- ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র প্রচ্ছদ রচনা
- অক্টোবর ৮, ২০২৬
সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার কবি, প্রাবন্ধিক অ্যান কার্সন
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন কানাডার কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কার্সন। বৃহস্পতিবার সুইডিশ অ্যাকাডেমির তরফে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়। ৭৬ বছর বয়সি কার্সনের সাহিত্যকর্মে কবিতা, গদ্য, নাট্যরচনা, সাহিত্যসমালোচনা এবং অপেরার গীতিনাট্য — বিভিন্ন মাধ্যমের মিশেল দেখা যায়। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও পুরাণের সঙ্গে আধুনিক জীবন, প্রেম, যৌনতা এবং মানুষের ব্যক্তিগত সংকটকে মিলিয়ে দেওয়াই তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কার্সনের বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। গ্রিক পুরাণের বীর হেরাক্লিসকে কেন্দ্র করে লেখা কবিতার একটি আধুনিক পুনর্নির্মাণ এই বই। তবে নিছক পুরাণের পুনর্কথন নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমকামী এক তরুণের বেড়ে ওঠা, প্রেম আর আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানের কাহিনি। পুরাণের চরিত্র ও সমকালীন মানুষের জীবনকে পাশাপাশি রেখে কার্সন যে স্বতন্ত্র সাহিত্যভাষা তৈরি করেছেন, এই বই তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তাঁর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মধ্যে রয়েছে ১৯৯২ সালের ‘গ্লাস, আইরনি, অ্যান্ড গড’, ১৯৯৫-এর ‘প্লেনওয়াটার: এসেজ অ্যান্ড পোয়েট্রি’ এবং ২০০১ সালে প্রকাশিত ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’। কবিতার প্রচলিত সীমানার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে কার্সন বার বার গদ্য, কবিতা, নাটক এবং প্রাচীন সাহিত্যচর্চাকে একই সৃষ্টির পরিসরে নিয়ে এসেছেন। ২০১৯ সালের ‘নর্মা জিন বেকার অব ট্রয়’ তাঁর সেই পরীক্ষামূলক সাহিত্যভাবনার আরও একটি দৃষ্টান্ত। গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিদিসের ‘হেলেন’-এর কাহিনিকে কেন্দ্র করে তৈরি এই রচনায় ট্রয়ের হেলেনের সঙ্গে হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর জীবন ও ভাবমূর্তিকে একসূত্রে বাঁধা হয়েছে। ইতিহাস, পুরাণ এবং আধুনিক জনপ্রিয় সংস্কৃতির এই সংযোগ কার্সনের লেখার স্বাতন্ত্র্যকে আরও স্পষ্ট করে।
১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোয় জন্ম অ্যান কার্সনের। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্য নিয়ে দীর্ঘ দিন পড়াশোনা ও গবেষণা করেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাও করেছেন। কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়কে কেবল কবি, প্রাবন্ধিক বা ধ্রুপদী সাহিত্যবিশারদ —কোনো একটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তাঁর রচনায় কবিতা, গদ্য, নাটক, সাহিত্যসমালোচনা, অনুবাদ, পুরাণ এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্যে অনায়াসে যাতায়াত করেছেন তিনি। অপেরার গীতিনাট্য থেকে সাহিত্য-সমালোচনা, গদ্য-কবিতা থেকে নাট্যরচনা — বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিচয় ছড়িয়ে রয়েছে। কার্সনের সাহিত্যচর্চার ভিত গড়ে উঠেছিল প্রাচীন সাহিত্যকে গভীর ভাবে পাঠের মধ্য দিয়ে। ১৯৮১ সালে ক্লাসিকস বিষয়ে তাঁর ডক্টরাল গবেষণার বিষয় ছিল ‘ওদি এত আমো এরগো সুম’। ল্যাটিন এই বাক্যাংশের শাব্দিক অর্থ, ‘আমি ঘৃণা করি এবং আমি ভালোবাসি, সুতরাং আমি আছি’। ভালোবাসা এবং ঘৃণা — দুটি আপাত-বিপরীত অনুভূতির সহাবস্থানকে ঘিরে এই ভাবনা কারসনের পরবর্তী সাহিত্যেও যেন নানা ভাবে ফিরে এসেছে। আকাঙ্ক্ষা যেমন তাঁর কাছে প্রেমের সঙ্গে জড়িত, তেমনই তার ভিতরে থাকে দূরত্ব, অনুপস্থিতি, দ্বন্দ্ব এবং যন্ত্রণা।
এ দ্বন্দ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক অনুসন্ধানগুলির একটি দেখা যায় তাঁর প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’-এ। প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি নিয়ে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের সূত্র ধরে তিনি যে অনুসন্ধান করেছিলেন, তা পরবর্তী কার্সন-সাহিত্যের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। তাঁর কাছে প্রেম মানেই কেবল প্রিয় মানুষের উপস্থিতি নয়; বরং আকাঙ্ক্ষার মধ্যে অনুপস্থিতির যে ভূমিকা, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রেম, বিচ্ছেদ এবং স্মৃতি তাঁর লেখায় একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে থাকে না। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ কারসনের সবচেয়ে আলোচিত রচনাগুলির একটি। কাব্যোপন্যাসটির কেন্দ্রে রয়েছে গ্রিক পুরাণের চরিত্র গেরিয়ন এবং প্রাচীন কবি স্তেসিকোরাসের একটি খণ্ডিত রচনা। পুরাণের উপাদানকে সরাসরি পুনরাবৃত্তি না করে কারসন তাকে আধুনিক সময়ের প্রেক্ষাপটে নতুন করে নির্মাণ করেছেন। ফলে গেরিয়ন হয়ে উঠেছে এক আধুনিক তরুণ, যার প্রেম, শরীর, একাকিত্ব, যৌন পরিচয় এবং আত্মপরিচয়ের সংকটের মধ্যে দিয়ে গল্প এগিয়েছে। প্রাচীন পুরাণের চরিত্র এখানে সমকালীন এক তরুণের বেড়ে ওঠার গল্পে রূপান্তরিত হয়েছে।
এ রচনার মধ্যেই কার্সনের সাহিত্যিক পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি প্রাচীন সাহিত্যকে আধুনিকতার অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহার করেননি। বরং একটি পুরনো কাহিনির ভিতর দিয়ে বর্তমানের মানুষের অভিজ্ঞতাকে নতুন করে দেখেছেন। ফলে স্তেসিকোরাসের প্রাচীন কাব্য এবং কারসনের আধুনিক রচনা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরস্পরের সঙ্গে কথোপকথনে থাকা দুটি সাহিত্যিক সময়। কার্সনের এই পদ্ধতির সঙ্গে তুলনামূলক সাহিত্যচর্চার সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। একটি প্রাচীন গ্রিক রচনা কী ভাবে আধুনিক কবিতার অর্থ বদলে দিতে পারে, একটি ভাষার বহু শতাব্দী পুরনো কবিতা কী ভাবে অন্য ভাষার সমকালীন পাঠকের কাছে নতুন অর্থ তৈরি করতে পারে — এই প্রশ্নগুলিই তাঁর লেখার কেন্দ্রে রয়েছে। তাই তাঁর সাহিত্যকে কেবল ‘প্রাচীন গ্রিসের পুনর্লিখন’ বললে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি আসলে দেখিয়েছেন, অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সাহিত্যিক দূরত্ব যতই দীর্ঘ হোক, মানুষের অনুভূতির কিছু মৌলিক প্রশ্ন বার বার ফিরে আসে।
এ কারণেই তাঁর কাছে অনুবাদও নিছক এক ভাষার বক্তব্য অন্য ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়। অনুবাদ করতে গিয়ে মূল রচনার ভাঙাচোরা অংশ, নীরবতা, অসম্পূর্ণতা কিংবা অনুপস্থিতিকে কী ভাবে ধরে রাখা যায়, সেই প্রশ্নও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতা নিয়ে তাঁর কাজ এই দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ‘ইফ নট, উইন্টার: ফ্র্যাগমেন্টস অব স্যাফো’-তে কারসন স্যাফোর খণ্ডিত কবিতাগুলিকে আধুনিক পাঠকের সামনে হাজির করেছেন। স্যাফোর কবিতার বহু অংশ আজ আর সম্পূর্ণ অবস্থায় নেই। কোথাও একটি পঙ্ক্তি, কোথাও কয়েকটি শব্দ, কোথাও আবার কেবল একটি বাক্যের অংশ পাওয়া যায়। কার্সন সেই হারিয়ে যাওয়া জায়গাগুলি নিজের কল্পনা দিয়ে পূরণ করে সম্পূর্ণ কবিতা বানানোর চেষ্টা করেননি। বরং খণ্ডিত অবস্থাটিকেই তাঁর অনুবাদের অংশ করে তুলেছেন। অর্থাৎ যে জায়গাগুলি নেই, সেগুলিও যেন পাঠকের কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
এ জায়গাতেই তাঁর অনুবাদ-ভাবনার অভিনবত্ব। তাঁর কাছে অনুবাদ মানে মূল রচনার ছায়া তৈরি করা নয়; অনুবাদ নিজেই একটি সৃষ্টিশীল কাজ হয়ে উঠতে পারে। মূলের সঙ্গে সংলাপ করতে করতে অনুবাদক একটি নতুন সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারেন। ফলে অনুবাদ এবং মৌলিক সৃষ্টির মধ্যে যে কঠোর বিভাজন প্রচলিত, কারসনের সাহিত্য তা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। তাঁর অন্য উল্লেখযোগ্য বই ‘গ্লাস, আইরনি, অ্যান্ড গড’, ‘প্লেনওয়াটার: এসেজ অ্যান্ড পোয়েট্রি’ এবং ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’। বিশেষ করে ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’-এ কবিতা, ইতিহাস, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রাচীন সাহিত্য এবং আধুনিক জীবনের নানা স্তর পরস্পরের সঙ্গে মিশেছে। এই বইয়ের জন্য ২০০১ সালে তিনি গ্রিফিন কবিতা পুরস্কারও পান। কার্সনের সাহিত্যিক পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজ়ব্যান্ড’-এর মতো রচনায়। বইটির উপশিরোনামই তার স্বাতন্ত্র্যের ইঙ্গিত দেয়—‘একটি কাল্পনিক প্রবন্ধ, ২৯টি ট্যাঙ্গো’। প্রেম, বিবাহ, বিচ্ছেদ এবং সম্পর্কের জটিলতাকে কবিতা, গদ্য ও নৃত্যের ছন্দের মতো একাধিক সাহিত্যিক রীতির সাহায্যে নির্মাণ করেছেন তিনি। ফলে বইটি একই সঙ্গে কবিতা, প্রবন্ধ এবং আত্মস্বীকারোক্তির মতো পাঠ করা যায়।
কার্সনের কাজের মধ্যে এই আন্তঃসাংস্কৃতিক ও আন্তঃকালিক সংলাপ আরও নানা ভাবে ফিরে এসেছে। ‘ইকনমি অব দ্য আনলস্ট’-এ তিনি প্রাচীন গ্রিক কবি সিমোনিদিসের সঙ্গে আধুনিক কবি পল সেলানের রচনাকে পাশাপাশি পাঠ করেছেন। প্রায় আড়াই হাজার বছরের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তাঁদের কবিতার মধ্যে স্মৃতি, ক্ষতি, অনুপস্থিতি এবং ভাষার ভূমিকা নিয়ে একটি দূরবর্তী সংলাপ খুঁজে পেয়েছেন তিনি। এই পাঠ দেখিয়ে দেয়, তুলনামূলক সাহিত্য কারসনের কাছে শুধু দুটি সাহিত্যকর্মের মিল-অমিল বিচার করার পদ্ধতি নয়। বরং দূরবর্তী সময় ও ভাষার সাহিত্য কী ভাবে পরস্পরকে নতুন ভাবে পড়তে শেখায়, সেটিই তাঁর অনুসন্ধানের বিষয়।
কার্সনের সাহিত্য তাই এক অর্থে সীমানা ভাঙার সাহিত্য। কবিতা এবং গদ্যের সীমা, প্রাচীন ও আধুনিকের সীমা, অনুবাদ এবং মৌলিক সৃষ্টির সীমা, গবেষণা এবং সৃজনশীল লেখার সীমা — কোনোটিকেই তিনি স্থির বলে মানেননি। তাঁর বই পড়তে গিয়ে পাঠককে কখনো গবেষণাগ্রন্থের মতো তথ্যের মুখোমুখি হতে হয়, কখনো কবিতার অস্পষ্ট ইঙ্গিত অনুসরণ করতে হয়, আবার কখনো নাটকের দৃশ্যের মধ্যে ঢুকে পড়তে হয়। তাঁর রচনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল খণ্ডিততা। সম্পূর্ণতার বদলে অসম্পূর্ণতা, সরাসরি বক্তব্যের বদলে ইঙ্গিত, সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তের বদলে প্রশ্ন—এই প্রবণতা তাঁর বহু লেখায় দেখা যায়। স্যাফোর হারিয়ে যাওয়া পঙ্ক্তি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত স্মৃতির টুকরো — কার্সনের কাছে অনুপস্থিতিও একটি সক্রিয় সাহিত্যিক উপাদান। যা বলা হয়নি, যা হারিয়ে গিয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভাবে উদ্ধার করা সম্ভব নয়—তারও একটি নিজস্ব ভাষা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল সেই সেতুরই স্বীকৃতি। কবিতা ও গদ্যের প্রচলিত বিভাজন অতিক্রম করে তাঁর এই স্বতন্ত্র সৃষ্টিশীলতার স্বীকৃতিই এ বার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে মিলল।
❤ Support Us








