- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ১৪, ২০২৫
‘পিএম কিষাণ সম্মান নিধি’ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, বঞ্চিত বহু প্রকৃত কৃষক ! রাজ্যগুলিতে চিঠি দিয়ে তথ্য যাচাইয়ের নির্দেশ কেন্দ্রের
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে দেশের কৃষকদের আর্থিক সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিশেষ এক প্রকল্পের ঘোষণা করেছিলেন। ওই সময় কেন্দ্র সরকার জানিয়েছিল, বছরে ৬ হাজার টাকা করে সহায়তা পাবেন দেশের প্রত্যেক বৈধ কৃষক পরিবার। একক পরিবার— যেখানে স্বামী, স্ত্রী ও নাবালক সন্তানরা মিলিয়ে নিজেদের নামে জমির মালিক, সেখানে কেবল একজনই এই সহায়তা পাওয়ার কথা। এবার সেই ‘প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান’ নিধি (পিএম-কিষাণ) প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ। মাটির টানকে কেন্দ্রীয় নির্বাচনের কৌশলে পরিণত করা এই প্রকল্প ঘিরে যে দুর্নীতির জাল গড়ে উঠেছে, তা সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রকের এক তদন্তে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
যাচাই অভিযানে কৃষি মন্ত্রকের হাতে এসেছে এমন এক তালিকা, যেখানে দেশের নানা প্রান্তে ৩১ লক্ষেরও বেশি কৃষক পরিবারের সদস্য, বিশেষত স্বামী ও স্ত্রী, একসঙ্গে সরকারি আর্থিক সহায়তা নিয়েছেন। প্রকল্পের কোনো নিয়মই ঠিক মতো পালন করা হয়নি। মাত্র ১৯ লক্ষ কৃষকের নথি যাচাই হয়েছে। চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসতেই তড়িঘড়ি রাজ্যগুলিকে চিঠি পাঠিয়ে কেন্দ্র নির্দেশ দিয়েছে, আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সম্পূর্ণ যাচাই প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। ইতিমধ্যেই ১৯ লক্ষ ২ হাজার কেস পুনরায় পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৭ লক্ষ ৮৭ হাজার কেসে প্রমাণ মিলেছে—একই পরিবারে স্বামী ও স্ত্রী, দু’জনেই টাকা নিয়েছেন।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। অনিয়মের মাত্রা আরো গভীর। কৃষিমন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, শুধু স্বামী-স্ত্রীর ভাতা নেওয়াই নয়, আরো ১ লক্ষ ৭৬ হাজার পরিবারে দেখা গিয়েছে, পরিবারের নাবালক সন্তান বা অন্য সদস্যরাও একসঙ্গে টাকা নিচ্ছেন। অথচ নিয়ম বলছে, একজন বৈধ জমির মালিক কৃষক ছাড়া আর কেউ এই প্রকল্পের উপভোক্তা হতে পারেন না। বিশেষ করে ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারির পরে জমি রেজিস্ট্রেশন করা হলে, নতুন কৃষককে জমির পূর্বতন মালিকের তথ্য দিতে হবে। সে তথ্যের ভিত্তিতেই যাচাই হয়, প্রকৃত মালিক কে এবং কার অধিকার রয়েছে ভাতা পাওয়ার। কিন্তু বাস্তবে ? বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ৩৩ লক্ষ ৩৪ হাজার উপভোক্তার জমি সংক্রান্ত নথিতে আগের মালিকের কোনও তথ্যই নেই। কেউ কেউ ফর্মের ওই অংশ ফাঁকা রেখেছেন, আবার কারো নথিতে লেখা রয়েছে ‘ইনভ্যালিড।’ চমকপ্রদ তথ্য আরো রয়েছে। ৮ লক্ষের বেশি ক্ষেত্রে জমির পূর্বতন ও বর্তমান মালিক, উভয়েই একই জমির উপর ভিত্তি করে ভাতা নিয়েছেন। যেখানে জমির হস্তান্তর উত্তরাধিকার সূত্রে না হয়ে অন্য কোনো কারণে হয়েছে, সে ক্ষেত্রেও একাধিক বার ভাতা তোলারও নজির মিলেছে। ৮.৮৩ লক্ষ কেসে দেখা যাচ্ছে, জমির মালিকানা বদলের কারণ ‘উত্তরাধিকার’ নয়, তবুও প্রকল্পের ভাতা পেয়েছেন আগের ও বর্তমান উভয় মালিক। স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও কেন এই বিপুল সংখ্যক অনিয়ম ঘটেছে, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
২০১৯ সালে এ প্রকল্প ঘটা করে চালু হয়েছিল লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই। রাজনৈতিক মহলে অনেকে মনে করেন, কৃষকদের মন জয় করাই ছিল লক্ষ্য। সে কারণে ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্যগুলিতে প্রকল্প ঘিরে চলেছে লাগাতার প্রচার। মোদি সরকার বারবার দাবি করে এসেছে, প্রকল্পটি স্বচ্ছ এবং দেশের ৯ কোটিরও বেশি কৃষক এর থেকে উপকৃত হয়েছেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, প্রকল্পের আর্থিক গঠন যতটা সরল, বাস্তব প্রয়োগ ততটাই জটিল এবং বিভ্রান্তিকর। কেন্দ্র সরকার এই প্রকল্পের জন্য ২০২৫-২৬ সালের বাজেটে ৬৩,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। অথচ একের পর এক যে পরিমাণে অনিয়ম সামনে আসছে, যা শুধু রাজস্বের অপচয় নয়, বরং প্রকৃত কৃষকদের হক মারার নামান্তর। এ অবস্থায় সরকার ফের উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে প্রকৃত কৃষকরাই শুধু প্রকল্পের টাকা পান। আগামী ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন উপভোক্তা হিসেবে নাম নথিভুক্ত করতে হলে ‘ফার্মার আইডি’ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
❤ Support Us







