Advertisement
  • খাস-কলম
  • নভেম্বর ২, ২০২৬

বদলে যাওয়া দেশে, প্রসারিত দু-বাহু !

ইমরাজ হাসান
বদলে যাওয়া দেশে, প্রসারিত দু-বাহু !

প্রেম, মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, প্রান্তিক মানুষের লড়াই আর বদলে যাওয়া ভারতের শৌখিন বাগানের বিশাল ক্যানভাস। তারই মাঝে সামান্য কাত হয়ে, দু-বাহু প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। সামনে উদ্বেলিত বিশাল জনস্রোত। রোমান্সের ‘বাদশা’ শাহরুখ খান, আজ ৬১-তে পা দিলেন। যার হাত ধরেই বদলে যেতে শুরু করেছিল হিন্দি সিনেমার প্রচলিত ঘরানা, ‘অ্যাংরি ইয়ংম্যান’-এর বদলে যিনি ফুরফুরে প্রেমের কাব্যিক নায়ক। আবার তিনি ফিরেও আসেন পূর্ব-আবর্তে। তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক, ভারতীয় সিনেমার অন্যরকম ইতিহাস। 

আশির দশকের শেষ ভাগে অমিতাভ বচ্চনের ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ ঘরানার প্রভাব ক্রমশ স্তিমিত হচ্ছে। অনিল কাপুর, মিঠুন চক্রবর্তী, ঋষি কাপুর, জ্যাকি শ্রফ, সানি দেওল, গোবিন্দা, সঞ্জয় দত্ত, রেখা, শ্রীদেবী, ডিম্পল কপাডিয়া, জয়া প্রদা, মাধুরী দীক্ষিত, জুহি চাওলা, মীনাক্ষী শেষাদ্রি, মনীষা কৈরালারা কোনোরকমে ধরে রেখেছেন বক্সঅফিস। মন্দার মুখে পড়া হিন্দি ছবির বাজার নতুন দর্শক ও নতুন ভাষা খুঁজছে। সে সময় পর্দা জুড়ে অ্যাকশন, প্রতিশোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মেলোড্রামা কিংবা কমেডির দাপট। টাটকা বাতাস নিয়ে আমির, সলমানও উঠে আসছেন ধীরে ধীরে। এমনই এক সময়ে,  ৯০-এর দশকের গোড়ায় হিন্দি সিনেমার পর্দায় যখন শাহরুখ খান এলেন, তখন দেশও গভীর পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক উদারীকরণ শুরু হয়েছে। বাজার খুলছে, বেসরকারি পুঁজির বিস্তার ঘটছে, বিশ্বায়ন, টেলিভিশন আর বিজ্ঞাপন তৈরি করছে নতুন ভোগসংস্কৃতি। শহুরে মধ্যবিত্তের সামনে খুলে যাচ্ছে উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিশাল আকাশ। একদিকে পুরনো সামাজিক মূল্যবোধ, অন্যদিকে নতুন অর্থনীতির হাতছানি।  দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছে এক নতুন ভারতীয় দর্শকসমাজ, নতুন দর্শনের অভিঘাত আছড়ে পড়ছে সর্বত্র।

এরই সাংস্কৃতিক প্রতিফলন পড়ল নব্বইয়ের দশকের রোম্যান্টিক ছবিতে। শাহরুখের উত্থানকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের বাইরে রেখে বোঝা সম্ভব নয়। তিনি এমন এক নায়ক, যিনি একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা প্রেমিক আবার নাগালের বাইরে থাকা চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, অধরা স্বপ্নেরও জ্বলজ্বলে প্রতীক। তাঁর চরিত্ররা কখনো ট্রেনে চেপে প্রেমিকার কাছে পৌঁছতে চায়, কখনো বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতীয় পরিচয়ের সংজ্ঞা খোঁজে, কখনো নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সন্দেহের মুখোমুখি হয়, আবার কখনো সমাজের প্রান্তে পড়ে থাকা মানুষের হয়ে কথা বলে। ১৯৯২ সালে ‘দিওয়ানা’ দিয়ে হিন্দি সিনেমায় আত্মপ্রকাশের পর খুব দ্রুতই শাহরুখ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, প্রচলিত নায়কের ছক মেনে চলতে তিনি আসেননি। ‘ডর’, ‘বাজিগর’, ‘আঞ্জাম’-এর মতো ছবিতে প্রেমের অন্ধকার দিক, আবেশ, প্রতিহিংসা আর হিংস্রতার রিনরিনে ছাপ নিপুণ দক্ষতায় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন দর্শকের মগজে। তখনকার মূলধারার হিন্দি সিনেমায় নায়কের যে পরিচিত ছাঁচ ছিল, এই চরিত্রগুলি তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। নায়ক হয়েও তিনি নির্দ্বিধায় নেতিবাচক, কখনো বা ভয়ংকর। এই যার শুরু, তিনিই আবার পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠলেন ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির সবচেয়ে পরিচিত প্রেমিকদের একজন।  

এ রূপান্তর নিছক বাণিজ্যিক কৌশল নয়, তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলির মধ্যে দিয়ে বদলে যাচ্ছিল ভারতীয় সমাজের প্রেম, পরিবার, শ্রেণি, অস্তিত্ব, চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাঙ্ক্ষা আর পরিচয় সংক্রান্ত ধারণাও। রাষ্ট্র, দুর্নীতি, বেকারত্ব, সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ যুবকের প্রতীক চরিত্রগুলি হয়ে উঠল অনেকবেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা প্রবণ। তাদের লক্ষ্য নিজের জায়গা তৈরি করা, প্রতিষ্ঠিত হওয়া, প্রেম পাওয়া, পরিবার গড়া, সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে তরতরিয়ে ওপরে ওঠা। উদাহরণ, ১৯৯২ সালের ‘রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’। ছবিতে রাজু একজন সাধারণ, উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক। ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বড়ো শহরে নিজের জায়গা তৈরি করতে চায় সে। কিন্তু শহর তাকে শুধু সুযোগ দেয় না, সামনে আনে প্রতিযোগিতা, অর্থের প্রলোভন, শ্রেণিগত ব্যবধান আর নৈতিকতার পরীক্ষা। একদিকে মেধা ও পরিশ্রম, অন্যদিকে পুঁজির ক্ষমতা ও পরিচিতির জোর। রাজুর সাফল্যের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে নব্বইয়ের দশকের নতুন ভারতীয় মধ্যবিত্তের উত্থানের ছবি রয়েছে।   

একই ধারায় ১৯৯৪ সালের ‘কভি হাঁ কভি না’ ছবির সুনীলকে মনে করা যাক। সে কোনোভাবেই ‘আদর্শ নায়ক’ নয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, সংগীতশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখে, প্রেমে পড়ে, ব্যর্থ হয়, ভুল করে, মিথ্যা বলে, আবার নিজের ভুলের মুখোমুখি হয়। সুনীলের মধ্যে যে অপূর্ণতা, অপরিণত আবেগ, সাধারণ মানুষের মতো ব্যর্থ হওয়ার ক্ষমতা রয়েছে, তা তাকে অন্য রকম করে তোলে। সে সব সময় জেতে না। প্রেমিকাকে পাওয়াই তার জীবনের একমাত্র পরিণতি নয়। বরং জীবনের কিছু হার মেনে নিয়েও বেঁচে থাকতে হয়, সে কথাটিই ছবিটি বলে।এই চরিত্রগুলির বিশেষত্ব হল, তারা কোনও অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী নয়। তাদের হাতে নেই বিপুল সম্পদ, নেই রাজনৈতিক ক্ষমতা, নেই সামাজিক প্রতিষ্ঠা। আছে স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য ছুটে চলা। শাহরুখের অভিনয়ের মধ্যে এই ছটফটানি, তাঁর নিজের আত্মবিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনিশ্চয়তা, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়কেও স্পষ্ট করে তুলেছিল।

মধ্যবিত্তের ‘নায়ক’ ক্রমশ বদলাতে শুরু করেন। ১৯৯৫ সালের ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’ সে পরিবর্তনের সবচেয়ে বড়ো মাইলফলক। ‘ডিডিএলজে’-র রাজ মালহোত্রা আর ‘রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’-এর রাজু এক মানুষ নয়। শহুরে জীবনে টিকে থাকার সংগ্রাম, দ্বন্দ্বই রাজুর ভবিতব্য, রাজ সেখানে লন্ডনে বেড়ে ওঠা, স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান। তার হাতে অর্থ আছে, ভ্রমণের স্বাধীনতা আছে, বিলাসের সুযোগ আছে। সে ইউরোপ ঘুরতে পারে, নিজের পছন্দমতো জীবন কাটাতে পারে। তার প্রেমের গল্পের পটভূমিতে রয়েছে বিদেশের রেলস্টেশন, সুইৎজারল্যান্ডের পাহাড়, ইউরোপের পর্যটনকেন্দ্র আর পাঞ্জাবের ‘নান্দনিক’ সর্ষেখেত। এ ছবি দিয়েই হিন্দি সিনেমায় এনআরআই মধ্যবিত্তের নতুন সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদেশে থেকেও ভারতীয় থাকা, আধুনিক জীবনযাপন করেও পরিবারের সম্মান রক্ষা করা, নিজের পছন্দে প্রেম করা অথচ বাবার অনুমোদন পাওয়া — রাজের প্রেমের রাজনীতি এ সমীকরণের মধ্যেই আবর্তিত।

সমাজতাত্ত্বিক প্যাট্রিসিয়া উবেরোই তাঁর গবেষণা ‘দ্য ডায়াসপোরা কামস হোম: ডিসিপ্লিনিং ডিজায়ার ইন ডিডিএলজে’-তে ছবিটিকে আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠা ভারতীয় মধ্যবিত্ত পরিবার, প্রেম, বিয়ের সামাজিক কাঠামোর প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে, ছবিটি ব্যক্তিগত প্রেমের স্বাধীনতাকে শেষ পর্যন্ত পরিবারের অনুমোদিত পরিসরের মধ্যে নিয়ে আসে। অর্থাৎ প্রেমের জয় হয়, কিন্তু পরিবারের প্রচলিত কাঠামো ভেঙে নয়। এ জায়গাতেই শাহরুখের রোম্যান্টিক নায়কের  গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ভূমিকা রয়েছে। তিনি একদিকে আধুনিক, স্বাধীনচেতা, বিশ্বনাগরিক যুবকের প্রতীক হয়ে উঠছেন, একই সঙ্গে আবার পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধ, বাবা-মায়ের সম্মান রক্ষায় আগ্রহী সন্তান। তাঁর প্রেমিক চরিত্রগুলি বিদ্রোহ করে, কিন্তু সে বিদ্রোহের চূড়ান্ত লক্ষ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রচলিত পারিবারিক কাঠামোর ভিতরেই স্বীকৃতি পাওয়া। এই প্রেমের জগৎটি মূলত স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের অবিরত আকাঙ্ক্ষার। যে তরুণের হাতে বিদেশ ভ্রমণের টাকা নেই, সামাজিক নিরাপত্তা নেই, যে মেয়ের নিজের জীবন বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা নেই — তাদের বাস্তবতা এ ছবির জাঁকজমকের বাইরে থেকে যায়। ফলে শাহরুখের প্রেমের সিনেমা যেমন নতুন ভারতের স্বপ্নকে জনপ্রিয় করেছিল, তেমনই সে স্বপ্নের নিদারুণ শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতাও বহন করে চলেছে।

শাহরুখের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তাঁর প্রেমিক চরিত্রের শারীরিক ও আবেগগত প্রকাশভঙ্গি। হিন্দি সিনেমার পুরুষ নায়ক দীর্ঘদিন ধরে ছিলেন শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী, অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃত্বপরায়ণ। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হলে তিনি রেগে যেতেন, প্রতিশোধ নিতেন, অথবা নিজের পৌরুষের জোরে পরিস্থিতি বদলে দিতে চাইতেন। শাহরুখের চরিত্রগুলি সে ছকের মধ্যে থেকেও অন্য কিছু করে চলেছিল। তারা কাঁদত, কষ্ট পেত, প্রত্যাখ্যানের ভয় পেত, প্রেমের জন্য অপেক্ষা করত। কখনো নিজেদের অসহায়তাও প্রকাশ করত। তাঁর হাসি, চোখের জল, হাত ছড়িয়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গি, প্রেমিকার সামনে আবেগে ভেঙে পড়া — সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল জনপ্রিয়, অনন্য এক প্রেমপুরুষ-ভাবমূর্তি। 

২০১৮ সালে প্রকাশিত প্রাসীদা গোপীনাথের গবেষণাপত্র ‘A Feeling You Cannot Resist: Shah Rukh Khan, Affect, and the Re-scripting of Male Stardom in Hindi Cinema’-তে এই পরিবর্তনটি বিশেষ ভাবে আলোচিত হয়েছে। গবেষকের মতে, শাহরুখের তারকাসত্তা পুরুষ নায়কের প্রচলিত রাগ ও কর্তৃত্বের বদলে আবেগ, সংবেদনশীলতা এবং শারীরিক দুর্বলতাকে সামনে এনেছিল। এর ফলে মধ্যবিত্ত পুরুষত্বের নতুন পর্দারূপ তৈরি হয়। তবে, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’, ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’, ‘মোহাব্বতে’, ‘দেবদাস’, ‘কাল হো না হো’, ‘বীর-জারা’— প্রতিটি ছবিতে প্রেমের প্রকাশ আলাদা। কখনো প্রেম বন্ধুত্বের মধ্যে দিয়ে আসে, কখনো সামাজিক বাধা অতিক্রম করে, কখনো বিচ্ছেদ ও অপেক্ষার মধ্য দিয়ে, কখনো আবার অসম্ভব এক ভালোবাসার অক্ষত স্মৃতি হয়ে থেকে যায়। বিশেষ করে ‘বীর-জারা’য় প্রেম আর নিছক ব্যক্তিগত অনুভূতি থাকে না। ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত, জাতীয় পরিচয়, রাজনৈতিক অবিশ্বাস আর দীর্ঘ বন্দিজীবনের মধ্যে প্রেমের অস্তিত্ব ছবিটিকে অন্য মাত্রা দেয়। এক ভারতীয় বিমানবাহিনীর অফিসার ও এক পাকিস্তানি নারীর সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ছবিটি দেখাতে চেয়েছিল, রাষ্ট্রের তৈরি সীমান্ত মানুষের আবেগকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। রোম্যান্টিক জগতের বিশাল ক্যানভাসে বৈপরীত্যও আছে। শাহরুখের প্রেমিক চরিত্রগুলি প্রায়ই নারীর স্বাধীনতার কথা বললেও, অধিকাংশ ছবিতে কাহিনির কেন্দ্র থাকে পুরুষের আকাঙ্ক্ষা, পুরুষের অপেক্ষা কিংবা পুরুষের আত্মত্যাগ। নারী চরিত্রের নিজস্ব সিদ্ধান্ত, পেশাগত জীবন, শ্রেণিগত অবস্থান কিংবা স্বাধীন অস্তিত্ব অনেক সময়ই প্রেমের আখ্যানের আড়ালেই থেকে গেছে। এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেই তাঁর প্রেমের সিনেমার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বুঝতে হবে।

তাঁকে কেবল প্রেমের শাশ্বত নায়ক হিসেবে দেখলে তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যায় বাদ থেকে যাবে। তাঁর অন্য ধারার ছবিগুলিতে এমন কিছু চরিত্র রয়েছে, যা বদলে দেয় প্রচলিত ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রেমধারণা। বৃহত্তর দায়বদ্ধতা, শ্রেণিগত বৈষম্য, ধর্মীয় পরিচয়, জাতীয়তাবাদ, মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন উঠে আসে সমহিমায়। ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া আশুতোষ গোয়ারিকরের ‘স্বদেশ’ সে তালিকার প্রথম সারিতে থাকবে। মোহন ভার্গব নাসায় কর্মরত ভারতীয় বিজ্ঞানী। তাঁর জীবন স্বচ্ছল, কর্মজীবন প্রতিষ্ঠিত, ভবিষ্যৎ নিরাপদ। আমেরিকার উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক পরিকাঠামোর মধ্যে তাঁর দিন কাটে। কিন্তু শৈশবের পরিচর্যাকারী কাবেরী আম্মাকে ফিরিয়ে আনতে ভারতে এসে তিনি অন্য এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ পানীয় জল, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, ন্যূনতম নাগরিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত। গ্রামের শিশুদের স্কুলে যাওয়ার বদলে কাজ করতে হয়। জাতপাতের ব্যবধান মানুষের সামাজিক সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থনৈতিক অভাবের কারণে বহু মানুষ নিজেদের প্রতিভা এবং সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে না।

মোহন প্রথমে এ বাস্তবতাকে বাইরের মানুষের চোখে দেখেন। পরে ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, এ কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক অবস্থান নয়, উন্নয়নের অসম বণ্টনের ফল। শহর ও গ্রামের যে ব্যবধান, তা আয় বা পরিকাঠামোর পার্থক্যই নয়; সুযোগ পাওয়ার অধিকারেরও প্রশ্ন। ছবির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ জায়গা বোধহয় এই যে, মোহন কোনো অতিমানবীয় নায়ক নন। তিনি গ্রামে এসে একাই সব সমস্যার সমাধান করে দেন না। বরং গ্রামের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে করতে শেখেন, শেখান। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে বোঝান, উন্নয়ন মানে আসলে কী! শহুরে ঝাঁ চকচকে বাড়ি, গাড়ি, শপিংমল, যাবতীয় সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের অশ্লীল দেখনদারির অন্যদিকে রয়েছে আরেক বাস্তব, অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয়, উন্নয়ন মানে যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন।

‘স্বদেশ’-এর মোহন দেশপ্রেমের প্রচলিত সংজ্ঞাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। দেশকে ভালোবাসা মানে বিশেষ বিশেষ দিনে জাতীয় পতাকা ওড়ানো, জাতীয় সংগীতে দাঁড়ানো, সহনাগরিককে আঘাত করা কিংবা আবেগমথিত বক্তৃতা নয়। দেশকে ভালোবাসা মানে তার সমস্ত নাগরিকদের জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করার ধারাবাহিক চেষ্টা। বক্স অফিসে ছবিটি সাফল্য পায়নি। এ খানিক প্রত্যাশিত। তবে, সময়ের সঙ্গে ‘স্বদেশ’ শাহরুখের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিনয় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটও ছবিটিকে তাঁর অপরিহার্য চলচ্চিত্রগুলির তালিকায় রেখেছে। এ ছবির গুরুত্ব আজ আরও বেশি। উন্নয়নের আলোচনায় যখন মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, পরিকাঠামো, প্রযুক্তি এবং বিশ্বমঞ্চে দেশের অবস্থান নিয়ে বিপুল প্রচার চলে, তখন ‘স্বদেশ’ মনে করিয়ে দেয় — উন্নয়নের আসল মাপকাঠি হল সাধারণ মানুষের জীবন কতটা বদলাল। আর তা বদলাচ্ছে কী?

সুভাষ ঘাই পরিচালিত ‘পরদেশ’, ভারতীয় সমাজে যখন বিদেশে পাড়ি দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ক্রমশ বাড়ছে, প্রবাসী ভারতীয়ের জীবন ও স্বদেশের প্রতি টানকে এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরে ছবিটি। ছবির গল্পে আমেরিকায় বসবাসকারী ধনাঢ্য ভারতীয় ব্যবসায়ী কিষেণলাল বিদেশের মাটিতে বড়ো হলেও ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট রাখতে চান। সে আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি নিজের ছেলে রাজীবের সঙ্গে গঙ্গার বিয়ে দিতে চান। কিন্তু বিদেশের চাকচিক্য, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ভোগবাদী জীবনযাপনের সঙ্গে গঙ্গার বেড়ে ওঠা ভারতীয় মূল্যবোধের সংঘাত ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শাহরুখ অভিনীত অর্জুন চরিত্রটি এই দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক সেতুর ভূমিকা নেয়। ‘পরদেশ’ শুধু প্রেমের ছবি নয়, প্রবাসী ভারতীয়ের সাংস্কৃতিক পরিচয়, দেশপ্রেম, পশ্চিমের প্রতি আকর্ষণ আর স্বদেশের প্রতি নস্টালজিয়ার এক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রভাষ্য। তবে ছবির ভারতীয় সংস্কৃতি ও পাশ্চাত্য জীবনযাপনের দ্বৈত বিভাজনকে সরলীকৃত বলেও সমালোচনা আছে। আবার সাম্প্রতিকালের, ‘ডাঙ্কি’; অবৈধ অভিবাসন, উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা, সীমান্ত অতিক্রমের বিপজ্জনক পথ, দেশ ছেড়ে যাওয়ার পিছনে থাকা আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা। যা প্রশ্ন তোলে, কেন মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে যেতে চায়? কেন উন্নত জীবনের স্বপ্ন বিপজ্জনক সীমান্তপথে ঠেলে দেয়? কেন বৈধ অভিবাসনের সুযোগ না পেয়ে মানুষ দালালচক্রের হাতে পড়ে?   

২০০৭ সালের ‘চক দে ! ইন্ডিয়া’ শাহরুখের অভিনয়জীবনের অন্যতম রাজনৈতিক ছবি। শিমিত আমিন পরিচালিত এবং জয়দীপ সাহনি রচিত এই ছবিতে শাহরুখ অভিনয় করেছেন কবীর খান নামে এক প্রাক্তন ভারতীয় হকি অধিনায়কের চরিত্রে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে পরাজয়ের পর কবীরের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ ওঠে। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়, পাকিস্তানি খেলোয়াড়ের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়কে কেন্দ্র করে সন্দেহ তৈরি হয়। যে মানুষটি দেশের হয়ে খেলেছেন, তাকেই শেষ পর্যন্ত নিজের দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে হয়। ছবিটি ভারতীয় সমাজের  গভীর সমস্যাকে সামনে আনে। একজন মুসলিম নাগরিকের দেশপ্রেম কি তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে? প্রশ্ন করলেই কাওকে ‘দেশদ্রোহি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া যায়। আজকের ‘ঘৃণার দেশ’-এ নয়া বাস্তব। 

কবীরের গল্প আসলে সেই নাগরিকের গল্প, যাঁর জাতীয় পরিচয়কে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে সংঘাতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনো সামাজিক বিচার হয় না, তাঁকে নির্বাসিত হতে হয়। বহু বছর পরে মহিলা হকি দলের কোচ হিসেবে ফিরে এসে তিনি অবশ্য আবার দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। ফিরে পান পুরনো গৌরব। দেশপ্রেমিকের সার্টিফিকেটও জোটে বইকি। কিন্তু ‘চক দে! ইন্ডিয়া’ কোনোভাবেই কবীরের ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের গল্প নয়। ছবির আসল রাজনৈতিক গুরুত্ব মহিলা হকি দলের সদস্যদের মধ্যে। দেশের বিভিন্ন রাজ্য, ভাষা, জাতি, ধর্ম, শ্রেণি এবং সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে আসা মেয়েরা এক দলে খেলতে এসে পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। পাঞ্জাবের বালবীর, হরিয়ানার কোমল, মণিপুরের মেরি, ঝাড়খণ্ডের জনজাতি মেয়েরা — প্রত্যেকের নিজস্ব পরিচয় ও লড়াই রয়েছে। দলের ভিতরেও রয়েছে আঞ্চলিক বিদ্বেষ, ভাষাগত বিভাজন, লিঙ্গবৈষম্য এবং সুযোগ পাওয়ার অসমতা। মেয়েদের একত্রিত করার প্রক্রিয়ায় ছবিটি জাতীয়তাবাদের বিকল্প ধারণা হাজির করে। ভারত কোনো এক ভাষা, এক অঞ্চল, এক ধর্ম কিংবা এক সংস্কৃতির নাম নয়। ভারত গড়ে ওঠে বিবিধতার, বহু পরিচয়ের, বহু অস্তিত্বের, বহু সংস্কৃতির পারস্পরিক সহাবস্থানে।

২০১০ সালের ‘মাই নেম ইজ খান’ শাহরুখের অভিনীত চরিত্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্র বলে আলোচিত হয়েছে বারবার। করণ জোহর পরিচালিত ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন রিজওয়ান খানের ভূমিকায়। ‘অ্যাসপারজার সিনড্রোম’ নিয়ে বেঁচে থাকা রিজওয়ান একজন ভারতীয় মুসলমান। কাজের সূত্রে আমেরিকায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানে মন্দিরা নামে এক হিন্দু মহিলাকে বিয়ে করেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় সন্ত্রাসবাদী হামলার পর দেশটির সামাজিক পরিবেশ দ্রুত বদলে যায়। ধর্মীয় পরিচয়, ধর্ম ও সন্ত্রাসবাদের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিস্থাপনে বিপজ্জনক পশ্চিমি চেষ্টা, নতুন সমীকরণ তৈরি করতে থাকে। নাম, পোশাক কিংবা চেহারার কারণে সাধারণ মানুষ সন্দেহের মুখে পড়তে শুরু করেন। অভিবাসী জীবন হয়ে ওঠে আরও অনিশ্চিত।   

এ পরিস্থিতিতে রিজওয়ানও বৈষম্যের শিকার হন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাঁর পরিবার আক্রান্ত হয়। এরপর তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে পড়েন দুর্দম, দীর্ঘ যাত্রায়। নিজের পরিচয় সম্পর্কে একটি কথা জানাতে চান — ‘মাই নেম ইজ খান, অ্যান্ড আই অ্যাম নট আ টেররিস্ট’। ছবির রাজনৈতিক তাৎপর্য এই যে, রিজওয়ান নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে কোনোরকম ধর্মীয় বা রাজনৈতিক যুক্তি হাজির করেন না। তিনি মানবিকতার সহজ বিভাজনে বিশ্বাস করেন — মানুষ ভালো হতে পারে, খারাপও হতে পারে। কোনো ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে একজন মানুষের নৈতিকতা নির্ধারণ করা যায় না। শাহরুখের অভিনীত চরিত্রটি একদিকে আমেরিকার ইসলামবিদ্বেষী সামাজিক পরিবেশের সমালোচনা করে, অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম পরিচয়ের মানুষের উপর নেমে আসা সন্দেহ ও বর্জনের বৃহত্তর বাস্তবতার কথাও মনে করিয়ে দেয়।

ছবিটির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ভারতীয় সমাজের প্রেক্ষাপটে যে প্রশ্ন আরও বিস্তৃত হতে পারত, তা হয়নি। যে দেশে ভূখণ্ড, জাতি, বর্ণ, ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, নাম, ভাষা, পেশা, উৎসব, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক যেখানে দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়, সেখানে সুদূর আমেরিকার প্রবাসী জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত কিছুটা দূরের বলেই মনে হয়। একজন নাগরিককে কেন বারবার দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে হবে? কেন তাঁর জাতীয় পরিচয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে? কেন তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হবে? কেন কোনো অপরাধের দায় ব্যক্তির পরিবর্তে গোটা সম্প্রদায়ের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে? ‘মাই নেম ইজ খান’ প্রশ্নগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় নিশ্চয়, কিন্তু ভারতীয় বাস্তবতার দিকে সেগুলিকে ফিরিয়ে আনে না কোনোভাবেই। ছবিতে আমেরিকার বর্ণবাদ ও ধর্মবিদ্বেষের বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে সব সময় যথেষ্ট গভীরতায় বিশ্লেষণ করা হয়নি। রিজওয়ানের ব্যক্তিগত যাত্রা, আবেগের উপর বেশি জোর দেওয়ায় বৈষম্যের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক ভিত্তি কিছুটা পিছনে চলে যায়।

তবে, ‘মাই নেম ইজ খান’ ভারতীয় সাম্প্রদায়িকতার প্রসঙ্গ একেবারেই যে এড়িয়ে গেছে, তাও নয়। রিজওয়ানের শৈশবের স্মৃতিতে রয়েছে ১৯৯২-৯৩ সালের মুম্বই দাঙ্গার অভিঘাত। ছোট্ট রিজওয়ান দেখে, কী ভাবে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে আলাদা করা হচ্ছে, কী ভাবে প্রতিবেশী পরস্পরের শত্রু হয়ে উঠছে। তাঁর মা তাঁকে শেখান, পৃথিবীতে দু-ধরনের মানুষ — ভাল মানুষ আর খারাপ মানুষ। ধর্মীয় বিভাজন দিয়ে মানুষকে বিচার করা যায় না। এ দৃশ্য ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত। এখানেই রিজওয়ানের মানবিক দর্শনের জন্ম। এখানেই ভারতীয় সমাজের সাম্প্রদায়িক বাস্তবতার সঙ্গে ছবিটির প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ স্মৃতিকে ছবির মূল আখ্যানের কেন্দ্রে রাখা হল না কেন? ১৯৯২-৯৩ সালের মুম্বই দাঙ্গা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ, ভারতীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার প্রশ্নে ছবিটির সামনে জ্বলন্ত বাস্তব ঐতিহাসিক উপাদান ছিল। অথচ ছবিটি সে ইতিহাসকে রিজওয়ানের ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। ভারতীয় সমাজে সাম্প্রদায়িকতার দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো, দাঙ্গার পর মানুষের পুনর্বাসন, বিচার না পাওয়ার অভিজ্ঞতা, সংখ্যালঘু মহল্লার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রশ্নে আর এগোয়নি। অথচ ছবিটি চাইলে অন্য রকম হতে পারত। রিজওয়ানের গল্প যদি ভারতের মাটিতেই শুরু হয়ে ভারতের মাটিতেই এগোত, তা হলে একজন মুসলিম নাগরিকের জীবনযাত্রার বহু স্তর উঠে আসতে পারত। 

তবে, সীমাবদ্ধতার প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ছবির নির্মাণকাল, তার বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান বুঝতে হবে। ২০১০ সালে ‘মাই নেম ইজ খান’ মুক্তির আগে শাহরুখ খানের নিজের জীবনেও একাধিক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। নিউ ইয়র্কের নিউয়ার্ক বিমানবন্দরে তাঁর নামের কারণে তাঁকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। তীব্র আলোড়ন পড়ে গেছিল গোটা পৃথিবীতে। আবার, একই সময়ে ছবির মুক্তি ঘিরে ভারতে প্রতিবাদও তৈরি হয়েছিল। আইপিএলে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের দলে নেওয়ার পক্ষে শাহরুখের বক্তব্যের পর তাঁকে নিশানা করা হয়েছিল। ছবিটি মুক্তির সময় এই বাস্তবতা তাকে আরও বহুমাত্রিক তাৎপর্য দিয়েছিল। তবে, নির্মাতারা কেন ভারতীয় সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নটিকে মূল কাহিনিতে আনলেন না, সে নিয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। ফলে, একে সরাসরি সেন্সরশিপের ভয়, রাজনৈতিক চাপ কিংবা শাহরুখ, করণের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল, কিছুই বলা যাবে না। তবে ছবিটির আন্তর্জাতিক বিপণন, প্রবাসী ভারতীয় দর্শক এবং আমেরিকার ৯/১১-পরবর্তী ধর্মবিদ্বেষকে কেন্দ্র করে নির্মিত সর্বজনগ্রাহ্য মানবিক আখ্যানের দিকে ঝোঁক যে এর কাহিনির পরিসর নির্ধারণ করেছে, তা আরও আলোচনার দাবি রাখে।

শাহরুখের অন্য ধারার ছবির কথা বলতে গেলে ‘বিল্লু’ (২০০৯)-এর কথা আলাদা করে বলতে হয়। প্রিয়দর্শন পরিচালিত এই ছবিতে শাহরুখ নিজে একজন সুপারস্টারের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু ছবির মূল চরিত্র বিল্লু, গ্রামের এক সাধারণ নাপিত। তাঁর আর্থিক অবস্থা খারাপ। সংসার চালাতে সমস্যা হয়। সন্তানদের পড়াশোনা, দৈনন্দিন খরচ এবং সামাজিক সম্মান —সবকিছু নিয়েই তাঁর লড়াই। হঠাৎ গ্রামের মানুষ জানতে পারে, বিল্লুর সঙ্গে এক বিখ্যাত চলচ্চিত্র তারকার বন্ধুত্ব রয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় তার সামাজিক অবস্থান। যে মানুষটিকে আগে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না, তাঁকে ঘিরে তৈরি হয় কৌতূহল। গ্রামের মানুষের কাছে বিল্লুর মূল্য যেন তার নিজের অস্তিত্বে নয়, বরং একজন বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে। শ্রেণিগত মর্যাদার এক চমৎকার কনট্রাষ্ট। বিল্লুর নিজের কোনও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নেই, সামাজিক প্রতিষ্ঠা নেই, এমনকি নিজের কথা প্রতিষ্ঠা করার মতো সুযোগও নেই। অথচ একজন তারকার সঙ্গে পরিচয়ের সম্ভাবনাই তাঁকে সাময়িক সামাজিক গুরুত্ব এনে দেয়। এ ছবিতে শাহরুখের উপস্থিতি এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। তিনি নিজের তারকাখ্যাতিকে ব্যবহার করেছেন এমন এক গল্পের ভিতর, যেখানে তাঁর চরিত্রই আসলে প্রান্তিক মানুষের সামাজিক স্বীকৃতির প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে আসে। ছবির কেন্দ্রে সুপারস্টার নয়, নাপিত বিল্লু। শেষে শিকড়ে ফেরার কথা, সহজ সরল সম্পর্কের কথা। অভিনয়ে প্রবাদপ্রতিম ইরফান খান। ‘ফ্যান’ ছবিতেও তারকাখ্যাতি আর সাধারণ মানুষের সম্পর্ক নিয়ে অন্য ধরনের আলোচনা রয়েছে। গৌরব নামে এক যুবক নিজের প্রিয় অভিনেতাকে প্রায় ঈশ্বরের জায়গায় বসিয়ে দেয়। কিন্তু তারকার সঙ্গে বাস্তব মানুষের সম্পর্ক যে সমান নয়, সেখানে যে ক্ষমতার ব্যবধান রয়েছে, তা ছবির কাহিনিতে স্পষ্ট হয়। গৌরবের জীবন তারকার পরিচয়ের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে চায়। তার আবেগ, ভালোবাসা এবং প্রত্যাশার কোনো মূল্য যখন তারকার কাছে থাকে না, তখন সে ভক্তি ক্রমশ হিংস্র হয়ে ওঠে। ছবিটি প্রশ্ন তোলে — জনপ্রিয়তার বাজারে একজন তারকা কি তাঁর ভক্তদের কাছে দায়বদ্ধ? না কি বাজার তাঁকে এমন এক দূরত্বে নিয়ে যায়, যেখানে সাধারণ মানুষের আবেগের আর কোনো মূল্য থাকে না?  

২০২৩ সালের ‘জওয়ান’ শাহরুখের চলচ্চিত্রজীবনে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। অ্যাটলি পরিচালিত এ ছবিতে ব্যক্তিগত প্রতিশোধের গল্পের সঙ্গে জুড়ে যায় কৃষক, ঋণ, সরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্য পরিষেবা, অস্ত্র ব্যবসা, নির্বাচন এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন। হিন্দি সিনেমায় আবার ফিরে আসে ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’। কৃষকের আত্মহত্যা, ঋণের বোঝা, সরকারি হাসপাতালের দুরবস্থা  সাধারণ মানুষের অধিকারের প্রশ্ন বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে দর্শকের বুক। পুঁজির মুনাফার জন্য কী ভাবে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে, সে প্রশ্নও ছবির কাহিনিতে রয়েছে। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালের পর্বটি গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসার অভাবে শিশুদের মৃত্যু, পরিকাঠামোর অভাব এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা — এসব বিষয়কে জনপ্রিয় ‘অ্যাকশন ছবি’-র ভিতরে নিয়ে এসেছে ‘জওয়ান’। আবার কৃষকের ঋণ, আত্মহত্যার প্রসঙ্গও দেখিয়েছে, কৃষি অর্থনীতির সংকট কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এ ছবি তথ্যচিত্র নয়। এর রাজনৈতিক বক্তব্য অনেক সময় অতিনাটকীয়, সমস্যার সমাধানও প্রায়ই একজন ব্যক্তির বীরত্বের উপর নির্ভরশীল। নির্বাচনী রাজনীতির জটিলতা, কৃষি সংকটের কাঠামোগত কারণ কিংবা স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা বিশ্লেষণের বদলে ছবিটি সেগুলিকে অ্যাকশন আর আবেগের মধ্যে প্রকাশ করেছে। তবু মূলধারার, বিপুল জনপ্রিয় বাণিজ্যিক ছবিতে এ ধরণের বিষয় সামনে আনা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। হিন্দি সিনেমার দর্শককে শুধু উগ্র জাতীয়তাবাদ, পুরুষ প্রধান প্রেম, প্রতিশোধ আর সস্তা বিনোদনের গল্প শুনিয়ে নয়, রাষ্ট্রের কাছে গভীর প্রশ্ন রাখার গল্প শুনিয়েও হলমুখী করা যায় — ‘জওয়ান’ সে সম্ভাবনা দেখিয়েছে।

আরেকটি ছবির কথা বলতে ইচ্ছা করছে, ২০১৬ সালের মুক্তি পাওয়া ‘ডিয়ার জিন্দেগি’। শাহরুখ অভিনয় করেছেন জাহাঙ্গির খানের চরিত্রে। আলিয়া ভট্ট অভিনীত, কায়রা নামের এক তরুণী,যে নিজের সম্পর্ক, কাজ, ব্যক্তিগত জীবনের নানা সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। জাহাঙ্গির একজন মনোবিদ, যিনি তাঁর সঙ্গে কথা বলে জীবনের জটিলতাগুলি বুঝতে সাহায্য করেন।এ ছবিতে শাহরুখ প্রচলিত নায়কের ভূমিকায় নেই। সমস্যার জাদুকরি সমাধানও তিনি দেন না, কারও জীবন নিজের হাতে বদলেও দেন না। বরং একজন মানুষকে নিজের অভিজ্ঞতা, ভুল করা আর মানসিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহায্য করেন। তাঁর চরিত্রটি তাই প্রেমিক বা উদ্ধারকর্তা নয়, একজন শ্রোতা, সহযাত্রীর। যে ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যাকে নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখে না। সম্পর্কের জটিলতা, পরিবারে অস্বস্তি, অতীতের অভিজ্ঞতা, নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশয় — এসবকেই জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখে। সে দর্শন ছড়িয়ে দেয় সহযাত্রী, সহযোদ্ধার মধ্যেও।

ফলে, শাহরুখের চলচ্চিত্রজীবনকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন। তাঁর সিনেমায় মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, প্রান্তিক মানুষের উপস্থিতি থাকলেও সব শ্রেণির জীবন সমান গুরুত্ব পায়নি।  নব্বইয়ের দশকের প্রেমের ছবিগুলিতে যে মধ্যবিত্তকে দেখা যায়, তার কাছে বিদেশ ভ্রমণ, দামি পোশাক, গাড়ি, বাড়ি আর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ক্রমশ আকাঙ্ক্ষার বিষয় হয়ে উঠছে। এ জীবনযাত্রা ভারতের উদারীকরণ-পরবর্তী ভোগসংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’, ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’, ‘কভি খুশি কভি গম’ কিংবা ‘কাল হো না হো’ — সব ছবিতেই পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা, সামাজিক প্রতিষ্ঠা এবং ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ‘স্বদেশ’, ‘বিল্লু’ কিংবা ‘জওয়ান’-এ অর্থনৈতিক বৈষম্যের অন্য ছবি পাওয়া যায়। সেখানে মানুষের কাছে বিদেশ ভ্রমণ বা বিলাসী জীবনযাপন প্রধান প্রশ্ন নয়। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ, শিক্ষা, চিকিৎসা, কাজ, ঋণমুক্তি এবং সামাজিক মর্যাদা। এই দুই জগতের মধ্যে দূরত্বই শাহরুখের সিনেমার বিশাল আকাশ।

তালির তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং দক্ষিণ এশীয় ভাষা ও সংস্কৃতির অধ্যাপক, চলচ্চিত্র গবেষক অ্যালেসান্দ্রা কনসোলারোর ২০১৪ সাল প্রকাশিত গবেষণাপত্র ‘Who Is Afraid of Shah Rukh Khan? Neoliberal India’s Fears Seen Through a Cinematic Prism’-তে শাহরুখের তারকাসত্তাকে উদারীকরণ-পরবর্তী ভারতের মধ্যবিত্তের উত্থান, ভোগবাদী আকাঙ্ক্ষা, পরিচয়-রাজনীতির প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁর পর্যবেক্ষণে শাহরুখ একদিকে নতুন অর্থনীতির সফলতার প্রতীক, অন্যদিকে পরিবর্তিত ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্বেগেরও প্রতিফলন। এ বিশ্লেষণের সঙ্গে আরেকটি বিষয় যুক্ত করা যায়। শাহরুখের অভিনীত চরিত্রগুলি প্রায়ই শ্রেণিগত সীমানা অতিক্রম করার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সে স্বপ্নের সফলতা সব সময় ব্যক্তিগত পরিশ্রমের ফল নয়। কখনো পারিবারিক সম্পদ, কখনো সামাজিক যোগাযোগ, কখনো তারকাখ্যাতি কিংবা কখনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত — বিভিন্ন উপাদান সে সাফল্যের পথ নির্ধারণ করে।

শাহরুখের বিখ্যাত দু-বাহু প্রসারিত করার ভঙ্গিটি তাই নিছক প্রেমের আহ্বান নয়। একসঙ্গে অনেক কিছুকে গ্রহণ করার ভঙ্গি। সে বাহুর মধ্যে রয়েছে প্রেমিকের অপেক্ষা, মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, অভিবাসীর যন্ত্রণা, নস্টালজিয়া, ধর্মীয় পরিচয়ের সংকট, গ্রামের উন্নয়নের দাবি, সমাজের প্রান্তে পড়ে থাকা মানুষের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ১৯৯০-এর দশকের ভারত নতুন করে তৈরি করছিল স্বপ্নের পরিভাষা, কী ভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়; তাতে ধ্রুবতারা ছিলন শাহরুখ, আবার  স্বপ্নের ভিতরেই কত বৈষম্য, কত অনিশ্চয়তা, কত পরিচয়ের সংঘাত লুকিয়ে রয়েছে, তা যখন ফুটে ফুটে বেড়ছে তাতেও দিকদর্শনে জ্বলজ্বল করছেন শাহরুখই। হিন্দি সিনেমায় তিনিই ‘লাস্ট অফ দ্য স্টার’। ‘দু-বাহু প্রসারিত করো’— এ আহ্বানের মধ্যে শুধু রোম্যান্স নেই। আছে এমন এক ভারত, যেখানে প্রত্যেক মানুষের অস্তিত্ব থাকবে, জায়গা থাকবে, আত্মসম্মানের সঙ্গে বাঁচবার অধিকার থাকবে। যেখানে কাউকে রিজওয়ানের মতো কাউকে বলতে হবে না, শাহরুখের মতো কাউকে বলতে হবে না, ‘মাই নেম ইজ খান, অ্যান্ড আই অ্যাম নট আ টেররিস্ট’ !

শুভ জন্মদিন, শাহরুখ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!