Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • জুন ২৬, ২০২৬

বেজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষায় স্বাক্ষরিত ১৩টি চুক্তি 

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বেজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষায় স্বাক্ষরিত ১৩টি চুক্তি 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফর। বেজিংয়ে গিয়ে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করলেন তারেক রহমান। সূত্রের খবর, বৈঠকে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, চিনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, তিস্তা-সহ নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা, বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব— একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। বৈঠকের পর দু-দেশের মধ্যে মোট ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, নতুন বাংলাদেশ সরকারের আমলে ঢাকা-বেজিং সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক করে তুলতেই তারেকের এ সফর।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর চিনকেই প্রথম গন্তব্য হিসাবে বেছে নেন খালেদা পুত্র। তিন দিনের সরকারি সফরে গিয়ে,  বৃহস্পতিবার তিনি চিনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। শুক্রবার, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন।  বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদি আমিন জানিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেছেন তারেক রহমান। তাঁর দাবি, এ সফরের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশ-চিন সম্পর্ককে কৌশলগত সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন প্রকল্প, প্রযুক্তি এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া।

জানা যাচ্ছে, বৈঠকে চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতির প্রসঙ্গ তোলেন তারেক রহমান। তিনি জিনপিংকে অনুরোধ করেন, বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি কৃষিজ ও শিল্পজাত পণ্য আমদানির ব্যবস্থা করতে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তাজা আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, সামুদ্রিক ও জলজ পণ্য, কাঁচা চামড়া, পাটজাত দ্রব্য এবং ওষুধ শিল্পের উৎপাদিত সামগ্রী চীনা বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর আবেদন জানান তিনি। একই সঙ্গে দেশের চলমান বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প, শিল্পাঞ্চলের আধুনিকীকরণ এবং নতুন শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বেজিংয়ের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্যের পর চিনা প্রশাসনও ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। চিনের তরফে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি উচ্চমানের পণ্য আমদানি করতে আগ্রহী বেজিং। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য শক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বাংলাদেশে চিনা বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। তারেক রহমানের এ সফরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নদী ব্যবস্থাপনায় চিনের সহযোগিতার আর্জি। বৃহস্পতিবার চিনের জলসম্পদমন্ত্রী লি গুওইয়িংয়ের সঙ্গে বৈঠকে রহমান তিস্তা নদী-সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর পুনরুদ্ধার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থার উন্নতি, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণের আধুনিকীকরণে চিনের সহযোগিতা চান বলে সূত্রের খবর।

পরবর্তীতে, লি গুওইয়িং সংবাদমাধ্যমে জানান, ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ও চিনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা ও গত বছর চিনা জলসম্পদ বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশ সফরের ভিত্তিতে দু-দেশের জলসম্পদ সহযোগিতা বাস্তবভিত্তিক ও গবেষণানির্ভর পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি বাংলাদেশ সরকারের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগের প্রশংসা করে এ ক্ষেত্রে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রকৌশলী, জলসম্পদ বিশেষজ্ঞ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের চিনে প্রশিক্ষণের আমন্ত্রণও জানান। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা-সহ বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত নদীর ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে দু-দেশের মধ্যে একটি সমঝোতাও হয়েছে। পাশাপাশি, ১৩টি চুক্তির আওতায় অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, নদী ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন সহযোগিতা, শিক্ষা ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

অন্যদিকে, এ সমঝোতাই দিল্লির কূটনৈতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এ চুক্তি ঝুলে রয়েছে। একই সময়ে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদও চলতি বছর শেষ হওয়ার মুখে। ফলে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কৌশলগত দিক থেকেও বিষয়টির গুরুত্ব কম নয়। পূর্ব হিমালয় থেকে উৎপন্ন তিস্তা নদী সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা স্পর্শকাতর শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এর কাছাকাছি তিস্তা অববাহিকা অবস্থিত। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নদী ব্যবস্থাপনার নামে যদি ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে বৃহৎ অবকাঠামো বা প্রযুক্তিগত উপস্থিতি বাড়ায় চিন, তা হলে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে। যদিও বাংলাদেশ ও চিন— দু-দেশই এই সহযোগিতাকে জলসম্পদ উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রকল্প হিসেবেই তুলে ধরেছে।

উল্লেখ্য, গত মাসেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বেজিং সফরে গিয়ে তিস্তা পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বেজিংয়ের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণের আবেদন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর তারেকের এ সফরে সে আলোচনাই আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও দু-দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ইঙ্গিত মিলেছে। বাংলাদেশ ২৪টি চিনা জে-১০সিই বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে। উন্নত রাডার, দ্রুতগতির কৌশলগত চালনা ও ‘বিয়ন্ড ভিজুয়াল রেঞ্জ’ যুদ্ধক্ষমতার জন্য পরিচিত এ যুদ্ধবিমান সংগ্রহ সম্পন্ন হলে পাকিস্তানের পর বাংলাদেশই হবে বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ, যারা এ মডেলের যুদ্ধবিমান ব্যবহার করবে।

বৈঠকের পাশাপাশি, ‘চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রোমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’ এবং ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’-র যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ কর্মসূচিতেও ভাষণ দিয়েছেন তারেক রহমান। চিনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের সঙ্গে দলীয় পর্যায়ে বৈঠকও করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। এ ছাড়া ‘চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন’, ‘চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশন’, ‘চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি’-সহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। ফলে, বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!