- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- জুলাই ৩১, ২০২২
সর্ষে ইলিশ
ছেলের কথা মনে পড়তেই জুঁই এর দুচোখ জলে ভরে উঠল। আবাসন থেকে বেরনোর রাস্তাটা এখন তার চোখে অস্পষ্ট। তবুও অন্ধকারে জিনিস হাতড়ানোর মতো সে বাইরে চেয়ে আছে।
অলঙ্করণ: দেব সরকার
‘আমাদের ইচ্ছে গুলো অপ্ল সময় ঘর পাতালো’ গানটা বাজলেই সোহাগ কেঁদে ফেলে। এক অদ্ভুত মন খারাপ যেন তাকে শীতের চাদরের মত জড়িয়ে ধরে। তখন আর কিছুই ভালো লাগে না। চুপটি করে বসে থাকে জানলার পাশে। কাকে যে তখন ভাবে তার ঠিক থাকে না। মনে পড়ে পরিচিত অপরিচিত অসংখ্য সব মুখ। তাদের সবার হয়ত নামও জানে না। তবুও তাদের জন্য মন খারাপ করে। মন খারাপ করে বলে যে এ গানটা শোনা বন্ধ করে দেবে, তা দেবে না। যদি সোহাগের ইউটিউব সার্চে গিয়ে দেখা যায় তাহলে সেখানে সবার আগে এই গানটা ভেসে উঠবে।ঘুম থেকে উঠতে অনেক দেরি করে ফেলেছে সে। অফিসের অতিরিক্ত কাজ শেষ করতে কাল অনেক রাত হয়ে গেছিল । মা দুবার ডেকে গেছে। সোহাগের সাড়া পায়নি। এখন সকাল নটা পার হয়ে গেছে। টেবিলে রাখা ঘড়িটার দিকে নজর পড়তেই অবাক হল সে এত বেলা তার কখনও হয় না। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে এলো। ল্যাপটপটা অন করতেই দেখল তিনটে ইমেল নোটিফিকেশন। সবগুলো তার অফিস থেকে। আজ সকাল দশটার সময় অফিস পৌঁছানোর কথা। মেল গুলো চেক করে ল্যাপিটা অফ করে নাস্তার টেবিলে বসে হাঁক পাড়ল —— মা খুব খিদে পেয়েছে। মা কিচেন থেকে খেঁকিয়ে উঠল-— সারা সকাল মড়ার মত পড়ে পড়ে ঘুমাবে আবার এখন খিদে পেয়েছে বলে চেঁচানো হচ্ছে ! খেতে পাবি না যা।সোহাগ জানে এটা তার মায়ের মনের কথা না। জন্মের পর থেকে সে তার মাকে দেখে আসছে। এক অসাধারণ মমতাময়ী এই মহিলা। মা গুলো কি করে যে এত মমতাময়ী হয়, অবাক হয়ে ভাবে মাঝে মাঝে। আজ মায়ের এমন কথাতে সে হেসে উঠল। কারণ কিচেন থেকে তার প্রিয় লুচি তরকারির আস্বদ্য গন্ধ আসছে। সোহাগ আদুরে গলায় বলল—— মাগো…খুব খিদে পেয়েছে যে। তাড়াতাড়ি লুচি নিয়ে এসো।বলতেই মা গরম গরম লুচি নিয়ে হাজির। প্লেটে লুচি তুলে দিয়ে একটা কাঁচের বাটিতে তরকারি দিল। সোহাগ বাচ্চাদের মত করে লুচি খেতে শুরু করল। মা তার এমন তাড়াহুড়ো করা দেখে বলল—— সোহাগ আস্তে আস্তে খা। মুখ পুড়ে যাবে তো। গরম আছে যে।মুখে আধ খানা লুচি চালান করে চিবোতে চিবোতে সে তার দেরির কথা জানাল। মা তো রেগেমেগে একশা। কারণ আজ তার জন্য মা ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচুশাক রান্না করবে বলে প্ল্যান করেছে। মায়ের ইচ্ছে দুপুরে মা ছেলেতে প্রাণ ভরে ইলিশের মুড়ো দিয়ে কচুশাক আর ভাত খাবে সেই সঙ্গে সর্ষে ইলিশ তো থাকছেই। না ছেলের এই ব্যস্ততার জন্য সামান্য এই সাধটুকুও তার পুরণ হবে না। প্রথমে রাগ হলেও সেই রাগ ধীরে ধীরে অভিমানে পরিণত হল। সোহাগের সামনে গুম হয়ে বসে থাকল। শেষ আধখানা লুচি মুখে পুরে সে মাকে উদ্দেশ্য করে বলল—— কি হল মা, চুপ করে আছো যে?তবুও মা এর মুখে কোনো কথা নেই। উঠে গিয়ে ফ্রিজ থেকে দুটো রসগোল্লা নিয়ে এসে ছেলের প্লেটে দিয়ে বলল-—কিছু না। কখন ফিরবি অফিস থেকে?রসোগোল্লা দুটো টপাটপ মুখে পুরে সে জানালো তার আজ ফিরতে দেরি হবে। এমন কি রাত হয়ে যেতেও পারে। কাঁচের গ্লাসে জল ঢেলে ঢকঢক করে পান করে এক মিনিটের মধ্যে ব্যগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ল।দরজার কাছে আসতেই মা কেমন যেন করুন স্বরে জানতে চাইল— সোহাগ আজ কি তুই একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে পারবি না খোকা?— চেষ্টা করব মা। সাবধানে থেকো। বলেই বেরিয়ে গেল দরজা টেনে।নিজ হাতে সোহাগকে সে গড়ে তুলেছে। সেই ছেলে যেন তার ধরা ছোঁয়ার অনেক বাইরে। চাইলেই সে ছেলের কপালে মধুর চুম্বন দিতে পারে না।সোহাগ অফিসে চলে যাবার পর জুঁই সম্পূর্ণ একা হয়ে যায়। এত বড়ো ফ্ল্যাটে সে ছাড়া আর কেউ নেই। আছে একটা বিরাট মাপের স্ক্রিন। ইচ্ছে হলে সেখানে নানান ধরনের সিনেমা, নাটক, ইত্যাদি দেখা যেতে পারে। এসব দেখতে তার একদম ভালো লাগে না। সেই ভোর বেলা সোহাগের বাবা চলে যান। ফেরেন সন্ধ্যার পরে। অনেক দুরের একটা গ্রামীন হাসপাতালের সুপারিনটেন্ডেন্ট। ইচ্ছে করলেই কাছাকাছি কোথাও বাড়ি বানিয়ে থাকতে পারতেন কিন্তু সোহাগের পড়ালেখার কথা ভেবে এই শহরেই থেকে গেছেন। মানুষটা সারা জীবন ট্রেনেই কাটিয়ে দিল। সবই একমাত্র ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে। এর আগে এতো কষ্ট, এতো একাকীত্ব লাগত না। কিন্তু ইদানিং যেন তার একাকীত্ব বেড়েই চলেছে। স্বামী সন্তান অফিসে বেরোনোর পর সে সম্পূর্ণ একা হয়ে যায়। তখন আর কোনো কাজ থাকে না। নানান ভাবনা মাথা চাঁড়া দিয়ে ওঠে।জুঁই এককালের বিএ পাশ। আধুনিকতা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল সে। স্মার্ট ফোনের দৌলতে এখন দুনিয়া তারও মুঠ্ঠিমে। ছেলে চলে যাবার পর সে মাত্র দুটো লুচি অনেকক্ষণ সময় নিয়ে খেল। বাসন গুলো সিঙ্কে রেখে বেলকনিতে এসে বসল। এখান থেকে আবাসনের বাইরের রাস্তাটা দেখা যায় অনেক দূর পর্যন্ত। এই রাস্তা ধরেই তার সোহাগকে একসময় স্কুলে রাখতে যেত রোজ। এতটুকু ছিল সে। আর আজ একটা নামী কোম্পানীর উচ্চপদস্ত অফিসার। গর্ব হবারই কথা তার। কিন্তু গর্ব হলেও সেই গর্বে কোথাও আনন্দ নেই। সোহাগের কথা মনে পড়তেই তার মন খারাপ হয়ে যায়। কেবলই মনে হতে থাকে তার জীবন যেন কেমন ! এই জীবনের জন্য তার এত কষ্ট করা ? তিল তিল করে নিজ হাতে সোহাগকে সে গড়ে তুলেছে। আর আজ সেই সোহাগ যেন তার ধরা ছোঁয়ার অনেক বাইরে। চাইলেই সে ছেলের কপালে একোটা মধুর চুম্বন দিতে পারে না। কারণ মায়ের এমন আবেগের কোনো দাম নেই কর্মব্যস্ত ছেলের কাছে।মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফোন করল সোহাগের বাবাকে। এটা তার রুটিন ফোন। ঠিক এগারোটার সময় ফোন করে জেনে নেবে হাসপাতালে পৌঁছেছে কি না। নাস্তা করেছে কি না। নিয়ম বাঁধা জীবনে তার সবকিছুই নিয়ম করে চলে। না কোথাও এতটুকু নিয়মের হেরফের হয় না। সোহাগের বাবার সাথে কথা শেষ হয়েছে অনেক আগে। ফোন নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ইউটিউব অ্যাপটা ওপেন করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘আমাদের ইচ্ছে গুলো’ গানটা। টাচ করে প্লে করেদিল। সে জানে এই গানটা শুনলেই সোহাগ কেঁদে দেয়। সে থাকলে কি গানটা প্লে করতে পারত? মা তো সে, কখনই ছেলেকে কষ্ট দিয়ে গানটা চালাত না। ছেলের কথা মনে পড়তেই জুঁই এর দুচোখ জলে ভরে উঠল। আবাসন থেকে বেরনোর রাস্তাটা এখন তার চোখে অস্পষ্ট। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। তবুও অন্ধকারে জিনিস হাতড়ানোর মতো সে বাইরে চেয়ে আছে। কি যেন খোঁজার চেষ্টা করছে।অফিসে পৌঁছে নিজের কেবিনে এসে বসতেই পাশের কেবিন থেকে রিতা সোহাগকে শুভেচ্ছা জানিয়ে গেল। তারপর অন্যান্যরাও শুভেচ্ছা বার্তায় তাদের বসকে খুশি করার চেষ্টা করল। কর্পোরেটে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। এধরণের শুভেচ্ছায় হৃদয়ের ছোঁয়ার পরিবর্তে চাটুকারিতা বেশি। সোহাগের এগুলো একদম পছন্দ না হলেও হাসিমুখে সকলকে প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে একেবারে চুপ হয়ে গেল। এই জন্যই মা তাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে বলছিল। কতবড়ো গাধা সে। মা এখন হয়ত তার পথ চেয়ে বসে আছে। অথবা ভাঙা মনে বারান্দায় গ্রিল ধরে পথের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। মায়ের দুঃখ ভারাক্রান্ত মুখটা মনে ভেসে উঠতেই তার কান্না পেল। একটু অভিমানও হল মায়ের উপর, কেন তাকে মনে করিয়ে দিল না মা ? বাবাও তো কোন ভোরে অপিসে বেরিয়ে গেছেন। তাহলে নিশ্চয় প্রতিবারের মতো এবারও বাবার মনে নেই। কিন্তু মা ঠিকই মনে রেখেছে।সোহাগের এখন মনে পড়েছে। মা কাল রাতে বাবাকে ইলিশ আনার কথা বলছিল। ওহ! সে একদমই লক্ষ্য করেনি। সে ভুলেই গেছে। প্রতিবছর এই দিনটিতে দুপুরবেলা তারা তিনজনে সর্ষে ইলিশ দিয়ে লাঞ্চ করে বাড়িতেই। মায়ের কাছে এই দিনটি যেন ইদের দিন। কীভাবে সে ভুলে গেল। এতক্ষণ মা নিশ্চয় একা একা খুব কান্না করছে। মা, তার অভিমানিনী। কখনও যাকে তার কাছে বা বাবার কাছে কোনো বিষয়ে অভিযোগ করতে দেখেনি। সেই মা এখন মন খারাপ করে বসে আছে। ভাবতেই সোহাগের মনে পড়ল ‘আমাদের ইচ্ছে গুলো অল্প সময় ঘর পাতালো’।নিজের ব্যাস্ত জীবনের প্রতি নিজেই একপ্রকার ধিক্কার দিয়ে উঠল। চেয়ার ছেড়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে পড়ল। অফিসের কাউকে কিছু না বলে সোজা বেরিয়ে এল রাস্তায়। একটা ট্যাক্সি ডেকে বাড়ির দিকে রওনা দিল। বাড়ির পথেই পড়ে বেশ কিছু ফুলের দোকান। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও পূজোপার্বনে জোড় জমাটি বেচাকেনা হয় দোকান গুলোতে। তার কেন যেন মনে হল আজ কোনো পরবের দিন, দোকান গুলোতে বেশ ভিড়। ড্রাইভারকে অনুরোধ করে একটা দোকানের সামনে নেমে গিয়ে বড়ো দেখে দুটো বুকে কিনল।বেলা সাড়েবারোটা নাগাদ ট্যাক্সিটা সোহাগকে আবাসনের সামনে রেখে গেল। বহুদিন পর দুপুরে সে ঘরে ফিরছে। মা নিশ্চয় খুব খুশি হবেন তাকে দেখে। আনন্দে স্কুল ফেরত শিশুর মতো এক প্রকার নাচতে নাচতে ফ্ল্যাটের দরজায় পৌঁছে গেল। কলিংবেল বাজানোর আগে একটু ভেবে নিল এই সময় বেল বাজলে মা কি কি ভাবতে পারে। সুইচে চাপ দিতেই বেল বাজার সাথে সাথে দরজা খুলে গেল। সোহাগ অবাক হয়ে দেখল বাবা মা দুজনেই সামনে দাঁড়িয়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবামা তাকে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা জানাল। মায়ের চোখে আনন্দে মুক্ত বিন্দু ঝরছে। সোহাগ ভীষণ আপ্লুত হয়ে জিজ্ঞেস করল-— তোমারা বুঝলে কি করে আমি বাড়ি আসব? মা চোখের জল সামলে বলল-— যেদিন তুই বাবা হবি সেদিন বুঝতে পারবি।— কিন্তু বাবা তোমার তো ডিউটিতে থাকার কথা?বাবা সোহাগের পিঠ চাপড়ে বলল- তোর জন্মদিনে আমার কোনো ডিউটি নেই খোকা। ডিউটি শুধু তোর মায়ের হাতের সর্ষে ইলিশ খাওয়া।তিনজনে এক সাথে হেসে উঠল। ফুলের বুকেগুলো পেয়ে বাবা মা দুজনেই খুব খুশি হয়েছে। কিছুক্ষণ পরে কিচেন থেকে সর্ষে ইলিষের গন্ধে পুরো বাসা ভরেগেলো। হটাত মা বলে উঠল-— সোহাগ এভাবেই আমাদের ইচ্ছে গুলোকে অল্প সময় নয়, দীর্ঘকাল ঘরে বসানো যায়।
♦–♦♦–♦♦–♦
গল্পের সমস্ত চরিত্র এবং ঘটনা কাল্পনিক । কোন মিল অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয় ।
❤ Support Us








