- ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
টরন্টোয় সেরার শিরোপা, অস্কারের পথে নাগাল্যান্ডের ‘অঙ্গ’
নাগাল্যান্ডের প্রত্যন্ত জনপদের গল্প আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের মঞ্চে সারা ফেলে দিল। টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ২০২৬ সালের ‘প্ল্যাটফর্ম পুরস্কার’ জিতে নিয়েছে নাগা পরিচালক থেজা রিও-র প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘অঙ্গ’। এই পুরস্কারের হাত ধরেই ২০২৭ সালের অস্কারের আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের পথ খুলে গেল ছবিটির সামনে। নাগাল্যান্ডের মাটি, মানুষ এবং সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে তৈরি এই ছবি টরন্টোর প্ল্যাটফর্ম বিভাগে ছিল একমাত্র ভারতীয় ছবি। ১২টি ছবির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে শেষ পর্যন্ত সম্মান ছিনিয়ে নিল ‘অঙ্গ’।
পুরস্কার মঞ্চে রিও-র কথায় উঠে এসেছে নিজের শিকড়ের প্রতি গভীর টান। তিনি বলেন, প্রথম ছবি হিসাবে এমন স্বীকৃতি পাওয়া যে বিরল, তা তিনি জানেন। তিনি ‘অঙ্গ’ তৈরি করেছে নিজের মাটি, মানুষ আর সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে। ‘অঙ্গ’-এর সাফল্যের তাৎপর্য শুধু একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছর থেকে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের নির্দিষ্ট পুরস্কার অস্কারের আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে সরাসরি যোগ্যতার পথ তৈরি করছে। টরন্টোর প্ল্যাটফর্ম পুরস্কার সে তালিকায় রয়েছে। ফলে প্রচলিত ভাবে কোনো দেশের সরকারি মনোনয়ন পাওয়ার উপর ছবিটির অস্কার-যাত্রা নির্ভর করছে না। ভারতের সরকারি ভাবে নির্বাচিত মারাঠি ছবি ‘গোঁধল’-এর পাশাপাশি ‘অঙ্গ’-ও ২৭ সালের অস্কারের আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগের দৌড়ে থাকতে পারবে। এর আগে অবশ্য ভারতের অস্কার-মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় নাগাল্যান্ডের ছবিটি জায়গা পায়নি। ফিল্ম ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া সরকারি এন্ট্রি হিসাবে ‘গোঁধল’-কেই বেছে নেয়। তার পরেই টরন্টো থেকে এল এই স্বীকৃতি।
‘অঙ্গ’-র গল্পের সময় ষাটের দশকের গোড়ার দিক। মায়ানমার সীমান্তের কাছে নাগাল্যান্ডের এক প্রত্যন্ত গ্রাম। এক সময়ের ব্যস্ত সে গ্রাম তখন প্রায় জনশূন্য। সেখানে পড়ে রয়েছেন গ্রামের শেষ জীবিত প্রধান ‘অঙ্গবা’। সঙ্গে অসুস্থ স্ত্রী আর মূক ছেলে। এমন সময় গ্রামে হাজির হন এক আমেরিকান মিশনারি। তাঁর হাত ধরে আসে নতুন ধর্মবিশ্বাস, নতুন সামাজিক রীতিনীতি আর এক ভিন্ন জীবনযাপনের ধারণা। আর সেখান থেকেই শুরু হয় বদল। বাবা অঙ্গবা আঁকড়ে থাকতে চান পূর্বপুরুষের বিশ্বাস, রীতি ও সংস্কৃতিকে। অন্যদিকে তাঁর ছেলে ক্রমশ আকৃষ্ট হয়ে পড়ে মিশনারির দেখানো নতুন জীবনের স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে। দুই প্রজন্মের এই টানাপড়েনই হয়ে ওঠে ছবির মূল সংঘাত। তবে শুধুই ধর্মীয় পরিবর্তনের গল্পই এখানে মূল বক্তব্য নয়। পরিচালক রিও জানিয়েছেন, ছবির কেন্দ্রে রয়েছে বাবা-ছেলের সম্পর্কের নানান দিক। তার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে ঘর ছেড়ে যাওয়ার বেদনা, নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক এবং জীবনের ক্ষণস্থায়ী হয়ে যাওয়ার অনুভূতি। রয়েছে সামাজিক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর সংস্কৃতির টানাপোড়েন। আর ঠিক সে কারণে নাগাল্যান্ডের নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে তৈরি হলেও ছবির আবেগ সর্বজনীন হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন পরিচালক।
তবে ‘অঙ্গ’-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছবির ভাষা। ছবির প্রায় পুরোটাই নাগাল্যান্ডের কন্যাক ভাষায়। পেশাদার অভিনেতার বদলে স্থানীয় সাধারণ মানুষদের নিয়েই কাজ করেছেন রিও। তাঁর বক্তব্য, নাগা সমাজ যে পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গত এক শতক ধরে এগিয়েছে, ছবির গল্পের বহু স্তর সেখান থেকেই এসেছে। আজও নাগাল্যান্ডের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মধ্যে টানাপড়েন রয়েছে। সে বাস্তবতাকেই পর্দায় ধরতে চেয়েছেন তিনি। আর সেখানেই উঠে আসে হারিয়ে যেতে বসা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসঙ্গ। মূলধারার ভারতীয় সিনেমায় নাগা সমাজের জীবন, বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় খুব বেশি জায়গা পায়নি। ‘অঙ্গ’ সেই অনুপস্থিত জায়গাতেই নিজের গল্প বলেছে।
‘অঙ্গ’-এর শুরু অবশ্য আরও কয়েক বছর আগে। ২০১৮ সালে গল্পটি প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির জন্য লিখেছিলেন রিও। ২০১৯ সালে সেটি পরিচালনাও করেন। ২০২১ সালে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়ে একাধিক পুরস্কার পায় ছবিটি। সে সাফল্যই তাঁকে গল্পটিকে বড়ো পর্দায় নিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়। রিও-র মতে এ তাঁর কাছে কাজটি করা কিছুটা সহজও হয়েছিল। কারণ চরিত্র, পরিবেশ এবং দ্বন্দ্ব — সবটাই তাঁর পরিচিত। পূর্ণদৈর্ঘ্যের পরিসর তাঁকে গল্পের আরও গভীরে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে। নাগাল্যান্ডে বেড়ে ওঠা রিও-র সৃজনশীল যাত্রার শুরু গান, র্যাপ, ছোটো গল্প ও চিত্রনাট্য লেখা দিয়ে। পরে বুঝতে পারেন, তাঁর লেখা গল্পগুলিই এক দিন সিনেমার ভাষা পেতে পারে।
ফিল্ম স্কুলে যাওয়ার ব্যাপারে প্রথম দিকে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না রিও। কোয়েন্টিন ট্যারান্টিনোর ফিল্ম স্কুল-বিরোধী মন্তব্যও তাঁর মনে প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু অতিমারির সময় সব কিছু থমকে যাওয়ার পর ২০২২ সালে পরিবেশ বদলের জন্য যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন স্কুলে ভর্তি হন তিনি। পরে সে সিদ্ধান্তকেই জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়েছে তাঁর। কারণ সেখানকার সহপাঠীদের অনেকেই এখন তাঁর ছবির সহযোগী। ‘অঙ্গ’-এর দৃশ্যগ্রহণেও রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। ছবিটি ১৬ মিলিমিটার ফিল্মে শ্যুট করা হয়েছে। চিত্রগ্রহণ করেছেন অ্যাডাম পিয়েতকেভিচ। ছবিতে তাঁর কাজের জন্য তিনিও টরন্টো উৎসবের ‘ভ্যারাইটি আর্টিজান’ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। রিও-র ব্যাখ্যা, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে নাগা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে তোলা পুরনো নথিভুক্ত ছবির মতো আবহ তৈরি করতেই এই মাধ্যম বেছে নেওয়া। ফিল্মের দানাদার গঠন, ছবির টেক্সচার এবং পুরনো নথির মতো দৃশ্যমান অনুভূতি দর্শককে যেন একই সঙ্গে পরিচিত অথচ দূরের এক জগতে নিয়ে যায়। এ ছবির কাজে চিত্রগ্রাহকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের কথাও জানিয়েছেন পরিচালক। প্রতিটি শট কোথা থেকে শুরু হবে, কোথায় শেষ হবে—প্রাক্-প্রযোজনার সময়েই তার বিস্তারিত পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
পাবলো ত্রাপেরোর নেতৃত্বাধীন প্ল্যাটফর্ম বিভাগের বিচারকমণ্ডলী ‘অঙ্গ’-র দৃশ্যগ্রহণের প্রশংসায় জানিয়েছে, ছবিটির সতেজ দৃষ্টিভঙ্গি, নির্মাণের শক্তি, একটি জগতের গভীর অনুরণিত প্রতিচ্ছবি–র জন্যই এই বিশেষ পুরস্কার। একই সঙ্গে পরিচালক থেজা রিও-র দৃষ্টিভঙ্গি, সাহস আর নির্ভীকতারও প্রশংসা করেছেন তাঁরা। রিও-র কাছে এ স্বীকৃতির আরও একটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। নাগাল্যান্ডের বাইরে, দেশের বাইরেও ‘অঙ্গ’ দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেছে। যে গল্পের শিকড় একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী ও অঞ্চলে, তার আবেগ যে সীমান্ত পেরিয়ে অন্য মানুষের কাছেও পৌঁছতে পারে, টরন্টোর পুরস্কার তারই প্রমাণ। ‘অঙ্গ’-র সাফল্যের পরেও নাগাল্যান্ড ছাড়ছেন না রিও। তাঁর পরবর্তী ছবির শুটিংও হচ্ছে ১৬ মিলিমিটার ফিল্মে, পটভূমিও নাগাল্যান্ড। এবার গল্প কৈশোরে পা রাখার সময়ের এক তরুণকে ঘিরে। সেখানেও স্থানীয় তরুণ অ-পেশাদার অভিনেতাদের নিয়েই কাজ করছেন তিনি।
❤ Support Us








