- দে । শ
- এপ্রিল ২, ২০২৬
নেতৃত্বের সঙ্গে বাড়ছে দূরত্ব ! রাজ্যসভার ‘ডেপুটি লিডার’ পদ থেকে সরানো হলো আম আদমির রাঘব চাড্ডাকে
কেজরীওয়ালের আম আদমি পার্টির অন্দরে ভাঙনের সুর ? দলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফাটল কি চওড়া হচ্ছে ? না কি নিছকই সাংগঠনিক রদবদল ? রাজ্যসভায় আপ-এর ‘ডেপুটি লিডার’-এর পদ থেকে তরুণ সাংসদ রাঘব চাড্ডাকে সরানোর খবরে দিল্লির বাতাসে নানান জল্পনা শুরু হয়েছে। রাঘবের পরিবর্তে নতুন দায়িত্বে আনা হচ্ছে পাঞ্জাবের আপ সাংসদ অশোক মিত্তালকে। ইতিমধ্যেই রাজ্যসভা সচিবালয়ে চিঠি দিয়ে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে দল। বর্তমানে রাজ্যসভায় আপ–এর ১০ জন সদস্যের মধ্যে ৭ জন পাঞ্জাব ও ৩ জন দিল্লি থেকে নির্বাচিত।
তবে শুধুমাত্র পদচ্যুতি নয়, আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, সংসদে দলের বরাদ্দ সময় থেকে রাঘব চাড্ডাকে বক্তব্য রাখার সুযোগ না দেওয়ার অনুরোধও জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এ সিদ্ধান্ত নিছক রদবদলের সীমা ছাড়িয়ে অন্য ‘বার্তা’ বহন করছে। ২০১২ সালে অরবিন্দ কেজিরীওয়ালের হাত ধরে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ রাঘবের। দিল্লির লোকপাল আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি দলের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে ছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় মুখপাত্র, পরে দলের কোষাধ্যক্ষ—ক্রমশ উত্থান ছিল নজরকাড়া। ২০২২ সালে রাজ্যসভায় প্রবেশের পর তাঁকে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবেই দেখা হচ্ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ অন্য গল্প বলছে। ২০২৩ সাল থেকে রাজ্যসভায় ডেপুটি লিডারের পদে থাকা এই তরুণ সাংসদ গত কয়েক মাসে দলীয় কার্যকলাপ থেকে ক্রমশ দূরে সরে গিয়েছেন বলেই অভিযোগ। দলের বৈঠক, সাংবাদিক সম্মেলন, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও তাঁকে অনুপস্থিত দেখা গিয়েছে বলে সূত্রের দাবি। সংসদে দলের ইস্যুর বদলে তিনি পিতৃত্বকালীন ছুটি, বিমানবন্দরে খাবারের দাম, গিগ কর্মীদের অধিকার বা শহুরে যানজটের মতো জনজীবনের প্রশ্ন তুললেও, দলীয় অবস্থান নিয়ে তাঁর নীরবতা ক্রমশ চোখে পড়তে শুরু করে। বিশেষ করে দিল্লির বহুল আলোচিত আবগারি নীতি মামলায় কেজরীওয়াল ও মনিষ সিসোদিয়া-সহ শীর্ষ নেতৃত্ব আদালতের রায়ে স্বস্তি পাওয়ার পর, যখন দলীয় শিবিরে উচ্ছ্বাস চরমে, তখনো প্রকাশ্যে নীরব ছিলেন এই তরুণ আপ সাংসদ। সমাজমাধ্যমেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি তিনি। সেই নীরবতাই প্রথমে কৌতূহল, পরে জল্পনার জন্ম দেয়।
শুধু তাই নয়, যন্তরমন্তরে আয়োজিত জনসভা কিংবা দলীয় কার্যালয়ে অরবিন্দ কেজরীওয়ালের-এর সাংবাদিক বৈঠকের মতো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চেও দেখা যায়নি তাঁকে। অসম-সহ একাধিক নির্বাচনে দলের ‘তারকা প্রচারক’-এর তালিকায় তাঁর নাম না থাকাও সেই দূরত্বের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকে। সামনে পাঞ্জাব ও গুজরাটের নির্বাচন, সে প্রস্তুতিতেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ চোখে পড়েনি। দলের অন্দরের একাংশের দাবি, সম্প্রতি সংসদীয় শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিরোধী শিবিরের ওয়াক-আউটের সময়েও তিনি শূন্যকালীন আলোচনায় অংশ নেন বলে অভিযোগ। এমনকি দলের সংসদীয় নেতার নির্দেশ অমান্য করার ঘটনাও নাকি একাধিকবার ঘটেছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে যে অপসারণ প্রস্তাবের নোটিশে একাধিক সাংসদ সই করেছেন, সেখানে দলের নির্দেশ সত্ত্বেও রাঘব চাড্ডা সই করেননি বলেই খবর। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এ ঘটনাই দলীয় অসন্তোষকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। অন্যদিকে, সংসদে জনস্বার্থের নানা ইস্যু তুলে ধরে সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তিনি। গিগ কর্মীদের অধিকার, টেলিকম সংস্থাগুলির রিচার্জ সংক্রান্ত অভিযোগ, বিমানবন্দরে খাবারের মূল্যবৃদ্ধি—একাধিক বিষয়েই সরব ছিলেন। এমনকি তাঁর তোলা কয়েকটি ইস্যুতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপও নজর কেড়েছে। ফলে জনমুখী রাজনীতিতে তাঁর ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতাও সুনজরে দেখছেন না আপ-এর শীর্ষ নেতৃত্বরা, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
দিল্লির বাতাসে নতুন জল্পনা, তবে কি এবার অন্য দলের দিকে ঝুঁকছেন রাঘব? আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি আপ, তবু রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, এ পদক্ষেপ ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রাজনৈতিক অবস্থানকে মাথায় রেখেই নেওয়া হয়েছে। যদিও নতুন ডেপুটি লিডার অশোক মিত্তল জানিয়েছেন, এটি নিয়মিত সাংগঠনিক পরিবর্তন মাত্র। এতে অন্য কোনো সমীকরণ নেই। তবুও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, যদি তা-ই হয়, তবে হঠাৎই কেন এমন কড়া সিদ্ধান্ত? ফলে, রাজ্যসভায় এই রদবদল আপাতদৃষ্টিতে সাংগঠনিক হলেও, এর অন্তরালে যে গভীর রাজনৈতিক সঙ্কেত লুকিয়ে রয়েছে, তা নিয়ে জল্পনা এখন তুঙ্গে।
❤ Support Us





