- খাস-কলম দে । শ
- জানুয়ারি ১৬, ২০২৪
সাগর এখন মহাসাগর। বিশ্বের বৃহত্তম পূর্ণার্থীর সমাবেশকে জাতীয় ঐতিহ্যের মর্যাদা দেওয়া হোক । দাবি তুলেছেন, বাহার উদ্দিন । দাবির ভিত্তি কী ?
ভ্যাটিকান, জেরুজালেম আর মক্কার হজ সমাবেশকে সংখ্যার নিরিখে অতিক্রম করল গঙ্গাসাগরের মহা সামুদ্রিক পুণ্যস্নান। এ এক বিরল ব্যতিক্রম। সাগর এখন কার্যত মহাসাগর। রাতের অন্ধকার, ভোরের সূর্য আর বিকেলের সূর্যাস্তকে সাক্ষী রেখে অদৃশ্য, স্তব্ধ শক্তির উদ্দেশ্যে রবিবার রাত ১২:১৩ থেকে আনুষ্ঠানিক আরাধনা শুরু করেছেন ১ কোটি পূর্ণার্থী। সোমবার শেষ হল মধ্যরাত পেরিয়ে, ১২:১৩ মিনিটে। বিশ্বের আর কোথাও এত বড়ো পূর্ণার্থী সমাগম হয় না, আমাদের এ সিদ্ধান্তের পূর্ণ সমর্থক প্রাপ্য তথ্য আর প্রমিত উচ্ছ্বাস।
এত দিন বলা হতো, হজ দুনিয়ার বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ। বলার কারণ, সৌদি আরবের অর্থনীতি, সামাজিক গৌরব যুগ যুগ ধরে নিয়ন্ত্রণ করে হজকেন্দ্রিক তীর্থযাত্রা। যোগ দেন বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলিম। প্রাক্ ইসলামি পর্ব থেকে ইসলামের উত্থান পর্যন্ত এটাই রীতি। আর এতে সায় দিত গোত্রজাত পৌত্তলিকদের সকলেই। ইসলামের উত্থানের পর, পুরাতন ঐতিহ্য আর গৌরবকে স্বীকৃতি জানিয়ে হজকে একেশ্বরবাদী করে তোলা হয়। নির্দেশিত হল কেবল মুসলিমদের যোগদানের রীতি আর নীতি।
পূর্বে-পশ্চিমে ইসলামের বিস্তৃতির পর, কষ্টসাধ্য হলেও হজে অনারব মুসলিমদের সমাগম বাড়ল বটে কিন্তু ১৪শ বছর জুড়ে বহুকাল পর্যন্ত পায়ে হেঁটে, জাহাজে হজযাত্রীদের মক্কায় যেতে হত। এজন্য সমাবেশের আয়োজন আর আয়তন বিষ্ময়কর হতে পারেনি। বংশ-পরম্পরার রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে-সঙ্গে সরকার হজের সুযোগ সুবিধা ও যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করে তোলার প্রস্তুতি শুরু করে। মক্কা ও মদিনায় ইতিমধ্যে অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে। উন্নত সড়ক। উন্নত যানবাহন। লক্ষ লক্ষ লোকের থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত।
২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত হজযাত্রীর গড় সংখ্যা দাঁড়ায় অনন্ত ২২ লাখ। ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। হজ এখন সৌদি আরবের পর্যটন অর্থব্যবস্থার অন্যতম উৎস। ভ্যাটিকানে,বছরে ৫০ লাখ, জারুজালেমে ৩৫ লাখ তীর্থযাত্রী জড়ো হন, এরকম তথ্য দুষ্প্রাপ্য নয়। সংখ্যার দিক থেকে, দুদিনের মকর উৎসব অবশ্যই সর্বোচ্চ, বিশ্বের বৃহত্তম পূর্ণার্থী সমাবেশের উজ্জ্বল আধার। উত্তর প্রদেশের কুম্ভমেলা,কাশমিরের অমরনাথ, বীরভূমের পাথরচাপি, আজমিরের উরুস সব ক্ষেত্রই নির্মল ধর্মীয় সমাবেশের মিলনভূমি। সাগর মেলাও তাই। সাগরে মকরস্নানে মানুষের আবেগ আর সাধনার যোগ অসামান্য, অতুলনীয়। কুম্ভমেলা জাতীয় ইতিহ্য বলে স্বীকৃত। অবশ্যই গৌরবের বিষয়। এরকম স্বীকৃতি থেকে সাগরের মকর উৎসব বাদ পড়ল কেন? আরোপিত বৈষম্য নয় কি?
সাগর মেলাকে কেন্দ্র করে বাংলার প্রশাসন, বাঙ্গালির ভাবাবেগ, বাঙ্গালির স্ব-অভিমান, বাংলার বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম মুকুরিত আর মুখরিত। যুক্তিময় উচ্ছ্বাসে আপ্লুত। গঙ্গাসাগরে মহা ভারতের আত্ম আর ভাবনা অসীমের খোঁজে আজ একাত্ম হয়ে তার অনুভূতির পরমাত্মার সন্ধানে নিবৃত। জড়ো হয়েছে বিদেশি বিশ্ময়ও। এই জড়তাহীন উৎসবের নিরাপত্তায় বঙ্গবিশ্ব ব্যস্ত। আকাশে উড়ন্ত পাহারা, কোণায় কোণায় সি সি ক্যামেরা। সর্বত্র হাজির স্যাটেলাইট ফোন। সমুদ্রে, পর্বতের চূড়া আর নিভৃত গুহায় ধ্যানের আড়ালে যে নিরাকারকে খোঁজে ভারতের মহা আত্মা, তার মনন আর আবহমান চিন্তা নিবৃত হয়ে ঘুরে বেড়ায় যে অনিশ্চত অনিঃশেষের সাধনায়, সেই স্পর্শাতীতের অনুভূত, আয়োজিত জপতপে মিলিত হয়ে জন সমুদ্র হয়ে উঠল মহাসমুদ্র।
ফলিত দর্শন আর সমাজতত্বের এও আরেক বিষ্ময়কর উপাদান। প্রান্তিক (সআবআলটআরন) ইতিহাস চর্চার সহজিয়া খোরাকের ভেতরের খোরাক নয় কি? তত্ব আর তথ্যের বিস্তৃত বুনিয়াদি বিশ্বাসে ঠাসা, যেখানে গ্রিকো-রোমান সর্বেশ্বরবাদ, আবহমান ছায়াবাদ ও সুফিচিন্তা এবং ভারতীয় যোগীদের ধ্যান ও ভাবনার নিদর্শন ছড়িয়ে আছে, জড়িয়ে আছে শাশ্বত বঙ্গের দিকদিশারি সাধনা —তারই অভিপ্রেত চিহ্ন হয়ে থাকবে সাগরের মহাস্নান। সম্প্রতি দার্শনিক অর্থশাস্ত্রী অমর্ত্য সেন জাতিকে সতর্ক করে বলেছেন, বাংলার ঐক্যবদ্ধ সত্তার নিরাপত্তা দরকার, দরকার অনুকুল রাজনৈতিক পরিবেশ। সাগর মেলার আয়োজনে এরকম সতর্কতার দৃষ্টিপাত দেখে ভালো লাগছে। ভাবতে ও বলতে আনন্দ হচ্ছে যে, ঐক্যের সামাজিকতায় অভ্যস্ত বাংলা হার মানেনি কখনো, পরাজয় নয়, জয় তার কণ্ঠ আর অস্তিত্বের মণিহার। তার রাজনীতি,তার কৃষ্টি,তার সমস্ত প্রাঙ্গনের ভেতরে, আরো ভেতরে সর্বপ্রাণ তারুণ্য জেগে আছে, জেগে আছে ইহজাগতিকতার প্রত্যাশা ও আশ্বাস।
❤ Support Us








