- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মে ২৩, ২০২৬
স্বাস্থ্যসাথীর ৬ কোটি উপভোক্তাই এবার আয়ুষ্মান ভারতে, জুলাই থেকে কার্ড বিলি। স্বাস্থ্যখাতে ‘যুগান্তকারী বদল’-এর ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
রাজ্যে সরকার বদলের পর স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ব্যাপক নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এত দিন ধরে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় থাকা প্রায় ৬ কোটি মানুষকে সরাসরি কেন্দ্রীয় আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। জুলাই মাস থেকেই রাজ্যে আয়ুষ্মান ভারতের কার্ড বিলি শুরু হবে বলেও ঘোষণা করেছেন তিনি। শনিবার নবান্নে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলনে একগুচ্ছ সিদ্ধান্তের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ‘যুগান্তকারী পরিবর্তন’ আনতেই এই পদক্ষেপ।
নবান্নের সাংবাদিক বৈঠকে শুভেন্দুর পাশে ছিলেন মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবাল এবং মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত। বৈঠকের শুরু থেকেই পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে ‘সহযোগিতা তো করেইনি, বরং বিরোধিতা করেছে’। তার ফলেই রাজ্যের কোটি কোটি মানুষ বহু কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে তাঁর দাবি।
তার পরেই আসে সবচেয়ে বড়ো ঘোষণা। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আয়ুষ্মান ভারতে এনরোলমেন্টের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, জুলাই মাস থেকেই আমরা কার্ড দিতে পারব। স্বাস্থ্যসাথীর সঙ্গে যুক্ত ৬ কোটিরও বেশি উপভোক্তাকে সরাসরি আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’ তিনি স্পষ্ট করেন, স্বাস্থ্যসাথীর বর্তমান উপভোক্তাদের নতুন করে আলাদা আবেদন করতে হবে না। পরে ধাপে ধাপে নতুন নামও যুক্ত করা হবে। যাঁরা এত দিন স্বাস্থ্যসাথীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না, তাঁরাও জুলাই মাস থেকে আবেদন করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
রাজ্যের প্রশাসনিক সূত্রে খবর, সরকার চাইছে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের পরিকাঠামো ও রাজ্যের বিদ্যমান স্বাস্থ্যসাথী ডেটাবেসকে একত্র করে দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোতে। সে কারণেই প্রথম ধাপে বিদ্যমান স্বাস্থ্যসাথী উপভোক্তাদেরই আয়ুষ্মান ভারতে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর জানান, ‘গোটা ভারতে এই প্রকল্পের সুবিধা নিতে পারবেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। কাজের সূত্রে বা পড়াশোনার জন্য অন্য রাজ্যে থাকা বাংলার বাসিন্দারাও পরিষেবা পাবেন।’ শুধু আয়ুষ্মান ভারত নয়, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলির সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই দিল্লিতে আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দির প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষর হবে বলেও জানিয়েছেন শুভেন্দু। সেখানে কেন্দ্র ও রাজ্যের মন্ত্রী-আমলারা উপস্থিত থাকবেন। তাঁর মতে, এত দিন কেন্দ্র-রাজ্যের প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবেই বহু প্রকল্প কার্যকর হয়নি। নতুন সরকার সেই পরিস্থিতি বদলাতে চাইছে।
এ দিনের বৈঠকে স্বাস্থ্যখাতে কেন্দ্রীয় বরাদ্দের পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ন্যাশনাল হেলথ মিশনের আওতায় এ বছর পশ্চিমবঙ্গের জন্য ২১০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে কেন্দ্র। তার মধ্যে প্রথম কিস্তির ৫০০ কোটি টাকা ইতিমধ্যেই রাজ্যের হাতে এসে গিয়েছে। পাশাপাশি আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের জন্য আলাদা ভাবে ৯৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে বলেও জানান তিনি। স্বাস্থ্য বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে সার্ভাইক্যাল ক্যানসার প্রতিরোধ কর্মসূচিও। মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী ৩০ মে থেকে রাজ্যে কিশোরীদের জন্য প্রতিরোধমূলক টিকাকরণ শুরু হবে। প্রথম পর্যায়ে সাত লক্ষেরও বেশি নাবালিকাকে ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিধাননগর সাব-ডিভিশন হাসপাতালে উপস্থিত থেকে তিনি নিজে এই কর্মসূচির সূচনা করবেন বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী কয়েক মাস আগেই দেশজুড়ে এই প্রকল্প চালু করলেও পশ্চিমবঙ্গে তা কার্যকর হয়নি। এ বার সেই ঘাটতি পূরণ করা হবে।
একই সঙ্গে রাজ্যে চারশোরও বেশি প্রধানমন্ত্রী জন ঔষধি কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। তাঁর দাবি, এই কেন্দ্রগুলিতে সাধারণ মানুষ অনেক কম দামে ওষুধ পাবেন। বহু ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় মিলবে। ২ হাজার টাকার ওষুধ দু-শো টাকায় পাওয়া যাবে। এ দিন রাজ্যের শিশুমৃত্যুর হার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শুভেন্দু। কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান, বীরভূম এবং মালদহের পরিস্থিতি বিশেষ ভাবে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকার স্বাস্থ্যব্যবস্থার যথাযথ মনিটরিং করেনি। ফলে বহু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
প্রসঙ্গত, মমতা ব্যানার্জির সরকারের আমলে কেন্দ্রের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু করা নিয়ে দীর্ঘদিন টানাপোড়েন চলেছিল। রাজ্য সরকারের দাবি ছিল, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পেই তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ওই প্রকল্পের আওতায় পরিবারের মহিলাদের নামে কার্ড ইস্যু করে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতো। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বাস্থ্যসাথীর ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। শনিবারের ঘোষণার পর আপাতত সে উদ্বেগ অনেকটাই কাটল বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
❤ Support Us





