- দে । শ
- নভেম্বর ২, ২০২৬
২০২৭-এর উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ‘লোকসভার সেমিফাইনাল ! মোদি-শাহ প্রচার ঘিরে চূড়ান্ত রণকৌশল
২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনকে কার্যত রাজনৈতিক সেমিফাইনাল হিসেবেই দেখছে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। দেশের বৃহত্তম এই রাজ্যের বিধানসভা ভোটের ফলাফল আগামী লোকসভা নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পর্কে আগাম ইঙ্গিত দিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। তাই উত্তরপ্রদেশের ক্ষমতা ধরে রাখতে এখন থেকেই কোমর বেঁধে ময়দানে নামতে চলেছে বিজেপি। দীপাবলির উৎসব মিটলেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং দলের সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনকে সামনে রেখে শুরু হবে জোরদার প্রচার অভিযান।
বিজেপি সূত্রে খবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসজুড়ে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ত্রিস্তরীয় প্রচার কর্মসূচি চালানোর পরিকল্পনা নিয়েছে দল। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ইতিমধ্যেই প্রচারে নেমে পড়েছেন। অন্যদিকে, মোদি, শাহ ও নিতিন নবীনের প্রচারের ক্ষেত্র এবং দায়িত্বও প্রাথমিক ভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই প্রচারের প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরা হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশের ১৮টি প্রশাসনিক বিভাগের প্রতিটিতে একটি করে বড় জনসভা করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে, অমিত শাহ তুলনায় ছোট আকারের সভার পাশাপাশি দলের বুথস্তরের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার দিকে নজর দেবেন। নিতিন নবীন বিধানসভা কেন্দ্রভিত্তিক প্রচার চালানোর পাশাপাশি প্রতিটি কেন্দ্রে দলের সাংগঠনিক প্রস্তুতি খতিয়ে দেখবেন। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের দায়িত্ব থাকবে জেলাভিত্তিক প্রচার পরিচালনা করা। রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে পৌঁছনোর লক্ষ্য নিয়েই এগোতে চাইছে বিজেপি।
দলীয় সূত্রের দাবি, ধনতেরস ও দীপাবলির উৎসব শেষ হওয়ার পর আগামী ২০ নভেম্বর থেকেই পুরোদমে প্রচার শুরু করতে চায় গেরুয়া শিবির। বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই আগাম প্রচারের মূল উদ্দেশ্য হল দলের নিচুতলার কর্মীদের সক্রিয় করা এবং রাজ্যের প্রতিটি এলাকার ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্যে বুথকর্মীদের অন্তত ৫০টি বাড়িতে গিয়ে জনসংযোগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু পদযাত্রা বা জনসভার মধ্যেই প্রচার সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না বিজেপি। সমাজমাধ্যমেও ব্যাপক প্রচারের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির সামনে চ্যালেঞ্জ যে যথেষ্ট কঠিন, তা স্পষ্ট হয়েছিল ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলেই। তৃতীয়বার কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে পারলেও উত্তরপ্রদেশে আশানুরূপ ফল করতে পারেনি গেরুয়া শিবির। রাজ্যের মোট ৮০টি লোকসভা আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছিল মাত্র ৩৩টিতে। অন্যদিকে, সমাজবাদী পার্টি (এসপি) একক ভাবে ৩৭টি আসনে জয়লাভ করে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল অযোধ্যার রামমন্দির অবস্থিত ফৈজাবাদ লোকসভা কেন্দ্রেও বিজেপির পরাজয়। যদিও এর আগে ২০১৭ ও ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে পরপর জয় পেয়েছিল বিজেপি।
২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে উত্তাপ বেড়েছে। এসআইআর বাতিল এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বিরোধী দলগুলির জোট ‘ইন্ডিয়া’। ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে ওঠা ‘ভোটচুরি’র অভিযোগকে হাতিয়ার করে বিরোধীরা রাজনৈতিক প্রচার আরও জোরদার করছে।
এই পরিস্থিতিতেই রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। তাঁর দাবি, ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি এমন ভাবে উত্তরপ্রদেশ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হবে যে, ভবিষ্যতে আর ফিরে আসার সুযোগ পাবে না।
প্রকাশ্যে অখিলেশের এই দাবি উড়িয়ে দিলেও তাঁর রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক বিজেপি নেতৃত্ব। বিশেষ করে দলিত, সংখ্যালঘু এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির ভোটারদের একজোট করে নিজেদের সমর্থনভিত্তি আরও মজবুত করার যে চেষ্টা সমাজবাদী পার্টি চালাচ্ছে, তা গেরুয়া শিবিরের চিন্তা বাড়িয়েছে। বিরোধীদের এই সামাজিক সমীকরণের মোকাবিলা করতে পাল্টা রণকৌশল তৈরিতে ব্যস্ত বিজেপিও।
সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে এখন থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক প্রস্তুতি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে হারানো জমি পুনরুদ্ধার করে রাজ্যে ক্ষমতা ধরে রাখাই বিজেপির প্রধান লক্ষ্য। তাই শুধু সাংগঠনিক শক্তির উপর নির্ভর না করে জনসংযোগ, বুথস্তরের তৎপরতা, বড় জনসভা এবং ডিজিটাল প্রচার—সব দিক থেকেই নির্বাচনী লড়াইয়ে ঝাঁপাতে চাইছে মোদি-শাহের দল। উত্তরপ্রদেশের এই মহারণে শেষ পর্যন্ত কারা বাজিমাত করে, তার দিকেই এখন নজর গোটা দেশের রাজনৈতিক মহলের।
❤ Support Us






