- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ৩০, ২০২৬
বদ্রীনাথ থেকে ফেরার পথে বিপর্যয় ! উত্তরাখণ্ডে ভেঙে পড়ল তীর্থযাত্রীদের হেলিকপ্টার, প্রাণহানীর আশঙ্কা
বদ্রীনাথ থেকে দেরাদুনে ফেরার পথে মাঝ আকাশে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল যাত্রীবাহী হেলিকপ্টারটির। উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার জোশীমঠ উপত্যকার উপর দিয়ে যাওয়ার সময় আচমকাই সেটির সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেন নিয়ন্ত্রণকক্ষের আধিকারিকেরা। চারদিকে ঘন মেঘ, অবিরাম বৃষ্টি আর প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই নিখোঁজ হয়ে যায় ‘ট্রান্স ভারত এভিয়েশনে’র হেলিকপ্টারটি। পরে সেটি ভেঙে পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিংহ ধামী। শুক্রবার দুপুরের এই ঘটনায় হেলিকপ্টারে থাকা পাঁচ যাত্রী এবং পাইলটের পরিণতি নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। প্রাথমিক ভাবে ছ-জনেরই মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও তাঁদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
জানা যাচ্ছে, শুক্রবার দুপুর ১টা ১৪ মিনিট নাগাদ বদ্রীনাথ থেকে দেরাদুনের সহস্রধারার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল হেলিকপ্টারটি। জোশীমঠ উপত্যকার উপর দিয়ে যাওয়ার সময় সেটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই সময়ে হেলিকপ্টারটির অবস্থান নির্ণয়কারী ট্র্যাকিং ব্যবস্থাও কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে সেটি ঠিক কোথায় রয়েছে, তা নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। পরে দুপুর ২টো ২১ মিনিট নাগাদ জোশীমঠের মহকুমাশাসকের কাছে খবর পৌঁছয়, ছাইয়ে গ্রামের উপরে জেপি পাওয়ার হাউস সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় একটি হেলিকপ্টার ভেঙে পড়েছে। কপ্টারে পাঁচ জন যাত্রী ও এক জন পাইলট ছিলেন বলে জানা গেছে। তবে, এখনো পর্যন্ত তাঁদের শারীরিক অবস্থা কিংবা হতাহতের সংখ্যা নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য মেলেনি। উদ্ধারকাজ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এসডিআরএফ) এবং ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (আইটিবিপি)।
‘উত্তরাখণ্ড সিভিল অ্যাভিয়েশন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ (ইউকাডা) জানিয়েছে, ‘ট্রান্স ভারত এভিয়েশন প্রাইভেট লিমিটেডে’র ভিটি-এইচসিএক্স কল সাইনযুক্ত হেলিকপ্টারটি বদ্রীনাথ থেকে দেরাদুনের সহস্রধারার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। জোশীমঠ উপত্যকার উপর দিয়ে যাওয়ার সময় সেটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হেলিকপ্টারটির অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব না হওয়ায় দ্রুত তল্লাশি ও উদ্ধারকাজ শুরু হয়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে ট্রান্স ভারত এভিয়েশনের সমস্ত হেলিকপ্টারের উড়ান আপাতত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হেলিকপ্টারে থাকা পাঁচ যাত্রীর নাম প্রতাপ, অরুণ, শঙ্কর গৌড়া, সুধীর কে এবং এইচ এস নটরাজ। পাইলটের নাম ক্যাপ্টেন হিমাংশু। যাত্রীদের তালিকা অনুযায়ী, পাঁচ জনই বেঙ্গালুরুর বাসিন্দা বলে জানিয়েছেন ইউকাডার মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক প্রতীক জৈন। তবে তাঁদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়েই তৎপর হয়েছে প্রশাসন। জোশীমঠ ও পাণ্ডুকেশ্বর থেকে এসডিআরএফের দু-টি উদ্ধারকারী দল দুপুর ২টো ২৪ মিনিট নাগাদ ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দেয়। পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং স্বাস্থ্য দফতরের কর্মীরাও উদ্ধারকাজে যোগ দেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ঘটনার কথা জানিয়ে উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিংহ ধামী সমাজমাধ্যমে লেখেন, জোশীমঠের কাছে ছাইয়ে গ্রাম সংলগ্ন এলাকায় একটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার খবর পেয়েছেন তিনি। জেলা প্রশাসন, বিপর্যয় মোকাবিলা দফতর এবং এসডিআরএফের যৌথ উদ্যোগে উদ্ধারকাজ চলছে। গোটা পরিস্থিতির উপর তিনি নিজে নজর রাখছেন বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। গুরুতর আহতদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হেলিকপ্টারে থাকা সকলের নিরাপদে ফিরে আসার প্রার্থনাও করেছেন তিনি।
জোশীমঠের মহকুমাশাসক চন্দ্রশেখর বশিষ্ঠ জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়েই সেনাবাহিনী, এসডিআরএফ, পুলিশ ও স্বাস্থ্য দফতরের দল ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়েছে। তিনিও নিজে ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন বলে জানান। দুর্ঘটনার সময়ে আবহাওয়া কতটা প্রতিকূল ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শুক্রবার চামোলি জেলায় কমলা সতর্কতা জারি করেছিল ভারতের আবহাওয়া দফতর (আইএমডি)। বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়, শিলাবৃষ্টি এবং ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল জেলার বিচ্ছিন্ন কিছু এলাকায়। পাশাপাশি গোটা জেলায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল আবহাওয়া দফতর। বদ্রীনাথ-জোশীমঠ পথেও হালকা বৃষ্টি ও তুষারপাতের পূর্বাভাস ছিল। সেই সতর্কতার মধ্যেই হেলিকপ্টারটি উড়েছিল কি না, প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে দুর্ঘটনার কোনও প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, উত্তরাখণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা নতুন নয়। গত এক দশকে রাজ্যে অন্তত ১২টি পৃথক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা বা বিপত্তির ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে পাঁচটি বড় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বাকি সাতটি ঘটনায় জরুরি অবতরণ, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং অন্যান্য কারণে বিপত্তি ঘটলেও বড়ো ধরনের প্রাণহানি হয়নি। গত বছরের জুন মাসে কেদারনাথ মন্দির থেকে গুপ্তকাশীর উদ্দেশে সাত জনকে নিয়ে যাওয়ার সময় একটি হেলিকপ্টার জঙ্গলের মধ্যে ভেঙে পড়ে। সে ঘটনায় সাত জনেরই মৃত্যু হয়েছিল। বদ্রীনাথ ও কেদারনাথের মতো দুর্গম তীর্থক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য বহু তীর্থযাত্রী হেলিকপ্টার পরিষেবার উপর নির্ভর করেন। সময় বাঁচানোর পাশাপাশি পাহাড়ি পথের দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রা এড়ানোর সুবিধা থাকায় এ পরিষেবার চাহিদাও বেশি। কিন্তু আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন, পাহাড়ি উপত্যকার ভৌগোলিক অবস্থান এবং উড়ানের নিরাপত্তা নিয়ে বার বার প্রশ্ন উঠেছে। শুক্রবারের দুর্ঘটনার পর ফের সে প্রশ্নই সামনে এল।
❤ Support Us





