Advertisement
  • এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • ডিসেম্বর ২, ২০২৫

ফের রাষ্ট্রের রোষে পরিচালক জাফর পানাহি। এক বছরের কারাদণ্ড ও দু-বছরের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার সাজা ঘোষণা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ফের রাষ্ট্রের রোষে পরিচালক জাফর পানাহি। এক বছরের কারাদণ্ড ও দু-বছরের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার সাজা ঘোষণা

প্যালম ডি’ওর জয়ী, বিশ্বনন্দিত ইরানি চলচ্চিত্র পরিচালক জাফর পানাহি আবারও রাষ্ট্রের রোষানলে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁর ওপর দুই বছরের বিদেশ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনি কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনের সদস্য হতে পারবেন না। অভিযোগ— ‘রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণামূলক কার্যকলাপ।’ পানাহির আইনজীবী মোস্তফা নিলি মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানান, এই কঠোর রায়ের বিরুদ্ধে তাঁরা শিগগিরই আপিল দাখিল করবেন, তবে তিনি অভিযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

৬৫ বছর বয়সী পানাহি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। সম্প্রতি তিনি তাঁর কান উৎসবের বিজয়ী চলচ্চিত্র ‘It Was Just an Accident’ প্রচারের জন্য লস অ্যাঞ্জেলস, সিয়াটেল, সান ফ্রান্সিসকো, শিকাগো, বোস্টন ও নিউ ইয়র্ক শহরে ঘুরেছেন। ছবিটি ফ্রান্সের তরফ থেকে ২০২৬ সালের অস্কারের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগের সরকারি মনোনয়ন পেয়েছে। চলচ্চিত্রটিতে তিনি অস্বস্তির এক গল্প বুনেছেন। মেকানিক বাহিদ (ভাহিদ মোবাসেরি) হঠাৎই এক ব্যক্তিকে দেখতে পান, যাকে তিনি সন্দেহ করেন একজন নিষ্ঠুর কারারক্ষী হিসেবে। অনিশ্চয়তার আতঙ্কে তিনি কয়েকজন প্রাক্তন বন্দিকে জড়ো করেন। তেহরানের রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে সবাই মিলে ঠিক করার চেষ্টা করেন, কতটা এগোবে তাঁদের প্রতিশোধের পথ? সেই নৈতিক দ্বন্দ্ব, অনিশ্চয়তা ও মানবিক বিচারের লড়াইই ছবির কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্ব চলচ্চিত্র মহলে ইতিমধ্যেই এটি সাফল্যের আলোচিত শীর্ষকর্ম। পনাহী আগামী বৃহস্পতিবার মরাকেশ চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করবেন। সেখানে তাঁর ছবির প্রদর্শনী ও বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। তাঁর এই যাত্রাপথ নিয়ে তৈরি হচ্ছে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ডকুমেন্টারি, যা ২০২৬ সালের শুরুতে মুক্তি পাবে।

নিউ ইয়র্কে গথাম অ্যাওয়ার্ডসে তিনটি পুরস্কার জেতার দিনই ইরান সরকারের রায় ঘোষণা করা হয়। মঞ্চে দাঁড়িয়ে পানাহি বললেন, ‘এ পুরস্কার আমি উৎসর্গ করছি সেই সব চলচ্চিত্রকারদের, যারা নীরবে ক্যামেরা চালু রাখেন, কখনো বিনা সমর্থনে, কখনো জীবন বাজি রেখে, শুধুই সত্য এবং মানবতার ওপর বিশ্বাসে।’ তাঁর চোখে এদিন ঝলমল করছিল সমবেদনা ও দৃঢ়তা। তিনি আরো বলেন, ‘যারা দেখা ও দেখানোর অধিকার হারিয়েও সৃষ্টি করে চলেছেন, বেঁচে থেকেছেন, তাদের প্রতি এই ক্ষুদ্র উৎসর্গ।’ নিউ ইয়র্ক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এই বছর মার্টিন স্করসেসির সঙ্গে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি অকপটে স্বীকার করেছিলেন— দেশে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, নিজের মাটি ছেড়ে দূরে থাকা সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, ইরানের অসংখ্য প্রতিভাবান নির্মাতা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন; ওই সব চলচ্চিত্র, যেগুলো অস্তিত্বই পেল না, সেই শূন্যতাই তাঁকে সবচেয়ে কষ্ট দেয়।

ইরানি বংশোদ্ভূত হলেও বর্তমানে ফ্রান্সে বসবাসকারী এই পরিচালকের সঙ্গে ইরান সরকারের সংঘাত বহুদিনের। ২০১০ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ সমর্থনের কারণে এবং রাষ্ট্র সমালোচনামূলক চলচ্চিত্র নির্মাণের কারণে তাঁকে চলচ্চিত্র বানানো এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ‘রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা’ অভিযোগে ৬ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন, তবে ২ মাস জেল খেটেই জামিনে মুক্তি পান। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই তিনি গোপনে বানিয়ে ফেলেন ‘This Is Not a Film’ (২০১১)। এরপরও পানাহী থেমে থাকেননি। কেকের ভেতর ফ্ল্যাশড্রাইভে লুকিয়ে ‘কান’-এ পৌঁছে দেন। পরবর্তীতে আলোড়ন তোলে তাঁর ‘Taxi’ (২০১৫) ছবিটি, যেখানে তিনি ট্যাক্সিচালকের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ২০২২ সালে সহ-চলচ্চিত্রকারদের প্রতিবাদ আন্দোলনের সূত্র ধরে ফের তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, ৭ মাস পরে মুক্তি পান। এই পরিস্থিতি ইরানে রাষ্ট্ররোষের নির্দিষ্ট এক প্যাটার্নের অংশ, যেখানে চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাংবাদিক ও জনসাধারণের ব্যক্তিত্বরা সরকারি নজরদারির মধ্যে থাকেন। গত বছর আরো একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ রাসূলফ ইরান ত্যাগ করে কারাদণ্ড এড়ান। ইরানে ফের কারাদণ্ড, নিষেধাজ্ঞা, কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে পানাহি এখনো ঝড় তুলে চলেছেন। তার জীবনের এই দ্বৈত বাস্তবতা এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের প্রতিচ্ছবি। যেখান থেকেই প্রশ্ন ওথে, এভাবে কি কণ্ঠস্বর থামানো যায়, শিল্পমাধ্যমকে আটকানো যায়। বিশ্বের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আলিঙ্গন সুস্পষ্টভাবে জানান দিচ্ছে তারা সর্বোতভাবে পাশে রয়েছেন জাফর পানাহির। প্রতিকূলতার মধ্যেই তিনি আরো তীক্ষ্ণ ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবেন এই প্রত্যাশা সকলেরই।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!