- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ১৮, ২০২৬
নবমে তিন ভাষা বাধ্যতামূলক, পড়ুয়ারা কি তবে ‘গিনিপিগ’? সিবিএসইয়ের সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে বিতর্ক
শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়ে গিয়েছে এপ্রিলেই। বহু স্কুলে প্রথম ইউনিট টেস্টও শেষ। এমন সময়েই আচমকা বড়ো সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই)-এর। আগামী ১ জুলাই থেকেই নবম শ্রেণিতে ৩টি ভাষা বাধ্যতামূলক করতে চলেছে বোর্ড। শুধু তা-ই নয়, নতুন তৃতীয় ভাষার জন্য নির্দিষ্ট বই হাতে না পাওয়া পর্যন্ত পড়ুয়াদের ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যক্রম পড়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’ এবং ‘ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক ফর স্কুল এডুকেশন (এনসিএফএসই) ২০২৩-এর ভিত্তিতেই নতুন নিয়ম কার্যকর করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সিবিএসই। কিন্তু শিক্ষাবর্ষের মাঝপথে এমন সিদ্ধান্ত ঘিরে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে শিক্ষক, পড়ুয়া এবং অভিভাবকদের একাংশের মধ্যে।
গত ১৫ মে প্রকাশিত নির্দেশিকায় সিবিএসই জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত তিন-ভাষা সূত্র চালু করা হবে। তবে নবম ও দশম শ্রেণির ক্ষেত্রে তা কার্যকর হবে আগামী ১ জুলাই থেকেই। বোর্ডের দাবি, জাতীয় শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য হলো ছাত্রছাত্রীদের স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা এবং ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরার সঙ্গে আরও নিবিড় ভাবে যুক্ত করা। সে লক্ষ্যেই মাতৃভাষার পাশাপাশি আরও দু’টি ভাষা শেখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ভাষাগুলিকে ‘আর-১’, ‘আর-২’ এবং ‘আর-৩’ নামে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘আর-১’ এবং ‘আর-২’-এ বাধ্যতামূলক ভাবে ২ টি ভারতীয় ভাষা রাখতে হবে। ‘আর-৩’ বিভাগে বিদেশি ভাষা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে বোর্ড স্পষ্ট জানিয়েছে, ইংরেজিকেও বিদেশি ভাষার বিভাগেই ধরা হবে। অর্থাৎ কোনো পড়ুয়া যদি ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি, জার্মান বা স্প্যানিশের মতো আরও একটি বিদেশি ভাষা নিতে চায়, তা হলে তাকে অতিরিক্ত চতুর্থ ভাষা হিসেবে নিতে হবে। মূল ৩ ভাষার মধ্যে অন্তত ২ টি ভারতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক।
বোর্ড সূত্রে খবর, বাংলা, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, কন্নড়, গুজরাতি-সহ একাধিক ভারতীয় ভাষার পাঠ্যবই ইতিমধ্যেই প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে। তবে নবম শ্রেণির জন্য আলাদা ‘আর-৩’ বই এখনো সব ভাষায় তৈরি হয়নি। সে কারণেই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে পড়ুয়াদের আপাতত ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যবই ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। সিবিএসই-র দাবি, উচ্চ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ভাষাশিক্ষার মূল কাঠামোয় প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ মিল রয়েছে। মৌখিক ভাষাচর্চা, ব্যাকরণ, লেখালিখি, পাঠ অনুধাবন এবং সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রে বিশেষ তফাত নেই বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। তাই নবম শ্রেণির পড়ুয়ারা সাময়িক ভাবে ষষ্ঠ শ্রেণির বই ব্যবহার করলেও খুব সমস্যা হবে না। তবে শুধু বই পড়ানোতেই থেমে থাকতে বলা হয়নি শিক্ষকদের। স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষার সঙ্গে পরিচয় বাড়াতে কবিতা, ছোটোগল্প, লোকসাহিত্য এবং তথ্যভিত্তিক রচনাও পড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ জুনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে বোর্ড। একই সঙ্গে দাবি করা হয়েছে, ১ জুলাইয়ের আগেই ১৯টি ভাষার ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আর-৩’ বই স্কুলগুলিতে পৌঁছে যাবে।
‘নিট’ প্রশ্নপত্র ফাঁস বিতর্কের মধ্যে সিবিএসই-এর এই সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক। বহু স্কুলের অভিযোগ, শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার পরে এ ধরনের পরিবর্তন কার্যত বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। একাধিক স্কুলে ইতিমধ্যেই ভাষাভিত্তিক ক্লাস, সময়সূচি এবং ইউনিট টেস্ট হয়ে গিয়েছে। অনেক পড়ুয়াই ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি বা জার্মান ভাষা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছে। এখন নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তাদের হঠাৎ করে ভারতীয় ভাষা বেছে নিতে হবে। দিল্লির এক অভিভাবক বলেছেন, ‘আমার ছেলে ইংরেজি ও ফরাসি পড়ছে। ইউনিট টেস্টও হয়ে গিয়েছে। এখন বলা হচ্ছে ভারতীয় ভাষা নিতে হবে। আগে জানালে আমরা প্রস্তুতি নিতে পারতাম। শিক্ষাবর্ষের মাঝপথে এমন সিদ্ধান্ত কেন?’ একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নবম শ্রেণির এক পড়ুয়ার মা টিনা সিংঘলও। তাঁর মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই ফরাসি পড়ছে। তিনি বলেন, ‘এখন হঠাৎ করে বলা হচ্ছে ফরাসি ছাড়তে হতে পারে। শিশুদের উপর এ ভাবে চাপ তৈরি করা ঠিক নয়। তারা ইতিমধ্যেই নতুন সিলেবাসের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্যস্ত।’
স্কুল কর্তৃপক্ষের তরফেও প্রশ্ন উঠছে। দিল্লির মাউন্ট আবু স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা জ্যোতি অরোরা জানিয়েছেন, জাতীয় শিক্ষানীতির ভাবনা ইতিবাচক হলেও শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার পরে তা কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন। তাঁর মতে, ‘এখন নতুন ভাষার শিক্ষক খুঁজতে হবে, রুটিন বদলাতে হবে, পড়ুয়ার বিষয় বদলাতে হবে। সব মিলিয়ে একটা অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’ সবচেয়ে বডড়ো সমস্যা শিক্ষকসংকট। দেশের বহু স্কুলেই এখনো পর্যাপ্ত ভারতীয় ভাষার শিক্ষক নেই। বিশেষ করে বাংলা, অসমিয়া, তামিল, সংস্কৃত বা কন্নড়ের মতো ভাষার শিক্ষক সব জায়গায় পাওয়া যায় না। সে কারণেই সিবিএসই আপাতত অন্তর্বর্তী সমাধানের পথ দেখিয়েছে। বোর্ড জানিয়েছে, অন্য বিষয়ের শিক্ষক হলেও যদি সংশ্লিষ্ট ভাষায় দক্ষ হন, তা হলে তাঁকে দিয়েও ভাষা পড়ানো যেতে পারে। প্রয়োজনে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, অনলাইন ক্লাস কিংবা ‘সহোদয়া’ স্কুলগুলির মধ্যে শিক্ষক ভাগ করে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
তবে শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও অবকাঠামো ব্যবস্থা তৈরি না করলে দীর্ঘমেয়াদে তিন-ভাষা নীতি কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, আমাদের প্রশাসন, আদালত, উচ্চশিক্ষা— সব কিছুই এখনো অনেকাংশে ইংরেজিনির্ভর। সেখানে ইংরেজিকে বিদেশি ভাষা বলা হচ্ছে। বাস্তবে এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে স্পষ্টতা দরকার। তাঁদের আশঙ্কা, এর ফলে বিদেশি ভাষাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং ছাত্রছাত্রী বিনিময় প্রকল্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অনেক পড়ুয়া ভবিষ্যতে বিদেশে উচ্চশিক্ষার কথা ভেবে ফরাসি বা স্প্যানিশ শেখে। এখন হঠাৎ সেই সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে। কারণ, বহু স্কুলে দীর্ঘ দিন ধরে বিদেশি ভাষা পড়ানো হতো। এখন মাঝপথে তা বদলানোয় পড়ুয়ারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। দিল্লি অভিভাবক সংগঠনের সভাপতি অপরাজিতা গৌতমের অভিযোগ, ‘শিশুদের কার্যত গিনিপিগ বানানো হচ্ছে।’
এ দিকে নতুন ভাষানীতি নিয়ে বিতর্ক চলার মাঝেই সিবিএসই-র বিরুদ্ধে উঠেছে আরও এক অভিযোগ— দ্বাদশ শ্রেণির উত্তরপত্র মূল্যায়নে অনিয়মের। এ বছর বোর্ড ফের ‘অন-স্ক্রিন মার্কিং’ বা ডিজিটাল মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করেছে। বহু পড়ুয়া এবং অভিভাবকের অভিযোগ, নম্বর প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম এসেছে। রবিবার সাংবাদিক বৈঠকে স্কুল শিক্ষা ও সাক্ষরতা বিভাগের সচিব সঞ্জয় কুমার অবশ্য সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ‘অন-স্ক্রিন মার্কিং কোনো নতুন পদ্ধতি নয়। ২০১৪ সালেও এটি চালু হয়েছিল। সে সময় প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এ বছর ফের সফল ভাবে তা কার্যকর করা হয়েছে।’ তিনি জানান, এ বার প্রায় ৯৮ লক্ষ উত্তরপত্র স্ক্যান করা হয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার উত্তরপত্রে সমস্যা হয়েছিল, কারণ অনেক পরীক্ষার্থী খুব হালকা কালি ব্যবহার করেছিল। পরে সেগুলি হাতে পরীক্ষা করে নম্বর আপলোড করা হয়। সঞ্জয়ের দাবি, ডিজিটাল মূল্যায়নের ফলে নম্বর যোগের ভুল প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে।
তবে অনেক পড়ুয়ার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। অসমের এক পরীক্ষার্থীর দাবি, জেইই মেন পরীক্ষায় সে ৯৯ শতাংশের বেশি নম্বর পেলেও দ্বাদশে তার নম্বর ৭৫ শতাংশের নীচে। এমনিতেই এ বছর সিবিএসই-র সামগ্রিক পাশের হার নেমে এসেছে ৮৫.২ শতাংশে। পড়ুয়া, শিক্ষক ও অভিভাবকদের একাংশের মতে, ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রভাবেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ আবহে পুনর্মূল্যায়ন ও নম্বর যাচাইয়ের নতুন নিয়মও ঘোষণা করেছে বোর্ড। সঞ্জয় কুমার জানিয়েছেন, কোনো পড়ুয়া যদি নিজের উত্তরপত্র দেখতে চায়, তা হলে তাকে ১০০ টাকা ফি দিতে হবে। উত্তরপত্র যাচাইয়ের জন্যও লাগবে ১০০ টাকা। এ ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো প্রশ্নের নম্বর পুনরায় পরীক্ষা করাতে চাইলে প্রতি প্রশ্নে ২৫ টাকা করে দিতে হবে। যদিও বোর্ড জানিয়েছে, পুনর্মূল্যায়নের পরে নম্বর বাড়লে পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।
❤ Support Us







