- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মে ৪, ২০২৬
গণনার সকালেই বদলের ইঙ্গিত দক্ষিণে, বাংলায় টানটান লড়াই, অসমে এগিয়ে পদ্ম; বঙ্গে বিজয় মিছিলে নিষেধাজ্ঞা কমিশনের
কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সোমবার সকাল গড়াতেই দেশের ৪ রাজ্য ও ১ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটগণনা বহুস্তরীয় রাজনৈতিক সংকেত সামনে আনতে শুরু করেছে। কোথাও নতুন শক্তির উত্থান, কোথাও দীর্ঘদিনের শাসনের ভিত নড়ে যাওয়ার আভাস, কোথাও আবার লড়াই পৌঁছে গিয়েছে স্নায়ুচাপের চরম পর্যায়ে।
সর্বশেষ প্রবণতায় অসমে ১২৬ আসনের মধ্যে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে ৯৭, কংগ্রেস ২৬, অন্যরা ৩। কেরালায় ১৪০ আসনের মধ্যে যুক্ত গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট এগিয়ে ৮৫, বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ৪২, বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জোট ১, অন্যরা ১২। তামিলনাড়ুতে ২৩৪ আসনের মধ্যে টিভিকে এগিয়ে ১০৭, এআইএডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোট ৭৮, ডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোট ৪৮, অন্যরা ২। পুদুচেরিতে ৩০ আসনের মধ্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট এগিয়ে ১৭, ইন্ডিয়া জোট ৪, বাকি আসনে অন্যরা। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মোট আসন ২৯৪। তবে ফলতা কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচন হওয়ায় সোমবার গণনা হচ্ছে ২৯৩টি কেন্দ্রে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৪৭টি আসন। এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রবণতায় রাজ্যের রাজনৈতিক ছবিতে স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে পদ্মশিবির। ১৭৯টি আসনে লিড ধরে রেখেছে তারা। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে রয়েছে ১০৭টি আসনে। কংগ্রেস এখনো পর্যন্ত কোনো আসনে এগোতে পারেনি। বাম শিবিরের পক্ষে সিপিএম এগিয়ে রয়েছে ১টি মাত্র আসনে। অন্য প্রার্থী বা দলগুলির দখলে রয়েছে ৪টি আসন। তবে, এ প্রবণতা চূড়ান্ত ফল নয়।
তামিলনাড়ুতে ভোটগণনা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সবচেয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে অভিনেতা বিজয়ের দল তামিলগা ভেত্রি কাঝাগম। ২৩৪টি আসনের এই রাজ্যে প্রাথমিক প্রবণতা বলছে, অভিষেকেই উল্লেখযোগ্য জায়গা করে নিচ্ছে দলটি। সকালবেলার হিসাব অনুযায়ী ৮৫টিরও বেশি আসনে এগিয়ে ছিল টিভিকে। অন্যদিকে, অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাঝাগম-নেতৃত্বাধীন জোট এগোচ্ছিল ৭৭টি আসনে। বিদায়ী শাসকদল দ্রাবিড় মুনেত্র কাঝাগম, জাতীয় কংগ্রেস এবং দেশিয়া মুরপোক্কু দ্রাবিড় কাঝাগমের জোট নেমে যায় তৃতীয় স্থানে। ফলত, ভোটগণনার প্রথম কয়েক ঘণ্টাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, দক্ষিণের রাজনীতিতে নতুন এক শক্তিকে আর উপেক্ষা করা যাবে না। চেন্নাইয়ের রাজনৈতিক মহলে ভোট ফলাফলের প্রাথমিক ইঙ্গিত নতুন করে জোট-জল্পনার জন্ম দিয়েছে। কারণ কয়েক মাস ধরেই প্রকাশ্যে এআইএডিএমকে এবং বিজয়ের দল পরস্পরের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালিয়েছে। ভোটের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে জোটের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু টিভিকে-র এই অভিষেক ভোট-পরবর্তী সমীকরণের প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। চেন্নাইয়ের কোলাথুর কেন্দ্রে ৩ দফার গণনায় পিছিয়ে রয়েছেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট্যালিন।এগিয়ে টিভিকে-র ভি. এস. বাবু। এই কেন্দ্র থেকেই ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১—টানা ৩টি বিধানসভা নির্বাচনে জয় পেয়েছিলেন স্ট্যালিন। ফলে কোলাথুরের এই প্রবণতা শুধু সংখ্যার বিচারে নয়, ডিএমকে-র জন্য তা স্পষ্ট মনস্তাত্ত্বিক চাপেরও ইঙ্গিত বহন করছে।
পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪টি আসনে লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস এবং ভারতীয় জনতা পার্টি। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ওঠানামা করেছে প্রবণতার রেখাচিত্র। প্রথম দফার প্রবণতায় বিজেপি অর্ধেকের গণ্ডি ছাড়িয়ে ১৬০টিরও বেশি আসনে এগিয়ে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে ১১০টির কিছু বেশি আসনে। ফলে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে আবারও এক স্নায়ুযুদ্ধের আবহ। বঙ্গনির্বাচন শুরু থেকেই বিশেষ রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছিল। প্রথমত, দীর্ঘদিন ধরে বাংলা বিজেপিকে ক্ষমতার বাইরে রেখেছে। দ্বিতীয়ত, ‘এসআইআর’ নিয়ে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই গড়ে তুলেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই প্রক্রিয়ায় ৮৯ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ে, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১১.৬ শতাংশ। এ সংখ্যা ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের ব্যবধানের তুলনায়ও সামান্য বেশি। এবারেই বাংলার ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ ভোৎ দিয়েছেন ভোটাররা।
কেরালায় সময় যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে, মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন বাম সরকারের এক দশকের শাসনের অবসান ঘটতে পারে। প্রাথমিক প্রবণতায় দ্রুত এগিয়ে যুক্ত গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট। ১৪০ সদস্যের বিধানসভায় ইউডিএফ ৯৯টি আসনে এগিয়ে। শাসক বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট এগিয়ে মাত্র ৪০টি কেন্দ্রে। বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট এগিয়ে একটি আসনে। তৃতীয় দফার গণনা শেষে পিনারাই বিজয়ন নিজেও ধর্মদম আসনে পিছিয়ে পড়েন। এতে শাসক শিবিরের উদ্বেগ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে বিরোধী দলনেতা ভি. ডি. সাথীশন, যিনি শুরুতে পিছিয়ে ছিলেন, পরে ব্যবধান ঘুচিয়ে এগিয়ে যান। পুদুচেরিতে ৩০ আসনের নির্বাচনে এখনো পর্যন্ত এগিয়ে রয়েছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ। ১৭টি আসনে তারা লিড ধরে রেখেছে। অন্য এক পর্যায়ের প্রবণতায় ১৬টি আসনেও তাদের এগিয়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে ৪ টি আসনে এগিয়ে রয়েছে বিজয়ের টিভিকে। বাকি আসনে অন্যদের উপস্থিতি রয়েছে।
অসমে ১২৬ আসনের বিধানসভায় বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জোট শুরু থেকেই স্পষ্ট সুবিধাজনক অবস্থানে। সকালবেলার প্রবণতায় বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জোট ৯৭টি আসনে এগিয়ে। কংগ্রেস এগিয়ে ২৬টি আসনে। অন্যরা ৩টি আসনে। অন্য এক পর্যায়ের গণনায় বিজেপি ৯২টি আসনে এবং কংগ্রেস ২৩টি আসনে এগিয়ে থাকার ছবিও সামনে আসে। অর্থাৎ সংখ্যার ওঠানামা থাকলেও সামগ্রিকভাবে অসমে বিজেপির স্পষ্ট অগ্রগতি ধরা পড়ে। অসম কংগ্রেস সভাপতি এবং জোরহাটের সাংসদ গৌরব গগৈ দ্বিতীয় দফার গণনা শেষে বিজেপি প্রার্থী হিতেন্দ্র নাথ গোস্বামীর কাছে পিছিয়ে পড়েন। সকাল প্রায় ১০টা ২০ মিনিটের হিসাবে গোস্বামী ৪,১৩২ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাঁর প্রাপ্ত ভোট ১৪,০০৭। গৌরব গগৈ পেয়েছিলেন ৯,৮৭৫ ভোট। ভোটগণনার মধ্যেই গৌরব গগৈ জানান, ইলেকট্রনিক ভোটযন্ত্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কংগ্রেস বিশেষ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তিনি বলেন, স্ট্রংরুম থেকে গণনাকেন্দ্রে ইভিএম পরিবহণের প্রতিটি ধাপ জেলাভিত্তিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গুয়াহাটিতেও গড়ে তোলা হয়েছে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। তাঁর কথায়, ‘আজ সকালে কড়া নজরদারির মধ্যে স্ট্রংরুম থেকে গণনাকেন্দ্রে ইভিএম আনা হয়েছে। প্রতিটি জেলায় আমরা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি। গুয়াহাটিতে রয়েছে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ইউনিট।’
এদিকে, বাংলায় ফল ঘোষণার দিনই বিজয় মিছিলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। কলকাতা পুলিশও এ নিয়ে পৃথক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। পিটিআই-কে এক নির্বাচন কমিশন আধিকারিক জানিয়েছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কয়েক জন এজেন্ট গণনাকেন্দ্রে পৌঁছতে পারেননি, এ অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজ ফল ঘোষণার পরে কোনও প্রার্থীর জয়ের উদ্যাপন করে রাজ্যের কোথাও মিছিল করা যাবে না।’ কলকাতা পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ৫ মে ২০২৬ অথবা তার পরে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকের পূর্বানুমতি নিয়ে তবেই বিজয় মিছিল করা যাবে। কেবল অনুমোদিত মিছিলকেই প্রচলিত নিয়ম, নির্দেশিকা এবং অনুমতিপত্রে আরোপিত সব শর্ত কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
সকাল থেকেই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল কমিশনের দফতরে পৌঁছে যান। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, রাজ্যে ৪৯৮টি গণনাকেন্দ্রে ভোটগণনা চলছে। নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক, রিটার্নিং অফিসার এবং ক্ষুদ্র পর্যবেক্ষক, সবাই ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছেন। তাঁর কথায়, কমিশন সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। বিজয় মিছিলের প্রশ্নে তিনি বলেন, সেই সিদ্ধান্ত জেলাশাসকের নির্দেশ অনুসারেই হবে। ‘জেলাশাসক যেমন নির্দেশ দেবেন, তেমনই হবে।’ প্রশাসনের ব্যাখ্যায়, ভোট-পরবর্তী হিংসা ঠেকাতেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। বাংলার নির্বাচনী রাজনীতিতে ফল-পরবর্তী সংঘর্ষ নতুন নয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, ফল ঘোষণার পরও কেন্দ্রীয় বাহিনী আরও ৬০ দিন পশ্চিমবঙ্গে মোতায়েন থাকবে।
❤ Support Us





