Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • আগস্ট ২৬, ২০২৫

বর্ধমানের সভা থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার ডাক, কেন্দ্রকে ‘চোর সর্দার’ বলে কটাক্ষ মুখ্যমন্ত্রীর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বর্ধমানের সভা থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার ডাক, কেন্দ্রকে ‘চোর সর্দার’ বলে কটাক্ষ মুখ্যমন্ত্রীর

সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধন, পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার আহ্বান, কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ এবং রাজনৈতিক পাল্টা আক্রমণ, সব মিলিয়ে মঙ্গলবার বর্ধমানের প্রশাসনিক সভা থেকে একগুচ্ছ বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন সভা শুরুতেই সরকারি বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন মুখ্যমন্ত্রী। পরে ধামসা-মাদল বাজিয়ে মঞ্চে ওঠেন তিনি। তারপরেই একের পর এক প্রকল্প উদ্বোধন, ঘোষণা ও কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মন্তব্যে মুখর হলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা।

পরিযায়ী শ্রমিক, কেন্দ্রীয় বঞ্চনা, আবাস যোজনা দুর্নীতি, জলবন্দি পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে মমতার ভাষণে উঠে আসে একগুচ্ছ বার্তা। সভা থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে বলেন, বাংলা থেকে প্রায় ২২ লক্ষ শ্রমিক ভিনরাজ্যে কাজ করতে গিয়েছেন। কেউ গয়নার কাজ করেন, কেউ জামা-কাপড় তৈরি করেন, কেউ নির্মাণে দক্ষ। তাঁদের আদর করে ডেকে নেওয়া হয়েছিল, অথচ আজ তাঁদের ওপর চলছে নিপীড়ন, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা। তাঁর প্রশ্ন, বাংলায় তো দেড় কোটিরও বেশি বাইরের মানুষ কাজ করেন। তাঁদের উপর কোনো বৈষম্য বা অত্যাচার হয় না। তাহলে কেন ওড়িশা, হরিয়ানা, গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে বাংলার মানুষকে অত্যাচার সহ্য করতে হবে? কেন তাঁদের শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার অপরাধে মারধর, থানায় হেনস্তা হতে হবে? এরপর মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ চালিয়ে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট গুজরাটের মানুষকে কোমরে দড়ি বেঁধে বের করে দিলেও, বাংলার মেধাকে ছুঁতে পারে না। বাংলার ছাত্রছাত্রী ছাড়া অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, এমনকি নাসাও চলবে না। বাংলার গবেষক ও মেধাবীদের অবদান আজ সারা বিশ্বের কাছে স্বীকৃত।

পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজ্যে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, নতুন ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্পের আওতায় তাঁদের জন্য মাসে ৫ হাজার টাকা করে এক বছরের জন্য ভাতা দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, থাকবে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড, খাদ্যসুরক্ষা কার্ড এবং যাঁরা যেই কাজে দক্ষ, সেই অনুযায়ী স্কিল ট্রেনিং ও কাজের ব্যবস্থা করবে সরকার। কেউ যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান, ব্যবসা করতে চান, সেখানেও রাজ্যের সহায়তা থাকবে। সভা থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি তোপ দেগে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যাঁরা বাংলা সরকারের বিরুদ্ধে ‘চোর’ শব্দ ব্যবহার করছেন, তাঁরা নিজেদের দিকে আগে তাকান। আমি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারকে সম্মান করি, কিন্তু প্রশ্ন করতেই হবে, বাংলাকে চোর বলার অধিকার তাঁকে কে দিল? আপনারাই ডবল ইঞ্জিন সরকার চালান। আর সেই ডবল ইঞ্জিন সরকারই দেশের সবচেয়ে বড়ো চোর। উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্রে কী হচ্ছে আগে দেখুন। আপনি যাঁদের সঙ্গে মিটিং করেন, তাঁরা চোর-সর্দার।’

নাম না করেই প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে মমতা বলেন, ‘আমি তো সরকার থেকে এক পয়সাও নিই না। মাসে আড়াই-তিন লক্ষ টাকা এমপি পেনশন পাই, তাও নিই না। সার্কিট হাউসে থাকলেও নিজের বিল নিজে মেটাই। গান লিখে, বই লিখে আমার চলে যায়। আমি একা মানুষ, দিনে একবেলা খাই—আর কী-ই বা চাই?’ নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও এদিন কড়া প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, ভোট এলেই এনআরসি, নাম কাটা, নতুন নতুন নির্দেশ। আমি কমিশনকে প্রণাম জানাই, সালাম জানাই। কিন্তু বলব, আপনারা বিজেপির ললিপপ হয়ে উঠলে মানুষ কিন্তু ক্ষমা করবে না। নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, বাংলার অপমান তিনি কোনো অবস্থাতেই মেনে নেবেন না।

বর্ষার অতিবৃষ্টিতে রাজ্যের বহু নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়েছে। তার উপর ডিভিসি-র লাগামছাড়া জল ছাড়ার ফলে জলবন্দি দশা আরো ভয়াবহ। বর্ধমানের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এবারের বৃষ্টিপাত অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ডিভিসি আমাদের না জানিয়ে জল ছেড়ে দিচ্ছে, ফলে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান-সহ একাধিক জেলা ভেসে যাচ্ছে। এরপরই তিনি জেলা শাসকদের নির্দেশ দেন, যাঁদের বাড়ি ভেঙে পড়েছে, তাঁদের নামের তালিকা দ্রুত চিফ সেক্রেটারির কাছে পাঠাতে। রাজ্য নিজস্ব তহবিল থেকে তাঁদের নতুন বাড়ি করে দেবে। তিনি স্পষ্ট করে দেন, এই প্রকল্প বাংলার আবাস যোজনার বাইরে আলাদা করে করা হবে। এর পাশাপাশি বর্ধমানের সভা থেকেই একগুচ্ছ সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধন ও পরিষেবা বিতরণের কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, এদিন ১৪টি জেলার একাধিক প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ৭২ হাজার নতুন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধাভোগী, ৫০ হাজার স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সহায়তা, ৫ হাজার নবম শ্রেণির পড়ুয়াকে সাইকেল বিতরণ এবং ২৮ হাজার জমির পাট্টা প্রদান। তিনি বলেন, আরও ২৪ হাজার পাট্টা দ্রুত সময়ের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

স্কুল শিক্ষার পরিকাঠামো উন্নয়নের কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। জানান, পূর্ব বর্ধমানের ৫৪টি স্কুলে স্মার্ট ক্লাসরুম, সায়েন্স ল্যাব, লাইব্রেরি তৈরি হয়েছে। এছাড়াও তৈরি হয়েছে ১৫টি আদিবাসী কমিউনিটি সেন্টার, ৪৯টি নতুন বাসস্ট্যান্ড এবং তিনটি ব্লকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। শিল্প ও কৃষির মধ্যে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে শিল্প সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। রানিগঞ্জ ও আসানসোলে পৌরনিগমের প্রশাসনিক ভবনের কাজও শুরু হয়েছে। সভা শেষে বাংলার মাটির প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কথা আরও একবার মনে করিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, বাংলাকে কেউ হেয় করলে, বাংলার মানুষকে কেউ অপমান করলে আমি চুপ করে বসে থাকব না। আমাকে গালাগালি দিন, অপপ্রচার করুন, ভয় দেখিয়ে কিছু হবে না। বুকের পাটা আছে। আমি বাংলার জন্য, বাংলার মানুষের জন্য শেষ অবধি লড়ব।

আজকের এই সভা যে শুধু প্রশাসনিক প্রকল্প ঘিরেই আবদ্ধ থাকেনি, তা বলাই বাহুল্য। পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচার, কেন্দ্রের বঞ্চনা এবং ‘চোর’ অপবাদ—সব মিলিয়ে সভা পরিণত হয় একপ্রকার রাজনৈতিক সঙ্কেতের মঞ্চে। যেখানে একদিকে মমতার প্রশাসনিক সাফল্যের ফিরিস্তি, অন্যদিকে আগামী নির্বাচনের ইঙ্গিত স্পষ্ট।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!