- দে । শ
- অক্টোবর ১০, ২০২৬
বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বিপন্ন মানসিক স্বাস্থ্য
১০ অক্টোবর। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। দিনটি ঘিরে প্রতি বছরই মানসিক সুস্থতা নিয়ে সচেতনতার বার্তা ছড়ায়। অবসাদ কাটাতে ইতিবাচক চিন্তা, উদ্বেগ সামলাতে ধ্যান, মানসিক বিপর্যয়ে পেশাদার সাহায্য নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়। কিন্তু ভারতের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, ব্যক্তিকে মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিলেই কি সমস্যার সমাধান সম্ভব ? যে সমাজে শিক্ষিত তরুণের কাছে চাকরি অধরা, কর্মরত মানুষের কাছে মাসের শেষে সংসার চালানো কঠিন, পড়ুয়ার কাছে পরীক্ষায় ব্যর্থতা কার্যত ভবিষ্যৎ হারানোর শামিল এবং মহিলার কাছে ঘর ও বাইরের দায়িত্ব সামলানো প্রায় প্রতিদিনের লড়াই, সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যকে কি শুধুই ব্যক্তিগত সমস্যা বলে দেখা যায়?
কোভিড-১৯ অতিমারি এ প্রশ্নগুলিকে আরও তীব্র করে তুলেছিল। লকডাউন উঠে গিয়েছে, স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে জনজীবন। কিন্তু নতুন করে অজানা সংক্রমণের ভয়, প্রিয়জনকে হারানোর শোক, কাজ হারানোর অনিশ্চয়তা, আর্থিক ক্ষতি আর দীর্ঘদিনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অভিঘাত অনেকের জীবন থেকে মুছে যায়নি। তার উপর রয়েছে বেকারত্ব, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, কম মজুরি, শিক্ষাক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক বৈষম্য এবং লিঙ্গভিত্তিক হিংসা। ফলে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা এখন আর শুধু চিকিৎসা বা ব্যক্তিগত সহনশীলতার প্রশ্নে আটকে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, কোভিড-১৯ অতিমারির প্রথম বছরেই বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ও অবসাদের প্রকোপ প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সংক্রমণের ভয়, কর্মক্ষেত্র থেকে ছাঁটাই, ব্যবসা-চাষবাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, আর্থিক অনিশ্চয়তা, প্রিয়জনকে হারানোর শোক এবং মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবায় বিঘ্নকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল সংস্থাটি। মহিলা ও তরুণদের উপর এর প্রভাব ছিল বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। ভারতে অতিমারির অভিঘাত এসে পড়েছিল বহুস্তরে। বহু পরিবারের স্বাস্থ্য পরিষেবা, নির্ভরযোগ্য আয় আর শিক্ষার সুযোগ আগে থেকেই সীমিত। কাজ হারিয়েছেন বহু শ্রমিক, কমেছে আয়, ভিন্রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের একাংশকে ঘরে ফিরতে হয়েছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে। অসুস্থ পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনা করতে গিয়ে বহু মানুষকে একই সঙ্গে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক চাপ সামলাতে হয়েছে।
অতিমারির পরে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও সেই অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। কারও পড়াশোনায় ছেদ পড়েছে, কারও সঞ্চয় শেষ হয়েছে, কেউ আবার পারি দিয়েছেন ভিন রাজ্যে, ভিন দেশে, কেউ ঋণের বোঝায় জর্জরিত, আবার কারও জীবনে তৈরি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ। ফলে সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠা মানেই মানসিক ভাবে সুস্থ হয়ে যে ওঠা যে নয়, এ কথা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। কোভিড পরবর্তী সময়ে কিছু গবেষণায় সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠা মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি, উদ্বেগ আর অবসাদের মতো উপসর্গের কথা উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ইনডেক্স’-এ ১৪৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ছিল ১১৮তম। জীবন সম্পর্কে মানুষের নিজস্ব মূল্যায়নের ভিত্তিতে তৈরি সে প্রতিবেদনে ভারতের স্কোর ছিল ১০-এর মধ্যে ৪.৩৮৯।
ভারতের এ অবস্থান বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে। একদিকে অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। আয় কমছে দেশের বিপুল সংখ্যার। অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে সচ্ছল ব্যাক্তিদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা ভিন্ন। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, প্রযুক্তির প্রসার কিংবা ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার বাড়লেই কি মানুষের জীবন নিরাপদ ও স্বস্তির হয়? পরিবারের আয় বাড়লেও বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও শিক্ষার ব্যয় মেটাতে গিয়ে চিন্তা আর উদ্বেগে বিপন্ন হতে পারে মানসিক স্বাস্থ্য। চাকরি থাকা সত্ত্বেও ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান থাকবে কি না, বেতন বাড়বে কি না কিংবা সঞ্চয় করা সম্ভব হবে কি না — এ প্রশ্নগুলি অনেকের জীবনেই উদ্বেগের কারণ। সুখের কোনো একক মাপকাঠি নেই। সামাজিক সম্পর্ক, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার স্বাধীনতা, শারীরিক নিরাপত্তা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থাও মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণ করে। ফলে উন্নয়নের সাফল্য বিচার করতে হলে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা কতটা বদলেছে, তা-ও দেখা প্রয়োজন।
ভারতের তরুণদের কাছে শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক উন্নতির অন্যতম প্রধান সিঁড়ি। পরিবারের সঞ্চয়, অভিভাবকদের ত্যাগ আর নিজের বহু বছরের পরিশ্রমের বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করেন অনেকে। তার পরেও উপযুক্ত চাকরি না পেলে সে পরিশ্রমের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। একের পর এক পরীক্ষা, সীমিত শূন্যপদ, নিয়োগে বিলম্ব কিংবা পরীক্ষা বাতিলের অনিশ্চয়তা বহু চাকরিপ্রার্থীর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও ‘ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট ২০২৪’-তে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। অন্যদিকে, পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সালে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১০.২ শতাংশ। এই হার নির্দিষ্ট সমীক্ষা-পদ্ধতির ভিত্তিতে নির্ধারিত। তাই একে সব ধরনের বেকারত্ব, কর্মহীনতা কিংবা যোগ্যতার তুলনায় কম মানের কাজে নিযুক্ত থাকার সম্পূর্ণ ছবি হিসেবে দেখা যাবে না।
সমস্যা শুধু কাজ না পাওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ না পাওয়া, যোগ্যতার তুলনায় কম পারিশ্রমিকের চাকরি গ্রহণ করা কিংবা দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও উপযুক্ত সুযোগ না পেয়ে চাকরির খোঁজ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বহু তরুণের জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বছর কেটে যায়। অথচ সে সময়ে নিজের আয় না থাকায় তাঁদের পরিবারের উপর নির্ভর করতে হয়। সামাজিক প্রত্যাশা ও বেকারত্বের সঙ্গে যুক্ত লজ্জাবোধ অনেক সময় তাঁদের মানসিক যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করতেও বাধা দেয়। বারবার ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়ে কেউ কেউ নিজের যোগ্যতা নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়েন। অথচ কর্মসংস্থানের সংকটকে শুধু ব্যক্তিগত অযোগ্যতার ফল হিসেবে দেখা যায় না। উপযুক্ত কাজের অভাব, নিয়োগপ্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা এবং কর্মসংস্থানের গুণগত সমস্যাও এর সঙ্গে যুক্ত। তাই তরুণদের আরও দক্ষ হওয়ার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বচ্ছ নিয়োগ, ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায় রয়েছে রাষ্ট্রের। কারণ, কাজের সুযোগ তৈরি না করে শুধু প্রতিযোগিতায় আরও ভালো করার পরামর্শ দিলে অনিশ্চয়তার মূল কারণটি থেকেই যায়।
তবে, বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেলেই যে মানসিক চাপের অবসান হয়, তা নয়। কম বেতন, অস্থায়ী চাকরি, অতিরিক্ত কাজের চাপ, অনিয়মিত কর্মঘণ্টা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অপমানজনক আচরণ কর্মক্ষেত্রকে অনেকের কাছে উদ্বেগের জায়গা করে তুলেছে। বিশেষত অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের ক্ষেত্রে চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার অভাব পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ভারত-সংক্রান্ত একটি প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬ কোটি ২০ লক্ষ শ্রমিক ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম উপার্জন করেন; তাঁদের অধিকাংশই মহিলা। এ হিসাবের প্রেক্ষিতে ন্যূনতম মজুরি ও জীবনধারণের উপযোগী মজুরির মধ্যে পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি থাকলেই যে একটি পরিবারের সমস্ত প্রয়োজন মিটবে, তা নয়। জীবনধারণের উপযোগী মজুরির ধারণায় পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটানোর সামর্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপের আর একটি দিক হলো, সমস্যার কথা বলার সুযোগ না থাকা। অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে অভিযোগ করলে কর্মীকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলা হতে পারে। ছুটি চাইলে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। উদ্বেগ বা অবসাদের কথা জানালে চাকরির উপযুক্ততা নিয়েই সংশয় প্রকাশ করতে পারেন কর্তৃপক্ষ। কর্মক্ষেত্রের মনোসামাজিক পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে কাজের চাপ, কর্মঘণ্টা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা এবং পরিচালন পদ্ধতির সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্কের কথা তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, কর্মীদের মানসিক সুস্থতার জন্য শুধু কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করলেই চলবে না; কাজের পরিবেশও বদলাতে হবে। কর্মী-ঘাটতি রেখে অতিরিক্ত কাজ চাপানো, ছুটি নিতে নিরুৎসাহিত করা কিংবা কর্মীদের সমস্যার কথা শোনার ব্যবস্থা না রেখে মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রচার চালানো — এসবের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে। প্রয়োজন বাস্তবসম্মত কাজের চাপ, যুক্তিসংগত কর্মঘণ্টা, ন্যায্য বেতন, হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং গোপনীয়তা বজায় রেখে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা। কর্মক্ষেত্রে সুস্থ থাকার অধিকারকে নিয়োগকর্তার দয়ার উপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
শিক্ষা সামাজিক উন্নতির পথ খুলে দেয়। কিন্তু সাফল্যের সংজ্ঞা যখন নম্বর, মেধাতালিকা এবং প্রবেশিকা পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন পড়াশোনা অনেকের কাছে শেখার আনন্দের বদলে চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। চিকিৎসাবিদ্যা, ইঞ্জিনিয়ারিং, অসামরিক প্রশাসন কিংবা সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বহু পড়ুয়া মনে করেন, একটি পরীক্ষার ফলাফলই তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। পরিবারের আর্থিক ত্যাগ, আত্মীয়স্বজনের প্রত্যাশা আর সামাজিক তুলনা এ চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ব্যর্থতার কথা স্বীকার করতে না পেরে অনেকে সমস্যার কথা গোপন রাখেন। জাতীয় অপরাধ নথি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে দেশে পড়ুয়াদের আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ৮,৪২৩। ২০২৩ সালে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩,৮৯২-তে। এক দশকে বৃদ্ধি প্রায় ৬৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে নথিভুক্ত মোট আত্মহত্যার প্রায় ৮.১ শতাংশের ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি ছিলেন পড়ুয়া।
এ পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। তবে আত্মহত্যার জন্য শুধু পরীক্ষার চাপকেই দায়ী করা যায় না। পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক সংকট, মানসিক অসুস্থতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, হিংসা এবং আরও নানা কারণ এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। তবু এই তথ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, পড়ুয়াদের উপর প্রত্যাশার চাপ আর মানসিক সহায়তার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ দেয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর, গোপনীয়তা বজায় রেখে সাহায্য চাওয়ার ব্যবস্থা, বুলিং-বিরোধী নীতি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার সুযোগ থাকা দরকার। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রয়োজন। শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষকে চিন্তা করতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং নিজের জীবন গড়ে তুলতে সাহায্য করা। সে শিক্ষা যদি ব্যর্থতার ভয়কে আরও গভীর করে তোলে, তবে মূল্যায়নের পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
ভারতের মতো দেশে রাজনীতি ও মানসিক স্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখা যায় না। নাগরিক অধিকার, সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর আস্থা, জনপরিসরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সামাজিক সম্পর্কের পরিবেশ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। গণতন্ত্রে মতপার্থক্য স্বাভাবিক। কিন্তু সরকারের সমালোচনা, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কিংবা রাজনৈতিক বিতর্কে ব্যক্তিগত, সম্প্রদায়গত, পারিবারিক, কুরুচিকর আক্রমণ, কখনো শারীরিক কখনো বা মানসিক হেনস্তা মত প্রকাশের অধিকারের উপর প্রবল আঘাত হানে। নাগরিক জীবনে অংশ নেওয়া দেখে ক্রমেই দূরত্ব বজায় রাখেন বহু মানুষ। ঘিরে ধরে একাকীত্ব। ফলে, নাগরিকেরা নিরাপদে মত প্রকাশ করতে পারছেন কি না, সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য পাচ্ছেন কি না এবং তাঁদের অভিযোগ ন্যায্য প্রক্রিয়ায় শোনা হচ্ছে কি না, এ বিষয়গুলি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ভাবা জরুরি। স্বাধীন সাংবাদিকতা, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ আর গণতান্ত্রিক আলোচনার পরিসর রক্ষা করাও জনআস্থা বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।সুস্থ সমাজে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু মতের অমিল যেন ভয়, ঘৃণা কিংবা নাগরিক নিরাপত্তাহীনতার কারণ না হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই।
সামাজিক পরিকাঠামোয় সবচেয়ে বেশি, ভিন্ন ভিন্ন স্তরে মানসিক ও শারীরিক আক্রমণের শিকার হন মহিলারা। কর্মক্ষেত্র ও অবৈতনিক গৃহশ্রমের বোঝা তাদের মনের অন্দরমহলের জানালা বন্ধ করে দেয় অচিরেই। সময়-ব্যবহার সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ মহিলা পরিবারের সদস্যদের জন্য অবৈতনিক গৃহস্থালির কাজে অংশ নেন, এ কাজে তাঁদের দৈনিক সময় ব্যয় গড়ে পাঁচ ঘণ্টা। পুরুষদের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের হার প্রায় ২০ শতাংশ এবং দৈনিক সময় ব্যয় মাত্র দেড় ঘণ্টা। এ বৈষম্য শুধু সময়ের হিসাব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত বিশ্রাম, বিনোদন, পেশাগত উন্নতি এবং আর্থিক স্বাধীনতার সুযোগ। কম বেতনের চাকরিতে যুক্ত মহিলাকে এক দিকে কর্মক্ষেত্রের চাপ, অন্যদিকে বাড়ির দায়িত্ব সামলাতে হয়। আবার বেতনের কাজের বাইরে থাকা মহিলাদের ক্ষেত্রেও আর্থিক নির্ভরতা ও সামাজিক বিধিনিষেধ মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পারিবারিক হিংসা, যৌন হয়রানি, চলাফেরার স্বাধীনতায় বাধা আর সামাজিক দোষারোপের ভয়। নির্যাতনের কথা জানালে বিশ্বাস করা হবে কি না, পরিবার পাশে থাকবে কি না কিংবা আর্থিকভাবে অসহায় হয়ে পড়তে হবে কি না — এ আশঙ্কা অনেককে সাহায্য চাইতে বাধা দেয়। এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় মহিলাদের জন্য সহজলভ্য ও গোপনীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা, নিরাপদ যাতায়াত, সাশ্রয়ী শিশুযত্ন, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ আর হিংসার অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তি জরুরি। একই সঙ্গে গৃহস্থালির দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টনেও পুরুষদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। পরিচর্যার কাজকে শুধু মহিলাদের স্বাভাবিক দায়িত্ব বলে ধরে নিলে সমস্যার মূল জায়গাটিই অক্ষত থেকে যায়।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনায় সকলের অভিজ্ঞতাকে এক করে দেখার প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু সামাজিক অবস্থান, জাতপাত, ধর্মীয় পরিচয়, আর্থিক সামর্থ্য আর ভৌগোলিক অবস্থান মানুষের মানসিক সুস্থতা ও চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ভারতের ১০,১২৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে স্বপ্রতিবেদিত অবসাদ ও উদ্বেগের পার্থক্য খতিয়ে দেখা হয়েছিল। গবেষণায় তফসিলি জাতিভুক্ত ও সংখ্যালঘু উত্তরদাতাদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘উচ্চবর্ণ’-এর উত্তরদাতাদের তুলনায় তুলনামূলকভাবে খারাপ মানসিক স্বাস্থ্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জাতিগত, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অপমান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা মানুষের আত্মমর্যাদা ও নিরাপত্তাবোধকে প্রভাবিত করে। আনুষ্ঠানিক ভাবে সমান অধিকার থাকলেও দৈনন্দিন জীবনে সমান আচরণ না পাওয়ার অভিজ্ঞতা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। তাই মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার পাশাপাশি বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। সামাজিক বিদ্বেষ, নিরাপত্তার আশঙ্কা কিংবা বৈষম্যমূলক আচরণ কারও শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বাসস্থান, যাতায়াতের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। মূলনিবাসি ও তফসিলি জনজাতির মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি’-তে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ১৯৮০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রকাশিত ৩২টি গবেষণা পরীক্ষা করে দেখা হয়েছিল। সেখানে গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ নিয়ে তথ্যের অভাবের কথা উঠে আসে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অভাব, যাতায়াতের সমস্যা, দারিদ্র্য এবং বাস্তুচ্যুতি চিকিৎসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জমি ও জীবিকা হারানোর ফলে শুধু যে আর্থিক সমস্যা তৈরি হয়, তাই নয়, সামাজিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে মূলবাসী সম্প্রদায়কে সহজাতভাবে দুর্বল হিসেবে দেখা কিংবা তাঁদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে অসুস্থতার লক্ষণ বলে ধরে নেওয়া অনুচিত। প্রয়োজন স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীল, সহজলভ্য ও সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে তৈরি স্বাস্থ্য পরিষেবা।
২০২৩ সালের মে মাসে মণিপুরে মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে শুরু হওয়া হিংসা দেখিয়ে দিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কী ভাবে মানুষের মানসিক সুস্থতাকে বিপন্ন করতে পারে। বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে, পরিবারগুলি বাস্তুচ্যুত হয়েছে, বহু মানুষের জীবিকা ব্যাহত হয়েছে। সংঘর্ষের তীব্রতা কমলেও নিরাপদে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা না থাকলে মানুষের জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরে আসে না। ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষেও মণিপুরে অন্তত ৭৮ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫২ হাজার মানুষ ত্রাণশিবিরে এবং প্রায় ২৬ হাজার মানুষ আশ্রয়দাতা পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছিলেন। প্রতিবেদনে চলাচল ও পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা ও বহু পরিবারের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের অনিশ্চয়তার কথাও বলা হয়েছে।
বাস্তুচ্যুতির অর্থ কেবল বাড়ি হারানো নয়। পরিচিত পরিবেশ, প্রতিবেশী, জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থাও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়, পরিবারের সদস্যেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য পরিষেবা ও নিরাপদ চলাচলের সুযোগ আরও সীমিত হতে পারে। ইম্ফল পূর্ব জেলার ত্রাণশিবিরে বসবাসকারী বাস্তুচ্যুত মানুষদের উপর পরিচালিত একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ৬৫.৮ শতাংশের মধ্যে পিটিএসডি শনাক্তকরণের পরীক্ষায় নির্ধারিত সীমা পূরণ করার মতো উপসর্গ পাওয়া গিয়েছিল। ২৪.৮ শতাংশ মাঝারি এবং ১৫.২ শতাংশ তীব্র উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন। প্রায় ৭৫.৮ শতাংশ বাড়িঘর ধ্বংস বা পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ৯.৪ শতাংশ পরিবারের সদস্য কিংবা বন্ধুর মৃত্যুর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এ ফলাফল নির্দিষ্ট একটি ত্রাণশিবিরভিত্তিক নমুনার উপর নির্ভরশীল। তাই গোটা মণিপুরের জনসংখ্যার ক্ষেত্রে এই হার প্রয়োগ করা যাবে না। তবে সংঘাতের মধ্যে দিয়ে যাওয়া বাস্তুচ্যুত মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে এ গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়।
মানসিক সমস্যার কথা বুঝতে পারলেও অনেকের পক্ষে চিকিৎসা পাওয়া কঠিন। গ্রামাঞ্চলে বিশেষজ্ঞের অভাব, শহরে বেসরকারি চিকিৎসার উচ্চ খরচ, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সামাজিক কলঙ্কের ভয় — সব মিলিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার নাগাল অনেকের কাছেই সীমিত। আর্থিক ভাবে দুর্বল মানুষের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল। তাদের পক্ষে নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের খরচ বহন করা কঠিন। সরকার জেলা মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি-সহ বিভিন্ন পরিষেবা চালু করেছে। কিন্তু কর্মসূচির অস্তিত্ব আর মানুষের কাছে তার বাস্তব পৌঁছনো এক বিষয় নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সম্প্রদায়ভিত্তিক পরিষেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে আরও ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন। প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা চিহ্নিত করা, প্রয়োজনমতো বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো এবং ধারাবাহিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সচেতনতার প্রচার অবশ্যই দরকার। কিন্তু কোথায় সাহায্য পাওয়া যাবে, তা জানার পরেও যদি চিকিৎসা নাগালের বাইরে থাকে, তবে সে সচেতনতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে সামাজিক মাধ্যমে বার্তা দেওয়া কিংবা কর্মক্ষেত্রে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজনের গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। বিশেষ করে ভারতবর্ষের মতো দেশে। যেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ দরিদ্র সীমার নীচে বাস করেন। মানসিক স্বাস্থ্যকে বাস্তবে অগ্রাধিকার দিতে হলে সরকার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় মানসিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়ানো, গ্রামাঞ্চলে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নিয়োগ, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি প্রতিরোধ, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং মহিলাদের উপর অবৈতনিক শ্রমের বোঝা কমানো — সবই সেই বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। একই সঙ্গে জাতপাত ও ধর্মীয় বৈষম্য প্রতিরোধ, বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত গবেষণাও জরুরি।
এ ক্ষেত্রে সাফল্য মাপার মাপকাঠিও বদলাতে হবে। কতগুলি সচেতনতামূলক কর্মসূচি হলো, কতজনকে পরামর্শ দেওয়া হল, কিংবা কত দ্রুত কর্মীরা কাজে ফিরলেন — শুধু এই হিসাব যথেষ্ট নয়। মানুষ প্রয়োজনের সময়ে চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করছেন কি না, পড়ুয়ারা ব্যর্থতার ভয় ছাড়াই সাহায্য চাইতে পারছেন কি না এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বৈষম্যহীন পরিষেবা পাচ্ছে কি না, তা-ও দেখতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যসংকটের কোনো একক কারণ নেই। ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা, শারীরিক অসুস্থতা, পারিবারিক সম্পর্ক, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা সামাজিক পরিস্থিতি মিলিয়ে তা তৈরি হতে পারে। প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা আলাদা। তাই সব সমস্যার জন্য একই সমাধানও কার্যকর হবে না।
১০ অক্টোবরের তাৎপর্য এখানেই। মানসিক সুস্থতা যেমন চিকিৎসার প্রশ্ন, তেমনই তা সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। ব্যক্তিগত চিকিৎসা, সহায়ক সম্পর্ক এবং নিজের যত্ন নেওয়ার কৌশল গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি প্রয়োজন ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মসংস্থান, শিক্ষার ন্যায্য পরিবেশ, লিঙ্গসমতা, বৈষম্যহীন স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং নাগরিকদের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান। উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি শুধু অর্থনীতির বৃদ্ধি কিংবা প্রতিযোগিতায় সাফল্য নয়। মানুষ বিশ্রামের সময় পাচ্ছেন কি না, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন কি না, প্রয়োজনের সময়ে সাহায্য চাইতে পারছেন কি না এবং জীবনের একটি ধাক্কা তাঁদের ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দেবে না — এই আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক সুস্থতা শুধু ব্যক্তির সহনশীলতার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তার জন্য এমন একটি সমাজ প্রয়োজন, যেখানে মানুষকে প্রতিনিয়ত ভয়, অনিশ্চয়তা, বৈষম্য এবং অবসাদের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় না।
❤ Support Us






