- বি। দে । শ
- নভেম্বর ৪, ২০২৬
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি, মার্কিন কংগ্রেসের দখল ডেমোক্র্যাটদের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার মাঝপথে রাজনৈতিক ধাক্কা। আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হটিয়ে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিল ডেমোক্র্যাটরা। সেনেটের পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠা করেছে বিরোধী শিবির। শুধু তাই নয়, রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত একাধিক রাজ্যেও একের পর এক আসন ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। ফলে হোয়াইট হাউসের দখল ট্রাম্পের হাতে থাকলেও আগামী দু–বছর আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিরোধীদের বাধার মুখে পড়তে হতে পারে তাঁকে। নির্বাচনের এই ফলকে ট্রাম্পের নেতৃত্ব এবং তাঁর দ্বিতীয় দফার শাসনকালের বিরুদ্ধে স্পষ্ট জনমত হিসাবেই দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
ভোটগণনা শুরু হওয়ার পর থেকেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আসনে এগিয়ে ছিল ডেমোক্র্যাটরা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সে ব্যবধান আরও বাড়ে। বিশেষ করে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা রাজ্যগুলিতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সাফল্য রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কানসাস, আইওয়া, টেক্সাস, নর্থ ক্যারোলাইনা এবং ওহায়োর মতো রাজ্যে পালাবদলের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিনিধি পরিষদেও রিপাবলিকানদের একাধিক আসন হাতছাড়া হয়েছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ্যে আসার পরে সমঝোতার সুর শোনা গিয়েছে ট্রাম্পের গলায়। ডেমোক্র্যাটদের জয় মেনে নিতে, তাঁদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সে আশ্বাসের কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজের সমাজমাধ্যমের পাতায় ‘ভেটো’ লেখা লাল টুপির ছবি পোস্ট করেছেন তিনি। অর্থাৎ, বিরোধীরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও তাঁদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর সাংবিধানিক ক্ষমতা যে তিনি প্রয়োগ করতে পারেন, সে বার্তাই দিতে চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তবে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের এ ফলাফলকে বিচ্ছিন্ন কোনো রাজনৈতিক ঘটনা হিসাবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। গত কয়েক মাস ধরেই আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য পরিষেবার খরচ বৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ছিলই। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাত। ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে। সে অসন্তোষই শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সেনেটে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাবর্তন নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আগে ১০০ আসনের সেনেটে রিপাবলিকানদের হাতে ছিল ৫৩টি আসন, ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে বিরোধীদের অন্তত চারটি আসন বাড়াতে হতো। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে একের পর এক আসন ছিনিয়ে নিয়ে সেনেটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
কানসাসে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার মার্শালকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট অ্যাডাম হ্যামিল্টন। পেশায় মেথডিস্ট ধর্মযাজক হ্যামিল্টনের জয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৩২ সালের পর এই প্রথম কানসাস থেকে কোনও ডেমোক্র্যাট সেনেটর নির্বাচিত হলেন। অন্ দিকে, আইওয়ায় রিপাবলিকান অ্যাশলি হিনসনকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট জশ তুরেক। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম আইওয়া থেকে কোনও ডেমোক্র্যাট সেনেটর নির্বাচিত হলেন। ঐতিহ্যগত ভাবে রিপাবলিকানদের সমর্থন করে আসা এই দুই রাজ্যের ফলাফল থেকেই স্পষ্ট, ট্রাম্পের দলের ভোটব্যাঙ্কে কতটা প্রভাব পড়েছে। টেক্সাসেও বড়োসড়ো রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত এই রাজ্যে ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীকে পরাজিত করে সেনেটে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকো। শুধু সেনেট নয়, গভর্নর পদেও ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে। রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসা। কয়েক দশকের রিপাবলিকান আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে টেক্সাসের শীর্ষ প্রশাসনিক পদটি ডেমোক্র্যাটদের হাতে এসেছে।
নর্থ ক্যারোলাইনাতেও গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছে বিরোধী শিবির। প্রাক্তন গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করে সেনেট আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে এনেছেন। ওহায়োতে প্রাক্তন সেনেটর শেরড ব্রাউন রিপাবলিকান জন হাস্টেডকে হারিয়েছেন বলে প্রদত্ত ফলাফলে জানানো হয়েছে। জর্জিয়া থেকে ফের নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট জন অসফ। নিউ হ্যাম্পশায়ারেও নিজেদের আসন ধরে রাখতে পেরেছে দল। এ জয়ের তাৎপর্য শুধু আসনসংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং যে রাজ্যগুলিকে এত দিন রিপাবলিকানদের নিরাপদ নির্বাচনী এলাকা বলে মনে করা হতো, সেখানেও ভোটারদের মনোভাব বদলেছে। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত প্রচার, তাঁর নির্বাচনী সভা এবং প্রার্থীদের হয়ে সরাসরি আবেদনও সে প্রবণতা ঠেকাতে পারেনি।
সেনেটের পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ৪৩৫ আসনের নিম্নকক্ষে আগে রিপাবলিকানদের হাতে ছিল ২১৮টি আসন, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। নির্বাচনের প্রাথমিক প্রবণতাতেই সে লক্ষ্য অতিক্রম করে তারা। পেনসিলভেনিয়া, নিউ জার্সি, কেন্টাকি, অ্যারিজোনা এবং নর্থ ক্যারোলাইনার মতো রাজ্যে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা একাধিক আসন ছিনিয়ে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এমন কিছু নির্বাচনী এলাকাতেও পালাবদল ঘটেছে, যেখানে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন ট্রাম্প। রিপাবলিকানদের পক্ষে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাস করে প্রতিনিধি পরিষদের আসন ধরে রাখার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি।
ইন্ডিয়ানার একটি আসনের ফলাফল বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে রিপাবলিকান সাংসদ ভিক্টোরিয়া স্পার্টজকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট জে ডি ফোর্ড। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ওই এলাকায় ১৭ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন ট্রাম্প। ফলে এই আসনে ডেমোক্র্যাটদের জয়কে রিপাবলিকান ভোটব্যাঙ্কে ফাটলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ভার্জিনিয়ার দশম কংগ্রেসনাল জেলা থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট নেতা সুহাস সুব্রহ্মণ্যম। বারাক ওবামার প্রশাসনে উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। এ ছাড়া জর্জিয়া, নিউ জার্সি, পেনসিলভেনিয়া, ইলিনয় এবং নিউ ইয়র্কের একাধিক আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। অন্য দিকে, ফ্লোরিডা, ওহায়ো, জর্জিয়া এবং ভার্জিনিয়ার কয়েকটি আসনে রিপাবলিকানরা নিজেদের দখল বজায় রাখতে পেরেছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে শুধু কংগ্রেসের আসন নয়, আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যের গভর্নর পদেও ভোটগ্রহণ হয়েছে। ৩৬টি রাজ্য এবং তিনটি টেরিটরির নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করেছে। জর্জিয়ায় আটলান্টার প্রাক্তন মেয়র কেইশা ল্যান্স বটমস গভর্নর নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন। আমেরিকার ইতিহাসে এই প্রথম কোনো কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা গভর্নর পদে নির্বাচিত হলেন। রিপাবলিকান ব্যবসায়ী রিক জ্যাকসনকে পরাজিত করে গুরুত্বপূর্ণ সে রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের দখল প্রতিষ্ঠা করেছেন বটমস। ওহায়োতেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট অ্যামি অ্যাক্টন। দু–দশক পর ওই রাজ্যে কোনো ডেমোক্র্যাট গভর্নর নির্বাচিত হলেন। একই সঙ্গে ওহায়োর ইতিহাসে প্রথম মহিলা গভর্নর হওয়ার নজিরও গড়েছেন তিনি। বিপুল অর্থব্যয়ে প্রচার চালানো হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সমর্থন পেয়েছেন অ্যাক্টন। অন্যদিকে, ফ্লোরিডায় ট্রাম্প-সমর্থিত বায়রন ডোনাল্ডস গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। রাজ্যের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হিসাবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন তিনি। রিপাবলিকানদের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এসেছে ওয়াইয়োমিং সহ অন্যান্য রাজ্যে। ফলে গভর্নর নির্বাচনের সামগ্রিক চিত্রেও ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি থাকলেও রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক লড়াই যে এখনো যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, তা স্পষ্ট।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ্যে আসার পরেও নিজের দায় স্বীকার করতে নারাজ ট্রাম্প। বরং তাঁর দাবি, তিনি নিজে নির্বাচনে প্রার্থী হলে রিপাবলিকানরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হতো। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘আমি ব্যালটে ছিলাম না। যদি থাকতাম, তা হলে আমরা বিপুল ব্যবধানে জিততাম।’ ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে পরাজয়ের দায় থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা হিসাবেই দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। কারণ, মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারের সময় বারবার রিপাবলিকানদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ভোটারদের যেন মনে হয় ব্যালটে তিনিই প্রার্থী। অর্থাৎ, দলের প্রার্থীদের হয়ে প্রচার করতে গিয়ে কার্যত নিজের নেতৃত্বকেই নির্বাচনের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু ফলাফল বিপরীত হওয়ায় এখন সে অবস্থান থেকে সরে আসতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ভোটের আগে ট্রাম্প টেক্সাস, নর্থ ক্যারোলাইনা, সাউথ ক্যারোলাইনা, ওহায়োর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন ট্রাম্প। রিপাবলিকান প্রার্থীদের হয়ে একাধিক নির্বাচনী সভায় বক্তব্য রেখেছিলেন। ভোটারদের কাছে আবেদন ছিল, যেন তাঁরা ট্রাম্পের নেতৃত্বের উপর আস্থা রেখেই প্রার্থীদের ভোট দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রচার ভোটারদের মন জয় করতে পারেনি। এর আগে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের কাছে পরাজয়ের পর ফলাফল মেনে নিতে চাননি ট্রাম্প। ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি, যদিও সে অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি। অতীত অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে এ বারও রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পরে তিনি ফলাফল মেনে নেবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। তবে এ বার তিনি বলেছেন, ‘আমি এই ফলাফল মেনে নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করব।’ এদিকে, পরাজয়ের দায় স্বীকার করার বদলে দলের প্রার্থীদের দিকেই আঙুল তুলেছেন তিনি। টেক্সাসের পরাজিত গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে ‘রিপাবলিকান ইন নেম অনলি’ বা নামমাত্র রিপাবলিকান বলে কটাক্ষ করেছেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, অ্যাবট যদি দলের নীতির প্রতি আরও অনুগত থাকতেন, তা হলে এই পরাজয় এড়ানো যেত। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি এ বার রাজনৈতিক ভাষ্যকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করবেন।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের আগেই ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য জয় নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিরোধীদের হাতে গেলেও তাঁর প্রশাসনের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। কারণ, প্রেসিডেন্ট হিসাবে তাঁর হাতে রয়েছে ‘ভেটো’ প্রয়োগের ক্ষমতা। ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল, ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তাঁকে ‘মিস্টার ভেটো’ বলে ডাকলেও তাঁর আপত্তি নেই। তাঁর ধারণা, বিরোধীরা কংগ্রেসে একের পর এক বিল পাশ করানোর চেষ্টা করলেও রাষ্ট্রপতির ভেটো ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত তাঁদের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পথ থেকে সরিয়ে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসবে। নির্বাচনের পরে সমাজমাধ্যমে ‘ভেটো’ লেখা লাল টুপির ছবি পোস্ট করে সেই অবস্থানই আরও এক বার স্পষ্ট করেছেন তিনি। অর্থাৎ, ফলাফল মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিলেও ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্বিঘ্নে বাস্তবায়িত হতে দেবেন না, সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ বদলে যাওয়ায় আগামী দু–বছর ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে একাধিক সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে পারবেন। বিভিন্ন সরকারি নথি তলব করা, আধিকারিকদের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে শুনানি আয়োজনের ক্ষমতা তাঁদের হাতে থাকবে। বিশেষত প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ও অভিবাসন নীতির প্রয়োগ নিয়ে তদন্তের সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রাম্পের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের উপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির বিভিন্ন দিকও খতিয়ে দেখতে পারে কংগ্রেসের কমিটিগুলি। এমনকি প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার সাংবিধানিক ক্ষমতাও ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকবে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এর আগেও দু–বার ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এ বার তৃতীয় বার সে সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে। তবে ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদে পাশ হলেও প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরাতে সেনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। ফলে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের অপসারণ—দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
কেন এমন ফল হলো ? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল অর্থনীতি। বাড়িভাড়া, জিনিসপত্রের দাম, বিদ্যুতের বিল ও দৈনন্দিন খরচ ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। ট্রাম্পের শুল্কনীতিও গণঅসন্তোষের অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের পণ্যের উপর শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ফলে আমেরিকার বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিরোধীদের অভিযোগ, ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তার উপর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। যুদ্ধের জেরে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ বেড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশনীতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভোটারদের একাংশের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে প্রশাসন আন্তর্জাতিক সংঘাতের দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের সময় হোয়াইট হাউসের পরিবেশ ছিল থমথমে। প্রেসিডেন্ট এবং মন্ত্রিসভার শীর্ষ সদস্যেরা হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে বসে ফলাফলের দিকে নজর রাখছিলেন। তবে এরপর হোয়াইট হাউসের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, পরাজয়ের পরেও ট্রাম্প প্রশাসনের মনোভাব ‘প্রতিরোধমূলক’। হোয়াইট হাউসের একাংশের মতে, রিপাবলিকান প্রার্থীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতার অভাবও এই বিপর্যয়ের কারণ। ট্রাম্প নিজে তাঁদের হয়ে দেশজুড়ে প্রচার করেছেন, নির্বাচনী সভায় অংশ নিয়েছেন, কিন্তু তাতেও ভোটারদের মন জয় করা যায়নি। ওই আধিকারিকের বক্তব্য, অনেক ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের হয়ে তাঁদের নিজেদের তুলনায় বেশি ভাল প্রচার করেছেন। ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে ভোটারদের অসন্তোষকেও গুরুত্ব দিতে নারাজ ট্রাম্প শিবিরের একাংশ। হোয়াইট হাউসের এক আধিকারিকের দাবি, ইরান সংঘাতের অবসান হলে জ্বালানির দাম দ্রুত কমবে। কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়া মানুষজন তখন তাঁদের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত হবেন।
মার্কিন কংগ্রেসে ক্ষমতার এই পালাবদল শুধু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষত বাণিজ্য, শুল্কনীতি, অভিবাসন এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে কংগ্রেসে নতুন করে বিতর্ক শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেই মার্কিন বিদেশনীতি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, এমন নয়। প্রেসিডেন্ট হিসাবে ট্রাম্পের হাতে বিস্তর নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। ফলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড়ো ধরনের কোনো পরিবর্তন ঘটবে কি না, তা নির্ভর করবে হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যে সমঝোতার উপর। ভারতের ক্ষেত্রেও আমেরিকার এই ভোটফলাফল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় রফতানিকারীদের কাছে আমেরিকা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার। ফলে মার্কিন শুল্কনীতির পরিবর্তন ভারতীয় পণ্যের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও আমেরিকা একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির কাঠামো ঘোষণা করেছিল। সেই কাঠামো অনুযায়ী ভারতীয় পণ্যের উপর ১৮ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপের কথা জানিয়েছিল ওয়াশিংটন। পরে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিশ্বজুড়ে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেয়।
তবে পূর্ণাঙ্গ ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। চলতি মাসের গোড়ায় মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো জানিয়েছিলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ভবিষ্যতে শুল্কনীতি নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। তবে সে আলোচনা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে দুই কক্ষের রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ট্রাম্পের অবস্থানের উপর। আমেরিকায় কর্মরত ভারতীয় পেশাদারদের কাছেও এই নির্বাচনের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ‘এইচ-১বি’ ভিসাধারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় অভিবাসন আইন ও ভিসা সংক্রান্ত বিধির উপর নজরদারি বাড়তে পারে। রিপাবলিকানদের প্রস্তাবিত কিছু অভিবাসন সংক্রান্ত পদক্ষেপের বিরোধিতা করতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। গত সেপ্টেম্বর মাসে নতুন ‘এইচ-১বি’ ভিসার আবেদনের ক্ষেত্রে এক লক্ষ ডলারের ফি চালুর ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ভিসার নিয়ম বদলে যাবে, এমন সম্ভাবনা নেই।
সব মিলিয়ে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার শাসনের বাকি দু–বছরের জন্য নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করল। হোয়াইট হাউসের দখল রিপাবলিকানদের হাতে থাকলেও আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে কার্যত প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে চলেছেন ট্রাম্প। নিজের দলের প্রার্থীদের পরাজয়ের দায় এড়িয়ে গেলেও সাধারণ ভোটারের অসন্তোষ যে তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ় রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন দেখার, ‘ভেটো’র হুঁশিয়ারি দিয়ে কতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন ট্রাম্প, আর কতটা কার্যকর ভাবে সে প্রতিরোধ ভেঙে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। আমেরিকার রাজনীতিতে এই পালাবদল আগামী দিনে শুধু ওয়াশিংটনের ক্ষমতার অলিন্দেই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও নতুন সমীকরণের জন্ম দিতে পারে।
❤ Support Us








