যে দেশ, সেই ভারতবর্ষের গল্প। ঋণ, দারিদ্র, স্বামীর মৃত্যু, সংসারের বোঝা — সব পিছনে ফেলে কবিতা এখন ছুটছেন, ছুটছেন একটি চাকরির দিকে, ছুটছেন আরেকটু সহজ ভবিষ্যতের দিকে। সামনে কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু ১,৬০০ মিটার দৌড়ের সেই ৮ মিনিট তাঁকে শিখিয়েছে — পথ যতই কঠিন হোক, নিজের উপর ভরসা আর পরিশ্রমে অবিচল থাকলে সেখানে পৌঁছনো একদমই অসম্ভব নয়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!