- এই মুহূর্তে দে । শ
- এপ্রিল ১০, ২০২৬
এপ্রিল থেকেই দেশজুড়ে নয়া ‘আয়-সমীক্ষা’, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগ বিরোধীদের
‘এসআইআর’, ‘জাতিগণনা’-সহ আদমশুমারির পাশাপাশি দেশের প্রতিটি পরিবারের আর্থিক কাঠামো ও আয়ের উৎস এবার সরাসরি নথিভুক্ত করতে চলেছে কেন্দ্র। এপ্রিল মাস থেকেই শুরু হচ্ছে ‘ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ইনকাম সার্ভে’, যেখানে দেশের প্রতিটি পরিবারের সদস্যের আয়, আয়ের উৎস, অতিরিক্ত উপার্জন এমনকি ব্যক্তিগত অর্থপ্রবাহ সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। কেন্দ্রের দাবি, আর্থিক নীতি নির্ধারণ ও সহায়তা বণ্টনের সঠিক রূপরেখা তৈরির জন্য এ তথ্য অপরিহার্য। তবে, কেন্দ্রের এমন উদ্যোগ ঘিরে ইতিমধ্যেই উঠতে শুরু করেছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের প্রশ্ন।
১৯৫০ সাল থেকে ‘জাতীয় নমুনা সমীক্ষা’ চালু থাকলেও এবারই প্রথম এত বিস্তৃত আকারে দেশের গৃহস্থালির আয়কে কেন্দ্র করে পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতদিন সেন্সাস ও বিভিন্ন নমুনা সমীক্ষার মাধ্যমে জনসংখ্যাগত ও ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হলেও, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের আয়কে কেন্দ্র করে এ ধরনের সর্বভারতীয় সমীক্ষা আগে হয়নি। জানা যাচ্ছে, নতুন এই সমীক্ষায় সমীক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানতে চাইবেন গত এক বছরে অর্থাৎ ৩৬৫ দিনে একটি পরিবারের মোট আয় কত, কার কী উৎস থেকে আয় হচ্ছে, এবং সে আয় কীভাবে অর্জিত হচ্ছে। শুধু চাকরি বা ব্যবসা নয়, কৃষি, স্বনিযুক্ত পেশা, বাড়িভাড়া, জমি লিজ দেওয়া, পেনশন, এমনকি নানাবিধ ছোটখাটো উপার্জনের উৎসও বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করা হবে। পরিবারের একাধিক সদস্যের আয় থাকলে প্রত্যেকের পৃথক আয়ের উৎস ও পরিমাণও আলাদা করে সংগ্রহ করা হবে।
সমীক্ষার আওতায় আরও থাকবে এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। পরিবারের কেউ নিয়মিতভাবে অন্য কাউকে টাকা পাঠান কি না, সে তথ্যও নথিভুক্ত করা হবে। কেন ওই টাকা পাঠানো হয়, তার ব্যাখ্যাও দিতে হতে পারে উত্তরদাতাকে। পাশাপাশি আয়ের বাইরে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ, অনিয়মিত আয় বা অন্যান্য উৎস থেকেও উপার্জনের তথ্য সংগ্রহ করবে জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর। সমীক্ষা পরিচালনা করবে কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ও প্রকল্প রূপায়ণ মন্ত্রকের অধীন ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্স অফিস। ‘কম্পিউটার-অ্যাসিস্টেড পার্সোনাল ইন্টারভিউইং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হবে সারা দেশজুড়ে। গ্রামীণ ও শহরাঞ্চল, সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে এই সমীক্ষা চালানো হবে। কেন্দ্রের দাবি, বর্তমানে আয়কর বিভাগের কাছে সীমিত সংখ্যক আয়করদাতার তথ্যই থাকে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুবই কম। আনুমানিক ১০ কোটির মতো আয়করদাতা থাকলেও, অসংখ্য পরিবারের একাধিক সদস্য ছোটোখাটো পেশা বা স্বনিযুক্ত কাজের মাধ্যমে আয় করেন, যা সরকারি পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয় না। সেই “অদৃশ্য আয়”-এর প্রকৃত চিত্র বোঝার লক্ষ্যেই নতুন এ উদ্যোগ।
অন্যদিকে, নয়া সমীক্ষা ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, একই সময়ে সেন্সাস, বিভিন্ন প্রশাসনিক তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন–এর মতো কর্মসূচির পাশাপাশি এ ধরনের বিস্তৃত ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ আসলে নাগরিক জীবনের উপর অতিরিক্ত নজরদারির ইঙ্গিত। তাদের বক্তব্য, প্রতিটি পরিবারের ক্ষুদ্রতম আয়ের উৎস পর্যন্ত জানতে চাওয়া, অর্থপ্রবাহের খুঁটিনাটি সংগ্রহ করা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করছে। পাল্টা, কেন্দ্র সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, এ সমীক্ষার মাধ্যমে সমাজের কোন স্তরের মানুষের কাছে কী ধরনের সরকারি সহায়তা পৌঁছানো প্রয়োজন, তার একটি বাস্তব চিত্র তৈরি হবে। সে তথ্যের ভিত্তিতেই ভবিষ্যৎ সামাজিক প্রকল্প ও অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করা সহজ হবে বলে দাবি প্রশাসনের।
‘ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্স অফিস’-এর আধিকারিকরা জানিয়েছেন, সমীক্ষার জন্য একটি টেকনিক্যাল এক্সপার্ট গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে, যারা প্রশ্নপত্র ও তথ্য বিশ্লেষণের কাঠামো নির্ধারণ করছে। পুনে আঞ্চলিক অফিসের অধীনে ইতিমধ্যেই প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছে। প্রায় ৯,৮০০টি গৃহস্থালি এবং ৪৮৮টি ফার্স্ট স্টেজ ইউনিট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এই পর্যায়ে। পুনে আঞ্চলিক প্রধান ড. রুহি কুলকার্নি জানিয়েছেন, শহরাঞ্চলে সার্ভের কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় নানান সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে সমীক্ষক দলকে। তিনি জানান, শহরাঞ্চলে আয়-সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা থাকলে একটি বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যেখানে পরিবারগুলি কাগজে তথ্য লিখে সিল করা খামে জমা দিতে পারবেন। সে খাম অফিসে এনে খোলা হবে এবং তথ্য ডিজিটালভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে গোপনীয়তা বজায় থাকে। তাঁর আহ্বান এটি শুধুমাত্র তথ্য সংগ্রহ নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রাক্-অংশ, তাই সব নাগরিকের সহযোগিতা প্রয়োজন।
❤ Support Us





