- এই মুহূর্তে দে । শ
- নভেম্বর ৩, ২০২৬
প্রাণীদের উপর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার নিয়মে লাগাম আলগা করছে কেন্দ্র ? নতুন বিধির খসড়া ঘিরে দেশজুড়ে প্রতিবাদ
বিজ্ঞানের অগ্রগতির নামে প্রাণীদের উপর অত্যাচারের পথ আরও প্রশস্ত হচ্ছে? পরীক্ষাগারে প্রাণীদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধি আনার প্রস্তাব ঘিরে এমনই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশিত নতুন খসড়া বিধির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন পশু অধিকার কর্মী থেকে শুরু করে বিজ্ঞানী, পশুচিকিৎসক, রাজনীতিক এবং চলচ্চিত্র জগতের একাধিক পরিচিত মুখ। তাঁদের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত বিধি কার্যকর হলে প্রাণীদের উপর পরীক্ষার ক্ষেত্রে এত দিন ধরে চালু থাকা একাধিক সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। বিশেষ করে, পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কমিটির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়েই আপত্তি সবচেয়ে বেশি।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রের তরফে প্রকাশ করা হয়েছে ‘প্রিভেনশন অফ ক্রুয়েলটি টু অ্যানিম্যালস (কন্ট্রোল অ্যান্ড সুপারভিশন অফ এক্সপেরিমেন্ট, ব্রিডিং অ্যান্ড ট্রেডিং অফ ল্যাবরেটরি অ্যানিম্যালস) রুলস, ২০২৬–এর খসড়া’। আগামী ৫ নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্তাবের উপর সাধারণ মানুষের মতামত ও আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে। খসড়া প্রকাশের পর থেকেই একাধিক পশু অধিকার সংগঠন এর বিরোধিতায় নেমেছে। তাদের দাবি, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে পরীক্ষাগারে প্রাণীদের ব্যবহার আরও সহজ হয়ে উঠবে। কমবে স্বাধীন নজরদারি। এমনকি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পথকুকুর, পথবিড়াল এবং বন্যপ্রাণীদেরও পরীক্ষার কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রতিবাদের ব্যাপ্তিও ক্রমশ বাড়ছে। জন আব্রাহাম, তব্বু, হেমা মালিনী, রবীনা ট্যান্ডন, শিল্পা শেট্টি, জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজ, দিয়া মির্জা, কে এল রাহুল, রূপালি গঙ্গোপাধ্যায়, ওয়ামিকা গাব্বি-সহ বহু তারকা সহ ১৮ হাজারের বেশি মানুষ প্রস্তাবিত বিধি প্রত্যাহারের দাবিতে স্বাক্ষর করেছেন। তাঁদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাংসদেরাও প্রতিবাদে সরব। তালিকায় রয়েছেন রাজ্যসভার সাংসদ সুলতা দেও, লোকসভার সাংসদ মহম্মদ জাওয়েদ এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রেণুকা চৌধুরী। লোকসভার সাংসদ হেমা মালিনীও এ আবেদনে সমর্থন জানিয়েছেন। শতাধিক ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী, শতাধিক পশুচিকিৎসক এবং ৬০টিরও বেশি পশু সুরক্ষা সংগঠনও এই প্রতিবাদে শামিল হয়েছে। অভিযোগ, প্রস্তাবিত বিধি কার্যকর হলে পরীক্ষাগারে প্রাণী ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা অনেকটাই চলে যাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কমিটির হাতে। পথকুকুর, বিড়াল ও বন্যপ্রাণীদের পরীক্ষায় ব্যবহারের সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ রিয়েছে।
বর্তমানে ১৯৬৮ সালের ‘এক্সপেরিমেন্টস অন অ্যানিম্যালস (কন্ট্রোল অ্যান্ড সুপারভিশন) রুলস’ এবং ১৯৯৮ সালের ‘ব্রিডিং অফ অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টস অন অ্যানিম্যালস (কন্ট্রোল অ্যান্ড সুপারভিশন) রুলস’ অনুযায়ী পরীক্ষাগারে প্রাণী ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হয়। সে ব্যবস্থায় প্রাণীদের উৎস, তাদের পরিচর্যা, পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগার ও প্রাণী প্রজননকেন্দ্রগুলিকে নথিভুক্ত হতে হয় ‘কেন্দ্রীয় কমিটি ফর দ্য কন্ট্রোল অ্যান্ড সুপারভিশন অফ এক্সপেরিমেন্টস অন অ্যানিম্যালস’ (সিসিএসইএ)-র কাছে।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে থাকতে হয় একটি ‘ইনস্টিটিউশনাল অ্যানিম্যাল এথিক্স কমিটি’ (আইএইসি)। প্রাণীদের উপর পরীক্ষা চালানোর প্রস্তাব খতিয়ে দেখা, তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে গবেষণা হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব এই কমিটির। ইঁদুর, গিনিপিগ,পাখি ও খরগোশের মতো ছোটো প্রাণীদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা চালানোর অনুমোদন দিতে পারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ‘আইএইসি’। কিন্তু কুকুর, ছাগল, শূকর, গবাদি পশু, বাঁদরের মতো তুলনামূলক উচ্চস্তরের প্রাণীদের উপর পরীক্ষা চালাতে হলে কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হয়। নতুন খসড়ায় সে ব্যবস্থাতেই বদল আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, পরীক্ষার ফলে প্রাণীর কতটা যন্ত্রণা হতে পারে, তার ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া হবে।
কোনো পরীক্ষা যদি ‘মাইল্ড’ বা সামান্য যন্ত্রণাদায়ক কিংবা ‘মডারেট’ বা মাঝারি মাত্রার কষ্টদায়ক হয়, তা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নৈতিকতা কমিটিই অনুমোদন দিতে পারবে। অর্থাৎ, প্রাণীর উপর পরীক্ষা চালানোর ক্ষেত্রে ছোট-বড় নির্বিশেষে অনেক বেশি ক্ষমতা পেতে চলেছে প্রতিষ্ঠানগুলি। কেবল ‘সিভিয়ার’ বা গুরুতর যন্ত্রণাদায়ক পরীক্ষা এবং ‘নন-রিকভারি’ বা যে পরীক্ষার পর প্রাণীটির আর জ্ঞান ফিরে আসবে না, সে ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, যে পরীক্ষায় প্রাণীর সামান্য ও স্বল্পস্থায়ী যন্ত্রণা, কষ্ট বা মানসিক অস্বস্তি হতে পারে, তাকে মৃদু শ্রেণিতে রাখা হবে। মাঝারি পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রাণীর শারীরিক সুস্থতা বা সামগ্রিক অবস্থার মাঝারি মাত্রায় অবনতি ঘটতে পারে। গুরুতর পরীক্ষায় তীব্র যন্ত্রণা, শারীরিক অক্ষমতা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী কষ্টের আশঙ্কা থাকে। আর নন-রিকভারি পরীক্ষায় প্রাণীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করে সাধারণ অ্যানাস্থেশিয়ার মধ্যে রাখা হয়। সে অবস্থা থেকে তাকে আর জাগিয়ে তোলা হয় না।
এই শ্রেণিবিভাগ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন পশু অধিকার কর্মীরা। ‘হিউম্যান ওয়ার্ল্ড ফর অ্যানিম্যালস ইন্ডিয়া’র গবেষণা ও বিষবিদ্যা বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ডিরেক্টর সুরত পার্বতমের বক্তব্য, খসড়ায় টিউমার তৈরি করা কিংবা প্রাণীকে একাকী বিচ্ছিন্ন করে রাখার মতো পরীক্ষাকে মাঝারি মাত্রার যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু মানুষের চোখে কোনো পরীক্ষা কতটা গুরুতর, তার সঙ্গে প্রাণীটির বাস্তব যন্ত্রণার মাত্রা এক নাও হতে পারে। ফলে এই শ্রেণিবিভাগের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর আরও অভিযোগ, ‘সিসিএসইএ’-র অন্যতম প্রধান দায়িত্ব অপ্রয়োজনীয় প্রাণী-পরীক্ষা বন্ধ করা। অথচ নতুন প্রস্তাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অনেকটাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কমিটির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
নয়া খসড়া অনুযায়ী, ‘আইএইসি’-র ন–জন সদস্যের মধ্যে পাঁচ জনই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। ফলে যে প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা চালাতে চাইছে, তার নিজের সদস্যরাই যদি পরীক্ষার অনুমোদন দেন, তা হলে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে কী ভাবে, সেই প্রশ্ন উঠছে। পশু নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিদের নেটওয়ার্ক ‘র্যাপিড রেসপন্স’-এর তৈরি আপত্তিপত্রেও একই উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো পরীক্ষাকে প্রয়োজনীয় বা সুবিধাজনক মনে করলেই তার অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়। বিকল্প গবেষণাপদ্ধতি রয়েছে কি না, প্রাণী ব্যবহার করা আদৌ জরুরি কি না এবং পরীক্ষার ফলে কতটা যন্ত্রণা হতে পারে, তা যথাযথ ভাবে বিচার করা প্রয়োজন। উপযুক্ত বিকল্প থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রতিষ্ঠান নিজের ইচ্ছায় প্রাণীদের উপর পরীক্ষা চালাতে পারে না।
নতুন খসড়া বিধির আর একটি বিতর্কিত দিক হলো বন্যপ্রাণী এবং পথপ্রাণীদের ব্যবহারের সুযোগ। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বন্য পরিবেশ থেকে ধরা প্রাণীদের সাধারণ ভাবে পরীক্ষার কাজে ব্যবহার করা যাবে না। তবে সংশ্লিষ্ট দফতরের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ বৈজ্ঞানিক যুক্তি বিবেচনা করে বিশেষ অনুমতি দিলে সেই নিষেধাজ্ঞায় ছাড় মিলতে পারে। পথকুকুর, পথবিড়াল এবং অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ছাড়ের কথা বলা হয়েছে। প্রাণীদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য বিশেষ প্রয়োজন থাকলে অথবা তাদের ব্যবহারের পক্ষে বৈজ্ঞানিক যুক্তি থাকলে পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে, গবাদি পশু ও খামারের অন্যান্য প্রাণী নথিভুক্ত প্রজননকেন্দ্র থেকে পাওয়া না গেলে ‘আইএইসি’-র অনুমতি নিয়ে অনথিভুক্ত প্রতিষ্ঠান কিংবা খোলা বাজার থেকেও কেনা যেতে পারে। এ প্রস্তাব নিয়েই সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন পশু অধিকার সংগঠনগুলি। তাদের আশঙ্কা, পরীক্ষার জন্য প্রাণী সংগ্রহের ক্ষেত্রে এত দিনের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে পথপ্রাণী এবং বন্যপ্রাণীদের ধরে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। তৈরি হতে পারে প্রাণী কেনাবেচার নতুন বাজারও।
সুরত পার্বতমের বক্তব্য, পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত প্রাণীদের বিশেষ ভাবে প্রজনন করানোর পিছনে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। তাদের জিনগত বৈশিষ্ট্য, স্বাস্থ্য, বয়স ও চিকিৎসা সংক্রান্ত অতীত সম্পর্কে গবেষকদের ধারণা থাকে। কিন্তু রাস্তা থেকে ধরে আনা কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে সে তথ্যগুলি অজানা। তার আগে কোনো সংক্রমণ হয়েছিল কি না, কী ধরনের খাবার খেয়েছে, কী পরিবেশে বেড়ে উঠেছে কিংবা কতটা মানসিক চাপে রয়েছে, তা জানা সম্ভব নয়। ফলে এমন প্রাণীর উপর চালানো পরীক্ষার ফলাফল কতটা নির্ভরযোগ্য হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে ‘সিসিএসইএ’-র একটি নির্দেশিকায় ক্লিনিক্যাল ভ্যাকসিন পরীক্ষায় পথকুকুর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সে নির্দেশিকা প্রত্যাহার করা হয়। সে সময় ‘সিসিএসইএ’-র সদস্যসচিব এস কে দত্ত জানিয়েছিলেন, কী ভাবে পথকুকুরের উপর ভ্যাকসিনের পরীক্ষা চালানো হবে, তার যথাযথ পদ্ধতি নির্ধারিত না থাকায় ওই নির্দেশিকা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এদিকে, নতুন বিধির প্রস্তাব এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারতে ওষুধ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণার প্রাক্-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার চাহিদা বাড়ছে। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ছোটো ও বড়ো প্রাণীদের নিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণা চালানোর জন্য দেশে ২,৩০০-রও বেশি প্রতিষ্ঠান ‘সিসিএসইএ’-র কাছে নথিভুক্ত রয়েছে। ‘গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ’-এর একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে প্রাক্-ক্লিনিক্যাল গবেষণায় যুক্ত ‘কন্ট্র্যাক্ট রিসার্চ অর্গানাইজেশন’ (সিআরও)-গুলির বাজারমূল্য ২০২৩ সালে ছিল ১৮৩.৩ মিলিয়ন ডলার। ২০২৪ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে সে বাজারের বার্ষিক বৃদ্ধির হার ১১.৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। ফলে গবেষণার অনুমোদন দ্রুত করা, প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর যুক্তিতে নতুন বিধি আনার পিছনে শিল্পক্ষেত্রের স্বার্থও কাজ করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
যদিও কেন্দ্র সরকারের বক্তব্য, নতুন বিধির উদ্দেশ্য গবেষণার অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, অযথা প্রশাসনিক বিলম্ব কমানো এবং প্রাণীকল্যাণের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে নৈতিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। কিন্তু পশুপ্রেমীদের দাবি, এ যুক্তিতে প্রাণী সুরক্ষার বিদ্যমান ব্যবস্থাকে দুর্বল করা যায় না। বস্তুত, প্রাণী-নির্ভর গবেষণার বিকল্প খুঁজতে ভারত ইতিমধ্যেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করেছে। ২০১৪ সালে প্রসাধনী সামগ্রীর পরীক্ষায় প্রাণী ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। ২০২৩ সালের ‘নিউ ড্রাগস অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালস’ সংশোধিত বিধিতে ওষুধের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য অর্গান-অন-চিপ এবং অন্যান্য আধুনিক গবেষণাপদ্ধতির স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ বা ‘আইসিএমআর’-ও এ ধরনের গবেষণায় উৎসাহ দিচ্ছে। দেশের ৭১টি প্রতিষ্ঠান ও গবেষণাগারে অর্গান-অন-চিপ প্রযুক্তি, ত্রিমাত্রিক টিস্যু মডেল এবং কম্পিউটার-নির্ভর গবেষণাপদ্ধতি-সহ প্রাণী ছাড়া পরীক্ষার বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে ১০৯টি গবেষণা প্রকল্পে সহায়তা করেছে ‘আইসিএমআর’।
এই মুহূর্তে আমেরিকা, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানও প্রাণী-নির্ভর নয় এমন গবেষণাপদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোর উপর জোর দিচ্ছে। অর্গানয়েড, মানবকোষ-নির্ভর গবেষণা, অর্গান-অন-চিপ এবং কম্পিউটার-নির্ভর পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষের শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়া আরও সরাসরি বোঝার চেষ্টা চলছে। যদিও এ পদ্ধতিগুলি এখনো সব ধরনের প্রাণী-পরীক্ষার বিকল্প হয়ে ওঠেনি, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এগুলি অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারে। পশু সুরক্ষা সংগঠনগুলোর দাবি, এ পরিস্থিতিতে ভারতের উচিত আরও উন্নত গবেষণাপদ্ধতির বিকাশে জোর দেওয়া। প্রাণীদের উপর পরীক্ষা চালানোর অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীন নজরদারি বজায় রাখা, প্রাণীকল্যাণের নিয়ম আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তার বদলে পরীক্ষার অনুমোদন সহজ করতে গিয়ে সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল করা হলে তা দেশের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পক্ষেও ক্ষতিকর হতে পারে।
প্রসঙ্গত, প্রাণী-পরীক্ষার ইতিহাসে আমেরিকার পেপার নামের ডালমেশিয়ান কুকুরটির মৃত্যু আজও বিশ্বজুড়ে প্রায়ই আলোচিত হয়। ১৯৬৫ সালে পরিবারের কাছ থেকে চুরি হয়ে যাওয়া পেপারকে একটি হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। তার মৃত্যুর ঘটনা আমেরিকায় পরীক্ষাগারের প্রাণীদের সুরক্ষায় প্রথম কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ভারতের ক্ষেত্রে অবশ্য ১৯৬০ সালেই প্রাণীদের উপর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃতি পেয়েছিল। অপ্রয়োজনে প্রাণী ব্যবহার বন্ধ করা, বড়ো প্রাণীর বদলে ছোটো প্রাণী বেছে নেওয়া এবং বিকল্প পদ্ধতি থাকলে প্রাণী-পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়ার মতো নীতি তখনই গ্রহণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষাগার নথিভুক্ত করা, প্রাণী সংগ্রহের উৎস নির্দিষ্ট করা এবং বড়ো প্রাণীদের উপর পরীক্ষায় কেন্দ্রীয় অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার মতো ব্যবস্থাও চালু হয়।
কিন্তু নতুন খসড়া বিধি সে দীর্ঘদিনের সুরক্ষাব্যবস্থাকে কতটা ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়েই সংশয়। বিশেষ করে, পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে গেলে নজরদারির নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। পশু অধিকার কর্মীদের বক্তব্য, বিজ্ঞানের অগ্রগতির অর্থ আরও বেশি প্রাণীর উপর পরীক্ষা চালানোর অনুমতি দেওয়া নয়। বরং বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এমন পদ্ধতি তৈরি করা, যাতে প্রাণীদের উপর পরীক্ষা চালানোর প্রয়োজনই ক্রমশ কমে আসে। সে কারণেই ৫ নভেম্বরের মধ্যে প্রস্তাবিত বিধির বিরুদ্ধে আপত্তি ও পরামর্শ জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ‘পেটা ইন্ডিয়া’। সংগঠনটির দাবি, বর্তমান খসড়া প্রত্যাহার করে নতুন করে এমন বিধি তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রাণীকল্যাণ, স্বাধীন নজরদারি এবং আধুনিক বিকল্প গবেষণাপদ্ধতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে।
❤ Support Us








