- খাস-কলম
- আগস্ট ১৫, ২০২৬
স্বাধীনতার আট দশক : অর্জন বৈপরীত্য ও প্রগতির রূপরেখা
ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ পেরিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট মধ্যরাতের সেই ঐতিহাসিক লগ্নে ভারত যখন ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে, তখন বিশ্বের বহু প্রভাবশালী রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এই নবজাত রাষ্ট্রটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছিল। বহু ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং শতধা বিভক্ত অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিশাল ভূখণ্ডকে ঐক্যবদ্ধ রেখে সেখানে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করা অসম্ভব বলে গণ্য করা হয়েছিল। সমস্ত আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে গত আট দশকে ভারত কেবল একটি রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকাই নয়, বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে গতিশীল গণতন্ত্র হিসেবে অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতির পথে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজ আমরা ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত; এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ নিছক উৎসব উদযাপনের নয়, বরং গভীর আত্মসমীক্ষা ও মূল্যায়নের সময়।
বিগত আট দশকের বর্ণাঢ্য পথচলা সততা ও বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে পর্যালোচনা করলে যুগান্তকারী রূপান্তরের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে — যেখানে চরম দারিদ্র্য ও খাদ্যঘাটতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে দেশ আজ খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, মহাকাশ গবেষণা থেকে তথ্যপ্রযুক্তির বৈশ্বিক মানচিত্রে অনন্য অবস্থান তৈরি করেছে এবং শক্তিশালী সংবিধানের বুনিয়াদকে আঁকড়ে ধরে বহুমাতৃক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে। তবে অর্জনের আলোয় বীর শহীদদের আত্মত্যাগ ও স্বপ্ন যেমন উজ্জ্বল হয়, তেমনই মুদ্রার অপর পিঠে আগামী দিনের নতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জগুলো আজ অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত অবক্ষয় এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর নেমে আসা অন্ধ অসহিষ্ণুতার মেঘ অগ্রগতির গতিপথকে শ্লথ করে দিচ্ছে। তাই স্বাধীনতার এই আট দশক পূর্তিতে দাঁড়িয়ে কেবল অতীত রোমন্থনে সীমাবদ্ধ থাকা চলে না; মহান প্রজাতন্ত্রের গণতান্ত্রিক মূল ভিত্তি, সংবিধানের প্রস্তাবিত সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও বৈজ্ঞানিক চেতনাকে রক্ষা করে প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল ভারত গড়ে তোলার নতুন অঙ্গীকার গ্রহণই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দাবি।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভুরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে বহু ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির এই বিশাল দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারবে না এবং এখানে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। কিন্তু ভারত সমস্ত আশঙ্কাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি কার্যকর হওয়া আমাদের সংবিধান দেশের প্রতিটি নাগরিককে প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার দিয়েছে। জাতি, ধর্ম বা বর্ণের ভেদাভেদ পেরিয়ে প্রতিটি নির্বাচন এই দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শাণিত ও শক্তিশালী করে তুলেছে। ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠন এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে পূর্ণ সম্মান জানিয়েও ভারত তার ভৌগোলিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছে, যা বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারত ছিল এক চরম দারিদ্র্যপীড়িত ও মূলত কৃষিভিত্তিক দেশ, যা খাদ্যের চাহিদার জন্যও বহুলংশে আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে স্বাধীনোত্তর ভারতের নীতিনির্ধারক ও পরিশ্রমী কৃষকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ষাটের দশকে ‘সবুজ বিপ্লব’ সংঘটিত হয়, যার মাধ্যমে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। আজ ভারত কেবল তার বিশাল জনসংখ্যার অন্নই জোগাচ্ছে না, বিশ্বের দরবারে অন্যতম প্রধান খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক হিসেবেও নিজের অবস্থান শক্ত করেছে।
পরবর্তীকালে, ১৯৯১ সালের যুগান্তকারী অর্থনৈতিক সংস্কার ভারতের অর্থনীতিকে এক সম্পূর্ণ নতুন গতিপথে চালিত করে। এর ফলস্বরূপ, বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তি (IT), ইসরোর (ISRO) হাত ধরে মহাকাশ গবেষণা এবং উদীয়মান স্টার্ট-আপ সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মহাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অর্থনৈতিক এই প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও সাধিত হয়েছে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষরতার হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মানুষের গড় আয়ুও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নারীশিক্ষার ব্যাপক প্রসার এবং সমাজজীবনে লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠার কঠিন লড়াইয়ে দেশ আজ অনেকদূর এগিয়ে গেছে। একই সঙ্গে, প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক যোজনা— যেমন বিনামূল্যে খাদ্য সুরক্ষা, গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে আবাসন প্রকল্প এবং জন ধন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি—সামাজিক সুরক্ষার পরিধিকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করেছে।
স্বাধীনতার আট দশক পূর্তি নিছক কোনো উৎসব পালনের উপলক্ষ নয়; এটি আত্মসমীক্ষা ও আত্মমূল্যায়নের এক পরম মুহূর্ত। ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল পেরিয়ে ভারত আজ এক আত্মবিশ্বাসী ও উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রার প্রকৃত সার্থকতা তখনই অর্জিত হবে যখন দেশের শেষ প্রান্তের মানুষটির মুখে হাসি ফুটবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সমাজের অন্তিম ব্যক্তির দোরগোড়ায় পৌঁছাবে। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক সমতাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল ভারত গড়ে তোলা, যা কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও শক্তিতেই নয়, বরং মানবতা, সহনশীলতা এবং বিশ্বশান্তির বার্তার ক্ষেত্রেও গোটা বিশ্বকে পথ দেখাবে
স্বাধীনতার আট দশকে দাঁড়িয়ে আমাদের অর্জন যেমন গৌরবোজ্জ্বল, তেমনই কিছু গভীর ও কাঠামোগত সমস্যা আজও আমাদের অগ্রগতির গতিপথকে মন্থর করে রাখছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জাতীয় উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও ‘ধনীর ধন এবং দরিদ্রের দরিদ্রতা’— এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্য আজ এক গভীর চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজের একটি বিরাট অংশ এখনও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। এর পাশাপাশি, দেশের বিপুল যুবশক্তিকে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তেমনি জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ দূষণের মাত্রা যেভাবে তীব্র আকার ধারণ করেছে, তা দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী উন্নয়নের পথে এক বড় অন্তরায় হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতার আট দশক পূর্তি নিছক কোনো উৎসব পালনের উপলক্ষ নয়; এটি আত্মসমীক্ষা ও আত্মমূল্যায়নের এক পরম মুহূর্ত। ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল পেরিয়ে ভারত আজ এক আত্মবিশ্বাসী ও উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রার প্রকৃত সার্থকতা তখনই অর্জিত হবে যখন দেশের শেষ প্রান্তের মানুষটির মুখে হাসি ফুটবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সমাজের অন্তিম ব্যক্তির দোরগোড়ায় পৌঁছাবে। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক সমতাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল ভারত গড়ে তোলা, যা কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও শক্তিতেই নয়, বরং মানবতা, সহনশীলতা এবং বিশ্বশান্তির বার্তার ক্ষেত্রেও গোটা বিশ্বকে পথ দেখাবে।
১৯৪৭ সালে ভারত এবং ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন স্বাধীনতা লাভ করলেও গত আট দশকে চীন অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত দিক থেকে ভারতের তুলনায় যথেষ্ট এগিয়ে গেছে। ভারতের বিশাল মানবসম্পদ ও গণতান্ত্রিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও দ্রুতগতির উন্নয়নের পথে যে কাঠামোগত ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতাগুলো প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা নিম্নে তুলে ধরা হলো:
ক. প্রশাসনিক জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা (লাল ফিতের ফাঁস): যেকোনো নীতি নির্ধারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লাল ফিতের ফাঁস ভারতের অগ্রগতির অন্যতম প্রধান অন্তরায়। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্তরে স্বচ্ছতার অভাব এবং দুর্নীতির কারণে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে দেরি হয় এবং সরকারি অর্থের অপচয় ঘটে।
খ. দুর্বল পরিকাঠামো ও উৎপাদন খাতের অনগ্রসরতা: উন্নত মানের সড়ক, রেলপথ, আধুনিক বন্দর এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। চীন সুপরিকল্পিতভাবে নিজেকে ‘বিশ্বের কারখানা’ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলেও, ভারত সেবা খাতে এগোলেও উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং) খাতে পিছিয়ে রয়েছে।
গ. শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি ও গবেষণার স্বল্পতা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থ বিদ্যার প্রবণতা প্রবল এবং ব্যবহারিক বা কারিগরি দক্ষতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। জিডিপির তুলনায় গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) ভারতের বরাদ্দ উন্নত দেশ বা চীনের তুলনায় অত্যন্ত কম, যা মৌলিক উদ্ভাবনের পথকে শ্লথ করে দেয়।
ঘ. স্বাস্থ্যখাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও মানবসম্পদের অনুন্নয়ন: স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় গ্রামীণ অঞ্চলে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা এবং চিকিৎসকের তীব্র অভাব রয়েছে। শিশু মৃত্যুহার, ব্যাপক অপুষ্টি এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্যবিমার অপ্রতুলতা বিশাল জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের পথে বড় বাধা।
ঙ. তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অসংগঠিত শ্রমবাজার: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি বাড়লেও তার সুফল সমাজের একটি ক্ষুদ্র ও ধনিক শ্রেণির হাতে বন্দি রয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার ভারসাম্য নষ্ট করছে। শ্রমশক্তির একটি বিরাট অংশ এখনও অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত, যেখানে আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব রয়েছে।
চ. সামাজিক-রাজনৈতিক বিভাজন ও বিচারবিভাগীয় দীর্ঘসূত্রিতা: জাতি, ধর্ম, ভাষা এবং বর্ণের ভিত্তিতে সংকীর্ণ রাজনৈতিক মেরুকরণ দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক ফোকাসকে ব্যাহত করছে। বিচারব্যবস্থায় বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লাগার ফলে নাগরিক ও ব্যবসায়িক স্তরে আস্থার সংকট তৈরি হয়।
ভারত ও চিনের উন্নয়নের মডেল দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। চিন তার রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত এককেন্দ্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিকাঠামোগত উন্নয়নে অভাবনীয় গতি আনলেও, ভারত একটি বৃহৎ, বৈচিত্র্যময় ও স্পন্দিত গণতন্ত্র। ভারতের এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মানুষের স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রাখলেও, এর নিজস্ব কিছু কাঠামোগত ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভারতের সংবিধানে দেশটিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ফায়দা তোলার উদ্দেশ্যে ধর্মীয় বিভাজন জিইয়ে রাখার প্রবণতা দেশের সামাজিক পুঁজিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গবেষণায় প্রমাণিত যে, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা অস্থিরতার পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। বিনিয়োগকারীরা সর্বদা এমন একটি স্থিতিশীল পরিবেশ খোঁজেন যেখানে সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকে। অস্থির অঞ্চলে পুঁজি বিনিয়োগ ব্যাহত হওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর বিভিন্ন লেখায় বারবার উল্লেখ করেছেন যে, পারস্পরিক সহনশীলতা ও সামাজিক সহযোগিতা ছাড়া টেকসই মানব উন্নয়ন অসম্ভব। যখন বিভাজনমূলক রাজনীতি প্রাধান্য পায়, তখন রাষ্ট্র ও সমাজের মূল এজেন্ডা থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির মতো জনকল্যাণমূলক ও মৌলিক বিষয়গুলো পিছিয়ে পড়ে। ভারতের বৈচিত্র্যই দেশটির অন্যতম প্রধান শক্তি, তবে উগ্র আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ এই বৈচিত্র্যের ঐক্যকে হুমকিতে ফেলে। উগ্র আঞ্চলিক বা ভাষিক আবেগ আন্তঃরাজ্য সহযোগিতা এবং জাতীয় স্তরের অভিন্ন নীতি প্রণয়নকে পঙ্গু করে দেয়। নদী জলবণ্টন, সীমান্ত বিরোধ কিংবা অর্থনৈতিক সম্পদের সুষম বণ্টনের মতো জটিল জাতীয় সমস্যাগুলো যখন কেবল আঞ্চলিক রাজনীতির সংকীর্ণ চোরাপথে পরিচালিত হয়, তখন দীর্ঘমেয়াদী সমাধান অধরাই থেকে যায়। সংকীর্ণ আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাজার এবং শ্রমের অবাধ চলাচলের পথে কৃত্রিম প্রাচীর তৈরি করে, যা ভারতের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে। এর ফলে অভিন্ন জাতীয় বাজারের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সম্পদ বণ্টনে সমতা নষ্ট হয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। তবে যখন দলীয় স্বার্থ বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার লোভ দেশের বৃহত্তর স্বার্থের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন সুশাসন বাধাগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদী নীতি প্রণয়নের বদলে স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক ফায়দা তোলার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাবে বড় ধরনের সংস্কারমূলক কাজ থমকে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অখণ্ডতার পথে গভীর সংকট তৈরি করে। গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য হলো বিতর্ক, ভিন্নমত এবং জনগণের অংশগ্রহণ। তবে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী রাখতে হলে কেবল পদ্ধতিগত নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক ন্যায়বিচার ও সহনশীলতা। সাম্প্রদায়িক ভেদভাব, উগ্র আঞ্চলিকতা এবং সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে নীতিগত স্বচ্ছতা ও জনকল্যাণমূলক ভাবধারাকে প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। ভারতের প্রকৃত সাফল্য নিহিত রয়েছে তার বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য বজায় রেখে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষার সঠিক ভারসাম্যের ওপর।
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের সেবক হলেও, যখন দল বা নেতাদের কাছে ক্ষমতা ও আত্মস্বার্থ দেশের স্বার্থের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রে নীতিগত স্থবিরতা দেখা দেয়। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতির এই আঁতাতকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা অসৎ শিল্পপতি-রাজনীতিক জোট বলা হয়। এখানে জনকল্যাণমূলক নীতির চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের আর্থিক ফায়দা হাসিলকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের প্রধান লক্ষ্য থাকে পরবর্তী নির্বাচন জয় করা। ফলে দীর্ঘমেয়াদী ও কাঠামোগত সংস্কারের (যেমন—শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে মৌলিক পরিবর্তন) চেয়ে স্বল্পমেয়াদী ও জনতুষ্টিমূলক প্রতিশ্রুতির ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়। উন্নয়নমূলক কাজের চেয়ে প্রতীকী রাজনীতি, বিশাল প্রচার এবং দলীয় স্বার্থে সরকারি সম্পদের অপব্যবহার প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, ভারতের মূল শক্তি তার বহুত্ববাদ, বৈচিত্র্য এবং গণতান্ত্রিক সহনশীলতা। কিন্তু যখনই উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, সংকীর্ণ আঞ্চলিকতা এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি এই মূল ভিত্তিগুলোকে দুর্বল করে দেয়, তখনই ভারতের বিশাল জনমিতিক লভ্যাংশ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থমকে দাঁড়ায়। গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র হলো ভিন্নমত, সমালোচনা এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দেশপ্রেমকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে এক করে দেখা হচ্ছে। যখনই কোনো নাগরিক বা রাজনৈতিক বিরোধী দল সরকারের নীতি, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখনই তাদের ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বা ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি সংগঠিত প্রয়াস চালানো হয়। এটি সংবিধানপ্রদত্ত বাকস্বাধীনতা ও প্রতিবাদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর বিভিন্ন রচনা ও সাক্ষাৎকারে বারবার বলেছেন যে, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো ‘যুক্তিগ্রাহ্য জনমত’। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, ভিন্নমতকে দমন করা এবং অসহিষ্ণুতার বাতাবরণ তৈরি করা আসলে দেশের অন্তর্নিহিত শক্তিকেই দুর্বল করে দেয়। তাঁর ভাষায়, “অসন্তুষ্টির অধিকার এবং সরকারের সমালোচনা করার ক্ষমতা হলো একটি প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি। দেশপ্রেম মানে অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং দেশের সংবিধান ও নাগরিকদের কল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতা।”
ভারতের আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী এবং প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁর ‘দ্য ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি’ বা ‘সায়েন্টিফিক টেম্পার’-এর ওপর সর্বাধিক জোর দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কুসংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত না হলে কোনো জাতি কখনোই প্রকৃত অর্থে আধুনিক ও উন্নত হতে পারে না। জওহরলাল নেহরু বলেন, “আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা আছে—একটি হলো অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার এবং অতীতের মৃত খোলসকে এঁকে ধরে থাকা; অন্যটি হলো বিজ্ঞানের আলো, যুক্তিবাদী চেতনা এবং ভবিষ্যতের দিকে উন্মুক্ত দৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে চলা। প্রগতিশীল সমাজ গঠনের জন্য দ্বিতীয় পথটিই একমাত্র অবলম্বন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ইডি, সিবিআই এবং আয়কর বিভাগ-এর মতো স্বশাসিত সংস্থাগুলি গঠিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার গুরুতর অভিযোগ উঠছে। যখন এই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি শুধুমাত্র বিরোধী দলের নেতা, সমালোচক সাংবাদিক বা অধিকারকর্মীদের নিশানা করে, তখন নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হয়। দেশের বহু প্রবীণ আইনবিদ ও বিচারক অতীতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থাসমূহের এই ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট ব্যবহার ফেডারেল কাঠামো এবং গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকে ভেঙে দেয়।
ভারতের সংবিধানের ৫১ক(ঘ) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, মানবতাবাদ এবং সংস্কার ও অনুসন্ধিৎসার মানসিকতা গড়ে তোলা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য। কিন্তু সাম্প্রতিককালে তথাকথিত সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের নামে বৈজ্ঞানিক সত্যের পরিবর্তে কাল্পনিক পৌরাণিক তত্ত্বকে ইতিহাসের স্থান দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অগ্রগতির যুগে স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে বিভিন্ন জাতীয় মঞ্চে অবৈজ্ঞানিক ও কাল্পনিক দাবি প্রচার করা হচ্ছে, যা তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে যুক্তিবাদী চিন্তার বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। ভারতের আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী এবং প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁর ‘দ্য ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি’ বা ‘সায়েন্টিফিক টেম্পার’-এর ওপর সর্বাধিক জোর দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কুসংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত না হলে কোনো জাতি কখনোই প্রকৃত অর্থে আধুনিক ও উন্নত হতে পারে না। জওহরলাল নেহরু বলেন, “আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা আছে—একটি হলো অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার এবং অতীতের মৃত খোলসকে এঁকে ধরে থাকা; অন্যটি হলো বিজ্ঞানের আলো, যুক্তিবাদী চেতনা এবং ভবিষ্যতের দিকে উন্মুক্ত দৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে চলা। প্রগতিশীল সমাজ গঠনের জন্য দ্বিতীয় পথটিই একমাত্র অবলম্বন।”
খ্যাতনামা ঐতিহাসিক, সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, মধ্যযুগ বা প্রাচীনকালের ইতিহাসকে বর্তমান রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বিকৃত করে ব্যবহার করা হলে তা দেশের সামাজিক সম্প্রীতি ও বহুত্ববাদী ঐতিহ্যকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে। সংকীর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে মেকী দেশপ্রেমের জিগির তোলা, ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং অবৈজ্ঞানিক কুসংস্কারকে উসকে দেওয়া কখনোই একটি শক্তিশালী বা প্রগতিশীল রাষ্ট্রের লক্ষণ হতে পারে না। ইতিহাস কোনো একক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করা যায় না; ভারতের অতীত বহুমুখী সংস্কৃতি, মিশ্র সভ্যতা এবং আন্তঃধর্মীয় আদান-প্রদানের এক অনন্য দলিল। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট ও পক্ষপাতদুষ্ট অংশকে সামনে এনে সাম্প্রদায়িক দূরত্ব তৈরি করা হচ্ছে। ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে বর্তমানের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৃত্রিম ঘৃণা ও বিভাজন তৈরি হয়, যা দীর্ঘকাল ধরে তিলতিল করে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্প্রীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ভারতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বর্তমানে পুঁজিপতি, প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক শক্তির এক গভীর ও অদৃশ্য জোট বা ত্রিভুজ আঁতাত গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘স্টেট ক্যাপচার’ বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতি তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই ব্যবস্থার পরিণতি অত্যন্ত ভয়ংকর, যা দেশের ভিত্তি এবং সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেশের নীতি নির্ধারণ, সরকারি সম্পদ বণ্টন এবং বড় বড় পরিকাঠামোগত প্রকল্পের ছাড়পত্র আজ হাতে গোনা কিছু বড় কর্পোরেট হাউসের স্বার্থে পরিচালিত হয়। এর বিনিময়ে রাজনৈতিক দলগুলি পায় বিশাল নির্বাচনী তহবিল (যেমন নির্বাচনী বন্ড বা অন্যান্য গোপন মাধ্যমের অর্থ), যা তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং এই অসাধুচক্রকে আরও শক্তিশালী করে।
যখন সাধারণ মানুষ চরম বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়, তখন সেই ক্ষোভ ও অসন্তোষকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার জন্য ধর্মীয় উন্মাদনা ও আবেগপূর্ণ সাংস্কৃতিক এজেন্ডাকে সামনে আনা হয়। ধর্মীয় নেতারা এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চালিকাশক্তির সহায়ক হিসেবে কাজ করেন। এর ফলে জনগণের মনোযোগ শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা জীবিকার মতো প্রকৃত সমস্যা থেকে সরে গিয়ে ধর্মীয় পরিচয়ের লড়াইয়ে কেন্দ্রীভূত হয়। একটি সুস্থ ও স্পন্দিত গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হলো ভিন্নমত, সমালোচনা এবং মুক্তচিন্তা। বিজ্ঞানমনস্কতা এবং যুক্তিবাদী চিন্তার পরিবর্তে অবৈজ্ঞানিক কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসকে উসকে দিয়ে জনমানসকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা একটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক সমাজ গঠনের অন্তরায়। মেকী দেশপ্রেম বা একচ্ছত্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে সমাজের একটি অংশকে অন্য অংশের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর মাধ্যমে সাময়িক রাজনৈতিক ফায়দা তোলা সম্ভব হলেও তা দেশের অখণ্ডতার জন্য আত্মঘাতী।
প্রকৃত দেশপ্রেম নিহিত রয়েছে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার মধ্যে। ভারতের প্রকৃত শক্তি তার বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, বৈচিত্র্য এবং মুক্তচিন্তার স্বাধীনতায় নিহিত। এই বহুমুখী পরিচয়ই ভারতের আত্মাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বর্তমানের এই গভীর সংকট ও অবক্ষয় থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন নাগরিক সমাজের এক জোরালো জাগরণ এবং আমাদের সংবিধানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের পূর্ণাঙ্গ পুনরুজ্জীবন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস্থার ডুফলোর গবেষণা এবং বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক অর্থনৈতিক বৈষম্যযুক্ত দেশগুলির একটি। দেশের শীর্ষ ১% মানুষের হাতে জাতীয় সম্পদের এক বিশাল অংশ কুক্ষিগত। নিচের দিকে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।
জিডিপি বা শেয়ারবাজারের সূচক ঊর্ধ্বমুখী হলেও তা সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে না। অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, কৃষক এবং প্রান্তিক যুবসমাজ আজ বেঁচে থাকার লড়াইয়ে দিশাহারা, অথচ কাঠামোগত সংস্কারের অভাবে তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। এই ত্রিভুজ আঁতাতের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে এবং সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় কর্পোরেট আধিপত্য কমিয়ে জনকল্যাণ, কর্মসংস্থান এবং প্রকৃত অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিতে হবে।
একটি সজীব ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো নাগরিকের সমান অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সরকারের কাছে জবাবদিহিতা চাওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু বর্তমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা গণতন্ত্রের সেই ভিতকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। যখন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জীবিকা ও অস্তিত্বের সংকটে জর্জরিত থাকে এবং অন্যদিকে রাষ্ট্র কর্পোরেট ও ধর্মীয় শক্তির ছত্রচ্ছায়ায় বলীয়ান হয়, তখন সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে ‘নাগরিক’ থেকে ‘প্রজা’ বা ‘ভোটব্যাংকে’ পরিণত হয়। তাদের মৌলিক অধিকারগুলি তখন দয়া বা অনুগ্রহের রূপ নেয়। বিরোধী কণ্ঠ ও জবাবদিহিতার বিলুপ্তি ঘটে এবং পুঁজির শক্তির কাছে মিডিয়া, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন যখন আপস করতে বাধ্য হয়, তখন সরকারের কাজের জবাবদিহিতা সম্পূর্ণভাবে লোপ পায়। গণতন্ত্র তখন কেবল কাগজে-কলমে পাঁচ বছর অন্তর একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পর্যবসিত হয়, যেখানে অর্থের জোয়ার এবং ভাবাবেগের রাজনীতি জনমতকে নিয়ন্ত্রণ করে।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যে সমাজ বা রাষ্ট্র চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং অন্ধ অসহিষ্ণুতার ওপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘকাল টিকে থাকতে চায়, তার অন্তর্নিহিত ভিত্তি একসময় ধসে পড়তে বাধ্য। আজকের ভারতে পুঁজিবাদী লোভ, ধর্মীয় উগ্রতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ত্রিমুখী আঁতাত যদি প্রতিহত করা না যায়, তবে সংবিধানের প্রস্তাবনায় প্রতিশ্ৰুত ‘সাম্য, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ’ চিরতরে বিপন্ন হবে। এই অবক্ষয় থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার, বৈজ্ঞানিক চেতনা এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে এক নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক জাগরণ। গত এক দশকে ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে সংখ্যাগুরুবাদী আদর্শের প্রকাশ যেভাবে মূলধারায় স্থান করে নিয়েছে, তাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা (বিশেষ করে মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়) এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। প্রকাশ্য জনসভায় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো, তথাকথিত ‘গো-রক্ষা’র নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা, উপাসনালয় ভাঙচুর এবং সামাজিক বয়কটের ডাক দেওয়ার মতো ঘটনাগুলি আজ আকস্মিক নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ মানসিকতার প্রকাশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, নির্দিষ্ট কিছু রাজ্যে ধর্মান্তরবিরোধী আইন এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি-র নামে এমন কিছু নীতি প্রণয়ন বা প্রস্তাব করা হচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা এবং তাদের সাংবিধানিক অধিকারকে খর্ব করা।
ভারত ঐতিহাসিকভাবে ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ এবং সর্বধর্ম সমন্বয়ের দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ভারতের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন-এর মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি নিয়মিত তাদের প্রতিবেদনে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন এবং অসহিষ্ণুতার চিত্র তুলে ধরছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন ফোরামেও ভারতের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ফ্রিডম হাউস এবং ভি-ডেম-এর মতো বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি ভারতকে ‘নির্বাচনী স্বৈরাচার’ বা ‘আংশিক মুক্ত’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের দীর্ঘদিনের অর্জিত নৈতিক উচ্চতা ও নরম শক্তি দুর্বল হয়েছে। সংবিধানের মূল চেতনাকে টিকিয়ে রাখতে এবং ভারতের বৈশ্বিক সম্মান পুনরুদ্ধার করতে হলে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও বিভাজনমূলক রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। দেশের অভ্যন্তরে আইনের শাসন, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠাই এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের অন্ধকারের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া ভারত সংবিধানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে প্রাধান্য না দিয়ে সমস্ত ধর্মের নাগরিকের সমান অধিকার সুনিশ্চিত করেছিল। ড. বি. আর. আম্বেদকর ও জওহরলাল নেহরুর মতো দূরদর্শী নেতারা এমন একটি সংবিধান তৈরি করেছিলেন যেখানে প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারা সুরক্ষিত থাকবে। স্বাধীনতার আট দশক পর এসে সংখ্যালঘুদের কোণঠাসা করার এই প্রবণতা মূলত ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনার সঙ্গে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা। একটি প্রকৃত গণতন্ত্রের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সংখ্যাগুরুরা কীভাবে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করছে তার ওপর। সংখ্যাগরিষ্ঠের জোরে সংখ্যালঘুদের কণ্ঠরোধ করা এবং তাদের নাগরিক অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা আধুনিক সভ্যতার মাপকাঠিতে একটি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। স্বাধীনতার দীর্ঘ আট দশক পরে দাঁড়িয়ে আজকের ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর এই আক্রমণ ও বৈষম্যমূলক আচরণ কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। এটি কেবল নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন নয়, এটি সমগ্র জাতির নৈতিক পতন এবং সংবিধানের মূল চেতনার ওপর এক গভীর আঘাত। এই অবক্ষয় রোধ করতে না পারলে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সমস্ত অর্জন এক ভুয়া ও অন্তঃসারশূন্য কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ধসে পড়তে বাধ্য ।
♦•–♦•♦–•♦ ♦•–♦•♦–•♦
❤ Support Us








