- এই মুহূর্তে কে | রি | য়া | র-ক্যা | ম্পা | স
- অক্টোবর ১৬, ২০২৫
ইংরেজি নয়, এবার মাতৃভাষায় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়াশোনা ! ভাষা-সমতা আনতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার আইআইটির
ইংরেজির একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে এবার আঞ্চলিক ভাষাকে পাশে রাখছে দেশের সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলি। মাতৃভাষায় প্রযুক্তি শিক্ষা— এখন আর কেবল তত্ত্ব আলোচনার বিষয় নয়, ক্রমশ বাস্তব রূপ নিচ্ছে তা। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের আহ্বান ও নতুন শিক্ষা নীতি-র নির্দেশনা মেনে একে একে উদ্যোগ নিচ্ছে ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলি।
আইআইটি মাদ্রাজ তৈরি করছে ইংরেজি টেক্সটকে সরাসরি ১১টি ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করার সক্ষম ‘লাইভ স্পিচ-টু-স্পিচ ট্রান্সলেশন টুল’, অন্যদিকে আইআইটি খড়গপুর শুরু করছে বাংলা ভাষায় পেশাভিত্তিক কোর্স। আইআইটি যোধপুর ইতিমধ্যেই চালু করেছে হিন্দি মাধ্যমে বিএটেকের পাঠদান। সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষায় ভাষার প্রাচীর ভাঙার পথে এক ঐতিহাসিক অধ্যায় শুরু হয়েছে। গত আগস্টে অনুষ্ঠিত ৫৬তম আইআইটি কাউন্সিল বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট— ‘ভারতের ভাষাই হবে ভারতের জ্ঞানের বাহক।’ তারপর থেকেই দ্রুত পদক্ষেপ নেয় আইআইটি মাদ্রাজ। প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর অধ্যাপক ভি. কামাকোটি জানান, তাঁরা এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যা ইংরেজি ভাষার দেওয়া অধ্যাপকের বক্তব্য প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ১১টি ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করতে পারে।
তামিল, হিন্দি, তেলেগু, কন্নড়, মালয়ালম— একাধিক ভাষায় এখন শোনা যাবে অধ্যাপকদের ইংরেজি ক্লাস। শুধু শব্দের অনুবাদ নয়, বক্তার স্বর, জোর, আবেগ—সবই অনুকরণ করতে পারে এই প্রযুক্ত। কামাকোটির জানিয়েছেন, ‘ছাত্ররা যেন রোবোটিক অনুবাদ না শোনে, বরং শিক্ষককে যেন নিজের ভাষায়ই শুনছে বলে মনে হয়—এই বাস্তব অভিজ্ঞতা দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।’ এই উদ্যোগে মাদ্রাজ আইআইটির নিজস্ব স্টার্টআপ ‘সর্বম এআই’ যুক্ত হয়েছে। প্রথম বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই ব্যবস্থা বিশেষভাবে চালু হবে, যাতে তারা প্রাথমিক দুই সেমেস্টারে মাতৃভাষার সহায়তায় জটিল ধারণা সহজে বুঝতে পারে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই প্রকল্পটি পূর্ণমাত্রায় চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিঠানটি। শিক্ষামন্ত্রী ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তির প্রদর্শনী দেখেছেন মাদ্রাজ ক্যাম্পাসে গিয়ে।
পিছিয়ে নেই বাংলাও। আইআইটি খড়গপুরের অধ্যাপক সুমন চক্রবর্তী জানালেন, তাঁরা বাংলা ভাষায় কয়েকটি নতুন পেশাগত কোর্স চালু করতে চলেছেন। মূল বিএটেক পাঠক্রমে নয়, বরং তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা সায়েন্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো শিল্প-ভিত্তিক বিষয়ের জন্য এই কোর্সগুলি তৈরি হচ্ছে। ভিডিয়ো লেকচার, লাইভ ক্লাস ও কিছু সরাসরি উপস্থিতি— সব মিলিয়ে ‘হাইব্রিড’ ধাঁচের এই কোর্সগুলিতে থাকবে ‘মাল্টিপল এন্ট্রি’ ও ‘এক্সিট সিস্টেম’। ফলে কেউ চাইলে ৪ বছরের পূর্ণ বিএসসি ডিগ্রি সম্পূর্ণ করতে পারে, আবার কেউ কর্মজীবনের প্রয়োজনে স্বল্প মেয়াদি সার্টিফিকেট বা ডিপ্লোমা কোর্সও নিতে পারে। অধ্যাপক আরো জানান, ‘কোনো মধ্যবয়সী কর্মী যদি দক্ষতা বাড়াতে চান, তাঁর জন্য স্বল্প মেয়াদি কোর্স যথেষ্ট। আবার কোনো চিকিৎসক যদি নিজের ক্ষেত্রেই প্রয়োগযোগ্য এআই শিখতে চান, তাঁর জন্য থাকবে বিশেষ এক বছরের ডিপ্লোমা। ভাষা ও সংস্কৃতির সংবেদনশীলতা বজায় রেখে আমরা এগোচ্ছি।’
গত বছর হিন্দি মাধ্যমে বি.টেক ক্লাস চালু করে নজির গড়েছিল আইআইটি জোধপুর। একই সিলেবাস, একই শিক্ষক, একই পরীক্ষা, তবে পাঠের মাধ্যম ভিন্ন। ইংরেজি ও হিন্দি, দুই সেকশনেই পড়ানো হচ্ছে সমান গুরুত্বে। ডিরেক্টর অধ্যাপক অমন কুমার আগরওয়ালের কথায়, ‘আমাদের উদ্দেশ্য ছিল হিন্দি-মাধ্যমের ছাত্রদের সেই অদৃশ্য দেয়াল ভেঙে দেওয়া, যা ভাষাজ্ঞানের কারণে তৈরি হয়। আমরা দেখেছি, হিন্দি সেকশনের ছাত্ররা আরও আত্মবিশ্বাসী হচ্ছেন, প্রশ্ন করছে, আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।’ জানা যাচ্ছে, আইআইটি যোধপুরে প্রথম বছরেই ১১৬ জন ছাত্র হিন্দি সেকশন বেছে নেয়। সেমেস্টার শেষে ফলাফলে দেখা গেছে, হিন্দি-মাধ্যমের ছাত্ররাও সেরাদের মধ্যে রয়েছে। অনেকেই দ্বিতীয় সেমেস্টার শেষে ইংরেজি সেকশনে স্বচ্ছন্দে চলে গিয়েছে। এছাড়াও, প্রথম বর্ষেই চালু তারা চালু করেছে একটি আলাদা ‘কমিউনিকেশন স্কিলস কোর্স’, যাতে ছাত্ররা ইংরেজি দক্ষতা বাড়িয়ে দ্বিতীয় বর্ষ থেকে সম্পূর্ণ ইংরেজি মাধ্যমে চালিয়ে যেতে পারে। তবে আপাতত এই প্রযুক্তি শিক্ষাকেন্দ্রের অন্য কোনো আঞ্চলিক ভাষায় পাঠদানের পরিকল্পনা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা বলছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হল শিক্ষার মান বজায় রাখা। তাই হিন্দি ও ইংরেজি—এই দুই মাধ্যমেই সমানভাবে এগোচ্ছি।’
আইআইটিগুলির এই উদ্যোগ যেন দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন বাতাস বইয়ে দিয়েছে। ভাষা আর প্রতিযোগিতার দেয়াল নয়, বরং বোঝাপড়ার সেতু। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মাতৃভাষা মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিসর, যেখানে ভারতের ছাত্ররা নিজের ভাষাতেই বিশ্বমানের শিক্ষা পাবে। ভাষা থেকে জ্ঞান, জ্ঞান থেকে আত্মবিশ্বাস— এই পরিক্রমায় ভারতীয় উচ্চশিক্ষার সামনে খুলে যাচ্ছে এক নতুন অধ্যায় বলে মত শিক্ষাজগতের একাংশের।
❤ Support Us






