Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘বিজেপির পুতুল’ বলে কটাক্ষ খাড়্গের,  পদ থেকে বরখাস্ত সহ পাঁচ দফা দাবি কংগ্রেসের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘বিজেপির পুতুল’ বলে কটাক্ষ খাড়্গের,  পদ থেকে বরখাস্ত সহ পাঁচ দফা দাবি কংগ্রেসের

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘বিজেপির পুতুল’ বলে কটাক্ষ করে তাঁকে অবিলম্বে পদ থেকে সরানোর দাবি তুললেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে। মঙ্গলবার কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানান তিনি। কংগ্রেস সভাপতির দাবি, জ্ঞানেশ কুমারের আর পদে থাকার কোনো অধিকার নেই।

চলমান বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই খাড়্গে বলেছেন, ‘দুই নির্বাচন কমিশনার নিজেরাই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদক্ষেপকে স্বেচ্ছাচারী ও অনুচিত বলে বর্ণনা করেছেন।’ গত সপ্তাহে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করে তিনি জানান, নির্বাচন কমিশনার বিবেক যোশী ও সুখবীর সিং সান্ধু বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন তুলেছিলেন। খাড়্গের অভিযোগ, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ধারাবাহিক পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া। তাঁর দাবি, ‘এ পরিস্থিতিতে তাঁর পদে থাকার কোনো অধিকার নেই এবং তাঁকে অবিলম্বে সরিয়ে দেওয়া উচিত।’ প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে আরও আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোদি সরকারের পুতুলে পরিণত হয়েছেন। এমনকি তাঁর নিজের সহকর্মীরাও তাঁকে বিশ্বাস করেন না। যুবসমাজ প্রশ্ন তুলবে এবং তাঁকে সরিয়ে দেবে।’

ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে কংগ্রেস সভাপতি ভোটার তালিকা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে পাঁচটি দাবি তোলেন। তাঁর দাবি, ভোটার তালিকায় যত পরিবর্তন হয়েছে, তার সমস্ত তথ্য প্রকাশ্যে আনতে হবে। ভোটার তালিকা থেকে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের প্রত্যেককে আপিলের সুযোগ দিতে হবে। সমস্ত রাজনৈতিক দলকে সময়মতো সহজবোধ্য বিন্যাসে ভোটার তালিকা দিতে হবে। গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠলে স্বাধীন ও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে কোনো তথ্য গোপন করা হচ্ছে বলে কারও মনে না হয়। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও নিশানা করেন মল্লিকার্জুন খাড়্গে। তাঁর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনের উপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের উপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগের জন্য নৈতিক দায় স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রীরও পদত্যাগ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

খাড়্গের আরও অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন মোদি সরকারের স্বার্থে কাজ করছে। নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালী এবং বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দলগুলির প্রশ্নের মধ্যেই তাঁর এই মন্তব্য সামনে এসেছে। সম্প্রতি একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন এবং অন্যান্য নির্বাচনী বিষয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। ওই আপত্তির মধ্যে ভোটার তালিকায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদনপত্র, ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং নির্বাচনী তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকারের মতো বিষয়ও ছিল।

তবে নির্বাচন কমিশন এই আপত্তিগুলিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক মতবিরোধের প্রমাণ হিসেবে দেখার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে। কমিশনের বক্তব্য, খসড়া পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যকরী প্রশ্ন, মতামত ও পরামর্শ উত্থাপন করা তাদের স্বাভাবিক প্রশাসনিক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ারই অংশ। এদিন, খাড়্গে বলেন, ভোটাধিকার গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক অধিকার। কোনো যোগ্য ভোটারকে যেন ইচ্ছামতো ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভোটার তালিকায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্তির নিয়মে পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন খাড়্গে। তাঁর দাবি, এই পরিবর্তনের ফলে তরুণ ও নতুন ভোটাররা প্রভাবিত হতে পারেন। তিনি এ পরিবর্তনকে ‘অসাংবিধানিক’ বলেও মন্তব্য করেন।

তবে কংগ্রেসের এ লড়াই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয় বলে দাবি করেন খাড়্গে। তাঁর দাবি, কংগ্রেস ‘ভোটারদের অধিকার, সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার’ পক্ষে লড়াই করছে। কংগ্রেস সভাপতি আরও বলেন, কংগ্রেস চায় নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য থাকুক, যাতে শাসক দল এবং বিরোধী—উভয় পক্ষই কমিশনের সিদ্ধান্তের উপর আস্থা রাখতে পারে। ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ তুলে বিষয়টি সামনে আনার জন্য লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর প্রশংসাও করেন খার্গ। তাঁর দাবি, ভোটার তালিকা নিয়ে রাহুল গান্ধী যে আশঙ্কাগুলি প্রকাশ করেছিলেন, সেগুলি পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে এবার প্রশ্ন উঠল শীর্ষ আদালতে। কমিশনের অন্দরে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন — এমন অভিযোগ তুলে দায়ের হওয়া মামলা গ্রহণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। আগামী সপ্তাহেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা। বেঞ্চে রয়েছেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি ভি. মোহনা। প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ সিং এই মামলা দায়ের করেছেন। তাঁর আবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন একটি বহু সদস্যের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। ফলে কমিশনের মতো একটি যৌথ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেই নেওয়া উচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কমিশনের নেওয়া কয়েকটি সিদ্ধান্তে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলাকারীর দাবি, সংবিধানের ৩২৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনকে যে সাংবিধানিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা কোনও একজন কমিশনারের ব্যক্তিগত ক্ষমতা নয়; বরং প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত। তাই কোনও একজন নির্বাচন কমিশনার এককভাবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে এককভাবে ওই ক্ষমতা প্রয়োগ করলেন, আদালতের কাছে তার ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে। মামলায় ভোটার তালিকার ডেটাবেস নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, ভোটার তালিকার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের অধীনে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ডেটাবেসে কারা পরিবর্তন করার ক্ষমতা পাচ্ছেন, তা যাচাই করার জন্য অডিটের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং জোশীও সহমত ছিলেন বলে আবেদনকারীর দাবি।

‘এসআইআর’ নিয়েও কমিশনের অন্দরে মতপার্থক্যের অভিযোগকে ঘিরে ইতিমধ্যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে কমিশন সে অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সম্প্রতি কমিশনের সদস্যদের একসঙ্গে ছবি প্রকাশ করে ঐক্যের বার্তাও দেওয়া হয়। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘এসআইআর’ নিয়ে কমিশনের অভ্যন্তরে কোনো মতপার্থক্য ছিল না এবং বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিহার দিয়ে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ-সহ আরও ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করে ২০২৫ সালের ২৪ জুন এসআইআর সংক্রান্ত নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। কমিশনের দাবি, এই সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবেই গ্রহণ করা হয়েছিল। ফলে একদিকে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাংবিধানিক পদ্ধতি ও একক ক্ষমতা প্রয়োগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে এসআইআর নিয়ে কমিশনের অভ্যন্তরে কোনও মতবিরোধ ছিল কি না, তা নিয়ে কমিশনের বক্তব্যও সামনে এসেছে। এখন আগামী সপ্তাহে শীর্ষ আদালতের শুনানির দিকে নজর থাকবে, যেখানে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাংবিধানিক কাঠামো এবং ৩২৪ ধারার ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!