- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ১৩, ২০২৫
রাজ্যসভা নির্বাচনে নতুন চমক — জম্মু-কাশ্মীরে বিজেপির তিন প্রার্থীর তালিকায় মীর
৩৭০ ধারা বিলোপের ৫ বছর পর রাজ্যসভা নির্বাচন আর তাতে জম্মু ও কাশ্মীরের বিজেপি প্রার্থীর নাম নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক চমক। আগামী ২৪ অক্টোবর ৪ টি রাজ্যসভা আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। রবিবার ৪ আসনের মধ্যে তিনজনের নাম ঘোষণা করেছে গেরুয়া শিবির। চমক এখানেই, তিনজনের মধ্যে রয়েছেন একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি — গোলাম মহম্মদ মীর। বাকি দুই প্রার্থী হলেন রাকেশ মহাজন ও সত্যপাল শর্মা।
সংখ্যার দিক থেকে স্পষ্ট, জম্মু-কাশ্মীরের এই ৪টি আসনের মধ্যে ৩টিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে শাসকদল ন্যাশনাল কনফারেন্স ও কংগ্রেস জোটের। একটিমাত্র আসনে জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বিজেপির। তবু রাজ্যসভায় আরো দুই আসনে লড়াইয়ে নামছে গেরুয়া শিবির। ন্যাশনাল কনফারেন্স ও কংগ্রেস জোট ইতিমধ্যেই ৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। চতুর্থ আসনে প্রার্থী ঘোষণা বিষয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে ন্যাশনাল কনফারেন্স। শীঘ্রই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২০১৯ সালে ৩৭০ ধারা বাতিলের পাঁচ বছর পর ২০২৪-র বিধানসভা নির্বাচন জম্মু-কাশ্মীরে হয়েছে। সেখানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে ওমর আবদুল্লাহ-র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কনফারেন্স ও কংগ্রেসের জোট। এবার সেই বিধায়কদের ভোটেই রাজ্যসভার ৪ সাংসদ নির্বাচিত হবেন। গত ৪ বছর ৮ মাস ধরে খালি ছিল জম্মু-কাশ্মীরের ৪টি রাজ্যসভা আসন। ফলে দীর্ঘদিন পর ফের রাজ্যসভায় প্রতিনিধিত্ব পেতে চলেছে উপত্যকা। ভোটগ্রহণ হবে ২৪ অক্টোবর, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ভোটের ফলাফলও সেই দিনই ঘোষণা করা হবে। প্রসঙ্গত, জম্মু-কাশ্মীর থেকে পূর্বে রাজ্যসভায় ছিলেন ফয়াজ আহমেদ মীর, শামসের সিং মানহাস, গুলাম নবী আজাদ ও নাজির আহমেদ। এবার তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পাঁচ বছর পর ফের নতুন সাংসদ নির্বাচিত হবেন।
বিজেপি প্রার্থী হিসাবে গোলাম মহম্মদ মিরের নাম ঘোষণা হওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ — কারণ লোকসভায় মুসলিম প্রতিনিধিত্ব প্রায় বিলুপ্ত হলেও রাজ্যসভায় একজন মুসলিম প্রার্থী মনোনয়নের পদক্ষেপকে অনেকেই বিজেপির ‘ইমেজ করেকশন; হিসেবে দেখছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গিয়েছে, দেশের ১৮৩ মিলিয়ন (১৮.৩ কোটি) মুসলমান জনসংখ্যার (১৪ শতাংশ) মধ্যে থেকে লোকসভায় জয়ী হয়েছেন মাত্র ২৪ জন। ২০১৯-এ এই সংখ্যাটা ছিল ২৬। ভোটপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন ৯৪ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী, যার মধ্যে ৩১ শতাংশ জয়ী হয়েছেন। শতাংশের নিরিখে সংখ্যা কিছুটা উন্নত হলেও, নিছক গাণিতিক তুলনাতেই এই হার জনসংখ্যার অনুপাতে আশাপ্রদ তো নয়ই, বরং গভীর চিন্তার বিষয়।
সবচেয়ে আশঙ্কার বার্তা বয়ে নিয়ে চলেছে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ)-এর সাংসদ তালিকা। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তৃতীয়বারের জন্য সরকার গঠন করা দলের ২৯৩ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে কোনো মুসলিম, খ্রিস্টান বা শিখ নেই। ব্যতিক্রম শুধু একজন, বৌদ্ধ ধর্মালম্বী সাংসদ, অরুণাচল পশ্চিমের কিরেন রিজিজু। অন্যদিকে, লোকসভায় জয়ী সংখ্যালঘু সাংসদদের মধ্যে রয়েছেন কংগ্রেসের ৯ জন, তৃণমূল কংগ্রেসের ৫ জন, সমাজবাদী পার্টির ৪ জন, ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের ২ জন, ন্যাশনাল কনফারেন্সের ১ জন। অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের আসাদউদ্দিন ওয়েসি এবং ২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলে সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৪-এ। বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ব্লকের মোট সাংসদ সংখ্যা ২৩৫। এর মধ্যে ৭.৯ শতাংশ মুসলিম, ৫ শতাংশ শিখ ও ৩.৫ শতাংশ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্ত সাংসদ রয়েছেন। কিন্তু ভোটের আগে এবং পরেও দেখা গিয়েছে, বহু বিরোধী দলগুলিও সংখ্যালঘু প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে স্পষ্ট অনিচ্ছা দেখিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে গত নির্বাচনে, ‘সংখ্যালঘু তোষণ’-এর অভিযোগ এড়াতে দলগুলো নিজেরাই সংখ্যালঘু প্রার্থীদের ভোত ময়দানের বাইরে রেখে দিয়েছে। এর ফলে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক কাঠামোর বাস্তব রূপ নিয়ে বারবার উঠেছে প্রশ্ন। বিজেপি বা এনডিএ জোট সংখ্যালঘু প্রার্থী না দেওয়ার বিষয়টিকে ‘উইনেবিলিটি’-র যুক্তিতে ব্যাখ্যা করে এসেছে। দলের শীর্ষ নেতা ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বহুবার দাবি করেছেন, ‘আমরা ধর্ম দেখে নয়, জয়লাভের সম্ভাবনা দেখে প্রার্থী দিই।’ কিন্তু তথ্য বলছে, বিজেপি পরপর তিনটি সাধারণ নির্বাচনে যে কয়েকজন মুসলিম প্রার্থী দিয়েছে, তাঁদের একজনও জয়ী হননি। রাজ্যসভাতেও বিজেপির সাংসদ অনুপাতের হিসাবে আশঙ্কাজনক কম। লোকসভায় সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব কম হওয়ায়, অতীতে রাজ্যসভার মাধ্যমে খানিকটা ভারসাম্য আনার চেষ্টা করত রাজনৈতিক দলগুলি। কিন্তু সেখানেও এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে যেখানে রাজ্যসভায় সংখ্যালঘু উপস্থিতির গড় ছিল ১২ শতাংশ, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৭ শতাংশে। মনোনীত কোটায় বর্তমানে কোনো সংখ্যালঘু সদস্য নেই।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান সংখ্যালঘুদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অনুপস্থিতির মূল কারণ। রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক ক্রিস্টোফ জাফরেলট-এর মতে, ‘যেখানেই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে, সেখানেই এই প্রতিনিধিত্ব সমীকরণ কমেছে। এছাড়াও ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থা সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের পক্ষে হলেও সংখ্যালঘুদের জন্য ভোট সংখ্যা অনুযায়ী কম আসন জেতার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে করেন বহু বিশ্লেষক। তাঁদের মতে, সংখ্যালঘু জনসংখ্যা সমগ্র দেশে ছড়িয়ে থাকায় তারা ভোট দিলেও সেটি আসনজয়ের জন্য যথেষ্ট হয় না। অন্যদিকে, বিরোধীরা সংখালঘু প্রার্থী দিলে সংখ্যাগুরু ভোটাররা একজোট হয়ে প্রতিক্রিয়ায় বিজেপির দিকে ঝুঁকতে পারেন— এই ভয়েই বিরোধী দলগুলোও অনেক সময় এমন প্রার্থীদের টিকিট দিতেও কুণ্ঠিত হয়। ভারতের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ, কিন্তু সাংসদদের তালিকা বা রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন-নীতিতে সেই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। রাজনীতির মূলস্রোতে সংখ্যালঘুদের যে কোনো প্রকৃত উপস্থিতি রয়েছে, এমন কথাও সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে বলা মুশকিল। ফলে দেশের বিশাল সংখ্যক মানুষের প্রতিনিধিত্ব দেশের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ‘প্রান্তিক দর্শক’ হিসেবেই এখনো রয়ে গিয়েছে।
❤ Support Us





