- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ৩০, ২০২৬
বৃষ্টির জেরে পিছল কংগ্রেস জোটের ‘গণ অভিযোগ’ কর্মসূচি, রামলীলা ময়দান থেকে সমাবেশ সরানোর আর্জি ব্যবসায়ী সংগঠনের
রাজধানীর আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা। চলছে একনাগাড়ে বৃষ্টি। আর তার জেরেই পিছিয়ে গেল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার প্রস্তাবিত ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’ বা ‘জনতার আদালতে অভিশংসন’ কর্মসূচি। শুক্রবার বিকেলে এই প্রতীকী অভিশংসন প্রক্রিয়া আয়োজনের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন বিরোধী নেতারা। নতুন সূচি অনুযায়ী, শনিবার, ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে কর্মসূচি। তার ঠিক পরের দিন, ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ও কথিত ভোট চুরির অভিযোগে মহাসমাবেশ করার কথা বিরোধী জোটের। পরপর দু-দিনের এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়তে চলেছে।
নতুন সূচি অনুযায়ী, শনিবার, ৩১ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টেয় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের সরকারি বাসভবনের প্রাঙ্গণেই অনুষ্ঠিত হবে ওই কর্মসূচি। তবে শুধু দিনক্ষণ নয়, আগেই বদলানো হয়েছে কর্মসূচির নাম আর পদ্ধতিও। আইনি জটিলতা এবং সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগ এড়িয়ে এ বার ‘পিপলস ইমপিচমেন্ট’ বা ‘জন মহাভিযোগ’-এর পথে হাঁটতে চাইছে বিরোধী শিবির। তার ঠিক পরের দিন, ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানকে সামনে রেখে মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে ‘ইন্ডিয়া’।
শুক্রবার সকাল থেকেই দিল্লিতে একটানা বৃষ্টি চলছিল। এই পরিস্থিতিতে খোলা জায়গায় দীর্ঘ সময় ধরে কর্মসূচি চালানো সম্ভব নয় বুঝেই তা ২৪ ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১০, রাজাজি মার্গে খড়্গের সরকারি বাসভবনের লনে শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টেয় অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল। শনিবারও একই সময়ে সেখানেই আয়োজন করা হবে বলে বিরোধী জোট সূত্রে খবর। এর আগে সংবিধান ক্লাব এবং তালকাটোরা স্টেডিয়ামের মতো জায়গায় কর্মসূচি আয়োজনের অনুমতি না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছিল কংগ্রেস। শেষ পর্যন্ত খড়্গের সরকারি বাসভবনকেই এই প্রতীকী প্রতিবাদের মঞ্চ হিসাবে বেছে নেওয়া হয়। প্রথমে কর্মসূচিটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’। পরিকল্পনা ছিল, সংসদে অভিশংসন প্রক্রিয়ার আদলে একটি প্রতীকী অধিবেশন বসবে। সেখানে স্পিকার, সরকার পক্ষ, বিরোধী পক্ষের পৃথক ভূমিকা থাকবে। কিন্তু সে পরিকল্পনা ঘিরে আইনি জটিলতা এবং সংসদের মর্যাদা সংক্রান্ত বিতর্ক তৈরি হয়। বিরোধী জোটের বিরুদ্ধে সংসদীয় পদ্ধতি ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অমর্যাদা করার অভিযোগ উঠতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই বৃহস্পতিবার কর্মসূচির নাম এবং পরিচালন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয় বলে কংগ্রেস সূত্রের খবর। ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’-এর পরিবর্তে নাম রাখা হয় ‘পিপলস ইমপিচমেন্ট’ বা ‘জন মহা অভিযোগ’।
শুধু নাম বদল নয়, প্রতীকী অধিবেশনের কাঠামো থেকেও সরে এসেছে বিরোধীরা। নতুন পরিকল্পনায় লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার মীরা কুমারই কেবল স্পিকারের ভূমিকা পালন করবেন। অন্য কোনো নেতা সংসদের কোনো পদাধিকারীর ভূমিকায় থাকবেন না। থাকবে না কোনো প্রতীকী ট্রেজারি বেঞ্চ বা সরকার পক্ষের উপস্থিতিও। অর্থাৎ, সংসদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের অনুকরণে কর্মসূচিটি পরিচালনা করার পরিবর্তে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগ তুলে ধরার জন্য একটি প্রতীকী গণশুনানির আয়োজন করা হচ্ছে। তবে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব উত্থাপনের পরিকল্পনা বহাল রয়েছে। সে প্রস্তাব খড়্গে পেশ করতে পারেন। মীরা কুমার কর্মসূচির সভাপতিত্ব করবেন। আর শেষ বক্তা হিসাবে বক্তব্য রাখবেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।
কর্মসূচিতে কারা কতক্ষণ বক্তব্য রাখবেন, তা নিয়েও বিরোধী শিবিরে আলোচনা হয়েছে। ‘ইন্ডিয়া’ জোট সূত্রের খবর, সংসদে সংশ্লিষ্ট দলগুলির সাংসদ সংখ্যার নিরিখেই বক্তৃতার সময় বরাদ্দ করা হবে। কংগ্রেসের পরে সবচেয়ে বেশি সময় পাবে সমাজবাদী পার্টি। তার পর বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হবে তৃণমূল কংগ্রেসকে। তৃণমূলের তরফে ডেরেক ও’ব্রায়েন, কীর্তি আজাদ, মহুয়া মৈত্র এবং সাগরিকা ঘোষের উপস্থিত থাকার কথা। জোটের অন্য দলগুলির প্রতিনিধিরাও বক্তব্য রাখবেন। সব মিলিয়ে অন্তত ২১টি রাজনৈতিক দলের প্রায় ৩০ জন বক্তা এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন। তাঁদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ায় সমস্যায় পড়া সাধারণ মানুষের বক্তব্যও শোনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার কর্মসূচির চূড়ান্ত রূপরেখা স্থির করতে বৈঠকে বসেছিলেন বিরোধী নেতারা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়ঙ্কা গান্ধী, জয়রাম রমেশ, কে সি বেণুগোপাল, প্রাক্তন লোকসভা স্পিকার মীরা কুমার, তৃণমূলের ডেরেক ও’ব্রায়েন, সমাজবাদী পার্টির হরেন্দ্র মালিক, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার মহুয়া মাঝি এবং সিপিআইএমের জন ব্রিটাস-সহ অন্য নেতারা। ইন্ডিয়া মঞ্চের সাংসদদের কাছে ইতিমধ্যেই আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। ১০, রাজাজি মার্গের ঠিকানায় শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টে থেকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার আবেদন জানানো হয়েছে তাঁদের। কিন্তু মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে এমন প্রতীকী অভিশংসনের আয়োজন কেন? বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’-এর নামে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা। বিরোধী দলগুলির দাবি, এ প্রক্রিয়া পরিচালনায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা পক্ষপাতদুষ্ট। তাই তাঁর পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়েছে ইন্ডিয়া মঞ্চ। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার খর্ব করা হচ্ছে। বিশেষ করে পরিযায়ী শ্রমিক, দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ায় দেশজুড়ে ১৩ কোটি ৩৯ লক্ষ ভোটারকে অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত এবং একাধিকবার নথিভুক্ত — এই চারটি শ্রেণিতে চিহ্নিত করা হয়েছে। কমিশনের পরিভাষায় এই শ্রেণিবিভাগের নাম ‘অ্যাবসেন্ট, শিফটেড, ডেড অ্যান্ড ডুপ্লিকেট’ বা ‘এএসডিডি’। কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে অযোগ্য ও একাধিকবার নথিভুক্ত ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়াই এই সংশোধনের উদ্দেশ্য। কোনো প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়ে থাকলে তিনি পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন জানাতে পারবেন বলেও জানিয়েছে কমিশন। কিন্তু বিরোধীদের বক্তব্য, এত বিপুল সংখ্যক ভোটারকে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়লে তার দায় এড়াতে পারে না নির্বাচন কমিশন।
তুমুল বিতর্কের মধ্যেই সংসদের দুই কক্ষে জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে প্রস্তাব জমা দিয়েছিল বিরোধীরা। গত ১২ মার্চ লোকসভার ১৩০ জন এবং রাজ্যসভার ৬৩ জন সাংসদের স্বাক্ষর-সহ ওই নোটিস জমা পড়ে। কিন্তু ৬ এপ্রিল লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি পি রাধাকৃষ্ণন সেই নোটিস খারিজ করে দেন। সংসদীয় পথে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের উদ্যোগ সফল না হওয়ায় এ বার জনসমক্ষে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিরোধী জোট। গত ১৩ অক্টোবর রাহুল গান্ধীর উদ্যোগে ইন্ডিয়া মঞ্চের নেতাদের একটি বৈঠকে প্রথম এই প্রতীকী কর্মসূচির প্রস্তাব ওঠে বলে জানা গিয়েছে। বিরোধীদের এই প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে নির্বাচন কমিশনের অন্দরমহলে মতপার্থক্যের অভিযোগ। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ১০ মাসে এসআইআর এবং ভোটার তালিকা পরিচালনা সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন। বিরোধীদের দাবি, কমিশনের অন্দরেই যদি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ থেকে থাকে, তা হলে সেই সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যদিও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছে। ফলে কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং কমিশনের পাল্টা দাবি ঘিরে বিতর্ক অব্যাহত।
এ দিকে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে অন্য এক বিতর্ক তৈরি হয়েছে রাজধানীর ব্যবসায়ী মহলে। ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে বিরোধিদের প্রস্তাবিত মহাসমাবেশ স্থগিত রাখার আর্জি জানিয়ে এ বার কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সনিয়া গান্ধীকে চিঠি দিল দিল্লির ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘চেম্বার অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (সিটিআই)। সংগঠনের চেয়ারম্যান ব্রিজেশ গোয়েলের দাবি, দীপাবলির আগে রাজধানীর বাজারগুলিতে ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে ১০ থেকে ১২ লক্ষ মানুষের জমায়েত হলে দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকায় যান চলাচল, পণ্য পরিবহণ ব্যাহত হতে পারে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ব্যবসা-বাণিজ্যে।
সনিয়াকে লেখা চিঠিতে ব্রিজেশের আবেদন, ১ নভেম্বরের পরিবর্তে দীপাবলির পরে ১০ বা ১১ নভেম্বর অথবা তার পরবর্তী কোনো সময়ে সমাবেশের আয়োজন করা হোক। একান্তই কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব না হলে রামলীলা ময়দানের পরিবর্তে দিল্লির উত্তর প্রান্তে আউটার রিং রোডের পাশে অবস্থিত বুরারি মাঠে সমাবেশ সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি। ‘সিটিআই’য়ের যুক্তি, রামলীলা ময়দানের তুলনায় বুরারি মাঠের আয়তন বেশি। সেখানে প্রায় ১৫ হাজার গাড়ি রাখার ব্যবস্থা থাকায় যানজটের আশঙ্কাও তুলনায় কম। ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, ধনতেরাস এবং দীপাবলিকে কেন্দ্র করে দিল্লির পাইকারি ও খুচরো বাজারে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। এ বছর ৬ নভেম্বর ধনতেরাস এবং ৮ নভেম্বর দীপাবলি। তার আগে ১ নভেম্বরের সমাবেশে বিপুল মানুষের সমাগম হলে বাজারগুলির স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা ‘সিটিআইয়ে’র। সংগঠনের দাবি, ওই দিন ১০ থেকে ১২ লক্ষ মানুষের পাশাপাশি ১৫ থেকে ২০ হাজার যানবাহন রাজধানীতে ঢুকতে পারে। এর ফলে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও এ পরিসংখ্যান ব্যবসায়ী সংগঠনের নিজস্ব অনুমান।
গত সপ্তাহেও রাহুল গান্ধীর কাছে একই আবেদন জানিয়েছিলেন ব্রিজেশ গোয়েল। তাঁর বক্তব্য ছিল, রামলীলা ময়দানের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ২০টি গুরুত্বপূর্ণ পাইকারি বাজার রয়েছে। সেখানে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষ ও যানবাহন পৌঁছলে পরিবহণ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে। রামলীলা ময়দানে যেখানে সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জায়গা হয়, সেখানে ১০ লক্ষ মানুষের সমাগমের সম্ভাবনা তৈরি হলে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হবে বলেও দাবি করেছিলেন তিনি। তাঁর আরও অভিযোগ, গত ২৫ দিনে দিল্লির ব্যবসায় ইতিমধ্যেই প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সমাবেশ হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। জবাবে রাহুল গান্ধী ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবি জানাতে। তাঁর বক্তব্য ছিল, প্রধানমন্ত্রী যদি সেই সিদ্ধান্ত নেন, তা হলে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে সব বিক্ষোভ বন্ধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ, সমাবেশ পিছিয়ে দেওয়ার বদলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তিকেই সমস্যার সমাধান হিসাবে তুলে ধরেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা।
‘সিটিআইয়ে’র দাবি, সমাবেশের কারণে যে বাজারগুলির ব্যবসা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে চাঁদনি চক, সদর বাজার, কনট প্লেস, পালিকা বাজার, জনপথ, ভাগীরথ প্যালেস, খড়ি বাওলি, কাশ্মীরি গেট, নাই বাজার, লজপত রায় বাজার, চৌরি বাজার, কিনারি বাজার, দারিবা কালান, বল্লীমারন, ফতেপুরী, তিলক বাজার, করোল বাগ, জামা মসজিদ, নবী করিম, গফ্ফর বাজার, অজমেরি গেট-পাহাড়গঞ্জ এবং দরিয়াগঞ্জ। সংগঠনের আরও দাবি, নারেলা, বাওয়ানা, ওখলা, মায়াপুরী, মুন্ডকা, উদ্যোগ নগর এবং মঙ্গোলপুরী-সহ ৫৬টি শিল্পতালুক থেকে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার ট্রাক ও টেম্পো ওই বাজারগুলিতে পণ্য নিয়ে আসে। অন্যদিকে, দিল্লির বাজারগুলি থেকে গুরুগ্রাম, নয়ডা, গাজিয়াবাদ, ফরিদাবাদ, সোনিপত এবং পানিপত-সহ অন্তত ২৫টি শহরে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার ট্রাক পণ্য পরিবহণ করে। ফলে সমাবেশের দিন যান চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব দিল্লির বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ী সংগঠনের।
ব্যবসায়ীদের এই আপত্তির মধ্যেও সমাবেশের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে বিরোধী জোট। ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানকে সামনে রেখে ১ নভেম্বরের জমায়েতকে বড়ো রাজনৈতিক শক্তিপ্রদর্শনে পরিণত করতে চাইছে তারা। ‘এসআইআর’, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা — এই তিনটি বিষয়কেই সমাবেশের মূল রাজনৈতিক ইস্যু করতে চাইছে বিরোধীরা। সব মিলিয়ে রাজধানীতে আগামী দু-দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক সমীকরণ। শনিবার খড়্গের বাসভবনে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতীকী ‘জন মহাভিযোগ’, রবিবার রামলীলা ময়দানে বিরোধীদের মহাসমাবেশ। এক দিকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা, অন্যদিকে সেই সমাবেশের কারণে রাজধানীর ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবহণ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা। বৃষ্টি প্রথম কর্মসূচির দিনক্ষণ বদলে দিলেও বিরোধীদের বৃহত্তর রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিকল্পনায় আপাতত কোনও ছেদ পড়েনি। এখন দেখার, পরপর দু-দিনের এই কর্মসূচি কতটা জনসমর্থন টানতে পারে এবং নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিরোধীদের আক্রমণ জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।
❤ Support Us





