Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • মে ৪, ২০২৬

উত্তরে-দক্ষিণেও পদ্মের উচ্ছ্বাস, গেরুয়া পথে বাংলা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
উত্তরে-দক্ষিণেও পদ্মের উচ্ছ্বাস, গেরুয়া পথে বাংলা

বাংলায় পালাবদল। ১৫ বছরের জোড়াফুলের শাসনকে উৎখাত করে, এবার বঙ্গের বিস্তীর্ণ জমিতে ফুটল পদ্ম। সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত ভোট গণনার পর, ইলেকশন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ৭৩টি আসনে জয়ী বিজেপি, এগিয়ে আরও ১২৭টি আসনে, অর্থাৎ, মোট ২০৪টি আসন যে পদ্মশিবিরের ঝুলিতে তা কার্যত স্পষ্ট। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছে মাত্র ৩৩টি সিট, এগিয়ে রয়েছে ৫০টি আসনে, মোট সংখ্যা ৮৩, যা দিয়ে সরকার গড়া সম্ভব নয়। তাই একথা বলাই যায়, একক সংখ্যাগরিষ্ট  বিজেপির সরকার গঠন এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

ফল স্পষ্ট হতে না হতেই প্রতিক্রিয়া আসে দিল্লি থেকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সমাজমাধ্যমে লিখেছে, ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনগণের শক্তির জয় হয়েছে এবং বিজেপির সুশাসনের রাজনীতি জয়ী হয়েছে।’ তিনি আরও বলেনবাংলার মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য তাঁর দল সম্ভাব্য সব কিছু করবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বাংলার মানুষকে কোটি কোটি প্রণাম’  জানিয়ে লেখেনএই বিপুল জনাদেশ ভয়তোষণ এবং অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষকদের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের জোরালো জবাব। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে দলের কর্মীদের ত্যাগসংগ্রামআত্মবলিদানের প্রসঙ্গও। শাহের ভাষায়, ‘গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত আজ গেরুয়া পতাকা উড়ছে।’

সোমবার বাংলার ২৯৩টি আসনে (হয়নি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা কেন্দ্রে পুর্নির্বাচন ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।) ভোটগণনা শুরু হতেই, রুদ্ধশ্বাস এক প্রতীক্ষায় ছিল আপামর বঙ্গবাসী। তৃণমূল-বিজেপি-সহ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও চাপা উত্তেজনা। গণনাকেন্দ্রের বাইরে দীর্ঘ প্রতীক্ষাদলীয় শিবিরে উৎকণ্ঠাআর টেলিভিশনের পর্দায় প্রতি মুহূর্তে বদলে যেতে থাকা সংখ্যার খেলা— সব মিলিয়ে দিনের শুরু থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিলএ শুধু আর একটি ভোটগণনার দিন নয়বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বড় পালাবদলের সম্ভাবনাও লুকিয়ে রয়েছে এর ভিতরে।

সকাল থেকে যে প্রবণতা ধরা পড়তে শুরু করেছিল, বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা আরও স্পষ্ট হয়। পশ্চিমবঙ্গে এ বার কার্যত গেরুয়া ঝড়ের ইঙ্গিত মিলতে থাকে। বর্তমান প্রবণতা ধরলে তাদের অগ্রগতি ২০০-র গণ্ডি পার করেছে বিজেপি, অন্যদিকে তৃণমূল একশোও ছুঁতে পারেনি। কমিশনের প্রাথমিক হিসাব বলছেবিজেপির প্রাপ্ত ভোট ৪৫.৪৩ শতাংশতৃণমূল পেয়েছে ৪০.৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ ভোটের ব্যবধানেও প্রায়  শতাংশের ফারাক।

উত্তরবঙ্গ থেকে পশ্চিমাঞ্চল— রাজ্যের বিস্তীর্ণ অংশে বিজেপির এই উত্থান বিশেষ ভাবে চোখে পড়ে। আলিপুরদুয়ারে ৫-০জলপাইগুড়িতে ৭-০দার্জিলিঙে ৫-০কালিম্পঙে ১-০— উত্তরবঙ্গের ফল প্রায় একতরফা। পশ্চিমাঞ্চলেও একই ছবি। পূর্ব মেদিনীপুরে ১৬-০ঝাড়গ্রামে ৪-০পুরুলিয়ায় ৯-০ ব্যবধানে পদ্মশিবিরের সাফল্য রাজনৈতিক মহলে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়েছে। এক এক করে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলির ফল সামনে আসতে থাকে। আসানসোল দক্ষিণে বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পাল ৪০,৮১৯ ভোটে পরাজিত করেন তৃণমূলের তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মেদিনীপুরে ৩৮ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হন বিজেপির শঙ্কর গুছাইত। দার্জিলিঙে ছহাজার ভোটে জেতেন নোমান রাই। বড়ঞায় সুখেনকুমার বাগদী ২২ হাজার ভোটে জয়ী হন। খড়দহে বিজেপির কল্যাণ চক্রবর্তী প্রায় ২৫ হাজার ভোটে জিতে নেন কেন্দ্রটি। জামুরিয়ায় ২২ হাজার ভোটে জিতেছেন বিজন মুখোপাধ্যায়। কালিম্পঙে ২১ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছেন ভরতকুমার ছেত্রী। মেখলিগঞ্জে তৃণমূলের পরেশচন্দ্র অধিকারীকে ২৯ হাজার ৫৮৪ ভোটে হারিয়ে জয়ী হন বিজেপির দধিরাম রায়।

বাঁকুড়াতেও গেরুয়া শিবিরের দাপট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওন্দারানিবাঁধ এবং বড়জোড়া— তিনটি কেন্দ্রেই জয় পায় বিজেপি। রানিবাঁধে ৫২ হাজার ২৬৯ ভোটে জেতেন ক্ষুদিরাম টুডু। শালতোড়ায় ৩২ হাজার ১৩৫ ভোটে জয়ী হন চন্দনা বাউড়ি। রানিগঞ্জে ১৭ হাজার ৭৮৬ ভোটে জয়ী হন পার্থ ঘোষ। জামালপুরে ১১ হাজার ১৭৮ ভোটে জেতেন অরুণ হালদার। আউসগ্রামে ১২ হাজার ৫৩৫ ভোটে জয় পান কলিতা মাঝি। বরাবনিতে ১১ হাজার ৭২২ ভোটে জয়ী হন অরিজিৎ রায়। ঝাড়গ্রামে ৩৮ হাজার ১৪৭ ভোটে জেতেন লক্ষ্মীকান্ত সাউ। গোঘাটে ৪৯ হাজার ৫৮২ ভোটে জয়ী হন প্রশান্ত দিগর। পূর্বস্থলী উত্তরে জয়ী হন গোপাল চট্টোপাধ্যায়।

তৃণমূল অবশ্য সম্পূর্ণ ভাবে মুছে যায়নি। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ঘাসফুল শিবির নিজেদের শক্তি ধরে রাখতে পেরেছে। শমসেরগঞ্জে ৯,৭২৫ ভোটে জয়ী হয়েছেন মহম্মদ নুর আলম। ভরতপুরে ২৪,৭৮২ ভোটে জিতেছে তৃণমূল। জলঙ্গিতেও ঘাসফুল শিবির জয় পেয়েছে। কামারহাটিতে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হয়েছেন মদন মিত্র। বালিগঞ্জে কৃষিমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ৬১ হাজার ভোটে জয়ী হয়ে দলের জন্য বড় স্বস্তি এনে দিয়েছেন। চৌরঙ্গীতে ২২ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছেন নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা বন্দরেও বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। অন্য দিকে বিরোধী শিবিরের অন্য দলগুলিও কিছু কিছু জায়গায় নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। ডোমকল বিধানসভায় সিপিএমের মোস্তাফিজুর রহমান রানা জয়ী হয়েছেন। রানিনগরে কংগ্রেস প্রার্থী জুলফিকার আলি জয় পেয়েছেন। ফরাক্কায় ৮,১৯৩ ভোটে জয়ী হয়েছেন কংগ্রেস প্রার্থী মোতাব শেখ।

মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক ছবিতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছেন হুমায়ুন কবীর। কংগ্রেসতৃণমূলবিজেপি— একাধিক রাজনৈতিক শিবিরে থাকার পর এ বার নিজস্ব দল গড়ে নির্বাচনে নেমেছিলেন তিনি। ভোটের মাস দুয়েক আগে গড়া তাঁর আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি) প্রার্থী দেয় ভবানীপুর থেকে নন্দীগ্রাম পর্যন্ত। তবে সবচেয়ে বড় চমক দেন হুমায়ুন নিজেই। নওদা এবং রেজিনগর— দুই কেন্দ্রেই জয় পান তিনি। নওদায় বিদায়ী বিধায়ক সাহিনা মুমতাজকে ২৭,৯৪৩ ভোটে এবং রেজিনগরে আতাউর রহমানকে ৫৮,৮৭৬ ভোটে পরাজিত করেন। ভবানীপুর বা নন্দীগ্রামে তাঁর দলের প্রার্থীরা প্রভাব ফেলতে না পারলেও মুর্শিদাবাদে তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই নির্বাচনে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলির একটি ছিল রাজ্যের একাধিক বিদায়ী মন্ত্রীর কঠিন লড়াই। গণনার ট্রেন্ড যত এগিয়েছেততই দেখা গেছে বহু মন্ত্রী নিজেদের কেন্দ্রে পিছিয়ে পড়ছেন। বিধাননগরে পিছিয়ে ছিলেন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু। দমদমে পিছিয়ে পড়েন বিদায়ী শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। দমদম উত্তরে পিছিয়ে ছিলেন স্বাস্থ্য ও অর্থ দফতরের বিদায়ী প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। দিনহাটায় পিছিয়ে ছিলেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী উদয়ন গুহ। সবংয়ে সেচমন্ত্রী মানস ভুঁইয়া এবং শালবনিতে ক্রেতাসুরক্ষা দফতরের মন্ত্রী শ্রীকান্ত মাহাতা পিছিয়ে ছিলেন। বিনপুরে পিছিয়ে ছিলেন বিদায়ী বনমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা। চন্দননগরে পিছিয়ে ছিলেন কারিগরি শিক্ষামন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। মোথাবাড়িতে পিছিয়ে ছিলেন সেচ প্রতিমন্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন। দুর্গাপুর পূর্বে পিছিয়ে ছিলেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার। স্কুলশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সত্যজিৎ বর্মন এবং পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তীও চাপে ছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের পরাজয় নিশ্চিতও হয়ে যায়। মন্তেশ্বর বিধানসভায় বিদায়ী মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরিকে ১৪,৭৯৮ ভোটে হারান বিজেপির সৈকত পাঁজা। শ্যামপুকুরে বিদায়ী মন্ত্রী শশী পাঁজাকে ১৪,৬৩৩ ভোটে হারিয়ে জয়ী হন পূর্ণিমা চক্রবর্তী। ভাতারে তৃণমূলের শান্তনু কোনারকে ৬,৫২৮ ভোটে পরাজিত করেন বিজেপির সৌমেন কার্ফা। তবে এই বিপর্যয়ের আবহেও তৃণমূলের দুই মন্ত্রী বিশেষ ভাবে নজর কাড়েন। বালিগঞ্জে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের বড় ব্যবধানের জয় যেমন দলকে কিছুটা স্বস্তি দেয়তেমনই কলকাতা বন্দর থেকে ফিরহাদ হাকিমের অগ্রগতি ঘাসফুল শিবিরের মনোবল ধরে রাখে।

রাজ্যের সবচেয়ে আলোচিত কেন্দ্রগুলির মধ্যে ছিল নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর। নন্দীগ্রামে ১০ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। অন্য দিকে ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারীর সরাসরি লড়াই ঘিরে শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা বজায় রয়েছে দুই দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতের খবর এসেছে। শেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ীমমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৩,৮৩০ ভোটে এগিয়ে থাকলেও এখনো ৬ দফা গণনা বাকি।

এ দিন বহরমপুরেও নজরকাড়া ফল সামনে আসে। ১৬,৮৫৮ ভোটে জয়ী হয় বিজেপি। পরাজিত হন অধীর চৌধুরী। সোনারপুর দক্ষিণে বিজেপির রূপা গঙ্গোপাধ্যায় জয়ী হন। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে গণনাকেন্দ্র ছাড়েন তৃণমূল প্রার্থী লাভলী মৈত্র। মানিকতলায় ১৫ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হন তাপস রায়। নৈহাটিতে ৭৭ হাজার ৪৮৪ ভোটে জয়ী হন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। দিনহাটায় ১৭ হাজার ৪৪৭ ভোটে জেতেন অজয় রায়। কার্শিয়াংয়ে ১৭ হাজার ৭ ভোটে জয়ী হন সোনম লামা। হেমতাবাদে ১২ হাজার ৩৬১ ভোটে জেতেন হরিপদ বর্মন। তপনে ৩৬ হাজার ৯৮৭ ভোটে জয়ী হন বুধরাই টুডু। অশোকনগরে ৯ হাজার ৪০৮ ভোটে জয় পান ড. সুময় হীরা। হবিবপুরে ৭৮ হাজার ১৮৮ ভোটে জয়ী হন জোয়েল মুর্মু। জয়পুরে ২২ হাজার ২১৮ ভোটে জেতেন বিশ্বজিৎ মাহাত। মেমারিতে ৭,১০৮ ভোটে জয়ী হন মানব গুহ।

দিনের শেষে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের বক্তব্যসোমবারের গণনার প্রবণতা শুধু কিছু আসনের জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়। এটি বাংলার দীর্ঘদিনের বদ্ধাবস্থা, একপাক্ষিক রাজনৈতিক সমীকরণে গভীর পরিবর্তনের আভাস। এতটুকু স্পষ্টউত্তর থেকে দক্ষিণপাহাড় থেকে জঙ্গলমহলনদীয়া থেকে রাঢ়অঞ্চলে বিজেপির বিজয়রথ সগৌরবে ঘোড়া ছুটিয়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!