Advertisement
  • এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৫

প্রয়াত কিংবদন্তী লোকসঙ্গীত শিল্পী ফরিদা পারভিন

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
প্রয়াত কিংবদন্তী লোকসঙ্গীত শিল্পী ফরিদা পারভিন

আপামর বাংলা লোকসঙ্গীত প্রেমীদের কাছে অনন্য সুন্দর নাম ফরিদা পারভিন। লালনের গান মানেই তাঁর কণ্ঠ। ৫ দশকের বেশি সময় ধরে বাউল সাধক লালন সাঁইয়ের দর্শন, কথা আর সুর যাঁর কণ্ঠে ফিরে ফিরে এসেছে, সেই কিংবদন্তি শিল্পী ফরিদা পারভীন আর সশরীরে নেই। শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে ঢাকার মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই কিডনির জটিলতা ও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন এই বরেণ্য শিল্পী। চলতি বছরই ৩ বার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে তাঁকে। শেষবার ২ সেপ্টেম্বর, শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় আইসিইউ, পরে ভেন্টিলেটর। চিকিৎসকরা তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখলেও শেষরক্ষা হয়নি। রবিবার সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে ফুলে ফুলে বিদায় জানাতে ভিড় করেন অনুরাগী ও বন্ধুরা। দুপুরে দেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। জানাজা নামাজের পর বিকেলেই কুষ্টিয়ার উদ্দেশে যাত্রা। শিল্পীর ইচ্ছানুসারে, তাঁকে কুষ্টিয়ার পৌর কবরস্থানে, তাঁর মা-বাবার কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শোয়ানো হয়।

১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোর জেলার সিংড়া থানার শাঁঔল গ্রামে জন্ম ফরিদা পারভীনের। বাবার বদলির চাকরির সূত্রে ঘুরেছেন দেশের নানা প্রান্তে। বাবার প্রেরণাতেই গানের জগতে প্রবেশ। তবে শুধু সংগীত নয়, সমান তালে চলেছে তাত্ত্বিক পড়াশোনাও। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন সেই সাধনা। গানের হাতেখড়ি মাগুরায়, উস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে, ১৯৬৮ সালে পেশাদার সংগীতজীবন শুরু। নজরুলগীতি, আধুনিক গান—সবই গেয়েছেন। কিন্তু লালনগীতিই তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। কুষ্টিয়ায় বসেই লালনের গানে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর গায়কিতে ছিল দর্শনের সঙ্গে সংগীতের অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। গানের বাণীর গভীরতা ও সুরের আবেশ একসঙ্গে ধরা দিত সে কণ্ঠে। তাঁর কণ্ঠে উঠে এসেছে— ‘মিলন হবে কত দিনে’, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’, ‘রব না আমি মারে আর কুলেরও সংসারে’— এমন অসংখ্য লালনগীতি, যেগুলি বাঙালির শ্রুতিমেধায় চিরস্থায়ী হয়ে রয়েছে।

১৯৮৭ সালে ‘লালনগীতিতে’ বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘একুশে পদকে’ সম্মানিত হন। ১৯৯৩ সালে ‘অনন্ত প্রেম’ সিনেমায় ‘নিন্দার কাঁটা’ গেয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন। দেশে-বিদেশে তিনি বহুবার প্রতিনিধিত্ব করেছেন সীমানাবিহীন বাংলা লোকসঙ্গীতকে। তাই দেশ-কালের গণ্ডি ছাপিয়ে সব কিছুর ফরিদা পারভীনের পরিচয় একটাই— বাংলা লোকসঙ্গীতের প্রধানতম কণ্ঠস্বর। একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘লালন ফকিরের গান তত্ত্বনির্ভর ঠিকই, কিন্তু সুর-তাল না থাকলে মানুষ তাকে হৃদয়ে টেনে নেয় না। আমি বৈতালিতে গেয়েছি, নতুন সুরে গেয়েছি, কিন্তু গানের অন্তর্নিহিত গভীরতাটা কখনও হারাতে দিইনি।’

বাংলা লোকগানে যেমন আব্বাসউদ্দিন ভাওয়াইয়ায়, আবদুল আলীম ভাটিয়ালিতে, তেমনই ফরিদা পারভীন—লালনগীতির একমাত্রিক প্রতিনিধি। নাগরিক পরিসরে গ্রামীণ সংগীতকে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আলোকসম। এমন মিলিত গায়নধারা উপমহাদেশে খুব কমই দেখা যায়, অধুনা যাঁদের মধ্যে উদাহরণ দেওয়া হয়, তাঁদের একজন ছিলেন তিনিও। এক সময়ের কুষ্টিয়ার নিরালায় বসে যিনি লালনগীতির জন্য জায়গা করে নিয়েছিলেন বৃহত্তর সাংস্কৃতিক মানচিত্রে, সে শিল্পী চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। কিন্তু রেখে গেলেন অমূল্য ভাণ্ডার— যা শুধুই সংগীত নয়, বাঙালির আত্মপরিচয়েরই অংশ। পরিপূর্ণ, প্রজ্ঞাবান কণ্ঠ, নাগরিকতা ও মাটির গন্ধ একসূত্রে গাঁথা শিল্পীর শূন্যস্থান কখনোই পূরণ হবার নয়। বাংলার আকাশে আহ তাই লালনের গানই যেন আজ আকাশে-বাতাসে বাজছে— ‘পাখি কখন জানি উড়ে যায়…’


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!